ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট জুন ৩, ২০১৯

ঢাকা বুধবার, ৯ কার্তিক, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ২৪ সফর, ১৪৪১

ফিচার চীন দেশে কেমন হয় বাংলাদেশীদের রমজান আর ঈদ…

চীন দেশে কেমন হয় বাংলাদেশীদের রমজান আর ঈদ…

ফায়সাল করিম,নিরাপদ নিউজ: আর মাত্র কয়েকদিন। তার পরই মুসলিম বিশ্বে বইবে খুশির আমেজ। ঈদের আনন্দে ভাসবে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ। এ আনন্দ উৎসবের দিনটি কেমন কাটে চীনে বসবাস করা বাংলাদেশীদের, তা নিয়ে কিছুটা বাড়তি আগ্রহ থাকতেই পারে অনেকের। কমিউনিস্ট পার্টি অধ্যুষিত দেশ, যার অধিকাংশ নাগরিকই ধর্মীয় আচার-রীতিতে বিশ্বাসী নয়, আছে প্রকাশ্য ধর্মীয় চর্চায় কিছু বাধা-নিষেধও। এসবের মাঝে চীনে বাংলাদেশী মুসলমানদের রমজান আর ঈদ পালন আদৌ সম্ভব হয় কি? বিষয়টি ভাবনারই বটে।

এসব নিয়ে অনেক কথা ভাবনায় এলেও বাস্তবে রমজান বা ঈদ পালন এখানকার ভিনদেশী মুসলমানদের জন্য খুব একটা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। চীন সরকারের ধর্মীয় চর্চার বিধি-নিষেধ মেনেই নিজেদের মতো করে এখানে যে কেউই পালন করতে পারেন ধর্মীয় আচার-উৎসব। প্রতি বছরই বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলিম শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা নিতে চীনে আসছেন। তাদের সংখ্যাও বাড়ছে দিন দিন। এ প্রবণতাই বলে দেয় চীন ভিনদেশী মুসলমানদের জন্য খুব একটা বৈরী দেশ নয়। ব্যতিক্রম দেখা যায়নি এবারের রমজানেও। দেশটির হুবেই প্রদেশের শিক্ষানগরীখ্যাত উহানে এখন বসবাস করছে কয়েকশ বাংলাদেশী। এদের মধ্যে মুসলমান শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। এ রমজানে তারা সিয়াম সাধনা করছেন, নিচ্ছেন ঈদের প্রস্তুতি। চীনের নগরী হওয়ায় প্রকাশ্যে মাহে রমজানের আমেজ না থাকলেও নিজেদের মতো করে রোজার আনুষ্ঠানিকতা পালন করছেন অনেকেই। বাংলাদেশের সময়ের সঙ্গে ২ ঘণ্টার ব্যবধান মাথায় রেখে সাহরি-ইফতারের আয়োজন থাকছে প্রতিদিনই। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক হলগুলোয় নিজ দেশের সহপাঠীদের সঙ্গে কিংবা ভিনদেশের মুসলমান বন্ধুদের নিয়ে ইফতারের আয়োজন বেশ জোরেশোরেই চলে। ছোটখাটো মিলনমেলার মতো এসব ইফতার বা সাহরি আয়োজন অনেকটা উৎসবের মতোই, জানান বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী।

দেশ থেকে দূরে ঈদের আমেজ কিছুটা পানসে হলেও ভিন্ন দেশে ভিন্ন অভিজ্ঞতার ঈদ খুব একটা খারাপ নয়’—বলছিলেন উহানের সেন্ট্রাল চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক আবদুল্লাহ আল হাফিজ। তার মতে, দেশের মাটিতে ঈদ করার মতো আনন্দদায়ক না হলেও এখানে বিশ্বের নানা দেশের মুসলমানদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের অভিজ্ঞতা সত্যিই অন্য রকম ধর্মীয় অনুভূতি জাগায়। পড়াশোনার সুবাদে প্রায় দুই বছর ধরে চীনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন বলে জানান বাংলাদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ কর্মকর্তা। ঈদের আগের প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে আবদুল্লাহ হাফিজ বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনকে উপহার দেয়ার ব্যাপারটি না থাকায় দেশের মতো হয়তো খুব বেশি কেনাকাটা করা হয় না, তার পরও দুই মেয়ে আর নিজেদের জন্য কিছু কেনাকাটা এরই মধ্যে সেরে নিয়েছি। দু-একদিন পরেই ঈদের দিনের খাওয়াদাওয়ার জন্য বাজার-সদাইয়ের পরিকল্পনা আছে।’ দ্বিতীয়বারের মতো চীনে ঈদ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঈদ নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি থাকলেও ঈদের দিন নামাজ শেষ করেই হয়তো ল্যাবরেটরিতে ছুটে যেতে হবে।’ গবেষণার কাজে প্রচুর চাপ থাকায় এখন প্রতিদিনই তাকে ল্যাবে সময় দিতে হয় বলে আফসোস করলেন। তবে এসবের মাঝেও ঈদের আনন্দ পরিবার ও বাংলাদেশী অন্যান্য ভাইয়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেবেন এমনটাই আশা তার।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের পিএইচডি গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হানিফ মিয়া জানান, চীনে তিন বছর ধরে পড়াশোনা করলেও এবারই প্রথম স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে ঈদ করছেন এখানে। পরিবারের অন্যান্য প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধব থেকে দূরে এ ঈদ কিছুটা সাদামাটা হলেও তার মতে, এখানকার বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন তার প্রিয়জনের মতোই। বলেন, ‘এ তিন বছরে নানা সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিয়ে তাদের সঙ্গে পরিবারের মতোই মিশে গেছি। সে হিসাবে ঈদে বাড়ি না যাওয়ার আফসোস তাদের সঙ্গেই ঈদ-আনন্দে ভাগাভাগি করে মিটিয়ে নেব।’ পরিবার নিয়ে ঈদের দিন ঘুরতে যাওয়া ও দেশী ভাই-বন্ধুদের সঙ্গে জম্পেশ খাওয়াদাওয়ার মাঝে দূর দেশে ঈদের আনন্দ খুঁজে নেবেন বলে জানান হানিফ মিয়া। এ লালন গবেষক বলেন, ‘ঈদের দিন নামাজ শেষে বিশ্বের নানা দেশের মুসলমানদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও কোলাকুলি নানা বর্ণের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির মেলবন্ধন বাড়িয়ে তোলে, তাই এমন অভিজ্ঞতা মিস করতে চাই না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সহকারী অধ্যাপক শাহীনুর রহমান এখানে পিএইচডি করছেন মনস্তত্ত্ব নিয়ে। ঈদ সামনে রেখে রোজার এই শেষ কয়েকদিন পরিবার নিয়ে কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বলে জানান তিনি। ঈদে সন্তানের জন্য কেনাকাটা ও অন্যান্য বাজার করতে এরই মধ্যে শহরের বেশকিছু বিপণিকেন্দ্র আর সুপারশপে ঢুঁ মেরেছেন। এখানকার মার্কেটগুলোয় পণ্যের দামে ব্যাপক হেরফের আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বেশকিছু বিপণিবিতান ঘুরে সুলভে ভালো মানের পণ্য খুঁজে নিতে হয় এখানে। যেহেতু ঈদের সঙ্গে চীনাদের কোনো সম্পর্ক নেই, সেহেতু এখানকার মার্কেটগুলোয় এখন কোনো ছাড় বা বাড়তি অফারেরও সুযোগ নেই।’ বললেন, ‘দেশ আর পরিজন থেকে দূরে হলেও ঈদের দিন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে উহানের বেশকিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে ঈদের আনন্দ খুঁজে নেব।

চীনের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় হুয়াজং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থী আরাফাত আহমেদ। চীনে বসবাস করছেন প্রায় দুই বছর ধরে। এখানকার সহপাঠী, বন্ধুবান্ধব আর ডরমিটই তার কাছে পরিবার। চীনের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে বলেন, ‘ছোটকাল থেকে মা-বাবা আর পরিবারের সঙ্গেই রোজা আর ঈদ করে অভ্যস্ত। তাই এখন সেই রোজা আর ঈদগুলো মিস করি খুব। এখানে এসে নানা দেশের নানা বর্ণের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে, তাদের অনেকেই আমার পরিবার-প্রিয়জন। উৎসবে, ঈদে দেশে থাকতে না পারার কষ্ট দুই বছর ধরে তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছি।’ ঈদের দিন ভিনদেশের প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে উহান নগরী ঘুরে বেড়াবেন বলে জানালেন এ আইনজীবী ও গবেষক।

চীনের উহানে প্রায় তিন বছর ধরে বসবাস করছেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থী আকিব ইরফান। এখানে চীনা ভাষার ওপর স্নাতক করছেন তিনি, তাই চীনা কথা বলায় অর্জন করেছেন পারদর্শিতা। এ সুযোগে গড়ে তুলেছেন চীনের নানা সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে সখ্য আর বন্ধুত্ব। কথা বলে জানা গেল, এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো চীনে ঈদ করছেন আকিব। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে মিল রেখে আমরা ঈদের অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা পালন করে ফেললেও এখানে ঈদের জামাতের দিনক্ষণের জন্য সাধারণত নির্ভর করতে হয় চীন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে তিন বছর ধরে দেখছি রমজান শেষ হওয়ার একদিন পরেই এখানে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়।’ প্রতি বছর উহান শহরের মা জিয়া ঝুয়াং, চি ই মেন ও জিয়াং আন—এ তিন মসজিদে ঈদ জামাতের আয়োজন করা হয় বলে জানালেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘এসব মসজিদে বেশ বড়সড়ভাবেই ঈদ জামাতের আয়োজন করা হয়, থাকে সহনীয় পর্যায়ে মাইক ব্যবহারের অনুমতিও। বাংলাদেশ ছাড়াও মিসর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সুদান, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ মধ্য এশিয়া ও আরব দেশগুলোর শত শত বিদেশী শিক্ষার্থী প্রতি বছর ঈদের জামাতে শামিল হয় বলে জানালেন সিসিএনইউর এ শিক্ষার্থী।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক, বর্তমানে সেন্ট্রাল চায়না নরমাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অধ্যয়নরত।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)