ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট অক্টোবর ৭, ২০১৯

ঢাকা বুধবার, ৯ কার্তিক, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ২৪ সফর, ১৪৪১

সাহিত্য একজন রসিক মামা

একজন রসিক মামা

নাজমীন মর্তুজা, নিরাপদ নিউজ: হেরি পটার মুভিটা আমাদের কম বেশী সবার দেখা আছে- মনে করলেই চোখের সামনে দেখতে পাবেন-
হ্যারি পটারের শেষ অঙ্কে স্নেপের মৃত্যু-মুহূর্তে স্নেপ হ্যারিকে হাত দিয়ে দেখিয়ে বলে, ‘টেক ইট, টেক ইট’।
হ্যারি একটা টেস্ট-টিউবে করে স্নেপের চোখের জল খানিকটা নিয়ে নেয়। তারপর সেটা পেন্সিভ ডিশে ফেলে হ্যারি দেখতে পায় স্নেপের সম্পূর্ণ জীবন কাহিনি। তার ব্যথা, বেদনা, তার ভালোবাসা, তার বুদ্ধি, তার ন্যায়বোধ, নীতি, সব কিছু।
ব্রেন-ম্যাপিং বলে একটা বিষয় আছে। মানুষের মস্তিস্কের ম্যাপিং এর শাস্ত্রীয় এবং তাত্ত্বিক গবেষণা । সাইকোলজির নানান দিক আছে মানুষের মনের গবেষণা করার জন্য। কিন্তু তা মানুষ বেঁচে থাকতে থাকতে। কোন প্রযুক্তি আজ অবধি ঘোষণা করা হয়নি যা দিয়ে মানুষের মনের কথা একটা পেন-ড্রাইভে তুলে নেওয়া যায়, হার্ড-ডিস্কে রেখে দেওয়া যায়, মানুষ মারা যাওয়ার অনেক, অনেক বছর পর পর্যন্ত। আমার সন্তান কে হারিয়ে আমার ভেতরে এলোমেলো সব চিন্তা হতো , তার মৃত্যু আমাকে এক বিরাট প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছিল মানুষ কোথায় যায় মারা গেলে? এতো বিদ্যা, সারা জীবনের এতো জ্ঞান, এতো অভিজ্ঞতা, এতো বিচার, বিবেচনা, তত্ত্বকথা, মতামত, সব কি ধুলিসাৎ হয়ে গেল এক নিমেষে? বাবুটার মৃত্যুর সাথে সাথে ।হৃদপিণ্ডর কথা বলছে। হৃদয়ের কথা কই? তার মনের কথা কোথায় যায়? তার সারা জীবনের স্মৃতি, দুঃখ, কান্না, বেদনা, অভিমান, ভালবাসা, গোপন কথা কোথায় যায়? আত্মা তো জানি অবিনশ্বর। এক শরীর থেকে আর এক শরীরে প্রবেশ করে। তবে কি বাবুটা আমার পাশেই আছে অন্য আত্মা হয়ে , আমি চিনে নিতে পারছিনা !
নানান ধরণের চিন্তা আমার মাঝে খেলা করে-
আজ আপনাদের শোনাবো আমার এক মামার কথা উনি আমার সংস্কৃত শেখার গুরু ছিলেন । ভীষণ সাধারণ মানুষ, ঘটা করে পরিচয় করে দেবার মতো
কোন পরিচয় নেই উনার, কিন্তু আমার কাছে অনন্য একজন মানুষ।
আজ মামার মৃতু বার্ষিকী। উনাকে স্মরণ করেই আমার পুরোনো একটা লেখা সংযোজন করছি উনার আত্মার প্রতি অন্জলী দিয়ে।
কন্যা, মীন ও মিথুন লগ্নে অথর্লাভ। কুম্ভ, ধনু , কর্কট, বৃশ্চিক, মেষ লগ্নে কাল নাশ।
লগ্ন, তিথী ,রাশিচক্র, এগুলো আমি মন থেকে বিশ্বাস করি কিনা জানি না, কিন্তু আমার জন্ম যে অঞ্চলে সেখানে হিন্দু সংখ্যা বেশী হওয়াতে, ছোটবেলা থেকে আমি এই শব্দ গুলোর সাথে খুব পরিচিত, এবং মনের অজান্তে, কিছু কিছু জিনিস মেনে চলি, কেন চলি, কি লাভ, কি ক্ষতি হয়, সে নিয়ে ভেবে দেখিনি, হতে পারে অভ্যাসের ধারাবাহিকতা। ছোট বেলায় আমার এক মামা আমাকে সংস্কৃত শেখাতে আসতেন, তিনি হিন্দু ছিলেন, আমার নানার ধর্মপুত্র, আমার মা কে দেখতাম দাদাকে যে কি শ্রদ্ধা করতেন তিনি, সেই মামা সপ্তাহে দু-দিন আসতেন নিজ গরজে আমাকে সংস্কৃত শেখাতে। তাঁর নাম ছিল রোশনী, কিন্তু আমি ডাকতাম রসিক মামা করে। মামার কাছে সংস্কৃত শেখার চেয়ে, আমি বেশী আগ্রহী হোতাম শ্লোক, ও মন্ত্র শিখতে, মামা ও ছিলেন তেমন মন্ত্র যেন তাঁর নিঃশ্বাসের গতিতে বের হতো, যে কোন বিষয়ে মন্ত্র তার যেন ইনষ্টেন্ট উপাদান, পায়ে ঝিঁ ঝিঁ লেগেছে মন্ত্র পরে মামা পায়ের বড় আঙ্গুল চেপে ধরে মিনিটে পা ফ্রী করে ফেলতো- গলায় মাছের কাঁটা লেগেছে মন্ত্র ফুকে ভাতের ঢেলা গিলিয়ে দিলেই, কাঁটা সুরসুর করে যমের দুয়ারে পৌঁছে যেতো, আর আমার বিস্ময়ের সীমা বেড়ে যেতো হাজার গুণ। এ বাড়ির মশা-মাছি পাশের বাড়িতে পাচার করবেন, মন্ত্র আছে তো চিন্তা কি!
“রাই সরিষা বেঙার ফুল
যারে মশা গাঙের কুল ”
” এ বাড়ির মশা মাছি ঐ বাড়ি যা
ঐ বাড়ির লক্ষ্মী ঠাকুরূন এই বাড়ি
আয়”
রসিক মামার কাছে আমি বিস্তর ঋণী হয়ে আছি, সেই ছোটবেলায় এই মানুষটার মুখে আমি লোকায়ত দশর্ন, ঋগ্বেদ, দ্রোপদীর আত্মকাহিনী, সীতার অগ্নীপরিক্ষা, চন্দ্রাবতীর জীবন, খনার কষ্ট, মনষার ক্রোধ, হাসান- হুসেনের জহর, কহরে মৃত্যু আরো কত কত উপাখ্যান, আমার মিথোলোজিক্যাল বিষয়ক জ্ঞানের প্রসারে আমাকে সম্বৃদ্ধ করেছে । ধন্য মামা তুমি , তোমার জন্য আমার হৃদয়ে তুলসী মন্চ সদা সাজিয়ে রাখি। কোথায় সেই দিন কোথায় সেই শ্লোক মন্ত্র, বিস্মিত হওয়া চোখ- আমি কত খেলা খেলেছি শৈশবে, মা- ষষ্ঠীর সাথে, দাদীর পান হামান-দিস্তায় পিসতে পিসতে শুনেছিলাম পান কি করে পৃথিবীতে এলো, ইন্দ্রের অমরাবতী থেকে পান এনেছিলেন নাকি অর্জুন এই পৃথিবীতে। চল্লিশে দাঁড়িয়ে আজো আমার পা নেচে উঠে- ইঁচিং বিচিং চিচিংচা, প্রজাপতি উড়ে যা, খেলতে- হাতের আঙ্গুল নিশ-পিশ করে, ইরির মিকির, চামচিকির, চামে কাটা মজুমদার, ধেয়ে এলো দামোদর ইত্যাদি খেলায়। এই কলিকালে এমন কথা লেখে কোন ছাগলে তবুও লিখি ভাল মন্দে নিজেই নিজের আনন্দে!
(আজ আমার রসিক মামা দেহ ত্যাগ করেছেন – কাশিতে ) তার আত্মার শান্তি কামনা করছি!

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)