ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৩ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড

ঢাকা সোমবার, ১০ আষাঢ়, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ২০ শাওয়াল, ১৪৪০

উপসম্পাদকীয় উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ: নতুন মাত্রায় বাংলাদেশ

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ: নতুন মাত্রায় বাংলাদেশ

উপসম্পাদকীয়

মোতাহার হোসেন,নিরাপদ নিউজ: দেশের স্থিতিশীলতা, উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ায় একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন টেকসই ব্যবস্থাপনা। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা খিলগাঁয়ের আমতলায় অফিস সময়ে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সমনের ফুটপাতে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন নানাবয়সী দরিদ্র, অসচ্ছল, পঙ্গু, বিধবা, বয়োবৃদ্ধ নারী পুরুষ। এটি প্রতি মাসের শেষ সপ্তাহের অফিস সময়ের নিয়মিত এই চিত্র। এরকম একদিন ওই রাস্তা পার হওয়ার সময় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনতে চাইলাম তারা কি জন্য বসে আছেন, কি চান তারা। উত্তর মেলে সহজেই। এরা সবাই দুস্থ ভাতার উপকার ভোগী। এ সময় একজন অন্যজনকে বলছেন, এই ভাতা না পেলে তাকে না খেয়ে মরতে হতো। প্রতি উত্তরে অন্যজন বলছেন, এই টাকা জমিয়ে রেখে তার মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন। এরকম অসংখ্য মানুষ সরকারি এই ভাতা পেয়ে আসছেন। মূলত এ ধরনের কর্মসূচি নিয়মিত অব্যাহত থাকা একটি কল্যাণকর রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে এ ধরনের ভাতার প্রচলন করেন। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বিস্তততর পরিসরে ভাতা দেয়া অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে মাসিক সম্মানী ভাতা দেয়া হচ্ছে। দিন দিন এই ভাতার উপকার ভোগীর সংখ্যা এবং আর্থিক সহায়তার পরিমাণও বাড়াছে। এ ধরনের কর্মসূচি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সদিচ্ছা আর দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী হওয়ায়। অবশ্য ইতোমধ্যে মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশের কাতারে সামিল হয়েছে। জাঁতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য বড় অর্জন এবং গর্বের। এই অর্জনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হলো।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর একটি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২১ প্রণয়ন করে। ওই পরিকল্পনায় ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। এ পরিকল্পনা বাস্ত্মবায়নে কাজ করায় স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ কর্তৃক উন্নয়নশীল দেশের উন্নীত হওয়ার ‘স্বীকৃতিপত্র’ দিয়েছে বাংলাদেশকে। মার্চ মাস বাঙালির স্বাধীনতা মাস। ঊনিশো একাত্তর সালের ২৬ মার্চ জাঁতি স্বাধীনতা অর্জন করে। আর এই বিজয়ের মাসেই আরেকটি বিজয় অর্জিত হলো- সেই অর্জন ‘উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর।’ জাতিসংঘের ইকোনমিক ও সোস্যাল কাউন্সিলের (ইউএনসিডিপি) চারদিনের বার্ষিক সভা শেষে বাংলাদেশের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এর পরই বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধির হাতে তুলে দেয়া হয় উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতিপত্র। স্বাধীনতা পরবর্তী উন্নয়ন ইতিহাসে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত (এলডিসি) উত্তরণ পর্বটি জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন উন্নয়নশীল বিশ্বের রোল মডেল হতে হচ্ছে বাংলাদেশ।

উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাওয়ায় বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা ও অবস্থান আরও সুসংহত হবে। আন্তর্জাতিক ঋণবাজার থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি হবে। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখন কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে গণ্য করা হবে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি দেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও যুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত কঠিন হতে পারে, রপ্তানিতে শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা সংকোচিত হতে পারে।

প্রসঙ্গত বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণা করে তালিকা প্রকাশ করে। বিশ্বব্যাংক মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে। একটি হচ্ছে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ, অন্যটি উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। প্রতিবছর ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় অনুসারে দেশগুলোকে চারটি গ্রম্নপে ভাগ করে। যাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৪৫ ডলার বা তার নিচে, তাদের বলা হয় নিম্ন আয়ের দেশ। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে এ তালিকাতেই ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনা ও মানুষের গড় আয়, গড় আয়ু কর্মসংস্থান, রিজার্ভ, রেমিট্যান্স প্রভৃতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবস্থান। দেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরই প্রতিফলন ও স্বীকৃতি এটি।

জাঁতি হিসেবে এটি অবশ্যই একটি বড় অর্জন ও মাইলফলক। এ প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জের মরমি কবি, গবেষক, সাধক ইবনে সালেহ মুনতাসির রচিত ‘সাধারণে অসাধারণ’ শীর্ষক লিরিকটি যৌক্তিক বলে প্রতিয়মান হয়েছে। লিরিকটির আংশিক তুলে ধরা হলো : ‘বিজয় শক্তিমান বাংলাদেশ গড়নের/সাধারণ যারা, একটু একটু গড়ে তুলেছে তাঁরাসাধারণের শ্রমে ঘামে/গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ শক্তিমানে/ সাধারণের কথা, শুনুন ভাবুন সাধারণের ব্যথাসাধারণই অসাধারণ/ বাংলাদেশের গল্প সাধারণে অসাধারণ/সাধারণের অসাধারণে/…গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ শক্তিমানে। শ্রমে ঘামে গড়া মহাপ্রকল্পবিজয় বাংলাদেশের/বিজয় সাধারণের অসাধারণ গল্পের/ বিজয় জনগণের/ বিজয় সাধারণ জনতার জন সাধারণের.. বিশ্বে বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় উত্থান, স্বাগতম উন্নয়নশীল বাংলায়.. এগিয়ে যাবে বহুদূরএটি যথার্থই যে, এটি আমাদের জন্য গর্বের, মর্যাদার এবং সম্মানের। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভের পর যেসব সমস্যা তৈরি হবে তা কাটিয়ে উঠতে অবশ্য ইতোমধ্যে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

এলডিসি স্ট্যাটাস থেকে উত্তরণ হলে বাংলাদেশের অনুকূলে প্রাপ্ত বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহায়তা যাতে কোনোভাবে হ্রাস না পায় সেজন্য কাজ শুরু করেছে সরকার। এ উপলক্ষে ২২ মার্চ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সেবা সপ্তাহসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীতে যে তিনটি সূচক রয়েছে, সবসূচকেই বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে এগিয়ে। এজন্য উন্নয়নশীল দেশে যেতে আর কোনো বাধা নেই। সম্প্রতি গণভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এলডিসি উত্তরণ এবং এজন্য সংবর্ধনাসহ নানা কর্মসূচি পালনের বিষয়টি অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে এ অর্জনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপনের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পরে ২২-২৬ মার্চ পর্যন্ত উৎসব উদযাপন কর্মসূচি পালন করা হয়।

সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে এলডিসিসংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স তৃথক একটি বৈঠক করে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে বলা হয়, উৎসব উদযাপন পর্বটি শুরু হবে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেয়ার মধ্যদিয়ে। ২২ মার্চ সকালে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ যৌথভাবে এ সংবর্ধনার আয়োজন করবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন ও ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরুর পর উন্নয়নের এ স্তরে উত্তরণ ও জাতিসংঘের স্বীকৃতিপত্র গ্রহণ পর্যন্ত একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হবে স্মরণিকাও বিতরণ করা হবে।

এ ছাড়া ঢাকা শহরকে চারটি জোনে ভাগ করে নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ স্ব স্ব উদ্যোগে এর্ যালি বের করবে এবং রাজধানী পদক্ষিণ করবে। সন্ধ্যার কর্মসূচিতে থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হওয়া এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এতে সমবেতরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করবেন। অনুষ্ঠানে ৫-৭ মিনিটের একটি লেজার শো এবং ১০-১২ মিনিটের একটি ফায়ার ওয়ার্কস পরিবেশিত হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে দুই ঘণ্টাব্যাপী। ২৩ মার্চ দিনব্যাপী আয়োজন করা হয় আন্তর্জাতিক সেমিনার। এতে দেশি-বিদেশি অর্থনীতিবিদ, সুশীল সমাজ ও এনজিও ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশের অগ্রগতি যেভাবে হচ্ছে, তার কোনো বড় ধরনের ব্যত্যয় না ঘটলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে সামিল হবে। এটি যেমন মর্যাদার তেমনি এর সঙ্গে বেশ কিছু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ যুক্ত হবে। এখন এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। এটা ঠিক, এই স্বীকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক মর্যাদার। বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, এটি তারই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পর বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে বাণিজ্যে যে অগ্রাধিকার সুবিধা পায় তার সবটুকু পাবে না। আবার বৈদেশিক ঋণে কম সুদ ও নমনীয় শর্তও সীমিত হয়ে আসবে।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতি প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই একটি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২১ প্রণয়ন করে। সেখানে ২০২১ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। দেশের স্থিতিশীলতা, উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ায় একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন টেকসই ব্যবস্থাপনা।
মোতাহার হোসেন : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)