ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট নভেম্বর ১, ২০১৯

ঢাকা শুক্রবার, ৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ২৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১

শিল্প-সংস্কৃতি আয়নাঘরে স্বাগতম

আয়নাঘরে স্বাগতম

রেজানুর রহমান, নিরাপদ নিউজ: বলতে গেলে একটানা ১৫ বছর পর মঞ্চে অভিনয়ে ফিরছি। নাটকের নাম আয়নাঘর। নাটকটি আমারই লেখা। আমাদের নাটকের দল ‘এথিক’ থেকে নাটকটি নির্দেশনারও দায়িত্ব পেয়েছি। আয়নাঘর নিয়ে অনেক চমক আছে। আস্তে আস্তে তা প্রকাশ করবো। তবে আনন্দের খবর আজ থেকে আমার বন্ধুদের জন্য নতুন একটি লেখা শুরু করলাম। নাম ‘আয়নাঘর’। ধারাবাহিক এই লেখাটি নিয়মিত প্রকাশ হবে। আজ প্রকাশ হলো অষ্টম কিস্তি….
আট
আমিন মামার মৃত্যু আমার কাছে এক ধরনের রহস্যের মতোই রয়ে গেছে। তার মৃত শরীরে এতো কাকড়া এলো কিভাবে? সবার জীবনেই এ ধরনের অনেক রহস্যজনক ঘটনা থাকে। প্রিয়জনের কাছে শোনা কয়েকটি রহস্যজনক ঘটনার কথা আজ খুব মনে পড়ছে।
নানা বাড়িতেই গল্পটা শুনেছি। উলিপুরের শীববাড়ি এলাকায় আমার নানার বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে একটি ঘর ছিল। বোধকরি এখনও আছে। অতিথিরা এলে এই ঘরে বসতে দেওয়া হতো। একদিনের ঘটনা। দরবেশ টাইপের একটি লোক নানাবাড়িতে এসে হাজির। তাঁকে দেখে নানা অনুরোধ করলেন, হুজুর যদি অনুমতি দেন তাহলে আপনার জন্য সামান্য ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতে চাই। আপনি খেয়ে যাবেন।
হুজুর সম্মতি জানালেন। নানা বাড়ির ভিতরে এসে মুরগী জবাই করলেন। পুকুরের মাছ ধরার ব্যবস্থা করলেন। আরও অনেক পদের তরকারী রান্না করা হলো। সাথে আয়োজন থাকলো পোলাওয়ের। একসময় রান্না শেষ হলো। হুজুরের সামনে সব খাবার আনা হল। এতো খাবার দেখে হুজুর নানাকে বললেন, কিরে তুই তো আমাকে ‘ডাল-ভাত’ খাওয়াবি বললি! এতো খাবার তো আমি খাব না। যা ‘ডাল ভাত’ নিয়ে আয়। সবাই বাড়ির ভিতর ছুটলো ডাল ভাত আনার জন্য। নানা ঘরের বাইরে অস্থির পায়চারি করছিলেন। বাড়ির লোকজন ডাল-ভাত নিয়ে আসার পর ঘরের ভিতর ঢুকে দেখেন হুজুর নেই।
গল্পটি মায়ের মুখে শুনেছি। কিন্তু এর ব্যাখ্যা কি আজও জানি না। মায়ের মুখেই আর একটি গল্প শুনেছি। আমার নানা তখনকার দিনে সাইকেলে চড়ে রাজারহাট এলাকায় চাকরি করতে যেতেন। একদিন সাইকেলে চড়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ দেখতে পান রাস্তার ধারে একটি মৃতু কুকুরের নাড়ি ভুড়ি তুলে খাচ্ছেন পাগল কিসিমের একটি লোক। নানাকে দেখে কচুর পাতায় কুকুরের নাড়িভুড়ির কিছু অংশ মুড়ে নানার দিকে বাড়িয়ে দেন। নানা কিছুতেই তা নিতে চাচ্ছিলেন না। তবুও সাইকেলের সামনে রাখা একটি ব্যাগের ভিতর কচু পাতায় মোড়া মৃতু কুকুরের পেটের নাড়ি ভুড়ি ঢুকিয়ে দেন ওই পাগল। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে নানা পড়ে যান উভয় সংকটে। ব্যাগের ভিতরটা নিশ্চয়ই নোংরা হয়ে গেছে। ব্যাগ ফেলে দিবেন ভাবতেই কেন যেন তার মনে হয় অফিস পর্যণÍ যাই তারপর না হয় দেখা যাবে।
এমনিতেই অফিসে যেতে সেদিন একটু দেরী হয়ে যায়। অফিসে পৌছে কাজের চাপে রাস্তার ঘটনা ভুলে গিয়েছিলেন। দুপুরে ব্যাগের কথা মনে পড়ে। ততক্ষণে খেয়াল করতে শুরু করেছেন সারা ঘর জুড়ে পোলাওয়ের সুবাস ভেসে আসছে। কৌতুহলী হয়ে ব্যাগ খুলতেই দেখতে পান কচুপাতায় মোড়া মৃতু কুকুরের নাড়ি ভুড়ি থেকেই পোলাওয়ের খুশবু আসছে। কচু পাতা খুলে দেখেন একদলা রঙিন পোলাও খুশবু ছড়াচ্ছে। এই ঘটনার ব্যাখ্যা কি আজও জানি না।
এবার যে ঘটনাটির কথা বলব তা আমার বাবার মুখে শোনা। তরুণ বয়সে আমার বাবা এলাকায় নামকরা হাডুডু প্লেয়ার ছিলেন। দুরের এলাকায় হাডুডু টুর্নামেন্টে তাকে হায়ার করে নিয়ে যাওয়া হতো। একদিনের ঘটনা, বাবা পাশের গ্রামে হায়ারে হাডুডু খেলতে যাবেন। হঠাৎ সকালে দাদী বললেন, ঝোলাগুড় আনার জন্য কুড়িগ্রাম শহরে যেতে হবে। তখনকার দিনে কুড়িগ্রাম শহর ছাড়া আর কোথাও হাটবার ছাড়া ঝোলাগুড় পাওয়া যেত না। আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে কুড়িগ্রামের দুরুত্ব প্রায় ৫ মাইল। হেঁটেই যেতে হয়। বাবা তার মায়ের কথা মতো কুড়িগ্রাম শহরে উদ্দেশে যাত্রা করলেন। ঝোলা গুড় কিনে মাটির কলসিতে ভরে নিয়ে আবার বাড়ির পথে রওয়না দিলেন। তার একটাই চিন্তা, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে যাতে বিকেলের মধ্যেই হাডুডু খেলতে যাওয়া যায়। পথে দ্রুত হাঁটছেন। হঠাৎ একজন প্রায় উদোম শরীরের লোক তার সামনে এসে দাঁড়াল। ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, বাবা একটু গুড় দেন না।
বাবা বিরক্ত হয়ে লোকটিকে তাড়িয়ে দিলেন।
লোকটি চলে গেল। কিছু দুর হাঁটার পর বাবা দেখলেন আবার সেই লোক গুড চাইছেÑ বাবা, একটু গুড় দেন না?
বাবা এবার আরও বেশি বিরক্ত হয়ে লোকটিকে তাড়িয়ে দিলেন। লোকটি বিরস মুখে চলে গেল।
বাবা আপন মনে হাঁটছেন। হঠাৎ বুঝতে পারলেন তার হাতের কলসের ওজন কমে গেছে। ঘটনা কী? কলসের ওজন কমলো কেন? তাকিয়ে দেখেন কলসে তিল পরিমান ঝোল গুড় নাই। কলস ধুয়ে মুছে সাফ করা…
সর্বনাশ! গুড় গেল কোথায়? গুড় না নিয়ে বাড়ি গেলে এলাহি কান্ড ঘটে যাবে। কলস মাটির ওপর রেখে ভয়ে কেঁদে ফেললেন বাবা।
কিছুক্ষণ পর তিনি যা দেখলেন তা অবিশ্বাস্য। কলস ভর্তি ঝোলা গুড় কলসের মুখ দিয়ে উপচে পড়ে যাচ্ছে… যাক, বাবা বিপদ কেটে গেছে। উপচে পরা ঝোলা গুড় হাতের তালুতে নিয়ে খেতে খেতেই বাড়িতে আসন তিনি এবং বাড়ির ঘরের চৌকির নীচে গুড়ের কলস রেখে হাডুডু খেলতে চলে যান।
গুড়ের প্রয়োজন পড়েছিল শীতের পিঠা বানানোর জন্য। আমার দাদী আম্মা গুড় নিতে এসে ভয় ও বিস্ময়ে রীতিমত চিৎকার দিয়ে ওঠেন। ঘটনা কী? ঘটনা হলো, চৌকির নীচে রাখা গুড়ের কলস উপচে ঝোলা গুড় ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে। রহস্যজনক এই ঘটনায় এলাকায় একটা হইচই পড়ে গেল। হাডুডু খেলে রাতে বাড়িতে কিরে এলেন বাবা। তাকে জিজ্ঞেস করতেই দিনের ঘটনা খুলে বললেন। সাথে সাথেই তাকে সবাই ধিক্কার জানাতে শুরু করলেন। করেছ কী! মানুষটা নিশ্চয়ই দরবেশ ছিল! খোঁজো তাকে…
এই ঘটনার ব্যাখ্যা কি তাও জানি না। বাবা জীবিত থাকতে সব সময় ফকির মিসকিনদের ভিক্ষা দিতেন। বাসায় খুচরা টাকা আলাদা করে রাখা থাকতো। কোনো ফকির বাদ যেতো না। আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কেউ হাত পাতলে ফিরিয়ে দিও না। সামর্থ্যে যা থাকে তাই দিও…
একটা ঘটনা বলি। ঢাকায় সবেমাত্র এসেছি। নতুন পরিবেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে শরীরে কম্বল জড়ানো এক লোকের সাথে দেখা। ঝাকড়া চুল, ময়লা দাঁত, দুই চোখে পেচুটি ভরা। ডান হাত তুলে বলল, কিছু দে। বাবার ঝোলা গুড়ের সেই ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। সাথে যা ছিল তাই তুলে দিলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিশেষ ভঙ্গি করে লোকটি তিন নেতার মাজারের দিকে চলে গেল।
কিছু দিন পর তাকেই দেখলাম নতুন রূপে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যাণের কোনায় বসে মেকআপ নিচ্ছে। জটাধারী পাগল সাজছে…
সেই থেকে একটা বিশ্বাস উঠে গেছে আমার…
(চলবে)

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)