ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৫ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড

ঢাকা শনিবার, ৫ কার্তিক, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১৯ সফর, ১৪৪১

নিসচা সংবাদ, লিড নিউজ ‘অবিলম্বে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর বিধিমালা প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি’

‘অবিলম্বে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর বিধিমালা প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি’

লিটন এরশাদ,নিরাপদ নিউজ: আজ মঙ্গলবার বার জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা আকরম খাঁ মিলনায়তনে আগামী ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০১৯ এবং জাহানারা কাঞ্চনের ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন উপলক্ষে আজ প্রেসব্রিফিং এর মাধ্যমে অক্টোবরের এক মাস ব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির ঘোষণা করেন নিসচার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন।

সেইসাথে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর সংশোধনের উদ্যোগ থেকে সরে আসার আহবান জানিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এই আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করুন। তিনি বলেন, কোন গোষ্ঠীর স্বার্থে এই আইনে যেন কোন কাটাছেঁড়া না করা হয়। কিন্তু শুনতে যা পাচ্ছি এই আইনে যতটুকু পেয়েছি তার উপর ছুরিকাঁচি চালানো হলে আইনটি কতটুকু জনকল্যাণে কাজে লাগবে সেটাই ভাবতে হচ্ছে।একথা কারও অজানা নয়, অনেক যুদ্ধ করে, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর এই আইনটি আমরা পেয়েছি।

আপনারা জানেন ২০১২ সাল থেকে এই আইনটি পাশ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছিল। কিন্তু একটা গোষ্ঠীর কারণে সেটি করা যাচ্ছিল না। যখনই সরকার উদ্যোগি হয়েছে তখনই তারা জুজুর ভয় দেখিয়ে, কখনও কখনও জনগণকে জিম্মি করে বাধা দিয়ে আসছিল। কিন্তু আমরা থেমে থাকিনি। জনগণের পাশে থেকে ক্রমান্বয়ে আমরা দাবি জানিয়ে আসছিলাম। পাশাপাশি গতবছর কোমলমতী শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আসা, পুরো দেশের মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ায় প্রতীয়মান নিরাপদ সড়ক চাই গণমানুষের আশাআকাঙ্খার মূর্ত প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যার প্রেক্ষিতে আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং জনমানুষের কাঙ্খিত চাওয়ায় যে আইন তৈরি হয়েছে তাকে আবার কাটাছেঁড়ার কথা ভাবাটা কতটুকু যুক্তিসংগত আপনাদের মাধ্যমে আমি প্রশ্ন রাখলাম।

তিনি আরও বলেন, আমি কারও প্রতিপক্ষ না। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় আমাকে চালকদের প্রতিপক্ষ বানানোর একটা অপচেষ্টা। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই আমি কারও প্রতিপক্ষ নই। প্রত্যেকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে কাজ করে যাচ্ছি।

কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, ২ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ট্রাফিক আইন মানতে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু মোড়ে ক্যাম্পেইন ও পালিত কর্মসূচির আলোকে সমস্যা চিহ্নিত করে সরকারের কাছে তুলে ধরা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান ও শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে কি কি সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে তা চিহ্নিত করা এবং স্কুলের সামনের সমস্যা চিহ্নিত করে তা প্রতিকারে ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগী হওয়া, বিদ্যমান চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ প্রদান, পিটিআইয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান, সেমিনারের আয়োজন, র‌্যালী এবং বাস টার্মিনালসমূহে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা। সেইসাথে দেশব্যাপী বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে ও বাস টার্মিনাল ছাত্রীদের মাঝে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হবে।


সংবাদ সম্মেলনে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ২৫ বছর পূর্বে এ দেশের জনসংখ্যা ১১ কোটি থাকলেও দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি ছিলো। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি হলেও গাড়ির সংখ্যা ব্যাপকহারে বেড়েছে তারপরেও দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেছে। কিন্তু ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে এ দুর্ঘটনার নিহতের সংখ্যা বেড়েছে। এসব দুর্ঘটনা কমানোর জন্যই মাসব্যাপী আমাদের এই কর্মসূচি করা হচ্ছে।

এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক চাই এর আন্দোলনের কারণে রাজধানীতে কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে তা পুরোপুরি পরিবর্তন করার জন্য কিছু সময় দরকার কারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস পরিবর্তন হতে একটু সময় লাগবে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উদযাপন কমিটির আহবায়ক ও যুগ্ম মহাসচিব লিটন এরশাদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন, নিসচা’র কেন্দ্রিয় মহাসচিব ও প্রধান প্রশিক্ষক সৈয়দ এহসান উল হক কামাল। পবিত্র কোরআন তেলোআত করেন নাসিম রুমি। শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহবায়ক ও আন্তর্জাতিক সম্পাদক মিরাজুল মইন জয়। পরিচালনা করেন জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম আজাদ, সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নিসচার উপদেষ্টা এএইচএম নোমান, যুগ্ম মহাসচিব সাদেক হোসেন বাবুল ও লায়ন গনি মিয়া বাবুল, দপ্তর সম্পাদক ফিরোজ আলম মিলন, প্রচার সম্পাদক এ কে এম ওবায়দুর রহমান, সহ-প্রচার সম্পাদক সাফায়েত সাকিব, প্রকাশনা সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ, যুববিষয়ক সম্পাদক জুনাইদুর রহমান মাহফুজ, সমাজকল্যাণ সম্পাদক আসাদুর রহমান আসাদ, কার্যনির্বাহী সদস্য কামাল হোসেন খান, নজরুল ইসলাম ফয়সাল, সেকান্দার আলম রিন্টু, জামাল হোসেন মন্ডল, সাধারণ সদস্য মোঃ মোহসিন খান, আবুল হোসাইন, শাহআলম সাবু, আবদুল মান্নান ফিরোজ, কাজী নসরুল্লাহ, হুমায়ুন আহমেদ, আবুল বাসার মজুমদার, মোঃ মুজাহিদ আলম, মোঃ আবদুল আলীম, এডভোকেট রাবেয়া সুলতানা, এহসান জুয়েল, মঞ্জু, নুরে আলম, ষিউলি আক্তার, রাইসিন গাজী, আনজুমান আরা তন্বি, নুরুল আজিম, মোঃ সাকিব হোসেন প্রমুখ।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০১৯ উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলন উপলক্ষে চেয়ারম্যানের বক্তব্য

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা

আসসালা মুআলাইকুম। সকলের সুস্বাস্থ্য ও সড়কে নিরাপদ জীবন কামনা করে আজকের সংবাদ সম্মেলন শুরু করছি।
আপনারা নিশ্চয়ই জানেন নিরাপদ সড়ক চাই প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ২২ অক্টোবরকে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ হিসেবে পালন করে এই দিনটিকে জাতীয় স্বীকৃতি দিয়ে সরকারীভাবে পালনের দাবী জানিয়েছিলাম। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ৫ জুন সরকার ২২ অক্টোবরকে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এবছর তৃতীয়বারের মত দেশব্যাপী সরকারীভাবে ২২ অক্টোবর ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ হিসেবে পালিত হবে। আমরাও সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। সরকারের পাশাপাশি দেশব্যাপী ১২০টি শাখা সংগঠনের মাধ্যমে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করতে যাচ্ছি। সেইসাথে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ বিদেশে আমাদের শাখা সংগঠনসমুহ একই কর্মসূচী পালন করবে।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা

আপনারা জানেন, আজ থেকে ২৬ বছর আগে কেন এবং কি প্রেক্ষাপটে আমি নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন শুরু করেছিলাম তা আপনাদের অজানা নয়। আমার স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর আমি যখন চলচ্চিত্র জগৎ ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম তখন আমার কিছু শুভাকাংখীর পরামর্শে স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার জন্য নয় বরং এদেশের জনগণকে সড়কের মড়ক থেকে রক্ষার জন্য এই আন্দোলন গড়ে তুলি। দীর্ঘ ২৬ বছরের পথ চলার শুরুতে এদেশের নামিদামি গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ অনেকেই আমার সাথে ছিলেন যাদের অনেকে এখনো আন্দোলনের সাথে আছেন, আবার অনেকেই মারা গেছেন। যারা মৃত্যুবরণ করেছেন আমরা তাঁদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। দীর্ঘ এই পথ পরিক্রমায় এদেশের কোটি কোটি জনগণ আমাকে সমর্থন দিয়েছে, ভালবাসা দিয়েছে বিশেষ করে আপনারা মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ আমার কর্মকা-কে অকুন্ঠ সমর্থন দিয়ে গেছেন যার ফলশ্রুতিতে ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-এর স্বীকৃতি অর্জন।
সেইসাথে দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কের দাবীতে জনতার স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ, সমাজের সর্বস্তরে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ঢেউ আমাদের ২৬ বছরের নিরবচ্ছিন্ন শ্রমকে যৌক্তিক অবস্থানে উন্নীত করেছে বলে আমি মনে করি।

প্রিয় সাংবাদিক সমাবেশ

নিরাপদ সড়ক চাই ১৭ কোটি মানুষের প্রাণের দাবীতে পরিণত হয়েছে আমাদের শ্রমের বিনিময়ে। আমাদের গঠনমূলক ও কার্যকর কর্মসূচি- জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে দেশের সর্বত্র সভা, সমাবেশ ও র‌্যালী, বিদ্যমান চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা, দেশের সকল বাস টার্মিনালসমূহে চালক ও যাত্রীদের মাঝে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলা, অভিভাবকদের মাঝে সড়ক নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা, তৃণমূল পর্যায় থেকে আগামী প্রজন্মকে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের (পিটিআই-এর মাধ্যমে) প্রশিক্ষণ প্রদান সর্বোপরি আপনারা (সংবাদ মাধ্যম) নিরাপদ সড়কের দাবীকে গুরুত্ব প্রদান করে তুলে ধরায় আজ টেশনাফ থেকে তেতুলিয়ায় সমস্বরে আওয়াজ উঠেছে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’। আমরা দাবী করতে পারি এটি আমাদের ২৬ বছরের আন্দোলন ও সংগ্রামের অর্জন।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা

২৬ বছর পূর্বে এদেশের জনসংখ্যা ছিল ১১ কোটি, গাড়ী ও সড়কের সংখ্যা ছিল অনেক কম কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিমাণ ছিল অনেক বেশী। তখন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা প্রতিবছর গড়ে ১০,০০০/১২,০০০ এর উপর ছিল। আহতের সংখ্যা ছিল গড়ে ২৫,০০০/৩০,০০০। আজ দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি, রেজিস্ট্রেশনকৃত গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ। তবে আনরেজিস্টার্ড গাড়ী তথা নসিমন, করিমন, ইজিবাইক, ভটভটি, মোটরসাইকেল মিলিয়ে এসংখ্যা হবে প্রায় ৬০ লাখ। সড়কের পরিধি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে সে তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত ও আহতের সংখ্যা অনেকাংশে কমে এসেছে। আমাদের আন্দোলনের ফলে সকলের মাঝে সচেতনতা সৃস্টি হচ্ছে বিধায় এ সুফল পাওয়া গিয়েছে। তবে কাংখিত সচেতনতা এখনও তৈরী হয়নি বলে আমরা মনে করি। গত বছর ২০১৮ সালে এসে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ৩১০৯। এতে আহত হয় ৭৪২৫ জন এবং নিহত হয় ৩৬৯৯ জন। যা এখনও উদ্বেগের বিষয়।

প্রিয় সাংবাদিক সমাবেশ

আমরা প্রচন্ড আশাবাদী বর্তমান সরকারের আন্তরিকতা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে যথেষ্ট আন্তরিক। তিনি সমস্যার গভীরে গিয়ে চালক তৈরির প্রশিক্ষকের অভাব নিরসনে প্রশিক্ষক তৈরির নির্দেশ প্রদানসহ লাইসেন্সবিহিন চালকদের লাইসেন্সের আওতায় আনা, হালকা যানবাহনের চালকদের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে যোগ্যতা সাপেক্ষে ভারী যান চালানোর লাইসেন্স প্রদান, সড়ক-মহাসড়কের ত্রুটি নিরসনে নির্দেশ প্রদান করেছেন। পাশাপাশি তিনি ১৭ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন তা বাস্তবায়নে সরকারের প্রতিটি সংস্থা তৎপর রয়েছে।

আমরা পথপ্রদর্শক বলেই আজ সড়ক জাতীয় সমস্যার একটি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে সমাধানের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায় কখনও কখনও আমাদের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও সড়ক নিয়ে বিভিন্ন সভা সেমিনারে কিংবা মতবিনিময়ে নিরাপদ সড়ক চাই’র নাম উপেক্ষা করা হয়। কেন কি কারণে এমনটা করা হয় আমরা সেদিকে যেতে চাইনা। আমরা বলতে চাই দেশবাসী তথা প্রবাসে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের ঢেউ যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে জনতাই আমাদের স্বীকৃতি।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা

পাশাপাশি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই আমরা পথ দেখিয়েছি এইমর্মে যে, সড়ক দুর্ঘটনা নিরাময় ও নিরসনযোগ্য। জনসচেতনতা ও বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে লাঘব করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসতে বাধ্য। ২৬ বছর ধরে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ে সেধরনের কর্মসূচিতে আরও বেশি করে উদ্যোগী হয়েছে।
কিন্তু এর মাঝেও দুঃখের সাথে বলতে হয় পথচারী, যাত্রী ও গণপরিবহনের মালিক-চালকের মাঝে সচেতনতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। কেন, কি কারনে প্রতিনিয়ত ধ্বংসস্তুুপ দেখার পরেও তাদের টনক নড়ছে না, আমি ভেবে পাইনা। রাজপথে প্রতিদিনের অব্যবস্থাপনার চিত্র যখন আমি সংবাদপত্রে দেখি মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। আমি মনে করি এ জন্য সরকারী, বেসরকারী এবং সকল সামাজিক সংগঠন বিশেষ করে রোড সেফটি বিষয়ে কাজ করছেন সে সকল সংগঠনকে জনগণের মানসিকতা পরিবর্তনের বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালনে আরও তৎপর হয়ে উঠতে হবে।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা

এবার আসছি বহুল প্রতীক্ষিত ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ এর বাস্তবায়ন প্রসঙ্গ নিয়ে। আমি শংকিত, আমি উদ্বিগ্ন। একবছর হয়ে গেল এই আইনটি পাশ হওয়ার পর কোন বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। যে কারণে আইনটি বাস্তবায়ন কিংবা প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। আমার প্রশ্ন কেন এই আইন নিয়ে কালক্ষেপন করা হচ্ছে। এরই মাঝে সরকারের দুইজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী (স্বরাষ্ট্র ও আইন) যখন বলেন, এই আইনটি সংশোধন করা হবে। তখনই আমাদের চিন্তার মধ্যে পড়তে হয়। এমনিতেই আইনটি আমরা যেভাবে চেয়েছি তাতে আমাদেও আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেনি। এই আইন প্রণয়নে আমাদের পক্ষ থেকে ছোট বড় মিলিয়ে একাধিক সংশোধনী দেয়া হয়েছিলো। বিশেষ করে আইনটির শিরোনাম ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০১৮’, সড়ক দুর্ঘটনায় শাস্তির মেয়াদ দশ বছর করা, অবৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং লাইসেন্সবিহীন ও ফিটনেসবিহীন গাড়ী চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটালে এবং তাতে কারো মৃত্যু হলে মামলা ৩০২ ধারায় হবে উল্লেখযোগ্য। যেহেতু নানামত ও গোষ্ঠী রয়েছে প্রত্যেকের চাওয়া পাওয়ার হিসেব আছে- সবাইকেই সরকারকে আস্থার মধ্যে রাখতে হবে সেহেতু আমরা যতটুকু পেয়েছি তাতেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা

কিন্তু শুনতে যা পাচ্ছি এই আইনে যতটুকু পেয়েছি তার উপর ছুরিকাঁচি চালানো হলে আইনটি কতটুকু জনকল্যাণে কাজে লাগবে সেটাই ভাবতে হচ্ছে।একথা কারও অজানা নয়, অনেক যুদ্ধ করে, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর এই আইনটি আমরা পেয়েছি। আপনারা জানেন ২০১২ সাল থেকে এই আইনটি পাশ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছিল। কিন্তু একটা গোষ্ঠীর কারণে সেটি করা যাচ্ছিল না। যখনই সরকার উদ্যোগি হয়েছে তখনই তারা জুজুর ভয় দেখিয়ে, কখনও কখনও জনগণকে জিম্মি করে বাধা দিয়ে আসছিল। কিন্তু আমরা থেমে থাকিনি। জনগণের পাশে থেকে ক্রমান্বয়ে আমরা দাবি জানিয়ে আসছিলাম। পাশাপাশি গতবছর কোমলমতী শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আসা, পুরো দেশের মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ায় প্রতীয়মান নিরাপদ সড়ক চাই গণমানুষের আশাআকাঙ্খার মূর্ত প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যার প্রেক্ষিতে আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং জনমানুষের কাঙ্খিত চাওয়ায় যে আইন তৈরি হয়েছে তাকে আবার কাটাছেঁড়ার কথা ভাবাটা কতটুকু যুক্তিসংগত আপনাদের মাধ্যমে আমি প্রশ্ন রাখলাম।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা

এদিকে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, বিষয়টি শুধুই গুঞ্জন বলে দাবি করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আমরা মাননীয় মন্ত্রীর কথায় আশাবাদী হতে চাই। আমরা বিশ^াস করি মাননীয় সড়কমন্ত্রীর কথানুসারে বিষয়টি গুঞ্জন আকারে থাকলেই জনমনে স্বস্তি নেমে আসবে।
একইসঙ্গে, সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় সুশাসন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নয়নে ও দুর্ঘটনারোধে প্রধানমন্ত্রীর ছয় নির্দেশনার আলোকে, আইনটির যথাযথ বাস্তবায়নে অনতিবিলম্বে এর বিধিমালা প্রণয়ন এবং স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানাই।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা

আমি এখন আগামী ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০১৯ এবং জাহানারা কাঞ্চনের ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন উপলক্ষে আজ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অক্টোবর মাসজুড়ে নিরাপদ সড়ক চাই প্রণীত মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির ঘোষণা করছি।
কর্মসূচিগুলো হচ্ছে ট্রাফিক আইন মানতে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু মোড়ে ক্যাম্পেইন ও পালিত কর্মসূচির আলোকে সমস্যা চিহ্নিত করে সরকারের কাছে তুলে ধরা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান ও শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে কি কি সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে তা চিহ্নিত করা এবং স্কুলের সামনের সমস্যা চিহ্নিত করে তা প্রতিকারে ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগী হওয়া, বিদ্যমান চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ প্রদান, পিটিআইয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান, সেমিনারের আয়োজন, র‌্যালী এবং বাস টার্মিনালসমূহে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা।

সুপ্রিয় সাংবাদিক সমাবেশ

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘জীবনের আগে জীবিকা নয়, সড়ক দুর্ঘটনা আর নয়’।
এখন মাসব্যাপী পালিতব্য কর্মসূচির সিডিউল তুলে ধরছি
০১ অক্টোবর- সংবাদ সম্মেলন (আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে)।
০২ অক্টোবর- কাকরাইল মোড়ে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক ক্যাম্পেইন পরিচালনা (বিকেল ৩টা)।
০৩ অক্টোবর- মিরপুরের ১০ নম্বরে অবস্থিত আবু তালেব স্কুলে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক ক্যাম্পেইন পরিচালনা
(সকাল ১১টা)।
০৫ অক্টোবর- ১০ অক্টোবর পর্যন্ত কাকরাইল, বাংলামটর, পুরানা পল্টন, হাইকোর্টের মোড়ে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক
ক্যাম্পেইন পরিচালনা
১২ অক্টোবর- শনির আখড়ায় অবস্থিত বর্ণমালা স্কুলে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক ক্যাম্পেইন পরিচালনা
(সকাল ১১টা)।
১৩ অক্টোবর- ফেনীতে চালক প্রশিক্ষণ কর্মশালা
১৪ অক্টোবর- ২১ অক্টোবর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন মোড়, বিভিন্ন স্কুল/কলেজ/বিশ^বিদ্যালয় ও বাস টার্মিনালে
সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক ক্যাম্পেইন পরিচালনা।
২২ অক্টোবর- সরকারীভাবে গৃহীত সকল কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ।
২৩ অক্টোবর- সকাল ১১.০০টায় মরহুমা জাহানারা কাঞ্চনের কবর জিয়ারত ও বিকেলে কেন্দ্রীয়সহ সকল শাখা
সংগঠনের উদ্যোগে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন।
২৪ অক্টোবর- ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকাসহ জেলা/উপজেলা পর্যায়ের বাস টার্মিনালে চালক ও যাত্রীদের মাঝে সড়ক
নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা।
২৮ অক্টোবর- মুন্সীগঞ্জ পিটিআইতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ
কর্মশালা পরিচালনা।
২৯ অক্টোবর- মিরপুর আইডিয়াল গার্লস স্কুলে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক ক্যাম্পেইন পরিচালনা।
৩০ অক্টোবর- দক্ষিণ খানে অবস্থিত ইমারাত হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক ক্যাম্পেইন পরিচালনা
৩১ অক্টোবর- চট্টগ্রাম পিটিআইতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ
কর্মশালা পরিচালনা ও মাসব্যাপী কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা।

সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা

পরিশেষে বলতে চাই-বাংলাদেশে বহু দিবস পালিত হয় কিন্তু ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস সেরকম দিবস নয়। এটির মাধ্যমে আমরা শুধু একদিনে দিবসটি উদযাপন করবো না বরং সারা বছর আমরা বিভিন্ন কার্য্যক্রমের মাধ্যমে চালক, মালিক, পথচারি, যাত্রী, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমজীবী, পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মকান্ড অব্যাহত রাখবো এবং দেশবাসিকে সচেতন করার মাধ্যমে দেশকে সড়ক দুর্ঘটনার মহামারী থেকে উদ্ধার করবো ইনশাআল্লাহ।

প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা-

আপনাদের মাধ্যমে ২২ অক্টোবরকে নিয়ে আমাদের সংগঠন কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কর্মসুচী এবং আমাদের কর্মকান্ডের কিছু দিক সংক্ষেপে তুলে ধরলাম। এ ছাড়া সরকার জাতীয় নিরাপদ সড়ক’ দিবস উপলক্ষে যে কর্মসুচী গ্রহন করবেন তার প্রতিও আমাদের সার্বিক সমর্থন ও অংশগ্রহণ থাকবে। সরকারী কর্মসুচিতে আমাদের সকল শাখা কমিটি, সামাজিক সংগঠন ও দেশবাসীকে অংশগ্রহন করে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের কর্মসুচিকে সাফল্যমন্ডিত করার জন্য আপনাদের মাধ্যমে বিনীত আহবান জানাচ্ছি।

দীর্ঘ ২৬ বছরের এ সামাজিক আন্দোলনের সফলতায় আপনারা সাংবাদিকবৃন্দ আমাদের পাশে থেকে যে সহযোগিতা, সহমর্মিতায় আবদ্ধ করেছেন তার জন্য আপনাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে,সু-স্বাস্থ্য কামনা করে আজকের সাংবাদিক সম্মেলন শেষ করছি। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হোন।

পথ যেন হয় শান্তির, মত্যুর নয়।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)