ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ১ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড

ঢাকা রবিবার, ৩ আষাঢ়, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ১৩ শাওয়াল, ১৪৪০

বিনোদন, লিড নিউজ, সাক্ষাৎকার আজ ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র ৩০ বছরপূর্তি: সিনেমাটি সম্পর্কে একান্ত আলাপে ইলিয়াস কাঞ্চন

আজ ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র ৩০ বছরপূর্তি: সিনেমাটি সম্পর্কে একান্ত আলাপে ইলিয়াস কাঞ্চন

নিরাপদ নিউজ: বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে- এই গানটি কেউ শোনেননি বা ছবিটি কেউ দেখেননি এমন কোনো দর্শক খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস সৃষ্টিকারী ছবি ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ পার করেছে ৩০টি বছর। ১৯৮৯ সালের এই দিনে (৯ জুন) দেশের চলচ্চিত্রে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি হয়। মুক্তি পায় ‌‘বেদের মেয়ে জোসনা’। নবীন পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুল ক্যারিয়ারে তুঙ্গে থাকা নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়ে তৈরি করেন চলচ্চিত্রটি। যেখানে জোসনা হিসেবে ছিলেন অঞ্জু ঘোষ। প্রচলিত আছে, মাত্র ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ ছবিটি তুলে আনে ২৫ কোটি টাকারও বেশি।এতগুলো বছর পার হলেও আজও ছবিটির রেকর্ড কেউ ভাংতে পারেনি। রেকর্ড ভাঙা তো দূরের কথা—গত বিশ বছরেও কোনো সিনেমা ১৫ কোটি টাকা আয় করেনি, সেখানে আলোচিত সিনেমাটির আয় ২৫ কোটি টাকা! এবং নানা বিচারে এ সিনেমার রেকর্ড ভাঙা প্রায় অসম্ভব! সিনেমাটি প্রথম সপ্তাহে খুব বেশি হলে মুক্তি পেয়েছে এমন না। কারণ কেউ ভাবেনি সিনেমাটি মারমার কাটকাট ব্যবসা করবে। ঢাকার বাইরের কিছু হলে মুক্তি পায়। তাই প্রথম সপ্তাহ হাউসফুল হলেও আয় অনেক বেশি হওয়ার কথা না। কিন্তু এরপর তো ইতিহাস। আর ওই সময় দেশে হল ছিল ১২০০ এর বেশি। সব হলেই ঘুরে ঘুরে ইলয়াস কাঞ্চন ও অঞ্জু ঘোষ অভিনীত সিনেমাটি চলেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একাধিকবার চলেছে। চলচ্চিত্রটি মুক্তির ৩০ বছরপূর্তিতে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বললেন এ ছবির নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। ইলিয়াস কাঞ্চনের দেয়া সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:

* ছবিটির সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে শুরুটা হয়েছিল কীভাবে?
ইলিয়াস কাঞ্চন: এ ছবিতে আমার কাজ করার কথাই ছিল না। কারণ একদমই শিডিউল ছিল না আমার। যখন প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন আমি ক্যারিয়ারের তুঙ্গে। ইন্ডাস্ট্রির এক নম্বর নায়ক। প্রায় ৩ বছরের শিডিউল সবাইকে দেওয়া। কিন্তু এমন কিছু মানুষ এই প্রস্তাব নিয়ে আসেন, আমি ‘না’ করতে পারিনি। আর ছবির পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুল ‘গো’ ধরে ছিলেন আমাকে ছাড়া কাউকে নিয়ে কাজটি করবেন না। বকুলের এটাই ছিল প্রথম ছবি। কিন্তু সে আমার অনেক ছবিতে প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি আবার মতিউর রহমান পানু ও দারাশিকোর প্রধান সহকারী ছিলেন। দারাশিকোর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল বাবা-ছেলের মতো। তিনি আমাকে অনেক পরামর্শও দিতেন। তারা আমাকে খুব করে বলেন। বিশেষ করে দারাশিকোর কারণে এই ছবিতে কাজ করতে সম্মত হই।

* আপনার তো শিডিউল ছিল না। কাজ শুরু করলেন কীভাবে?
ইলিয়াস কাঞ্চন: সে সময় আমি ও দারাশিকো ‘বোনের মতো বোন’ নামের ছবি প্রযোজনা করছিলাম। তিনি এসে বলেন, ‘বকুল তোমাকে ছাড়া ছবি করবে না। ওর প্রথম চলচ্চিত্র। হিরো, আপনি পরের মাসে ‘বোনের মতো বোন’-এর সাত দিনের যে সময় আছে সেটা তাকে দিয়ে দেন।’ আমি বললাম, এটা হলে তো আমাদের ছবি মুক্তি দিতে পারব না। তিনি আমাকে যুক্তি দেখালেন। বললেন, ‘অনেক প্রযোজক ছবি শিডিউল মিস করে। সেখানে আমরা কাজ করে নিতে পারবো।’ এভাবেই ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র শুরু করি।

*শোনা যায়, এ ছবিতে আপনার নায়ক হওয়ার কথা ছিল না। অন্য কারও এটা করার কথা!
ইলিয়াস কাঞ্চন: প্রথম দিকে প্রযোজক আব্বাস উল্লাহ হিরো সাত্তারকে চুক্তিও করেন ছবিটির জন্য। পাঁচ হাজার টাকা বুকিং মানিও দেওয়া হয়। কিন্তু পরিচালক বকুলের এককথা—আমাকে ছাড়া সে ছবি করবে না।

*শুটিং শুরুর কথা বলছিলেন। এটা কোথায়  হলো?
ইলিয়াস কাঞ্চন: শুরুতে টানা ৭ দিনের কাজ করি। বিএফডিসিতে রাজদরবারের সেট তৈরি করা হয়। এখানেই রাজদরবারের শুটগুলো হয়। পাশাপাশি সাপে আমাকে দংশন করা, ওঝা ও বিষ নামানোর দৃশ্যগুলোও সেখানে হয়। ছবিটির শুটিংয়ের মধ্যেই বুঝতে পারি, এটি হিট হতে যাচ্ছে। তবে এভাবে সুপারহিট হবে, ভাবিনি। ছবিতে আমাকে সাপে কাটলো। বাবা ঘোষণা দিলেন, যে আমাকে সারাতে পারবে, সে যা চাইবে তাকে তা দেওয়া হবে। এ সময় ‘মরণ বীণ’ বাজাতে এগিয়ে এলো অঞ্জু। এ বীণ বাজালে সাপ এসে বিষ চুষে নেবে। রক্তবমি হয়ে অঞ্জু মারা যাবেন! পরিবারের বাধা সত্ত্বেও অঞ্জু বীণ হাতে নেয়। এত জীবনঘনিষ্ঠভাবে ছবিটি পরিচালক ফুটিয়ে তোলেন, যার প্রভাব আমরা হলেও দেখি। এ দৃশ্য আসার সঙ্গে সঙ্গে হলের দর্শকরাও মনের অজান্তে নিজেদের চুলের বাঁধন খুলে ফেলেন। যেন সাপ আসে, রাজকুমার বেঁচে ওঠে। এই যে ভালোবাসা, তা টাকার চেয়েও বেশি।

*শোনা যায়, ছবিটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৫ কোটি টাকা তুলেছে। আসলে লাভের হিসাবটা কেমন?
ইলিয়াস কাঞ্চন: এটার সঠিক তথ্য আমার কাছে নেই। বলাটাও মুশকিল।


*কিন্তু উদাহরণ তো আছে। যেটা দিয়ে আঁচ করা সম্ভব।
ইলিয়াস কাঞ্চন: ছবি মুক্তির আগেই আমরা এর গান বিক্রি করে দিতাম। অঞ্জু ঘোষের অবস্থা তখন খুব একটা ভালো নয়। টানা ১৯টি চলচ্চিত্র ফ্লপ। ছবি হিট হবে না ভেবে এক ভদ্রলোক আমাদের অডিও কিনেও পরে তা ফিরিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে যিনি কিনেছিলেন তার নামটা মনে আসছেন না। তিনি এই অডিওর লাভেই এক কোটি টাকার একটি বাড়ি কিনেছিলেন। আর আগের ভদ্রলোক (যিনি বুকিং দিয়েও টাকা ফিরিয়ে নিয়েছিলেন) তো প্রায় পাগল প্রায় অবস্থা। টানা ৬ মাস তিনি অসুস্থ ছিলেন। শরীর একটু ভালো হলেই শুধু বলতেন, এটা আমি কী করেছি!

* ছবির নাম ভূমিকায় ছিলেন অঞ্জু ঘোষ। তিনি কীভাবে যুক্ত হলেন?
ইলিয়াস কাঞ্চন: অন্য বেশ কয়েকজন নায়িকা ব্যস্ত। অঞ্জু ঘোষের টানা ১৯টি চলচ্চিত্র ফ্লপ। তাকে নিয়ে অনেকেরই আপত্তি। অন্যদিকে আমি বছরের ১৯-২০টি করে চলচ্চিত্র করছি। প্রায় সবই সুপারহিট। বাজারে কানাঘুষা চলছিল ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ অঞ্জুর ২০তম ফ্লপ ছবি হতে যাচ্ছে। সঙ্গে আমিও ডুবতে যাচ্ছি! তবে অঞ্জু মনপ্রাণ দিয়ে এটির কাজ করে যান। যার ফল সবাই জানেন।

* ছবি মুক্তির পর এর প্রভাব তো কেটে যায় নিশ্চয়ই? না হলে তো এতটা হিট হতো না?
ইলিয়াস কাঞ্চন: সত্যি বলতে, প্রথম কয়েকদিন ছবিটি চালাতে আমাদের কষ্ট হয়েছিল। তবে প্রথম দুই দিন যারা দেখেছিল, তারা মুখেই এর প্রচারণা করেছিলেন। এটা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। আমি ছবি মুক্তির দিন খুলনা ও রাজশাহীতে গিয়েছিলাম। তবে চট্টগ্রামে ছবিটি প্রথমে মুক্তি পায়নি। পরিচালক আবুল কাশেমের চট্টগ্রামের সিনেমা হলগুলোতে ছবিটি চালানোর কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে তিনি বেঁকে বসলেন। টানা ১৯ ছবির ফ্লপ নায়িকা, সঙ্গে নতুন পরিচালক—সব মিলিয়ে তিনি ছবিটি চালাতে রাজি নন। প্রযোজক আব্বাস উল্লাহ রাগে হাত দিয়ে টেবিলের গ্লাস ভেঙে ফেলেছেন। এমনই নানা সমস্যা কাটিয়ে ছবিটি মুক্তি পায় এবং ইতিহাস হয়ে যায়। এসব ভাবলে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। ভাবি, চলচ্চিত্রের জন্য কী অসাধারণ দিন পার করে এসেছি।

বাংলা ট্রিবিউনের সৌজন্যে

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)