ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৫ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড

ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১২ রবিউস-সানি, ১৪৪১

সিলেট, সড়ক সংবাদ কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনা: ২১ ঘণ্টা পর রেল চালু

কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনা: ২১ ঘণ্টা পর রেল চালু

নিরাপদ নিউজ: সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্ত নগর উপবন এক্সপ্রেস ট্রেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক যাত্রী। গত রবিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার বরমচাল লেভেলক্রসিং এলাকার অদূরে এই দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এই দুর্ঘটনার ফলে সড়কপথের পর সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামত শেষে ২১ ঘণ্টা পর গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করা হয়েছে।

সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুর সেতুর চতুর্থ স্প্যানের ফুটপাতসহ রেলিং ভেঙে পড়ায় গত ১৯ জুন থেকে সেই সেতু দিয়ে ভারী যান চলাচল বন্ধ ছিল। সড়কপথে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ গিয়ে পড়ে রেলের ওপর। ফলে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল দুর্ঘটনাকবলিত উপবন এক্সপ্রেস।

কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল স্টেশনের পাশে ইসলামাবাদ রেল আউটার সিগন্যাল এলাকার বড়ছড়া রেলব্রিজে এই দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন—কুলাউড়া পৌর শহরের ইউটিডিসি এরিয়ার বাসিন্দা আব্দুল বারীর স্ত্রী মনোয়ারা পারভিন (৪৫), দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার থানার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের আব্দুল বারীর মেয়ে ফাহমিদা ইয়াসমিন ইভা (২১), বাগেরহাটের আকরাম মোল্লার মেয়ে সানজিদা আক্তার (২০) ও হবিগঞ্জের বাহুবল থানার নূর হোসেনের ছেলে কাওসার (২৬)।

আহতদের মধ্যে ৬৩ জনকে কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখান থেকে ১৩ জনকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও সাতজনকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এই দুর্ঘটনার পর গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব মোজাম্মেল হোসেন ও রেলের মহাপরিচালক কাজী মো. রফিকুল আলম। সচিব মোজাম্মেল হোসেন  জানান, পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। সেগুলো উদ্ধারের জন্য দুটি ক্রেন আনা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে রেলওয়ের চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মিজানুর রহমানকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। রেলওয়ের বিভাগীয় পর্যায়ে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জানা যায়, গত রবিবার রাত ১০টা ৪ মিনিটে তিন শতাধিক অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে উপবন ট্রেনটি সিলেট ছাড়ে। মোগলাবাজার রেলস্টেশনে আসার পর কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনটির সঙ্গে ক্রসিংয়ের জন্য প্রায় ৩০ মিনিট সময় অতিবাহিত হয় ট্রেনটির। মোগলাবাজার থেকে ট্রেনটি রওনা হয়ে মাইজগাঁও স্টেশনে এসে যাত্রাবিরতি করে। মাইজগাঁও স্টেশন থেকে বেপরোয়া গতিতে ট্রেনটি ছেড়ে আসে। বরমচাল স্টেশনে লেভেলক্রসিং পার হওয়ার পর নড়বড়ে ব্রিজের ওপর দিয়ে যে গতিতে ট্রেনটি যাওয়ার কথা তার দিগুণ গতিতে ট্রেনটি ছুটে চলার কারণে ব্রিজের ২০০ গজ উত্তর পাশে রেললাইনের একপাশ থেকে অন্যপাশে ট্রেনটি যাওয়ার সময় স্লিপার ক্লিপ ভেঙে যায়। এতে রেললাইন এলোমেলো হয়ে গেলে ট্রেনটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।

দুর্ঘটনাকবলিত উপবন ট্রেনের ‘গ’ বগির যাত্রী সাংবাদিক রাহেলা সিদ্দিকা বলেন, চালক আব্দুস সাত্তার বেপরোয়া গতিতে ট্রেনটি চালানোর কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রেনের পেছনের পাঁচটি বগি রেখে সাতটি বগি নিয়ে ট্রেনটি অনেকদূর চলে যায়। পরে দুর্ঘটনাকবলিত বগিগুলোর যাত্রী চিৎকার আর আর্তনাদ শুনে আমরা ট্রেন থেকে নেমে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাই। এলাকাবাসীও দৌড়ে আসে উদ্ধারকাজে অংশ নিতে।

জেলা সিভিল সার্জন শাহজাহান কবীর, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাশেদুল ইসলাম, ফায়ার সার্ভিসের সিলেট বিভাগীয় উপপরিচালক মোহাম্মদ আলী, বিজিবি ব্যাটালিয়ন ৪৬ শ্রীমঙ্গলের সহকারী পরিচালক মো. শাহজাহানসহ জেলার বিভিন্ন থানার পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান।

ফায়ার সার্ভিসের সিলেট বিভাগীয় উপপরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, তাঁদের ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিটের ৫৪ জন সদস্য উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। বিজিবি ব্যাটালিয়ন ৪৬ শ্রীমঙ্গলের সহকারী পরিচালক মো. শাহজাহান জানান, বিজিবির দুই প্লাটুন সদস্য উদ্ধারকাজে অংশ নেয়।

দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম বলেন, রেলের বিশেষজ্ঞ টিম ছাড়া এই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা যাবে না। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, স্কাউট গ্রুপ ও স্থানীয় এলাকাবাসীর প্রাণপণ চেষ্টায় আহতদের দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

সিলেট বিভাগীয় স্টেশন মাস্টার আফসার উদ্দিন জানান, উপবন ট্রেনে নির্ধারিত টিকিটের যাত্রী ছিল ৮৮১ জন। আর বিনা টিকিট ও স্ট্যান্ডিং টিকিটের যাত্রী ছিল অসংখ্য।

সরেজমিন দেখা যায়, গতকাল সকালে ইসলামাবাদ এলাকায় বড়ছড়া রেলব্রিজের উত্তর পাশে ২০০ ফুট সামনে স্লিপার ভাঙাচোরা ও ওঠানো। ব্রিজের ওপর থেকে লাইনচ্যুত হয়ে একটি বগি নিচে খালে পড়ে যায় এবং একটি বগির সঙ্গে আরেকটি ঝুলছে। এ ছাড়া রেললাইনের পাশে ছিটকে পড়ে আছে তিনটি বগি।

রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (কুলাউড়া) জুলহাস গতকাল সন্ধ্যায় জানান, লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়া রেললাইন মেরামত হয়ে গেছে। বগিগুলো উদ্ধারের কাজ চলছে।

কুলাউড়ার বরমচাল স্টেশন মাস্টার রোমান আহমেদ বলেন, সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ ফের চালু হয়েছে। তবে এই রুটে চলাচলকারী সব ট্রেনকে দুর্ঘটনাকবলিত এলাকায় সর্বোচ্চ পাঁচ কিলোমিটার গতি রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)