আপডেট ৩০ মিনিট ৪ সেকেন্ড

ঢাকা সোমবার, ৯ আশ্বিন, ১৪২৬ , শরৎকাল, ২৪ মুহাররম, ১৪৪১

ভ্রমন এক পথে তিন ঝরনা

এক পথে তিন ঝরনা

অসাধারণ এক ঝরনাধারার বৈচিত্র্য

অসাধারণ এক ঝরনাধারার বৈচিত্র্য

ঢাকা, ১৬ মার্চ ২০১৫, নিরাপদনিউজ: ঢাকা ছাড়ার সময় দেখে এসেছি পরিষ্কার আকাশ। মধ্যরাতের পর কুমিল্লার সীমানা পার হতেই ঠাণ্ডা হাওয়া বাসের জানালা গলে ঝাপটা মারতে লাগল শরীরে। সঙ্গে বৃষ্টির ফোঁটা। খুব ভোরে যখন নয়দুয়ারী বাজারে নামলাম, ততক্ষণে পুরো মিরসরাই এলাকা বৃষ্টিতে কাকভেজা। সঙ্গে সঙ্গে চোখ চকচক করে উঠল। আমাদের এবারের অভিযান এমন এক ঝরনার খোঁজে, যার খবর খুব বেশি মানুষের কাছে নেই। বেশ কয়েক দিন বৃষ্টিহীন থাকায় আশঙ্কা ছিল ঝরনাকে হয়তো তার যৌবনা রূপে দেখা নাও যেতে পারে। কিন্তু বৃষ্টি সে আশঙ্কা দূর করল। নয়দুয়ারী এলাকা তখনও ঘুমে আচ্ছন্ন। স্থানীয় কাউকে সঙ্গে নেওয়ার উপায় নেই। সহায় বলতে ঠিক কয়েক দিন আগে ঘুরে যাওয়া এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া রোড ম্যাপের এক টুকরো কাগজ। সেটুকু সম্বল করেই টিপরাখুমের পথ ধরলাম। বৃষ্টি ভেজা কর্দমাক্ত গ্রামীণ পথ পেরিয়ে, ধানক্ষেত পেছনে ফেলে পূর্বদিকে সোজা সবুজ পাহাড়ের সারি। আমরা চলেছি সে দিকেই। টিপরাখুম গেলে গাইড হিসেবে কাউকে পাওয়া যেতে পারে এই ভরসা। ওপরে মেঘলা আকাশ, ভোরের বাতাস গায়ে মাখতে মাখতে পেঁৗছে গেলাম পাহাড়ের কোলে টিপরাখুম। মূলত ত্রিপুরা আদিবাসীদের বাস এখানে, বেশ কয়েক ঘর বাঙালিও থাকে। সেখান থেকেই নাম টিপরাখুম। মেঘ না চাইতে জলের মতো পৌঁছেই পেয়ে গেলাম শাহাদতকে। এ কিশোরই পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা আমাদের পথ দেখাবে।
পাহাড় থেকে ঝিরি নেমে এসে লোকালয়ের দিকে গেছে। টিপরাখুম থেকে সেই ঝিরি ধরে এগোতে লাগলাম আমরা। ঝিরিতে অসংখ্য ছোট-বড় পাথর, কিন্তু চড়াই-উতরাই না থাকায় চলতে অসুবিধা হচ্ছিল না। মিনিট বিশ-পঁচিশেক হেঁটেই দেখা পাওয়া গেল দিনের প্রথম বিস্ময়ের। পাথরের মসৃণ দেয়াল নেমে এসেছে ঝিরি পথে। গড়িয়ে পড়ছে পানির ধারা। শাহাদত বলল, এর নাম ছোট নাপিত্তাছড়া ঝরনা। ঘণ্টাখানেক আগে বৃষ্টি হলেও খুব বেশি না হওয়ায় পানির ধারা জোরালো নয়। ভরা বর্ষায় এ রূপ আরও চোখ ধাঁধানো হতো নিশ্চয়ই। এরপরের গন্তব্য বান্দরখুম। যেতে হবে নাপিত্তাছড়া ঝরনা পার হয়ে। এবার খাড়া পাহাড় বাইতে হবে। নাপিত্তাছড়া ঝরনার উৎসমুখের পাশেই পাহাড় উঠে গেছে আকাশমুখী। পিচ্ছিল সে পথ ভয় ধরালেও অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ সে ভয় তাড়াল। ওপরে উঠে দেখা মিলল এ এলাকার স্কাই লাইনের। ভরা বর্ষা মৌসুম শেষ হয়েছে। কিন্তু রেশ কাটেনি। স্বাভাবতই সবুজে সবুজময় চারপাশ। এবার ট্রেইল ধরে এগোতে লাগলাম আমরা। যদিও দশ মিনিটের মধ্যেই আবার নামতে হলো ঝিরিতে। বান্দরখুম ঝরনার ছবি ফেসবুকের কল্যাণে আগেই দেখা ছিল। তার রূপ শিহরণ জাগানো। সেই উত্তেজনা বাকিটা পথ আচ্ছন্ন করে রাখায় পথের দূরত্ব কষ্টের কারণ হয়নি। ঝিরিতে বেশ পানি। পায়ের পাতা ছাড়িয়ে সে স্রোত মাঝেমধ্যেই উঠে আসছে হাঁটু পর্যন্ত। পিচ্ছিল পাথর সমস্যা করছিল খানিকটা। বেশ বড় কয়েকটা পাথর পেরুতেই খানিক দূরে গাছের ফাঁকে চোখে পড়ল বান্দরখুম ঝরনার ওপরের অংশ। সমবেত চিৎকার! প্রকৃতির নীরবতা ভঙ্গ করলেও করার কিছু নেই। ভয়াবহ সুন্দর কিছুর সামনে দাঁড়ালে এ বুঝি মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। সামনে সোজা আকাশের পানে উঠে যাওয়া দুই পাহাড়ের মাঝামাঝি নেমে এসেছে ঝরনাধারা। নেমে আবার নিচের পাথরে পড়ে ভাগ হয়ে গেছে তিনটি ধারায়। যে ছবি দেখে আগ্রহী হয়েছিলাম বান্দরখুমের ব্যাপারে সেটি পুরোপুরি না পেলেও, চোখের সামনে যা বর্তমান তার রূপও কোনো অংশে কম নয়।
মাঝেমধ্যে কিছু মুহূর্ত আসে যখন নীরবতা অবলম্বনই সবচেয়ে ভালো। ঝরনাধারার সামনে বিভিন্ন পাথরে বসে আমরা কয়েকজন দেখছি অসাধারণ এক ঝরনাধারার বৈচিত্র্য। মেঘ সরে ততক্ষণে দেখা দিয়েছে রোদের রেখা। সকাল ৯টা কি সাড়ে ৯টা বাজে। এরই মধ্যে দু-দুটি ঝরনা দেখা সারা। তবে বিস্ময়ের বাকি আছে তখনও। গাইড শাহাদত জানাল, কাছাকাছি আছে আরেকটি ঝরনা। নাম বাঘ বিয়ান। এর উচ্চতা আরও বেশি। বান্দরখুম থেকে একদমই যেতে মন চাইছিল না।
এক সময় এ পাহাড়ি এলাকায় ছিল বাঘের ব্যাপক উপস্থিতি। মানুষের উপদ্রবে বাঘ পালিয়েছে, কিন্তু মুখে মুখে এখনও শোনা যায় সেসব গল্প। বাঘ বিয়ান ঝরনার নামটি রাজকীয় এ প্রাণীটি থেকেই আসা। ঝিরি ধরে আবার শুরু করলাম হাঁটা। তবে এ পথের একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য নজরে এলো। ফেলে আসা ঝিরিপথে প্রচুর পাথর থাকলেও বাঘ বিয়ান ঝরনায় যেতে চোখে পড়ল মসৃণ ঝিরি পথ। যেন শান বাঁধানো পথে বয়ে চলেছে পানির ধারা। সূর্যের আলোয় তার রূপ এক কথায় মন ভোলানো। বাঘ বিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে আরেকবার বিস্মিত হওয়ার পালা। এখানে পানির ধারা বান্দরখুমের চেয়ে কম। কিন্তু বিশাল দুই পাথুরে দেয়ালের মাঝ দিয়ে নেমে আসা এ ঝরনাধারা অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করবে। অসীম নীরবতার মাঝে অবিশ্রান্ত ঝিঁঝির ডাক ধ্যানমগ্ন হওয়ার একেবারে আসল জায়গা। ঝরনার সৌন্দর্য, সঙ্গে চকোলেট বার ও বিস্কুট ক্লান্তি একেবারেই ভুলিয়ে দিল। ফিরতি পথে ব্যবহৃত খাবারের প্লাস্টিকের প্যাকেট সঙ্গে করে আনতে ভুলল না জুয়েল থিওটোনিয়াস। টিপরাখুম এসে শাহদাতকে বিদায় দিয়ে রেললাইন পেরিয়ে ধরলাম গ্রামের পথ। এ অভিযানে পাশের খৈয়াছড়া ঝরনায় যাওয়ার কথা থাকলেও পাথরে পিছলে সহযাত্রী তোরা খানিক আহত হওয়ায় বাতিল করতে হলো সে পরিকল্পনা।
পরামর্শ :ঢাকা থেকে যারা আসতে চান তারা আগের দিন রাতের বাসে রওনা দিলে একেবারে ভোরে পৌঁছে যাবেন মিরসরাই। তবে নয়দুয়ারী বাজারে নামলে কাজটা আরও সহজ হয়। নয়দুয়ারী বাজার থেকে সোজা রাস্তা চলে গেছে টিপরাখুম। হেঁটে সময় লাগবে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা। সেখান থেকে গাইড নিয়ে নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে। একদিনে জনপ্রতি খরচ এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। চাইলে পাশের বড় তাকিয়ার খেয়াছড়া ঝরনা দেখা সম্ভব একদিনে।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)