ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৫৯ মিনিট ৪০ সেকেন্ড

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩ কার্তিক, ১৪২৫ , হেমন্তকাল, ৮ সফর, ১৪৪০

নিসচা সংবাদ, লিড নিউজ আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে ঋণী, এদেশের মানুষের কাছে ঋণী: ইলিয়াস কাঞ্চন (ভিডিও)

আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে ঋণী, এদেশের মানুষের কাছে ঋণী: ইলিয়াস কাঞ্চন (ভিডিও)

ইলিয়াস কাঞ্চন

নিরাপদ নিউজ: সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক পেয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই এর চেয়ারম্যান চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। গত ২০ ফেব্রুয়ারি ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ইলিয়াস কাঞ্চনের হাতে পুরস্কারটি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নিরাপদ সড়ক চাই এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ঢাকাই চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের একুশে পদক লাভ উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল ৭১ এ ‘নিরাপদ সড়ক চাই’নিসচার আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় প্রীতি সম্মেলন। সম্মেলনে সারাদেশ থেকে আগত নিসচা কর্মিদের পাশাপাশি সিনেমা, সঙ্গীত, সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও শুভানুধ্যায়ীদের পদচারণায় ঝলমলে হয়ে উঠে সম্মেলন স্থল।

নিসচার সূচনা সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর অভ্যাগত অতিথিদের সামনে তুলে ধরা হয় ইলিয়াস কাঞ্চনের কর্ম ও জীবন। প্রজেক্টরের বড় স্ক্রিনে ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে যখন এ কীর্তিমানের সংগ্রামী জীবন দেখানো হচ্ছিল তখন সেখানে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। সবাই প্রত্যক্ষ করছেন একজন মানুষের সংগ্রামময় জীবন যাতে মিশে আছে গভীর মর্মবেদনা, জীবনবোধ, দেশাত্মবোধ আর সমাজের জন্য কিছু করার তাগিদ। মূলত জীবনের চরম বিমর্ষ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, যার পরতে পরতে আছে মানুষের জন্য, সমাজের জন্য ভাবনা। যে ভাবনা রুপালি জগতের জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান থেকে তাকে নামিয়ে এনেছিল রাস্তায়, মানুষের কাতারে। আবার সেখান থেকে পরিণত হন একটি প্রতিষ্ঠানে।

১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যু হয়। প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি ভেঙ্গে পড়েছিলেন। জীবন হয়ে পড়েছিল বিপর্যস্ত। এ রকম একটা অবস্থায় অনেকেই যেখানে হতাশ হয়ে পড়েন, সেখানেই ব্যতিক্রম ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। শোককে শক্তিতে পরিণত করেন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জীবনের বাকি দিনগুলো কাজ করার প্রতিজ্ঞা করেন। আর কেউ যেন তাঁর মতো ভুক্তভোগী না হন সেজন্য প্রতিষ্ঠা করেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) নামের একটি সংগঠন। দুর্ঘটনার হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে নেমে পড়লেন রাস্তায়। তাকে দেখে মানুষও সচেতন হলো। সরকারও তাগিদ অনুভব করল। মানুষের মাঝে বাড়তে থাকল সচেতনতা। ২৫ বছর ধরে করে যাচ্ছেন এ কাজ। নেই ক্লান্তি, আছে একাগ্রতা, নিষ্ঠা আর অন্যকে অণুপ্রাণিত করার রসদ। তার নেতৃত্বাধীন নিসচার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এ বছর থেকে ২২ অক্টোবর দেশে পালিত হচ্ছে নিরাপদ সড়ক দিবস। সংগঠনটি জাতিসংঘেও প্রশংসিত হয়েছে। তারই স্বীকৃতি হিসেবে ইলিয়াস কাঞ্চন এ বছর পেলেন একুশে পদক সম্মাননা।


অনুষ্ঠানে ইলিয়াস কাঞ্চন তার বক্তব্যে বলেন, আমি ঋণী। ভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন সেই শহীদদের কাছে। আমি ঋণী। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের কাছে, মা-বোনদের কাছে- যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।  আমি ঋণী। এদেশের আলো বাতাসে বড় হয়েছি বলে। সৃষ্টিকর্তা আমাকে এখানে সৃষ্টি করেছেন, আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে ঋণী। এদেশের মানুষের কাছে আমি ঋণী এবং এদেশের মানুষ আমাকে ভালবাসেন, আমাকে ইলিয়াস কাঞ্চন যারা বানিয়েছেন তাদের কাছে আমি ঋণী।


আমার কর্ম দিয়ে আমার এ ঋণ আমি শোধ করতে আসলেই আমি পারব না। আমি যা করেছি, আবার ‘কিছুই করিনি’ তারপরেও সরকার আমাকে পুরস্কৃত করেছেন। নিরাপদ সড়ক দিবস দিয়েছেন, আমি সরকারের কাছে ঋণী। আপনারা যারা এখানে এসেছেন তাদের কাছে আমি ঋণী। আমাকে ভালবেসে যারা আজকে এখানে উপস্থিত হয়েছেন তাদের সকলের কাছে আসলে আমি ঋণী। আপনারা বলেছেন আমি যেন আরও এগিয়ে যাই, আমি যেন আরও ভালো কাজ করি। আমি আপনাদের সহযোগিতা যদি পাই, আপনাদের হাত যদি আমার মাথার উপরে থাকে ইনশাআল্লাহ আমি এগিয়ে যাব। এদেশের মানুষের জন্য কাজ করব এবং যতদিন জীবন থাকবে আমি কাজ করে যাবো, ভালো কাজ করব। এদেশের মানুষের কথা চিন্তা করে কাজ করব।
আমার এখানে অনেক পছন্দের মানুষ এসেছেন। বাংলা একাডেমির সচিব সাহেব এসেছেন, উনি বলেছেন রিটায়ার্ড করার সঙ্গে সঙ্গে আমার এখানে চলে আসবেন। বিআরটিএ’র প্রাক্তন চেয়ারম্যান, উনি বলেছিলেন যে রিটায়ার্ড করার সঙ্গে সঙ্গে আমার এখানে চলে আসবেন… উনিও চলে এসেছেন এবং এরকম আমাকে অনেকেই ভালোবাসেন, নিরাপদ সড়ককে ভালোবাসেন এবং তারাও কাজ করতে চান। আমি আপনাদেরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।
তখন আমি স্বপন ভাইকে থামিয়ে দিয়েছিলাম কথাটি নিজে বলার জন্য, আমাদের ইঞ্জিনিয়ার স্বপন ভাই আমার আর একটি স্বপ্ন পূরণ করছেন, আমি যে হাসপাতালটি করতে যাচ্ছি আশুলিয়াতে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি এগিয়ে এসেছেন। আমি একটা কথা সবসময় বলি, সরকার কি করে দিল সেটা বড় কথা নয়। আমার যতটুকু আছে তাই দিয়ে আমি করব।

আমি সরকারের কাছে জমি চেয়েছি কিন্ত পাইনি। আমার একটি মাত্র জমি সেই জমির মধ্যেই হাসপাতাল হতে যাচ্ছে। এই স্বপন ভাই সেটির ডিজাইন করছেন। অলরেডি ৬ তলা ভবনের ডিজাইন হয়ে গেছে। শুধু ডিজাইন না এটার পারমিশন করানোর জন্য সরকারের যত জায়গায় যত পারমিশন লাগে স্বপন ভাই বলেছেন- আমি নিজে যেয়ে সব করে দিব।


আমার স্বপ্ন আমি এককভাবে আশুলিয়াতে বাস্তবায়ন করছিনা, আপনাদের প্রত্যেকের সাহায্য, সহযোগিতা নিয়ে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করছি। এ পি জে আবুল কালাম আজাদ সাহেব ভারতের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, উনি বলেছেন একটি কথা ‘ঘুমিয়ে যে স্বপ্ন দেখে সেটা শুধুই স্বপ্ন, জেগে যে স্বপ্ন দেখেন সেটা আসল স্বপ্ন’ আর সেটিই বাস্তবায়িত হবে। আর আমি যে স্বপ্ন দেখছি, সে স্বপ্ন আমি একার জন্য দেখছিনা। আপনাদের সকলকে নিয়ে, আপনাদের সহযোগিতা নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখছি। ইনশাল্লাহ সেটি বাস্তবায়িত হবে।

সড়কের মড়ক থেকে শুধু দেশের মানুষ নয়, বিশ্বের মানুষদের মুক্ত করবো, তার জন্য আমরা নেতৃত্ব দিব। সেই জায়গায় জাতিসংঘ যেটি বলেছেন সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেক নামিয়ে আনতে ইনশাল্লাহ আমরা কাজ করব এবং আমরা পারবো।

আমি আর কথা বাড়াতে চাইনা, আবারও আপনাদের কাছে আমি ঋণী। আমি আপনাদের সহযোগিতা ও দোয়া চাই। আমি পরবর্তী নেতৃত্ব তৈরী করছি আমার সন্তানকে, আমার সন্তানের জন্য দোয়া করবেন। সে যথেষ্ঠ কাজ করছে, সে এই সংগঠনকে ধরে রাখার জন্য অনেক কাজ করে যাচ্ছে। এটাও একটা ভাল দিক। ছবি তোলার জন্য, প্রচারের জন্য আমি কাঙ্গাল নই। আমার ছেলে আরও বেশি, সে সামনেই আসতে চায় না, যাই হোক তার জন্য আপনারা দোয়া করবেন এবং আবারও সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনাদের কাছে দোয়াপ্রার্থী, ধন্যবাদ সবাইকে।

ইলিয়াস কাঞ্চনকে শুভেচ্ছা জানাতে প্রীতি সম্মিলনে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী খুরশিদ আলম ও ইন্দ্র মোহন রাজবংশী, বাংলা একাডেমির সচিব আনোয়ার হোসেন, পরিচালক ড. মুজাহিদ, বিআরটিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব শফি বিক্রমপুরী, হাফিজ উদ্দিন, চিত্রনায়িকা রুজিনা, দিলারা, পপি, চিত্রনায়ক বাপ্পারাজ, অমিত হাসান, জায়েদ খান, পরিচালক সৈয়দ হারুন, অ্যাডভোকেট মনজুর মোর্শেদ, ভারতীয় সাহিত্যিক মলয় চন্দন মুখোপাধ্যায়, সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যকরি সভাপতি রুস্তম আলী খান, মর্ডান হারবালের স্বত্বাধিকারী ডা. আলমগীর মতি, শ্রোতা সদস্যসচিব মো. সদরুল, সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এ্যান্ড রিসার্চ এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম ফজলুর রহমান, ডিপিডিসির ব্যবস্থাপক শফিক আহমেদ, নিসচা উপদেষ্টা এইচএম নোমান, নিসচার ভাইস-চেয়ারম্যান এস এম আবু তৈয়ব, এলজিইডির প্রজেক্ট ডিরেক্টর প্রকৌশলী আকতার হোসেন, এডিবির পরামর্শক প্রকৌশলী দেওয়ান ও লিয়াকত আলী, ডিটিসিএ’র নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ আহমেদ প্রমুখ। যৌথভাবে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নিসচার যুগ্ম মহাসচিব লিটন এরশাদ, সাদেক হোসেন বাবুল ও সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম আজাদ। সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন নিসচার ভাইস-চেয়ারম্যান শামীম আলম দীপেন ও মহাসচিব সৈয়দ এহসানুল হক কামাল।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)