আপডেট ২ মিনিট ৩ সেকেন্ড

ঢাকা বুধবার, ৪ আশ্বিন, ১৪২৬ , শরৎকাল, ১৯ মুহাররম, ১৪৪১

সাহিত্য গল্প: ‘মশা’

গল্প: ‘মশা’

মহিউদ্দীন আহ্মেদ,নিরাপদ নিউজ: ধরো তোমার মন-মেজাজ বেজায় তিরিক্ষি। পকেটে টাকা নাই তার ওপর রাত ১১ বাজল তো শুরু হলো গ্যাস্ট্রিকের বেদনা। মাসটা আবার জুলাই বলে পইপই গরম। পলেস্তরা খসা থেঁতলানো ছাদের লগে সাঁটানো ১৪ বছরের পুরনো আমিন ফ্যান-এর ক্বরক্বর ধ্বনি মেশানো উঞ্চ বাতাস ৫ হাত বাই সাড়ে ৩ হাত টুটা-ফাটা ঘিয়ে রঙের মশারির গতর পর্যন্ত যেতে না যেতেই হাঁপিয়ে ওঠে। ভেতরে তুমি আর তোমার বউ; ঘামে ভেজা চিটচিটে বেডশিটে লেপ্টানো নিম্ন মধ্যবিত্ত। বাতাসের তোড়ে মশারি ঘুমন্ত বেড়ালিনীর মতো খালি গোঙায়। জীবন বীমা-টীমার কোনোরকম সঞ্চয়হীন নিরঙ্কুশ চারটি কপর্দকহীন ও ফ্যাকাশে হাত মশারির ভেতর পড়ে আছে মৃতলাশের মতো।

ব্লাউজ আবৃত পিঠ ঘামে ভেজা কর্দমাক্ত কলপাড়; তবু আমার নিশপিশ হাত ওঠা-নামা করে; একটা সেতু নির্মাণের চেষ্টায়।
তবে, ঘুম আসুক আর না আসুক, পরদিন সকালে যথাসময়ে ঘুম না-ভাঙলে চাকরি গেল বলে! চাকরি তো নয়মুটোগিরি। ফলে যতই গ্যাস্ট্রিকের বেদনা থাক কিংবা মোটা বউয়ের নাক ডাকার ঘড়ঘড় শব্দ থাকুক ঘুমের জন্য নিজেকে ঘুমদেবীর কাছে সমর্পণ ছাড়া গতি কী! কিন্তু সমস্যা করবে ১০টি নয় পাঁচটি নয় একটি মাত্র মশা। মশকরাজ!

সৈন্য-সামন্ত মশারা মশারির চারপাশ থেকে হুমড়ি খেয়ে দেখবে তোমার বউকে। আর মশকরাজ ৩০ সেকেন্ড অন্তর অন্তর তোমার কানের কাছে প্লেন চালাবে পুঁন পুঁন পুঁন. পুঁন পুঁন!

তুমি যতই হাপিত্যেশ করো না কেনএর কোনো প্রতিকার নাই কেননা বৈষয়িক কাজে-কর্মে কুটিল বাধা অন্তহীন।

সমস্যা হলো মশাটা কামড়ায় না। তন্দ্রাভাব আসামাত্র কানের কাছে ছুটোছুটি শুরু করে। প্রথমে ডান কান তারপর বাম কান। আমি সচেতন হয়ে হাত এটেনশনে রাখি কানের কাছে মশাটা আসামাত্র কষে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেবো বলে; থাপ্পড় দিইও; কিন্তু সে উধাও! নিজেই নিজের থাপ্পড় খেয়ে কুঁইকুঁই করতে করতে পারভীনের মোটা হাতের ড্যানার নিচে মুখ লুকাই। অমা! স্ত্রীলোকের অমন নরম হাত রেখে মশাটি আমার কানের কাছেই চলে আসে আবার। তা বাপু আমার মধ্যে কী এমন সুধা লুক্কায়িত? এমনিতেই গ্যাস্ট্রিক; পাকস্থলী হতে কণ্ঠনালি পর্যন্ত হলো গিয়ে দহন প্রজেক্ট; ল্য্যাক্টামিল আর এন্টাসিড নিত্যসঙ্গী সেই আমার রক্ত কি এতটাই টেস্টি?

সাত বছরের দাম্পত্য জীবনে আমরা নিঃসন্তান। বলতে কী, বাবা হওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছি। এখন গ্যাস্ট্রিকের চিকিৎসা করাচ্ছি কলতা পাড়ার নিধুবাবুর কাছে। সে নিয়মিত গাছন্তি ওষুধ দিচ্ছে। বলেছে, নির্মূল হয়ে যাবে। নিজের গ্যাস্ট্রিকের বাইরে অন্য কোনো চিন্তা আপাতত মাথায় নিচ্ছি না। আগে দহন প্রজেক্টের নিস্তার হোক। পরে না-হয় বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা যাবে।

একেক রাতে এমন হয় যে, ঘুমাতেই পারি না। বার কয়েক বাথরুমে যাই; শরীর পানিশূন্য হয়ে আসে, ক্ষুধায় পেট চিনচিন করতে থাকে; উপায়ান্ত না দেখে এপাশ-ওপাশ করতে করতে পারভীনের কাঁধাংশে বা পিঠাংশে হাত রেখে ফেলি। সুতি ব্লাউজ আবৃত পিঠ ঘামে ভেজা কর্দমাক্ত কলপাড়; তবু আমার নিশপিশ হাত ওঠা-নামা করে; একটা সেতু নির্মাণের চেষ্টায়। এমন সময় শুরু হয় মশাটির দাপাদাপি। দমে যায় উদ্গত শিহরন। পারভীনও যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। অতঃপর একটা নেভি সিগারেট ধরানোর সাথে সাথে দহন প্রজেক্ট হুরমুর করে ফেটে পড়ে উল্লাসে!

 

আলমগীর অযথাই চেষ্টা করে। মশকরাজের নাগাল পাওয়া অত সহজ নয়। কেননা আমি তার শক্তিমত্তা জানি। বাতি নেভালে সে আলমগীরের কানের মধ্যে প্রবেশ করতে চায় আর বাতি জললে চুপটি করে এসে বসে আমার নাকের ডগায় কিংবা চিবুকে কিংবা ঠোঁটে। আলমগীর দেখতে পায় না তার শত্রুকে।

মাঝে-মধ্যে মশাটি আমার গলায় সুড়সুড়ি দেয়। তখন জানালার পর্দা হয়ে পড়ে কোমল বাতাসের ঘূর্ণায়মান পাখা। ৭ বছরের দাম্পত্য জীবন বিবমিষাময়। সকল স্বপ্নের শিরা-উপশিরা এখন রক্ত শূন্য নিষ্ফলা। যেদিকে তাকাই শুধু কর্পূরের ধোঁয়া। ধুলোর নিচে চাপা পড়ে আছে আমার যৌবন। আমি কি পারি না সেই পারু হতে যাকে দেখার জন্য শত শত জোয়ান ঘুরঘুর করত কিংবা যার জন্য গলায় দড়ি দিতে চেয়েছিল ম-ল বাড়ির মোস্তফা? এখন এই আলমগীরের ঘর-সংসার-রান্নাবান্না সব আমার কাছে হাঁসফাঁস ঠেকে। আলমগীর নিজের জীবন নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে। তার নাকি আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নাই। শুনে আমার গা জ¦লে। জীবিত মানুষের আবার চাওয়া-পাওয়া থাকে না কিভাবে?

পারভীনের সাথে রাত্রিযাপন করবে কি-না সেটাও ভেবে দেখা জরুরি। কেননা ফুটো হয়ে যাওয়া নৌকা কতদিন ভেসে থাকে জলে?

তার টিনটিনে হাড্ডিসার শরীর আর মাথা মোটা করোটির মধ্যে কোনো প্রত্যাশার জ্যোতি নাই, দম্ভ নাই এমনকি কোনো কিছু হারাবার আশঙ্কাও নাই। কিন্তু আমার আছে। জীবনের জন্য যদি কোনো মায়া-দয়া থাকে তবে সে জীবন কখনোই একা নয়; জীবনেরও থাকে অনেক শাখা-প্রশাখা।

আলমগীর!
তুমি এখন কী করবা? পারভীন যা বলার সাফ বলে দিয়েছে। তার কথার মধ্যে শুধু বেদনা। মানুষকে কাতর করে তোলে। মনে হলো পারভীন খুব যন্ত্রণার মধ্যে আছে।

শোনো। সংসার জীবনডা জটিল। সবাই পারে না। সবাইকে পারতে নেইও। না না, তোমার মুরোদ নাই সে কথা বলছি না। ধরো, এটা মনোবিশ্লেষণী একটা কথা।

তাহলে এখন কী করবা? পারভীন খুব সম্ভবত চায় আলাদা থাকতে। তোমাকে ফাঁকি দিয়ে মশকরাজ তোমার বউয়ের ঠোঁটে, গলায়, চিবুকে আদর বোলায়। তাতে সে আনন্দ অনুভব করে। সেই মশকরাজের জন্য তোমার ঘুম হারাম হোক তা নিশ্চয় তুমি চাও না!

এক কাজ করতে পারো। মশাটিকে শত্রু না ভেবে বন্ধু ভাবতে পারো। দেখবে মশাটিও আর তোমাকে জ্বালাতন করছে না। ফাঁকিও দিচ্ছে না।
কিন্তু তারপর থেকে একই মশারির নিচে পারভীনের সাথে রাত্রিযাপন করবে কি-না সেটাও ভেবে দেখা জরুরি। কেননা ফুটো হয়ে যাওয়া নৌকা কতদিন ভেসে থাকে জলে?

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)