আপডেট ১০ মিনিট ৬ সেকেন্ড

ঢাকা মঙ্গলবার, ২ শ্রাবণ, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ১৩ জিলক্বদ, ১৪৪০

উপসম্পাদকীয় দুর্ঘটনামুক্ত হোক দেশের নৌচলাচল ব্যবস্থা

দুর্ঘটনামুক্ত হোক দেশের নৌচলাচল ব্যবস্থা

মো. জাহাঙ্গীর আলম খান,নিরাপদ নিউজ:  অসংখ্য নদনদী দিয়ে পরিবেষ্টিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। নদীমাতৃক এদেশে নদনদী ছাড়াও রয়েছে অনেক খালবিল, হাওড়বাওড়। এদেশের জলসম্পদ এদেশকে একটা বিশেষত্ব দিয়েছে। পৃথিবীতে এতো নদনদী বেষ্টিত দেশের সংখ্যা খুবই কম।

আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাথে যোগাযোগের একমাত্র বাহন ছিল কাঠের তৈরি পালতোলা নৌকা অথবা দাঁড়টানা নৌকা। কালের পরিক্রমায় এ সকল কাঠের তৈরি নৌকার স্থলে ইস্পাত/লোহার তৈরি নৌযান স্থান করে নিয়েছে। নৌযানে ইঞ্জিন সংযোজন করার পর নৌযানের গতি বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকজনের চলাচলে সময় কম লাগার পাশাপাশি মালামাল পরিবহণে গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হয়েছে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। বাংলাদেশে একসময় হাতে তৈরি নকশা ব্যবহার করে কাঠ দ্বারা ছোটো নৌযান নির্মাণ করা হতো। ধীরে ধীরে কাঠের তৈরি নৌকার স্থলে লোহার তৈরি লঞ্চ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলাচল শুরু করে।  জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে  নৌপথে যাত্রী ও মালামাল পরিবহণও বৃদ্ধি পায়। যুগের চাহিদার নিরিখে নৌযানের আকার-আকৃতি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

 

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বল্পমূল্যে যাত্রী ও মালামাল পরিবহণে নৌযানের কোনো বিকল্প নেই। মানুষের যাতায়াত ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহণে নৌযানের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের অসংখ্য নদীতে চলাচলকারী হাজার হাজার নৌযানে বহনকৃত যাত্রী ও পণ্যের নিরাপদ চলাচলে নৌযান মালিক, শ্রমিক ও যাত্রী সাধারণের ভূমিকা ও দায়িত্ব অপরিসীম। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই কালবৈশাখি মৌসুমে প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যায়। এ সময়ে নৌপথে চলাচলরত সকল নৌযানকে যথাযথ সতর্কতা, নৌ আইন মেনে নৌযান পরিচালনাসহ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আরও সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।

ঝড়ের মৌসুমে হঠাৎ করে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই প্রলয়ংকরী ঝড় দেশের যে কোনো স্থানে বয়ে যেতে পারে। এ সকল ঝড় নদীতে ও উপকূলীয় অঞ্চলে চলাচলকারী সকল ধরনের নৌযান ও বিশেষভাবে যাত্রীবাহী নৌযানের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক। এ সময় যাত্রীবাহী নৌযানের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকে। দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নৌপরিবহণ অধিদফতর কর্তৃক প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল যাত্রীবাহী নৌযানের মালিক ও মাস্টারদের অনুরোধ করা হয় যাতে নির্ধারিত সংখ্যক ও নির্ধারিত গ্রেডের মাস্টার ও ড্রাইভার দ্বারা নৌযান পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি নৌযানে মোবাইল ফোন ও রেডিও সরবরাহ নিশ্চিত করা ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করলে নৌযানের যাত্রা স্থগিত রাখার জন্য মাস্টারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। যাত্রীবাহী নৌযানের দু’পাশের ভারী পর্দা ও রশি অপসারণ করা; মাস্টার ব্রিজে যাত্রী সাধারণের অবাধ চলাচল বন্ধ করার জন্য নৌযানের দু’পাশ অস্থায়ীভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়।

 

তাছাড়া আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে নৌযান নিয়ে বন্দর ত্যাগ করা উচিত। সার্ভে সনদে উল্লিখিত যাত্রী সংখ্যার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা ও ডেকের ওপর যাত্রীদের বসার স্থানে ব্যবসায়িক মালামাল পরিবহণ করা ঠিক না। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত মালামাল বহন করা যাবে না। হ্যাচের মধ্যে মালামাল রেখে হ্যাচ কভার নাট-বল্টু দিয়ে পানিরোধকভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট সংখ্যক বয়া নৌযানের আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনের সময় যাত্রীরা যাতে সহজে বয়া ব্যবহার করতে পারে সেভাবে বয়াগুলো রাখতে হবে। যাত্রার পূর্বে ইঞ্জিন ভালোভাবে কাজ করছে কিনা তা পরীক্ষা করতে হবে, নেভিগেশনাল বাতিসমূহ সচল আছে কিনা যাত্রার পূর্বে নিশ্চিত হতে হবে; পথিমধ্যে ঝড়ের আশঙ্কা দেখা দিলে নৌযানকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া বা কিনারায় ভিড়িয়ে রাখতে হবে, নৌযানে মোবাইল ফোন ও রেডিও রাখা এবং নিয়মিত আবহাওয়ার বুলেটিন শোনা জরুরি; আবহাওয়ার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে নৌযান ছাড়ার পূর্বে পরবর্তী বন্দরের পোর্ট অফিসারের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করে নৌযান ছাড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে; বৈধ কাগজপত্র এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক এবং নির্ধারিত গ্রেডের মাস্টার-ড্রাইভার নৌযানে না থাকলে নৌযান পরিচালনা করা যাবে না; ঝড়ের সময় যাত্রীবাহী নৌযানের দু’পাশের ভারী পর্দা উঠিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখতে হবে যাতে অবাধে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। যাত্রীরা যাতে নৌযানের ছাদে উঠতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

 

অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে নৌযানে ওঠা ঠিক না কারণ এর ফলে নৌযানের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নৌযানে ভ্রমণের পূর্বে যাত্রীদেরও কিছু সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। যেমন- নৌযানের ছাদে যাত্রীর ভ্রমণ করা ঠিক না, এতেও নৌযানের ভারসাম্য নষ্ট হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌযানে ভ্রমণ না করাই শ্রেয়। সুশৃঙ্খলভাবে নৌযানে আরোহণ ও অবতরণ করা এবং পথিমধ্যে ঝড় দেখা দিলে এদিক ওদিক ছুটাছুটি না করে নিজের জায়গায় অবস্থান করা দরকার; জীবন রক্ষাকারী বয়া হাতের নাগালে রাখতে হবে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌযানের নীচ থেকে ওপরের দিকে এবং ছাদে না যাওয়াই ভালো; সেইসাথে নৌযানের চালককে উত্ত্যক্ত বা চাপ প্রয়োগ করা ঠিক না।

ঝড়ের আগমন বুঝার উপায় হলো উত্তর, পশ্চিম বা উত্তরপশ্চিম দিকে কালো মেঘ দেখা যাবে; হঠাৎ করে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করবে; বায়ুর চাপ হঠাৎ করে কমে যাবে (ব্যারোমিটারের সাহায্যে নির্ণয় করা যায়)। সংকেতগুলি দেখা গেলে বা অনুভূত হলে মোটামুটিভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, নৌযানের উপর দিয়ে একটি ঝড় বয়ে যাবে তখন দ্রুত আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

উল্লিখিত নির্দেশনা মেনে কেবল বৈধ সার্ভে সনদধারী নৌযান উপযুক্ত মাস্টার/ড্রাইভার ও উপযুক্ত নেভিগেশনাল বাতি দ্বারা সজ্জিত হয়ে রাতে চলাচল করবে। সকল বালুবাহী, মাটিবাহী, ইটবাহী ট্রলার, ড্রেজার, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের রাতে চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সকল নৌযান শুধু দিনে অর্থাৎ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলাচল করবে।

 

নৌপরিবহণ অধিদপ্তর দুর্ঘটনামুক্ত নৌ চলাচল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে যার মধ্যে রয়েছে: নৌযান নির্মাণের লক্ষ্যে হাতে তৈরি নকশার স্থলে আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সফটওয়ার আমদানি করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নির্ভুলভাবে নৌযানের নকশা তৈরি করা; পুরানো ডিজাইনের Sunken Deck বিশিষ্ট যাত্রীবাহী  নৌযান চলাচল বন্ধ করার লক্ষ্যে ১৪০ ও ২৫০ আসন বিশিষ্ট ক্যাটাম্যারান ডিজাইনের (দু’টি নৌযানের  হালের উপর তৈরিকৃত স্থাপনা) যাত্রীবাহী ও Sea Truck ডিজাইনের নতুন ধরনের দ্রুত গতিসম্পন্ন স্ট্যাবল নৌযান প্রবর্তন। ইতোমধ্যে ক্যাটাম্যারান টাইপের নৌযান সফলভাবে চলাচল করছে; রিভারসিবল গিয়ার সংযোজন করায় দুর্ঘটনা হ্রাস পেয়েছে; ডকইয়ার্ডগুলোতে প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে নৌযান নির্মাণ করা হচ্ছে; নৌযান চলাচল দ্রুত ও নিরাপদ করার জন্য নৌযানে সাধারণ স্টিয়ারিং এর স্থলে হাইড্রোলিক স্টিয়ারিং সংযোজন করা হচ্ছে।

 

হাইড্রোলিক স্টিয়ারিং এর সাহায্যে বড়ো নৌযানগুলো সহজে ম্যানুভার করার পাশাপাশি নাবিকের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব করেছে; এক জাহাজের সাথে অন্য জাহাজের যোগাযোগ রক্ষার জন্য নৌযানের ভিএইচএফ যন্ত্র স্থাপন নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে; জাহাজে জিপিএস স্থাপন এবং তার সাথে কোর্স সেট করার ফলে ঐ রুটে নৌযান পরিচালনা করা সহজ হয়েছে; রাডার সংযোজন করার ফলে অন্ধকার রাতে অথবা কুয়াশার মধ্যে নৌযান চালনার সময় অন্যান্য নৌযানসমূহকে সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে; ইকোসাউন্ডারের মাধ্যমে নদীর গভীরতা এবং জাইরো কম্পাসের মাধ্যমে জাহাজের সঠিক নির্দেশনা ও গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে; ইউনিফ্লো সিস্টেম সুপারচার্জ ইঞ্জিন ব্যবহার করে স্বল্প ফুয়েল দিয়ে ইঞ্জিনের অধিক গতি পাওয়া যাচ্ছে, ফলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে; অটোমেশন ইঞ্জিন এবং অটো কন্ট্রোল সিস্টেম মেশিনারি ব্যবহার করে সহজে সেইফটি নিশ্চিত করা যাচ্ছে।

এ সকল কাজে জাহাজ মালিকদের উৎসাহব্যঞ্জক সহযোগিতা আর যাত্রীর নিরাপত্তা সচেতনতা থাকলে দুর্ঘটনামুক্ত নৌ চলাচল ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)