সংবাদ শিরোনাম

২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং

00:00:00 শুক্রবার, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ , শরৎকাল, ২রা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী
চট্টগ্রাম, ফিচার চট্টগ্রামে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ

চট্টগ্রামে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ

পোস্ট করেছেন: Nsc Sohag | প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ২৬, ২০১৭ , ৬:২৬ অপরাহ্ণ | বিভাগ: চট্টগ্রাম,ফিচার

চট্টগ্রামে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ

শফিক আহমেদ সাজীব, ২৬ জানুয়ারি ২০১৭, নিরাপদ নিউজ : চন্দনাইশসহ চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে এক সময় সারি সারি খেজুর গাছ ছিল। এখন সে রকম খেজুর গাছ নজরে পড়ে না। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ এবং সে গাছের রসের তৈরি শীতের পিঠা। বর্তমানে নানা প্রকার খাদ্যদ্রব্য বাজার ও দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। এসব কৃত্রিম খাদ্য মানুষ নানা উপকরণ মিশ্রিত করে তৈরি করে থাকে। এ সকল খাদ্যদ্রব্য স্বাস্থ্যসম্মত কিনা এ নিয়ে প্রায় কথা উঠে।

মানুষ স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সময় সময় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও দোকানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে থাকে। ভেজাল খাদ্য সনাক্ত করে প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে অর্থদ দিয়ে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে জেলও দেয়া হয়। গ্রামের বিভিন্ন ফলফলাদির গাছ থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক খাদ্য এখন নেই বললেই চলে। খেজুর গাছও সে ধরনের একটি গ্রাম্য গাছ। যার থেকে শীতকালে রস বের করে মানুষ বিভিন্ন ধরনের শীতের পিঠা তৈরি করে থাকে। তাছাড়া খেজুর গাছের ফলগুলো খুব মিষ্টি এবং সুস্বাদু।

খেজুর গাছ মানুষের অনেক উপাধেয় খাদ্যের যোগান দিয়ে থাকে। শীত মৌসুমে রস, বৈশাখের শেষদিকে জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে খেজুর উৎপাদিত গুড় সংরক্ষণ করে সারা বছর খেজুর রসের স্বাদ গ্রহণ করা যায়। গ্রামে প্রচলন ছিল নতুন বিয়ে হলে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে শীত মৌসুমে শীতপিঠা, ভাপাপিঠার সাথে খেজুর রস পাঠানোর রেওয়াজ এখনো বিদ্যমান। রসসহ পিঠা না পাঠালে মেয়ের শ্বশুরপক্ষ অসন্তুষ্ট হয়। তাই মেয়ের শ্বশুর পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে রস সংগ্রহ করে শীতপিঠা পাঠাতে হতো। গ্রামে-গঞ্জে যখন খেজুর গাছ প্রচুর ছিল, তখন স্বেচ্ছাশ্রমে কাজে খেজুর মিষ্টান্ন ওা শীতপিঠা দিয়ে কাজ শেষে আপ্যায়ন করা হতো। শুধু তাই নয় গ্রামের দুষ্টু ছেলেরা খেজুরের রস চুরি করে খেয়ে খুব আনন্দ পেত। এমনকি যার গাছের রস চুরি করেছে তাদের বাড়িতে এনে ছেলে ও আত্মীয়স্বজনদের খাওয়াত।

এ নিয়ে অনেক গল্প-কবিতাও রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন উপজেলায় খেজুর গাছ নেই বললেই চলে। গত এক দশক ধরে ইটভাটায় খেজুর গাছ জ্বালানোর ফলে এখন গাছগুলো বিলুপ্তির পথে। খেজুর গাছের পাতা দিয়ে ঘরের ঝাড়–তৈরি করা হয়। আর খেজুর কাটা দিয়ে বাড়ির আঙিনায় ঘেরা দেয়া হয়। যাতে বাড়িতে চোর বা অবাঞ্চিত লোক বাড়িতে ঢুকতে না পারে। এছাড়া খেজুর পাতা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। খেজুর গাছ কেউ রোপন করত না। পাখ-পাখিরা খেজুর খেয়ে মাটিতে বীজ ফেললে এ ধরনের বীজ থেকে খেজুরের গাছের জন্ম হতো। এখন গাছ যেহেতু নেই, কোন পাখি আর পাকনা খেজুর খেতে পারে না। তাই গাছেরও জন্ম হচ্ছে না।

তাছাড়া সাধারণ মানুষের খেজুর গাছ রোপনের প্রবণতাও নেই। শীতের শুরুতে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো চন্দনাইশের গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। যদিও আগের মত সে রকম খেজুর গাছ নেই। প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য খেজুর গাছ আর গুড়ের জন্য কিছু অঞ্চল ছিল পরিচিত। অনেকে শখের বসে এ খেজুর গাছকে মধুবৃদ্ধি বলে ডাকত। শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথে খেজুর গাছ কাটার প্রতিযোগিতা পড়ে যেত গাছিদের মাঝে। গত কয়েক দশক ধরে ইটভাটায় জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় খেজুর গাছ ফুরিয়ে যেতে শুরু করেছে। পুরো চন্দনাইশে জীববৈচিত্রের সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গত কয়েক বছর ধরে খেজুর গাছ সংরক্ষণ ও রোপনের কোন ব্যবস্থা নেয়নি কোন মহলই। দেশি জাতের এ খেজুর গাছ এখন বিলুপ্তির পথে।

বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, এখানকার আবহাওয়ার সাথে মানানসই খেজুর গাছ এমনিতেই জন্মে। অন্যান্য সময় অবহেলায় পড়ে থাকা খেজুর গাছ শীতকালে কদর বেড়ে যায়। কারণ এ গাছ মিষ্টি রস দেয় এ মৌসুমে। আর এ রস জ্বালিয়ে দানা গুড় ও পাঠালি গুড় তৈরি করা হয়। খেজুরের গুড় থেকে এক সময় বাদামি চিনিও তৈরি করা হতো বলে জানালেন বিশেষজ্ঞ মহল। যার স্বাদ ও ঘ্রাণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। খেজুর গাছ থেকে রস আহরণকারী গাছিদের প্রাণ ভরে উঠত আনন্দে। যদিও আগের মত সে রমরমা খেজুর রসের চাহিদা থাকলেও গাছ নেই। শীতকে স্বাগত জানাতে গাছিরা খুব জোরেসুরে খেজুর গাছ কাটা শুরু করেন। গাছ থেকে গাছিরা সুমিষ্ট খেজুর রস সংগ্রহ করে। সে রস দিয়ে তৈরি হবে সুস্বাদু নলেম গুড় ও পাঠালি। খেজুর রসের নলেম গুড়ের মু মু গন্ধে ভরে দেবে গ্রাম্য জনপদ।

খেজুর রস দিয়ে গৃহবধূদের সুস্বাদু পায়েস, বিভিন্ন ধরনের রসে ভেজানো পিঠা তৈরি করার ধুম পড়ে। রসনা তৃপ্তিতে খেজুরের নলেম গুড়ের পাঠালি নেই। গ্রাম্য জনপদের সাধারণ মানুষ শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে কাপতে কাপতে খেজুর রস না খেলে যেন দিনটা মাটি হয়ে যায় এ মন্তব্য বিজ্ঞজনদের। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হরেক রকমের শীতকালীন বাহারি পিঠা। আমন ধান ঘরে তোলার সাথে সাথে নবান্নের উৎসবে মেতে উঠে বাংলার মানুষ। পাড়ায়-মহল্লায় ছোট-বড় সকলেই পিঠা খাওয়ার আনন্দে মেতে ওঠে। কিন্তু এখন তা আর চোখে পড়ে না। কর্মচাঞ্চল্য ব্যস্তময় জীবনের গর্বে তা এখন বিলুপ্তি প্রায়।

শীত যতই বাড়ে, ততই যেন মানুষের পিঠা বানানোর ব্যস্ততা বাড়ে। শীত আসলেই গ্রাম-গঞ্জ, শহরের ফুটপাত হতে শুরু করে প্রতিটি স্থানে পিঠা বানানোর ব্যস্ততা বেড়ে যেত। বাহারি রকমের পিঠা তৈরির উৎসবে আত্মহারা হত সর্বস্তরের মানুষ। শীতের আগমনি বার্তায় হত দরিদ্র মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম পন্থা হয়ে উঠত পিঠা তৈরির। এ পিঠা বিক্রির অর্জিত অর্থের মাধ্যমে চলত তাদের সংসার। তীব্র কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়কের পাশে, হাটে-বাজারে, পাড়া-মহল্লার মোড়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পিঠা বিক্রির উৎসব চলত। বিভিন্ন শ্রেণীর, পেশার মানুষ এসব পিঠা খাওয়ার জন্য ভিড় করতে দেখা যেত। এসব পিঠা বিক্রির কাজে পুরুষের পাশাপাশি মহিলারাও যুক্ত হত। এখন সে দৃশ্য চোখে পড়ে না। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে চিতল, দুধ চিতল, পুলি, নকশী, পাটিশাট্টা, ভাপা, চুষি, শিম, পাখন, তেলে, গোটাপিঠা হরেক রকমের পিঠা তৈরিতে গৃহিনীরা ব্যস্ত সময় কাটাত।

কিন্তু কালের বিবর্তনে কর্মচাঞ্চল্যের কারণে মানুষ এখন বাড়ীতে পিঠা তৈরির উৎসব-আমেজ হারিয়েছে। এতে শীতের বাহারি নকশী করা পিঠা খাওয়ার স্বাদ ও আমেজ হারাচ্ছে এ প্রজন্ম। ভবিষ্যত প্রজন্ম হারাচ্ছে পিঠা তৈরির কৌশল। সে পিঠা বানানোর আমেজ হারিয়ে গেছে অনেক আগে। এখন সবাই পিঠা বাজার থেকে কিনে এনে খায়। এতে কোন আনন্দ-উৎসাহ থাকে না। গ্রামে-গঞ্জের গৃহিণীদের মধ্যেও আগেকার মত পিঠা বানানোর উৎসব নেই। তাই পিঠা বানানোটা এখন স্মৃতি হয়ে গেছে। এতে করে হরেক রকমের পিঠা আমাদের নতুন প্রজন্ম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। যুগ যুগ ধরে ঐতিহ্য বহন করা বিভিন্ন বাহারি পিঠা তৈরি করে বিক্রির বিষয়টি কর্ম সন্ধানে দরিদ্রদের আলোকবর্তিকা হিসেবে জীবিকা নির্বাহের সহায়ক হবে বলে বিজ্ঞজনেরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আজকের জনপদে ঐতিহ্যের সে বাঙালির বাহারি পিঠা আসতে আসতে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Digg thisShare on Tumblr0Email this to someonePin on Pinterest0Print this page

comments

Bangla Converter | Career | About Us