আপডেট ২৮ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড

ঢাকা সোমবার, ৯ আশ্বিন, ১৪২৬ , শরৎকাল, ২৪ মুহাররম, ১৪৪১

ভ্রমন ঘুরে আসুন ভারতের মন্দির নগরী বিষ্ণুপুর

ঘুরে আসুন ভারতের মন্দির নগরী বিষ্ণুপুর

রাসমঞ্চে সাংবাদিক, লেখক পর্যটক নাসিম রুমি

নাসিম রুমি, নিরাপদ নিউজ : সম্প্রতি কলকাতা থেকে মাত্র চার ঘন্টার ট্রেনে বাহক হয়ে ভারতের মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরে এই প্রথম সফরে গিয়েছিলাম। ভারতের বিভিন্ন টেরাকোটার মন্দিরগুলি আমাকে আকৃষ্ট করে। রামের্শর, কন্যকুমারী, মাদ্রাজ, মহিশ্বরের মন্দিরগুলি আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।

জোড় বাংলো মন্দিরের নিকটে লেখক

জোড় বাংলো মন্দিরের নিকটে লেখক

মল্লরাজাদের একদার রাজধানীর জাদুঘরটাও অসাধারণ, আরো অসাধারণ রাসমঞ্চটি। লালগড় উদ্যানটিও বেশ সুন্দর। এটাকে অনেকে প্রেম-কানন বলে অবহিত করে থাকেন। এখানে শুধু প্রেমিক-প্রেমিকাদের লিলা খেলা এবং অশ্লীলতা।

লালগড় উদ্যানে পর্যটক নাসিম রুমি

লালগড় উদ্যানে পর্যটক নাসিম রুমি

এমন কিছু দূর নয়। কলকাতা থেকে ২৫৭কিমি দূরত্বে প্রাচীন মল্লভূমের রাজধানী ও মন্দিরের শহর বিষ্ণুপুর। রাত্রিবাসের উপযুক্ত ব্যবস্থা আছে। কাজেই এবার আপনার বেড়ানোর কেন্দ্রবিন্দু হোক শিল্প সংস্কৃতি ও সঙ্গীতের পীঠস্থান তথা প্রাচীন ইতিহাস আর উপকথার শহর বিষ্ণুপুর। আগে থেকে পরিকল্পনা করলে আপনি শতাব্দী প্রাচীন এই মন্দিরময় বিষ্ণুপুর ঘুওে আসতে পারবেন।

মদন মোহন মন্দির

মদন মোহন মন্দির

একদা মল্লরাজাদের রাজধানী শহর বিষ্ণুপুর। চতুর্দশ ও ষোড়শ শতকের প্রচুর মন্দির প্রধানত টেরাকোটা কারুকার্যখচিত বহু মন্দির ছড়িয়ে আছে বিষ্ণুপুর জুড়ে । মল্লভূম সা¤্রাজ্যের উত্থন পতন আরও কত রোমাঞ্চকর ঘটনার সাক্ষী এই বিষ্ণুপুর । জঙ্গল পরিবেষ্টিত বিষ্ণুপুরের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছেন তাঁরা।

নন্দলাল মন্দির

নন্দলাল মন্দির

পশ্চিম দিগন্তে সূর্য আস্তে আস্তে হেলে পড়েছে । সমগ্র বনাঞ্চলে আসন্ন সন্ধ্যার পূর্বাভাস ফুটে উঠেছে। মালভূম বীরভূম শরভূ সেনভূমম ধলভূম সামন্তভূম ,শিখরভূম ও তুঙ্গভুম এই আটটি রাজ্য নিয়ে গড়ে উঠেছিলো সেদিনের মল্লভূম সাম্রাজ্য । আজও বিষ্ণুপুরের এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে অগণিত মন্দির । শহরটি তাই মন্দিরময় ।

থাকার আবাসন হলিডে রিসোর্ট

থাকার আবাসন হলিডে রিসোর্ট

এইসব মান্দির মল্লরাজদের কীর্তি বহর করে চলেছে চতুর্দশ ও ষোড়শ শতকে এগুলি নির্মিত। মন্দিরগুলির গায়ে খোদাই করা শিল্পকীর্তি ও কারুকার্য দেখলে বিশ্মত হতে হয় । পোড়ামাটির ফলকে দেবদেবীর উপাখ্যান, তৎকালীন সমাজ জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে।

বিষ্ণুপুরে সরকারী লজের বাগানে লেখক পর্যটক নাসিম রুমি

বিষ্ণুপুরে সরকারী টুরিস্ট লজের বাগানে লেখক পর্যটক নাসিম রুমি

বিষ্ণুপুরের অগণিত মন্দিরগুলির মধ্যে জোড় বাংলা শ্যামসুন্দর , মদনমোহন এবং রাধাশ্যাম মন্দির ছাড়া প্রায় প্রত্যেকটি মন্দিরের গঠন প্রণালী একই প্রকার। প্রত্যেক কটি মন্দিরের মাথায় কারুকার্য খচিত একটি করে চুড়া । শ্যামসুন্দর মন্দিরের কিছু মিথুন মুর্তি ছাড়া রামলীলা ও বিভন্ন নৃত্যের চিত্রশৈলী দেখতে পাওয়া যায় ।রাজ্য জগৎমল্ল প্রতিষ্ঠাত মৃন্ময়ী মন্দিরটি বিষ্ণুপুরের আদি মন্দিও বলে জানা যায় । মল্লভূম রাজাদের প্রয় দু- হাজারের ওপর কামাছ ছিল।

বিষ্ণুপুর জাদুঘরে লেখক

বিষ্ণুপুর জাদুঘরে লেখক

দলমাদল কামান তাদের অন্যতম । কামানটি প্রয় সাড়ে বারো ফিট দৈর্ঘ্য এবং ওজনে ১৯৬ টন ৬৩ টি লোহার আংটা পেটাই করে এই কামানটি তৈরি করা হয়েছিল। সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য যে এই কামানটির গায়ে আজও কোন মরচে (রাস্ট ) পড়েনি। বীর হাম্বীরের আশ্চর্য কীর্তি রাসমঞ্চ । দূর থেকে পিরামিডের মত মনে হয় । এর গঠন নৈপুণ্য অন্যান্য মন্দিরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । রাসলীলা উৎসবের সময় অন্যান্য মন্দিরের শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ এই স্থানে রাখা হতো । মল্লভূমের রাজা বীর হাম্বীর এর নির্মাতা বলে আছে । আজও বিষ্ণুপুরের অতীতে সাক্ষ্য বহন করে আছে সাতটি সুবৃহৎ বাঁধা লাল বাঁধ , কৃষ্ণ বাধ শ্যাম বাঁধ ও পোকা বাধঁ জলসেচের সুবিধার জন্য এইসব বাঁধ খনন করা হয়েছিল । বর্ষা ও প্লাবনের জল এইসব বাঁধগুলোয় ধরে রাখা হতো । বাঁধগুলোর মধ্যে লাল বাঁধ সর্ববৃহৎ ছিলো এবং এটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ।

রাসমঞ্চের অন্যদিকের দৃশ্য

রাসমঞ্চের অন্যদিকের দৃশ্য

ভারতীয় সঙ্গীত চর্চায় বিষ্ণুপুর এক সময় বিশিষ্ট স্থান আধিকার করেছিলো । বিষ্ণুপুর ঘরানার জন্ম অষ্টদশ শতকের শুরু থেকে মল্লরাজ দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ ছিলেন সঙ্গীেেতর উপাসক । রাজ্য পরিচালনার চেয়ে সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিলো অপ্রতিরোধ্য । মল্লরাজ তার রাজসভায় তানসেন বংশধর ওস্তাদ বাহাদুল খাকে স্থান দিয়েছিলেন। দিল্লী থেকে পাখোয়াবাদক পীরবক্রাকেও নিয়ে এসেছিলেন তাঁর দরবারে ।

রাসমঞ্চের বারান্দায় লেখক

রাসমঞ্চের বারান্দায় লেখক

বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা মল্লরাজ দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ হলেও গদাধর চক্রবর্তী ও রামশস্কর ভট্রাচর্য ছিলেন এই ঘরানাকে যাঁরা শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বছিয়েছিলেন তাদের অনেকের মধ্যে যদুভট্র থেকে রামপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় পাখোয়ার শিল্পী নিত্যানন্দ গোস্বামী , মণিলাল নাগের নাম উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়। বিদেশের বাজারে এই শিল্পের চাহিদা আছে বিশেষ করে পোড়ামাটির ঘোড়া । অন্যান্য শিল্পের মধ্যে তাঁত শিল্প বিশেষ করে বিষ্ণুপরের বালুচরী শিল্প আজ বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেছে।

দলমাদল কামান

দলমাদল কামান

বিষ্ণুপর মল্লরাজ বংশের ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়ের কথা উল্লেখ না করলে এ লেখা অসম্পুর্ণ থেকে যাবে । ইতিহাস প্রসিদ্ধ লাল বাঁধের কথা আগেই বলেছি কারণ মল্লরাজ দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ – র প্রেমিকা লালবাঈ – এর নামে এই বাঁধের নামকরণ হয়। সঙ্গীতপ্রেমী রঘুনাথ সিংহ মনেপ্রণে ভালোবেসেছিলেন মুসলমান নর্তকী লালবাঈকে । ভুলে গিয়েছিলেন রাজর্ধম । লালবাঈ- এর রূপ যৌবন তার রঘুনাথকে চন্দ্রপ্রভা কাছে থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলো । চন্দ্রপ্রভা সে জ্বালা সহ্য করতে পারেননি । কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে চন্দ্রপ্রভার বিষাক্ত তীর এসে বেঁধে রঘুনাথের বুকে । রঘুনাথের মৃত্যুর পর লালবাঈকে লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ করে লাল বাঁধের জলে ডুবিয়ে মারা। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেক্ষ বিষ্ণুপুর শহরে থাকার জন্য অসংখ হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে সরকারী টুরিস্ট লজ, উদয়ন, মনা লিসা লজ, হোটেল হেরিটেদ ও হলিডে রিসোর্ট অন্যতম।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)