ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ডিসেম্বর ৮, ২০১৫

ঢাকা বুধবার, ৫ পৌষ, ১৪২৫ , শীতকাল, ১১ রবিউস-সানি, ১৪৪০

রংপুর ঠাকুরগাঁওযে় রক্তে রাঙা দীঘির নাম খুনিয়াদীঘি পাক বাহিনীর নির্মম খুনের নিরব সাক্ষী

ঠাকুরগাঁওযে় রক্তে রাঙা দীঘির নাম খুনিয়াদীঘি পাক বাহিনীর নির্মম খুনের নিরব সাক্ষী

ঠাকুরগাঁওযে় রক্তে রাঙা দীঘির নাম খুনিয়াদীঘি পাক বাহিনীর নির্মম খুনের নিরব সাক্ষী

ঠাকুরগাঁওযে় রক্তে রাঙা দীঘির নাম খুনিয়াদীঘি পাক বাহিনীর নির্মম খুনের নিরব সাক্ষী

ননী গোপাল, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৫, নিরাপদনিউজ : ঠাকুরগাঁওযে়র রানীশংকৈল উপজেলার রক্তে রাঙা এক দীঘির নাম খুনিয়াদীঘি। এই দীঘিকে ঘিরে রযেছে পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্মম খুনের এক বিরল ইতিহাস। স্বাধীনতা সংগ্রামে ঠাকুরগাঁওযে়র জনপদে আছে হাজারও মুক্তিকামী মানুষের গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস। আছে ত্যাগ আর শহীদের আত্মত্যাগের ইতিহাস।
১৯৭১ সালের ২৭শ মার্চ পাক সেনাদের হাতে প্রথম শহীদ ঠাকুরগাঁওযে়র রিকশাচালক মোহাম্মদ আলী। তারপর থেকে পাক সেনারা চালায় বিভিন্ন জায়গায় বাঙালী নিধন। কিন্তু তবুও স্বাধীনতার জন্য ঠাকুরগাঁওযে়র মুক্তিকামী মানুষের আত্মত্যাগ থেমে থাকেনি। ঠাকুরগাও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডারা গ্রামের খুনিয়াদীঘি এখন শুধু ইতিহাস নয়, বাঙ্গালীর স্বাধীনতার এক নীরব দলিল। যে দীঘি ছিল মানুষ ও পশু-পাখির তৃষ্ণা নিবারণের জন্য। সেই দীঘি হযে় উঠে পাক হানাদার বাহিনীর প্রাণ হননের এক নির্মম বধ্যভূমি। এই দীঘি হযে় উঠে অসংখ্য মানুষের রক্তে রাঙা রঙিন।

হাজার খুনের দুঃসহ যন্ত্রণা গাঁথা এই দীঘির নাম খুনিয়াদীঘি। আর তাই এর নামকরণ তার প্রকৃত স্বার্থকতা খুঁজে পেযে়ছে। খুনিয়াদীঘির বুকে রযে়ছে একাত্তোরের সংঘটিত গণহত্যার এক নিষ্ঠুরতম ইতিহাস।
স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ঠাকুরগাঁওযে়র সীমান্ত এলাকা রাণীশংকৈল, হরিপুর ও বালিয়াডাঙ্গী মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা তৎপরতায় পাক বাহিনী দিশেহারা হযে় পডে়।

১৯৭১ এর মে মাসে তারা পরিকল্পিতভাবে শুরু করে বাঙ্গালী নিধন। বিভিন্ন স্থানে তারা ক্যাম্প স্থাপন করে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুরু করে বাঙ্গালী ধর পাকড় এবং হত্যাযজ্ঞ। এমনি এক হত্যাযজ্ঞের জন্য পাক বাহিনী রাণীশংকৈল থানাতে স্থাপন করে একটি ক্যাম্প। সে সময় তাদের সহযোগিতা করে ‘মালদইয়া’ বলে কথিত এই দেশের স্বাধীনতা বিরোধী এক শ্রেণীর লোক। এই দোসরদের সহায়তায় তারা বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের লোকজন ও মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে জডে়া করতো খুনিয়াদীঘির পাডে়। ছেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার অপরাধে পিতা ও ভাই এবং তাদের আত্মীয় স্বজনদের ধরে এই ক্যাম্পে নিযে় আসতো পাক সৈন্যরা। এরপর ভান্ডারা গ্রামের খুনিয়াদীঘির পাডে় বেয়নেট দিযে় খুঁচিযে় খুঁচিযে় ও গুলি করে হত্যা করতো।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার অপরাধে অনেক যুবক ও তাদের আত্মীয় পরিজনদের ধরে এনে দিঘীরপাডে়র শিমুল গাছে বেঁধে পেরেক মেরে গাছে অটকে রাখত। এক সময় রক্ত ঝরতে ঝরতে তার মৃত্যু হত। মৃত্যু বা হত্যার পর লাশ পুকুরের পানিতে ফেলে দিত। কখনো কখনো হত্যার পূর্বে লোকজনকে কবর খুঁড়তে বাধ্য করতো।পরে হত্যার পর দীঘির পাডে়র উঁচু জমিতে মাটি চাপা দিত । দিনের বেলা কুকুর ও শকুন আর রাতের বেলা শিয়ালের মহোৎসব চলতো খুনিয়াদীঘির পাডে়।
একদিন পাক বাহিনী ১৮ জন বাঙ্গালীকে এক সঙ্গে লাইন করে দাঁড় করে গুলি করে হত্যা করে।পরে তাদের লাশ দীঘির পানিতে ফেলে দেয়। ১৮ জনের মধ্যে একজন ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যায়। সারাদিন দীঘির কচুরী পানার মধ্যে মাথা ভাসিযে় বেঁচে থাকে। রাতে লাশ ঠেলে পাডে় উঠে কোন মতে পালিযে় গিযে় সীমান্ত পেরিযে় ভারতে আশ্রয় নেয়। আর এরপরেই চারিদিকে প্রচার হযে় যায় খুনিয়াদীঘির নির্মমতার কথা। চারদিকে আতঙ্ক ছডি়যে় পডে়।
রাণশিংকৈল উপজেলার কদমপুর, উত্তরগাঁও, নাথনগর, কাঁঠালডাঙ্গী, টেংরিয়া, ভাতুরিয়া ও রুপসা গ্রামের শত শত বাঙালীকে এখানে হত্যা করা হয়।

খুনিয়াদীঘির আশেপাশে যাদের হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে আছেন খোকা, দবিরুল, কুরমন, বসিরউদ্দীন ও সাইফুদ্দিন। এমনি অনেক নিরাপরাধ অসহায় মানুষ প্রাণ দিযে়ছে পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে খুনিয়া দীঘি পাডে়। আজ খুনিয়াদীঘি আশেপাশের গ্রামের মানুষের কাছে এক বেদনাবিধুঁর স্মৃতি।

খুনিয়াদীঘির হত্যাকান্ডের কথা বলতে গিযে় অনেকেই শিঁউরে উঠেন।
রাণীশংকৈল উপজেলার সন্ধ্যারই গ্রামের পবার আলী ও বনগাঁও গ্রামের নুরুল ইসলাম জানান, প্রায় ২ হাজারেরও বেশী বাঙালীকে এই খুনিয়াদীঘিতে হত্যা করা হয়।

তবে অনেকের অনুমান এর সংখ্যা আরও বেশী। অনেকের মতে এখানে প্রায় ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করা হযে়ছে । স্বাধীনতার পর এই আত্মত্যাগের নির্মম ইতিহাসের সে সব শহীদদের কথা স্মরণ করে দীঘির পাডে় নির্মিত হয় একটি স্মৃতিসৌধ। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি খুনিয়াদীঘি বধ্যভূমি খননের।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)