ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট জুলাই ৪, ২০১৯

ঢাকা মঙ্গলবার, ২ শ্রাবণ, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ১৩ জিলক্বদ, ১৪৪০

সম্পাদকীয় আমরা সত্য আর জানিলাম না: গডফাদারদের নিশ্চিন্ত ঘুম!

আমরা সত্য আর জানিলাম না: গডফাদারদের নিশ্চিন্ত ঘুম!

নিরাপদ নিউজ: সমাজে যারা নয়ন বন্ডদের বীজ বপন করে, পানি দেয়, সার দেয়, পরিচর্যা করে। আর (পর্দার আড়াল থেকে) ফল ভোগ করে, তাদের ‘ক্রসফায়ার’ কি কখনো দেশবাসী দেখতে পারবে? এমন গভীর রাতে পুলিশ সুধুমাত্র নয়ন বন্ডকেই গুলির নিশানায় পেয়ে হত্যা করতে পারলো? আর কোন সহযোগীই ন্যূনতম আহত পর্যন্ত হলো না? সুস্থভাবে পালিয়ে গেলো? নয়ন যে অন্যায় করেছে, এতে তার মৃত্যুই কাম্য ছিল, তবে সেটা বিচাররকের রায়ে। এ বন্দুকযুদ্ধের অন্তরালের ঘটনায় কাউকে আড়াল করা হলো নাতো?

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার ভোররাতে বরগুনা সদরের বুড়িরচর ইউনিয়নের পূর্ব বুড়িরচর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি তাজা গুলি, তিনটি রামদা ও তিনটি গুলির খোসা জব্দ করা হয়েছে।

একজন নয়ন বন্ড কীভাবে তৈরি হয়? কিংবা নয়ন বন্ড কার লোক? এ প্রশ্নের উত্তর কখনো পাওয়া যায় না। মাঝে মধ্যে চুনোপুঁটি মেরে রাঘব-বোয়ালদের আড়াল করা হয় মাত্র! কথা হলো, আড়ালে থাকা এই মহারথীরা কারা? কেন এদেরকে আড়াল করা হচ্ছে? এদের কালো হাত কতদূর বিস্তৃত? কখনো জানতে পারা যাবে কী?

সম্প্রতি বরগুনা সরকারি কলেজের মূল ফটকের সামনের রাস্তায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফ নামের এক তরুণকে। এ সময় বরগুনা সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী আয়েশা সিদ্দিকা তার স্বামীকে রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালান। কিন্তু সন্ত্রাসীরা তাকে (রিফাত) উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়। জনবহুল এলাকায় এমন নৃশংস হামলার ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভের ঝড় ওঠে।

একথা শতভাগই ঠিক যে, নয়ন বন্ডরা খেলার পুতুল মাত্র! ক্রসফায়ার তাদেরও প্রাপ্য, যারা নয়ন বন্ডদের তৈরি করে। বন্ধুকযুদ্ধ হলো, নয়ন বন্ড নিহত হলো, কিন্তু তার সহযোগীদের কেউ ধরা পড়লো না, বা আহতও হলো না! নয়ন বন্ডকে যারা তৈরী করেছে, বন্ডকে বিচারের মুখোমুখি করলে যাদের নাম প্রকাশ পেতো, সেই গডফাদারদের অদৃশ্য ইশারাতেই যে নয়ন বন্ডকে হত্যা করা হয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। বন্দুক যুদ্ধ শুধুই মুখোশধারী রাজনীতিকদের রক্ষা করে। এসব শুধুই প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতা ও আশ্রয়-প্রশ্রয় ধামাচাপার অপকৌশল মাত্র! সেই সাথে দেশও ‘আসল’ সত্যটা জানতে পারলো না। গডফাদারদের ঘুম নিশ্চিন্ত হলো!

নয়ন তো একজন নয়। বরগুনার সন্ত্রাস ও মাদক সাম্রাজ্যে ছোট্ট একটি হিস্যা মাত্র, এই সাম্রাজ্যে প্রতিটি কোনায় কোনায় নয়নরা আছে, তাদের কী হবে? সে উত্তর কারো কাছে আছে কী? তবে একথা ঠিক, এই সন্ত্রাস সাম্রাজ্যের মূল মালিকরা বরাবরই যখন যারা ক্ষমতায় থাকে ক্ষমতার তাদের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়েই থাকে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিচারহীন কতিপয় খুনেও শান্তিপ্রিয় মানুষের নেচে ওঠে! মন ভাল লাগে! বোঝা যায়, পাড়ায়-মহল্লায়, বেকার, চাঁদাবাজ, অহেতুক যন্ত্রণাবাজ এসব রাজনৈতিক লেজুরধারী কীটদের সর্বসাধারণ মন থেকে কতটা ঘৃনা করে! সোশ্যাল মিডিয়ায় নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহতে ঘটনায় মানুষ শোক নয়, নানাভাবে আনন্দ প্রকাশ করেছে। কোনো করুণা বা আক্ষেপের কথা শোনায় যায়নি। এ থেকে নয়ন বন্ডের সাঙ্গ-পাঙ্গদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। নয়ন বন্ডের মদদদাতারা এভাবেই তাদের স্বার্থসিদ্ধি করে নিজ দলের ক্যাডারদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। একটি ছবিতে দেখা গেছে, কলাপাতার ওপর হাফ প্যান্ট পরা নয়ন বন্ডের লাশ অযত্নে, অবহেলায় পড়ে আছে। অথচ ৩ দিন আগেও তার ভয়ে বরগুনা প্রকম্পিত ছিল!

পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম ব্যক্তিরও বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হওয়া উচিত নয়। যারা এই হত্যাকে সাধুবাদ দিচ্ছেন, তারা কি ভেবে দেখেছেন বাংলাদেশে এই ক্রসফায়ার নাটক কতদিন শুরু হয়েছে? তাতে কয়জন সন্ত্রাসী ভয় পেয়েছে? কয়জন দমেছে? একটা অন্যায়কে কখনোই আর একটা অন্যায় দিয়ে জাস্টিফাই করা যায় না। অন্যায়কে অন্যায় হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে। যদিও কারো বিচার বর্হিভূত মৃত্যু চাওয়া অন্যায়, তারপরও বর্তমান আইনি কাঠামোয় বিচারের দীর্ঘসূত্রিতায় না চেয়ে উপায় নেই দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের। দেখা যেতো আইনের মারপ্যাচে পড়ে ও উকিল, আদালতে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে স্বামী হারা নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী আশেয়া সিদ্দিকার জীবনে কত ভোগন্তি নেমে আসতো তার সীমা নেই।

এজন্যে এ ধরনের হত্যাকা-ের বিচারে, জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্র আইন সংশোধন করে হলেও, ‘নগদ শাস্তির’ বিধান কার্যকরে আইন করত হবে। বিচারের আওতায় এনে অপরাধীকে শাস্তি দিলে সমূলে অপরাধের উৎপাটন ঘটবে। কিন্তু এভাবে ক্রসফায়ার দিলে একজন অপরাধী হয়তো কমে যায় কিন্তু চক্র ঠিকই থাকে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে নয়ন বন্ড তৈরি হবেই।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)