ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট আগস্ট ৭, ২০১৯

ঢাকা সোমবার, ৫ ভাদ্র, ১৪২৬ , শরৎকাল, ১৮ জিলহজ্জ, ১৪৪০

সাহিত্য আমার রবীন্দ্রনাথ

আমার রবীন্দ্রনাথ

শ্রাবণী হালদার রাখী, নিরাপদ নিউজ: আপনার সঙ্গে কবে আমার প্রথম চেনা হলো? কবে ? যেদিন ভীষণ দুঃখের ভিতর এক রৌদ্রহীন, বর্ণহীন ভোরে বিনিদ্র রাত্রির পর জেগে উঠে মনে হলো – কোনো মানে নেই, কোনো অর্থ নেই বেঁচে থাকার; পৃথিবীতে আলো নেই, হাসি নেই, বন্ধুতা নেই; সমস্ত রাত্রি বিনিদ্র চোখে যে অন্ধকারের পাথরে মাথা খুঁড়েছি, নখ দিয়ে ছিঁড়তে চেয়েছি যে গাঢ় কালো_ সকালের সমস্ত গায়ে তারই শুকনো ছড়,কালশিটে ,রক্তের দাগ লেগে আছে। আমি ঈশ্বরহীন, ব্রতহীন, বিশ্বাসহীন এক অচ্ছুৎ মানুষ; আমি চূর্ণ, বিচূর্ণ ; বড় একা।
তখন একটি সুর, একটি মূর্ছনা, কিছু বাণী আমার কাছে পৌঁছেছিল । যেভাবে ফাঁসির সেলে পৌঁছোই আলোর একটি কিরণ, বাতাসের একটি তরঙ্গ । যেভাবে ক্ষুধার্তের কাছে পৌঁছোই রুটির প্রথম টুকরো, তৃষ্ণাফাটা মানুষের কাছে জলপাত্র । আমি কতবার শুনেছি, কতবার…। কিন্তু সেদিন সেই হতাশার দীর্ঘ অন্ধকার গুহায় একা- শুনলাম, বুঝলাম, দেখতে পেলাম-আকাশ। সমস্ত আকাশ কিভাবে খোঁচিত হয়ে যাচ্ছে সূর্য-তারায় । দেখতে পেলাম, অজস্র তারকাকণায় খোঁচিত নিহারিকাপুঞ্জ ঘুরে উঠছে আকাশপারের মহাকাশে, ছিটিয়ে দিচ্ছে আজস্র নতুন তারা, নতুন প্রাণ, নতুন নতুন ভুবন। দেখতে পেলাম সমস্ত প্রপঞ্চজুড়ে পুঞ্জে পুঞ্জে, স্তরে-স্তরে বিথরে সজ্জিত প্রাণ। প্রাণ। বিশ্বভরা প্রাণপুঞ্জ।
আমার বিবর্ণ সকালের পাংশু পাথর থেকে করুণা গড়িয়ে পড়লো । আমি দেখলাম, আমার বেদনা বদলে যাচ্ছে আনন্দে; আমার দুঃখ মোথিত করে উঠছে বিপুল সুখ। আমার কান্না থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে হাসির হীরকদীপ্তি। আমার সমস্ত অপমান সম্মানিত হয়ে উঠছে ভিতর-ভিতর। যন্ত্রণা কারুকার্যে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে সুন্দর করে দিচ্ছে আমার অভ্যন্তর ।
জীবনকে যেভাবে পেয়েছি, সেভাবেইতো নিতে হবে। নেবো । এই বেরঙা ভোরকে ভেঙে তুলে আনবো সাতরঙের আলো । এই অন্ধকারের নদীতেই ভাসিয়ে দেবো ভালোবাসার মান্দাস…।
যারা আমাকে এতো যন্ত্রণা দিয়েছে আমি তাদের দিকেই ছুটে যাবো । যে সুর আমাকে দেখিয়েছে, যে সুর অন্ধকার থেকে দৌড় করিয়ে নিয়ে গেছে আমায় আলোর দিকে, মানুষের দিকে_ সেই সুর বিস্ময়ে জাগিয়ে দিয়েছে আমার প্রাণ । সেই সুরই আমাকে সেই ভোরে, সেই বিবর্ণ অপমান, ক্লান্ত সকালে একে একে ফিরিয়ে দিয়েছিলো- আমার আরাধ্য, আমার দেবতা, আমার কর্ম, আমার ব্রত, আমার সম্বল, আমার বিশ্বাস। আমার ঠাকুর। আমার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
সেইদিন থেকেই আপনার সঙ্গে আমার চেনা। একদিন যখন পৃথিবী পেরিয়ে যাবে অনেকগুলো সংক্রান্তি । যেদিন এই সময়ের হা হুতাশ, ঘূর্ণি , ঈর্ষার ধুম, অহমিকার মালিন্য ধুয়ে যাবে ; অপমানের বরষায় জমবে মরচে; সমালোচনার নিউজপ্রিন্ট যাবে গুড়ো গুড়ো হয়ে; যেদিন সব মিশবে ধূলায় –
সেদিনও, সেদিনও রবিঠাকুর, এক বিবর্ণ ভোরে মরবার ইচ্ছে নিয়ে জেগে উঠবে একটি মানুষ। প্রেমহীন, প্রীতিহীন, বন্ধুবিহীন এক দুঃসময় আর তার অন্ধ গুহায় একটু কিরণ, একটু হাওয়া, একপাত্র জল, এক টুকরো রুটির মত ছুটে আসবে আপনার সুর। আপনার মূর্ছনা। ধরে ফেলবে তার শিরাছিন্ন করতে যাওয়া হত্যার হাত। বলবে- বাঁচো, বাঁচো।
দেখছনা, আমি এতো সহে, এতো যন্ত্রণা পেয়েও কিভাবে বেঁচে আছি। দেখছনা, আকাশ ভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ।
সেইদিন মানুষ জানবে, যিনি গানের ভেতর দিয়ে ছবি আঁকতে পারেন, ছবির ফ্রেম ফাটিয়ে নিয়ে যেতে পারেন দর্শনের গভীর জগতে। জীবিতকালেই যিনি উপকথার আশ্চর্য সম্রাট- তার নাম ছিলো, তার নাম আবহমান- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)