ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড

ঢাকা সোমবার, ৮ শ্রাবণ, ১৪২৫ , বর্ষাকাল, ৯ জিলক্বদ, ১৪৩৯

চট্টগ্রাম, জীবনযাপন কুকুর হত্যায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ৪৫ বছর কুকুর নিয়েই তার বসবাস!

কুকুর হত্যায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ৪৫ বছর কুকুর নিয়েই তার বসবাস!

কুকুর হত্যায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ৪৫ বছর কুকুর নিয়েই তার বসবাস!

শফিক আহমেদ সাজীব , ২৫ এপ্রিল ২০১৭, নিরাপদ নিউজ :  নাম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। উপজেলার পশ্চিম খরণদ্বীপ শরীফপাড়ার মোহাম্মদ শরীফের বাড়ির সরু মিয়ার প্রথম পুত্র। এলাকাবাসী যাকে ‘জাহাঙ্গীর পাগলা’ হিসেবে চেনে। দীর্ঘ ৪৫ বছর বোয়ালখালীর এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন মানসিক ভারসাম্যহীনভাবে। জাহাঙ্গীর নিজ ইচ্ছায় চলতেন, ঝামেলা পাশ কাটিয়ে নিজের মতো করে চলার কারণে সবাই তাকে আসল পাগলা হিসেবে ভালবাসতেন। স্বভাবে খুবই শান্ত। তবে অমাবস্যা-পূর্ণিমাতে তাকে খুবই অশান্ত হয়ে পড়তে দেখা যেত। ওইসময়ে যতই উশৃঙ্খল হোক না কেন কারও কোনো ক্ষতি করতেন না। ভারসাম্যহীন আচরণ নিজের সাথে করতেন। অনেকে পরীক্ষা করতে টাকা দিয়ে দেখতো, যত টাকাই দেয়া হোক এক থেকে পাঁচ টাকায় সীমাবদ্ধ ছিল তার টাকার চাহিদা। তাও আবার এককাপ চা আর কারিকর বিড়ি পর্যন্ত। এক বান্ডিল কারিকর বিড়ি তাকে কেউ দিতে পারেনি। সর্বোচ্চ ২টি নিয়ে বাকিগুলো ফেরত দিতে তার কখনও ভুল হয়নি। দুপুরে আর রাতের খাবারের সময় হলে এলাকার কিছু নির্দিষ্ট বাড়িতে নিজের ইচ্ছেমতো ধর্ণা দিতেন খাবারের জন্য। ওই পরিবার খাবার দিতে ব্যর্থ হলে ওই বাড়িতে তার আর যাওয়া হয়েছে এমন নজিরও নেই। নিজের একটি থালা ছিল, থালাতেই খাবার দিতে হতো। টিনের এ থালাটি কতদিন থেকে ব্যবহার করছিলেন প্রতিবেশী কিংবা নিকট আত্মীয়রা কেউ বলতে পারেননি। থাকতেন কুকুর-বিড়ালের সাথে। ওই থালাতেই একসাথে কুকুর-বিড়াল আর জাহাঙ্গীর পাগলা ভাত খেতেন। রাগ করতেন তখনই যখন কেউ তার সাথে থাকা কুকুরগুলোকে তাড়াতে চেষ্টা করতো। জাহাঙ্গীর সম্পর্কে তার ছোট ভাই মো. নাছের (৫৮) বলেন, জাহাঙ্গীর আমাদের ৪ ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। তার জন্ম ১৯৪৯ সালে। জন্মের পর তিনি স্বাভাবিক ছিলেন। ৬৩ সালে নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। নবম শ্রেণির পর থেকে তার আর লেখাপড়া এগোয়নি। শহরের কাজীর দেউড়ির আমাদের হোটেলের দায়িত্ব তার ওপর এসে পড়ে। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি হোটেল পরিচালনাও করতে থাকেন। মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন স্বাধীনতার কয়েকদিন পর থেকেই। কেন এমন হয়েছে জানতে চাইলে নাছের বলেন, শুনেছি ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর আমাদের হোটেল থেকে রান্না করা মাংস খেয়ে ফেলে একটি কুকুর। আমার বড় ভাই জাহাঙ্গীর ওই কুকুরটিকে রাতে ফাঁদে ফেলে আটকে বেদম পিটুনি দেন। কুকুরটি মারা যায়। একদিন পর তিনি বাড়িতে আসলে আজে-বাজে বকতে থাকেন। কোনো কিছুই ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারছিলেন না। ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। তারপর পারিবারিকভাবে তাকে সুস্থ করার অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এরপর তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর পার করেছে কুকুর নিয়েই। কীভাবে সুস্থ হলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির দিকের ঘটনা। উপজেলার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মাইক্রো সকালে শিক্ষার্থী আনতে যাওয়ার পথে স্থানীয় ঝাড়োয়াদিঘির পাড় এলাকায় সকাল ৬টার দিকে কুয়াশার কারণে দেখতে না পেয়ে সজোরে ধাক্কা দেয় জাহাঙ্গীর পাগলাকে। এতে তিনি কোমড় ও মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিছুদিন চিকিৎসা চালানোর পর দেখা যায় আস্তে আস্তে তিনি স্মৃতিশক্তি ফিরে পাচ্ছেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে আমরা তার প্রতি আরো যত্মবান হই। বর্তমানে স্বাভাবিক লোকের মতো আচরণ করেন। নামাজ পড়েন। পরিষ্কার পরিছন্ন থাকার চেষ্টা করেন। এখন কুকুর-বিড়ালের সাথে থাকার বিষয়টি তিনি আর মনে করতে পারছেন না। জানতে চাইলে ওই সময়ের মাইক্রো চালক মো. খোরশেদ বলেন, দুর্ঘটনার সময় আমি মূলতঃ জাহাঙ্গীর পাগলাকে দেখিনি। তবে দুর্ঘটনার পর নিজের বিবেকের তাড়নায় তার অনেক সেবা করেছি। আজকে তিনি ভালভাবে জীবন-যাপন করছেন দেখে খুব ভাল লাগছে।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)