ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট October ১৯, ২০১৯

ঢাকা শুক্রবার, ৩০ কার্তিক, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১৭ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১

শিল্প-সংস্কৃতি আয়নাঘরে স্বাগতম

আয়নাঘরে স্বাগতম

রেজানুর রহমান, নিরাপদ নিউজ: বলতে গেলে একটানা ১৫ বছর পর মঞ্চে অভিনয়ে ফিরছি। নাটকের নাম আয়নাঘর। নাটকটি আমারই লেখা। আমাদের নাটকের দল ‘এথিক’ থেকে নাটকটি নির্দেশনারও দায়িত্ব পেয়েছি। আয়নাঘর নিয়ে অনেক চমক আছে। আস্তে আস্তে তা প্রকাশ করবো। তবে আনন্দের খবর আজ থেকে আমার বন্ধুদের জন্য নতুন একটি লেখা শুরু করলাম। নাম ‘আয়নাঘর’। ধারাবাহিক এই লেখাটি নিয়মিত প্রকাশ হবে। আজ প্রকাশ হলো সপ্তম কিস্তি….
সাত
সর্বনাশটা হতে হতেই হল না। ডাক্তার গিন্নী আমার দিকে গভীর সন্দেহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। তার পিছনে শাড়ির আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছোট মেয়েটি। ডাক্তার গিন্নী আমাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি বেগমের কাছে এসেছিলে?
এইরে ধরা পড়ে যাচ্ছি না তো? ভয়ে আমতা-আমতা শুরু করে দিলাম।
ডাক্তার গিন্নী অভয় দিয়ে বললেন, তুমি কি ভয় পাচ্ছ? কেন? আমাকে সত্যি কথাটা বলো। কেউ কি তোমাকে পাঠিয়েছে?
না। সাহস করে বললাম। আমার কথা ডাক্তার গিন্নীর মোটেই মনপুত হল না। তবে তা বুঝতে না দিয়ে এবার হাসি মুখে বললেন, এসো কিছু খেয়ে যাও।
ডাক্তার গিন্নী আমাকে কিছু খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানোয় দেখলাম ছোট মেয়েটি খুব খুশি হয়েছে। মুখে কিছুই বলছে না। তবে মনে মনে বেশ খুশি হয়েছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। খুশিতে ঘাস ফড়িং এর মতো লাফালাফি করছে।
ডাক্তার গিন্নী তার ঘরের দিকে যাবার জন্য ইঙ্গিত করলেন। ভয়ে এবার আমার গলা শুকিয়ে গেছে। ঘরে ডেকে নিয়ে তিনি কি আমার শরীর তল্লাশী করবেন? তাহলেই তো আমি ধরা খেয়ে যাব। ডাক্তার গিন্নীকে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে দিলাম ভোঁ দৌড়। ডাক্তার গিন্নী ততক্ষণে যা বোঝার বুঝে ফেলেছেন! আমাকে চিৎকার দিয়ে ডাকতে থাকলেনÑ এই ছেলে… চলে যাচ্ছ কেন? এই ছেলে…
আমি ডাক্তার বাড়ির বাইরে এসে পড়েছি। ভয়ের আর কোনো কারণ নাই। ডাক্তার গিন্নী এখন আমার টিকিটিও ছুঁতে পারবেন না। ভেতর বাড়ির থেকে ডাক্তার গিন্নীর চিৎকার-চেচামেচি শোনা যাচ্ছে। বেগম খালাকে বকাঝকা করছেনÑ আমার সাথে চালাকি… এখন থেকে তুমি বাড়ির বাইরে যাবে না। কী বললাম কানে ঢুকেছে?
বেগম খালার জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো। আহারে! বেচারী… তার মায়ের বকাঝকা হয়তো চলতেই থাকবে।
বেগম খালার দেওয়া চিঠিখানা পকেটে নিয়েই ছুট দিলাম নানাবাড়ির দিকে।
বাড়ির বাইরে মসজিদের সামনে অস্থির পায়চারি করছিলেন আমিন মামা। আমাকে দেখে দৌড়ে এসে বললেন, কিরে, বেগম তোকে কিছু দিয়েছে?
দৌড়ে আসার জন্য হাফাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হল, অভিনয় করলে কেমন হয়? মামাকে বলব বেগম খালা কিছুই দেয়নি। দেখি মামা ব্যাপারটা কিভাবে নেয়।
আমিন মামা এবার অনেকটা ধমকের সুরে প্রশ্ন করলেনÑ কিরে বেগম তোকে কিছু দেয় নাই?
না। বিরস মুখে বললাম।
কিছুই দেয় নাই?
না। কিছুই দেয় নাই। (বলতে গিয়ে বুঝলাম অভিনয় ভালই হচ্ছে। কারণ আমার কথা আমিন মামা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন)
আমিন মামা এবার আমার দিকে সন্দেহ ভরা চোখে তাকালে তোর সাথে বেগমের দেখা হয়েছে তো?
হ্যা হয়েছে?
তারপর?
তারপর আর কী… উনার মা আশে-পাশেই ছিলেন তো, তাই….
তার মানে সে তোকে কিছুই দেয়নি?
বললাম তো, না…
আমিন মামা আমাকে পুরোপুরিই বিশ্বাস করে ফেলেছেন। বুঝে ফেললাম, আমি অভিনয় করলে পারব। খুব খুশি খুশি লাগছে। কিন্তু আমিন মামার করুণ চেহারা দেখে ভাবলাম, এবার সত্যিটা বলা দরকার। তা নাহলে এই লোক তো বোধকরি কেঁদে ফেলবে। যা-ভেবেছি তাই ঘটলো। আমিন মামা কাঁদতে কাঁদতেই আবার জিজ্ঞেস করলেন, বেগম তোকে কিছুই দেয় নাই? ওর তো একটা চিঠি দেয়ার কথা ছিল। চিঠি দিল না…
পকেট থেকে বেগম খালার চিটিখানা বের করে আমিন মামার সামনে তুলে ধরলাম। আমিন মামা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। আমি যে তার সাথে এভাবে অভিনয় করবো সেটা হয়তো তার মাথায়ই আসেনি।
চিঠি খানা আমার হাত থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে আমার সামইে কয়েকবার পড়লেন। আমার ওই ছোট্ট বয়সে চিঠিখানার ‘মাহাত্মা’ তখন তেমন বুঝিনি। আজ বড় বেলায় এসে বুঝতে পারছি একটা চিঠিও একজন মানুষকে চরম হতাশা থেকে বের করে আনতে পারে। চিঠি পাবার আগে আমিন মামা বাচ্চাদের মতো কেঁদে ফেলেছিলেন। কিন্তু চিঠি পাওয়ার সাথে সাথেই নিজেকে বদলে ফেললেন। হাসছেন আমিন মামা। বিজয়ের হাসি!
আমিন মামার গল্পটা এর বেশি আমার আর জানা নেই। কারণ লেখাপড়ার জন্যই আমি আবার মামা বাড়ি উলিপুরের শীববাড়ি থেকে বাবার বাড়ি ফরকের হাটের বালাকান্দিতে চলে আসি। তবে পরবর্তিতে ঘটনা যা শুনেছি তা খুবই হৃদয় বিদারক। শেষ পর্যন্ত আমিন মামা ও বেগম খালার বিয়ে হয়েছিল। এক পর্যায়ে দু’জনে পালিয়ে বিয়ে করেন। আমিন মামাদের পরিবার ব্যাপারটা মেনে নেয়নি। সে কারণে আজ এখানে কাল সেখানে দৌড়াদৌড়ি করেই সংসার করেছেন তারা। শেষ দিকে দিনাজপুরে কোথাও আস্তানা গেড়েছিলেন। কিন্তু এই ইতিহাসটা আমার পুরোপুরি জানা নেই। কারণ আমিন মামার সংসার জীবনের কঠিন সময়ে আমি ঢাকায় এসে কঠিন এক জীবন যুদ্ধে জড়িয়ে যাই। সত্যি বলতে কী আমিন মামাকে আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। মায়ের কাছেই আমিন মামার কিছু কিছু খবর পেতাম। জীবনের শেষ দিকে খুবই দর্মপ্রাণ হয়ে উঠেছিলেন। মুখে দাড়ি রেখেছিলেন। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। হঠাৎ একদিন আমার মায়ের কাছে শুনি আমিন মামা মারা গেছেন! আমার নানার বাড়ি থেকে একটু দূরে ‘নাভির দীঘি’ নামে একটি দীঘি আছে। গ্রামের মানুষ জন ওই দীঘিতেই মূলত গোশল করে। ওই দীঘিতেই সন্ধ্যার দিকে গোশল করতে এসেছিলেন আমিন মামা। পরের দিন ওই দিঘীতেই তার লাশ পাওয়া যায়। অসংখ্য কাকড়া পানিতে ভেসে ওঠা লাশের মধ্যে হাটাচলা করছিলো… অথচ ওই দীঘিতে নাকি এর আগে কেউই কাকড়া দেখেনি। তাহলে হঠাৎ এতো কাকড়ার আগমন ঘটলো কিভাবে? এর ব্যাখ্যা কী?
(চলবে)

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)