আপডেট জুন ২১, ২০১৯

ঢাকা রবিবার, ৬ কার্তিক, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ২১ সফর, ১৪৪১

কৃষি, চট্টগ্রাম চট্টগ্রামের মীরসরাই উপকূল এলাকায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চিংড়ি রেণু আহরণ

চট্টগ্রামের মীরসরাই উপকূল এলাকায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চিংড়ি রেণু আহরণ

জামশেদুল ইসলাম,নিরাপদ নিউজ: মীরসরাই উপজেলার উপকূলীয় জোন ও ফেনীর সোনাগাজী মধ্যবর্তী এলাকার সমুদ্র উপকূলীয় ফেনী নদীর বিভিন্ন স্থানে ও সাগরের মোহনায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অবৈধভাবে অবাধে চলছে গলদা-বাগদা চিংড়ির রেণু আহরণ। রেণু আহরণ করতে গিয়ে প্রতিনিয়তই ধ্বংস হচ্ছে হাজারো প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী।

নদীর বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, নিষিদ্ধ মশারি ও ঠেলা জাল দিয়ে জেলেরা লাখ লাখ চিংড়ি রেণু আহরণ করে বিক্রি করছে স্থানীয় ব্যাপারীদের কাছে। ব্যাপারীরা সেগুলো দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছে খুলনা, বাগেরহাট ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন চিংড়ি ঘের মালিকদের কাছে। ফেনী নদীর মুহুরী রেগুলেটরের দু’পাশে, চর খোন্দকার, ইছাখালী ও উপকূল, সোনাগাজীর জেলেপাড়া, সুজাপুর, থাক খোয়াজ লামছি, ছোট স্লুইচ গেট, ভাঙ্গাবেড়ী, চর খোয়াজের লামছিসহ বেশ কিছু স্থানে গিয়ে চিংড়ির আহরণ ও মৎস্য প্রজাতির এ ধ্বংসলীলা দেখা যায় প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত। অথচ প্রজনন মৌসুম থাকায় এ সময়টাতে নদীতে মাছ ধরার প্রতি রয়েছে সরকারি নিষেধাজ্ঞা। ফেনী নদীর মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের মীরসরাই এর ইছাখালী, বানচন্দ খাল পর্যন্ত এবং ছোট ফেনী নদীর কাজীর হাট স্লুইচ গেট থেকে দক্ষিণে সন্দ্বীপ চ্যানেল পর্যন্ত বিশাল উপকূলীয় এলাকায় প্রতিদিনই লাখ লাখ চিংড়ি পোনা আহরণ করা হচ্ছে। এতে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও সোনাগাজী উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ শুধু নদীতে চিংড়ি পোনা আহরণ করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে।

এসব স্থান ঘুরে দেখা যায়, জেলে, শিশু ও বৃদ্ধ সবাই মশারি এবং ঠেলা জাল নিয়ে চিংড়ি রেণু আহরণ করছে। জেলেরা শুধু বাগদা-গলদা চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করে অন্যান্য মাছের রেণু ও জলজ প্রাণী ফেলে দিচ্ছে। পোনা আহরণের জন্য এসব জেলেরা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় গড়ে তুলেছে অবৈধভাবে অসংখ্য টিনের ঘর। ফেনী থেকে ঢাকা, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার চিংড়ি ঘেরগুলোতে পোনা পাঠানো হয়। শুধু সোনাগাজী এলাকা থেকেই প্রতিদিন লক্ষাধিক চিংড়ি পোনা ঢাকা ও খুলনা অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। নদীর মুহুরী প্রজেক্টের ফেনী রেগুলেটর এলাকায় গিয়ে দেখা হয় এমন কয়েকজন মাছ ব্যবসায়ীর সঙ্গে।

জাহিদুল ইসলাম নামে এক মাছ ব্যবসায়ী এসেছেন খুলনার পাইকগাছা এলাকা থেকে। তিনি জানান, চিংড়ির রেণু পোনা আহরণ করতে দু’মাসের জন্য এ এলাকায় এসেছেন। স্থানীয় মহাজনের মাধ্যমে তিনি নদী থেকে এ পোনা আহরণ করে প্রতি পিস ৫০ পয়সা ধরে বিক্রি করেন। চিংড়ি রেণু আহরণে ধ্বংস হচ্ছে জলজ প্রাণী।

সাতক্ষীরার আশাশুনি থেকে আসা আমজাদ হোসেন নামে আরেকজন জানান, তিনি প্রতি বছরই এপ্রিল-জুন তিনমাসের জন্য এলাকায় চিংড়ির রেণু পোনা আহরণের জন্য আসেন। স্থানীয় কালু মিয়া মহাজনের মাধ্যমে তিনি আহরণ করা পোনা বিক্রি করেন।

আব্বাস হোসেন নামে আরেকজন বলেন, চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করার সময় কোরাল, কাঁকড়া, বাইলা, মলা, ডেলা, চেউয়া, তফসে, বাটা, চাপিলা, কুচিয়া, টেংরা, পোয়া, লইট্টা, ভেটকি, ইলিশ, কাচকিসহ আরও অনেক প্রজাতির পোণা আসে। তারা শুধু চিংড়ি পোনা আহরণ করে বাকিগুলো ফেলে দেন। প্রতিটি চিংড়ির ভালো দামে বিক্রি করতে পারেন। অন্য মাছের পোনা নষ্ট হলে তাতে তাদের কোনো সমস্যা নেই।

এসব অঞ্চলের মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমরাও বুঝি আমরা মাছের জাত ধ্বংস করছি। কিন্তু কী করবো? এই সময় কোনো কাজ না থাকায় জীবনের তাগিদে বাধ্য হয়ে এই রেণু আহরণ করছি। তারা আরও বলেন, খুলনা, বাগেরহাট যশোর এলাকার ঘের মালিকরা স্থানীয় সোনাগাজী ও মীরসরাই এলাকার আড়তদারদের মাধ্যমে চিংড়ি রেণু সংগ্রহ করে। আড়তদাররা হকারের মাধ্যমে জেলেদের কাছ থেকে রেণু সংগ্রহ করে। সবাই নির্দিষ্ট হারে কমিশন পায়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি পোনা ৫০ পয়সায় বিক্রি করলেও খুলনা পর্যন্ত যেতে তার দাম পড়ে তিন টাকার মতো।

স্থানীয়রা জানায়, এক সময় এ অঞ্চলে অনেক মাছ পাওয়া যেতো। এভাবে চিংড়ির আহরণ করতে গিয়ে মাছের প্রজাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, এর ফলে নদীতে আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। এলাকার সাধারণ মানুষ বলছে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে বেপরোয়াভাবে এই রেণু ধরা বন্ধ করার দরকার। অনেকে অভিযোগ করেন, স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই অবাধে চলছে এ রেণু সংগ্রহ।

এ বিষয়ে কথা হয় ফেনী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মৎস্য বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো. সাইফুদ্দিন শাহের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে চিংড়ির রেণু আহরণ করা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে। তারপরও সাগর মোহনা অঞ্চলের গরিব মাছ ব্যবসায়ীদের ঠেকানো যাচ্ছে না। তারা অবৈধভাবেই নদী ও খাল থেকে গলদা এবং বাগদার রেণু পোনা আহরণ করছেন। এ প্রবণতা আরও বেড়ে গেছে বিগত কয়েক বছরে হ্যাচারিগুলোতে কৃত্রিমভাবে পোনা উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে। এখন ঘের মালিকরা সবাই গলদা চিংড়ির জন্য প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদের উপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে আছে। আর বাগদার রেণুতো ধরেই। ফলে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ দিনদিন মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, একটি গলদা বা বাড়দা চিংড়ির রেণু পোনা আহরণ করতে গিয়ে অন্য ৪৬৩ প্রজাতির মাছের রেণু পোনা ধ্বংস হয়। আর সঙ্গে নদীর পানিতে বাস করা ক্ষুদ্র জীব কণা ধরা হয় তাহলে তার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭৬৩টি। এটা সার্বিকভাবে বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের জন্য বিশাল ক্ষতির কারণ। এটা কঠিনভাবে রোধ না করতে পারলে বাংলাদেশের নদীগুলো ধীরে ধীরে মাছ শূন্য হয়ে যাবে। আর রোধ করা গেলে বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদ বাড়বে দিনকে দিন।

ফেনী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শরিফ উদ্দিন বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে, এভাবে নদীতে চিংড়ির রেণু পোনা ধ্বংস করা অবৈধ, যদি কেউ এভাবে করে থাকেন, তাহলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা উপজেলা প্রশাসন থেকে সহায়তা নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালাবো এবং মৎস্য সংরক্ষণ আইনের আওতায় শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। তিনি আরও বলেন, এই রেণু আহরণে বেশি ক্ষতি হচ্ছে ইলিশের। এতে হাজারো জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য দরকার ব্যাপক গণসচেতনতা ও জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান।

মীরসরাই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বলেন, আমরা শীঘ্রই এই বিষয়ে মুহুরী নদীর মোহনায় অভিযান পরিচালনা করবো। তবে পোনা আহরনের অধিকাংশ অংশ ফেনী এলাকায় হওয়ায় ফেনী মৎস্য বিভাগের জরুরি পদক্ষেপ বেশি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)