আপডেট ১০ মিনিট ৫ সেকেন্ড

ঢাকা সোমবার, ১ আশ্বিন, ১৪২৬ , শরৎকাল, ১৬ মুহাররম, ১৪৪১

চট্টগ্রাম, সড়ক সংবাদ দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে জেলেদের অবরোধ

দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে জেলেদের অবরোধ

শফিক আহমেদ সাজীব,নিরাপদ নিউজ: সাগরে মাছ ধরায় ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরোধ করেছিলেন কয়েক হাজার জেলে। এসময় তাদের হাতে ছিল ব্যানার-ফেস্টুন। লাল-সবুজ রংয়ের ছোট দু’টি নৌকা মহাসড়কে আড়াআড়িভাবে রেখে, শুয়ে-বসে তারা বন্ধ করে দেন যানবাহন চলাচল। জেলেরা বলছেন, ‘আমাদের জালে ইলিশ ধরা পড়ে না, তবে সরকার আমাদের কেন কষ্ট দিচ্ছে?’ সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থেকে শুরু করে কোলের শিশু নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে নারীরাও অংশ নেন এই অবরোধে। প্রায় ৭৫ বছর বয়সী তরণী জলদাস নামে এক বৃদ্ধ বলেন, ‘আমরা মাছ ধরে ভাত খাই। আমরা আর কিছুই জানি না। সরকার মাছ ধরা বন্ধ করে আমাদের পেটে লাথি দিয়েছে। আমাদের চাল দিয়ে নাকি সরকার সাহায্য করছে। আমরা চাল নেব কেন? আমরা গরীব হতে পারি, ভিখিরি নয়। সাগরে মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানাতে মহাসড়কে এসেছিলেন সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি জেলেপল্লীর বাসিন্দা রামহরি সর্দার। প্রায় ৭০ বছর বয়সী রামহরি আগে মাছ ধরার পাশাপাশি বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঢোল-বাঁশি বাজাতেন। বয়স হয়ে যাওয়ায় এখন আর বাঁশিতে সুর তোলার মতো দম নেই তার। বাড়ির পাশে সাগরে ‘ভাসা জাল’ বসিয়ে ছোট চিংড়ি আর লইট্যা মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করেন। রামহরি বলেন, ‘আমরা চাল চাই না।

আমাদের চাল লাগবে না। আমাদের মাছ ধরতে দিলেই হবে। সীতাকুণ্ডের বার আউলিয়ার পাক্কা মসজিদ এলাকা থেকে আসা শুকলাল জলদাস বলেন, ‘একবছর আগে যদি আমরা জানতাম যে, এবার মাছ ধরতে পারব না, তাহলে তো আমরা ঋণ নিয়ে নৌকা-জাল মেরামত করতাম না। এখন আমাদের ঋণের টাকা শোধ হবে কিভাবে? সরকার চাল দিচ্ছে। চালে কি পেট ভরে? তার চেয়ে আমাদের সবাইকে জেলখানায় নিয়ে যাক, সেখানে তো ফ্রিতে ভাত পাব। বৃদ্ধা সরোজিনী জলদাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার পাঁচ ছেলে। নাতি-নাতনি, ছেলের বৌ মিলিয়ে একবেলায় আমাদের ১৫ জন খাওয়ার লোক। গত ১৫ দিন ধরে ছেলেরা সাগরে যেতে পারছে না। আমাদের দিন আর চলছে না। আমরা তো ইলিশ মাছ ধরি না। আমাদের জালে ইলিশ ধরা পড়ে না, তবে সরকার আমাদের কেন কষ্ট দিচ্ছে?’ ৯ জুন ২০১৯ রোববার সকাল থেকে দেড় ঘণ্টার এই অবরোধে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় অচল হয়ে থাকে দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ খ্যাত এই মহাসড়কটি। অবরোধস্থলের দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকায় আটকে থাকে শত, শত যানবাহন। ঈদের টানা ছুটি শেষে খোলার প্রথম দিনেই মহাসড়কের এই পরিস্থিতি নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে হাজার হাজার যাত্রীকে। অবরোধকারী জেলেরা এবং তাদের আন্দোলনে সংহতি জানাতে যাওয়া ব্যক্তিরা, এই পরিস্থিতির জন্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনকে দায়ী করেছেন। সকাল ১০টার দিকে মহাসড়কে সীতাকুণ্ড উপজেলার বাংলাবাজার বাইপাস এলাকায় জড়ো হতে থাকেন নগরীর পতেঙ্গা থেকে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত সাগরতীরের ৩৮টি জেলেপল্লীর বাসিন্দারা। ১০টা ২৫ মিনিটের দিকে জেলে সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বয়সী নারী, পুরুষ ও শিশু মিলে কয়েক হাজার মানুষ মহাসড়কের দুইপাশে বসে পড়ে। এতে মহাসড়ক পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, জেলের সম্প্রদায়ের লোকজন প্রথমে যখন মহাসড়কে আসার চেষ্টা করছিলেন, তখন সীতাকুণ্ড সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একদল পুলিশ তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশকে এসময় তাদের উপর চড়াও হতে দেখা যায়। তবে একসময় পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে জেলেরা মহাসড়কে অবস্থান নেন। অবরোধ চলাকালীন বাইপাসের মুখে ফৌজদারহাট পুলিশ বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে ‘উত্তর চট্টলা উপকূলীয় মৎস্যজীবী জলদাস সমবায় কল্যাণ ফেডারেশন’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে সমাবেশ শুরু হয়। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত, সীতাকুণ্ড থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দিদারুল আলম, চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) জাহাঙ্গীর আলম, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিল্টন রায়, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্যামল কুমার পালিত এসময় সমাবেশস্থলে একে একে উপস্থিত হন। সমাবেশে সংগঠনের সভাপতি লিটন জলদাস বলেন, ‘সরকার ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ ঘোষণা করেছে। সাতবছর ধরে সরকারিভাবে প্রতিবছর মাছ ধরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ থাকে। এতদিন এই নিষেধাজ্ঞা ছিল শুধু বাণিজ্যিক ট্রলারের জন্য। ছোট নৌকায় যারা মাছ ধরেন, তারা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন না। গত ৬ মে মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক সভা থেকে ছোট নৌকায়ও মাছ ধরা বন্ধের সিদ্ধান্ত দেন। আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের ফলে ৩৮টি জেলেপল্লীর বাসিন্দারা মানবেতর জীবনযাপন করছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা গত ১ জুন সংবাদ সম্মেলন করে যারা গভীর সাগরে না গিয়ে নিজেদের বাড়ির আশপাশে ছোট নৌকায় মাছ ধরে, তাদের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার অনুরোধ করেছিলাম। আমরা সাতদিন সময় দিয়েছিলাম। কিন্তু জেলা প্রশাসন আমাদের কথায় কর্ণপাত করেনি। এজন্য আমরা মহাসড়কে আসতে বাধ্য হয়েছি। আমরা সাগরে থাকার লোক, রাস্তায় আসার কথা না। কি পরিস্থিতিতে আমরা রাস্তায় এসেছি, সেটা প্রশাসনকে একবার ভাবতে বলব। অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘গত ২০ মে থেকে সাগরে মাছ ধরা বন্ধ। ১ জুন তারা সংবাদ সম্মেলন করেছে। এক সপ্তাহ ধরে তাদের কান্না কেন প্রশাসনের কানে পৌঁছায়নি? প্রশাসনের কানে তাদের আকুতি পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়ে তারা রাস্তায় এসেছে। এর দায় সম্পূর্ণ জেলা প্রশাসনের। আমরা প্রশাসনের কাছ থেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতো আশ্বাসের বাণী শুনতে চাই না। আজকের মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিলে মঙ্গলবার আমরা একই জায়গায় আবার গণ অনশনে বসব।

তিনি বলেন, ‘চাল দিলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? চালে কি সবার জন্য ভাত হয়? জেলে সম্প্রদায়ের লোকের গরীব, কিন্তু তারা তো ভিক্ষা করে না। তাহলে সরকার চাল দিচ্ছে কেন? আমরা মানুষ হয়ে মানুষের কাছে মানুষের মর্যাদা চাই। সংসদ সদস্য দিদারুল আলম জেলে সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা আপনাদের দাবির সঙ্গে একমত। এ বিষয়ে আমি মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। জেলা প্রশাসকের অফিসে গিয়ে বৈঠক করে আজ রোববারের মধ্যে একটা সমাধানে আসার চেষ্টা করব। জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে সমাবেশে যাবার কথা জানিয়ে ইউএনও মিল্টন রায় বলেন, ‘জেলা প্রশাসক মহোদয় বলেছেন, ঊর্দ্ধতন পর্যায়ে কথা বলে আজকের মধ্যেই তিনি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অবরোধের কারণে যানবাহন, যাত্রী, পণ্য আটকে আছে। রাস্তায় মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অবশ্যই আপনাদের দাবির স্থায়ী সমাধান দরকার। সরকার নিশ্চয় এর সমাধান করবে। পূজা উদযাপন পরিষদের নেতা শ্যামল কুমার পালিত বলেন, ‘অতীতেও সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু আমাদের প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর হস্তক্ষেপে পতেঙ্গা থেকে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত জেলেরা এর আওতায় ছিল না। কারণ তারা মাছ ধরে বাড়ির কাছে, গভীর সাগরে তারা যায় না। তারা মাছ ধরে ছোট নৌকায়। কিন্তু মৎস্য প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান এবার নতুন নিয়ম চালু করেছেন। তিনি বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা না করে আমলাতান্ত্রিক মনোভাব থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই সমস্যার সৃষ্টি করেছেন। এরপর সমাবেশ থেকে অবরোধ স্থগিতের ঘোষণা আসে। দুপুর ১২টার দিকে মহাসড়ক ছেড়ে যান অবরোধকারী জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন। সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘দেড় ঘণ্টা অবরোধের কারণে উভয়পাশে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। অবরোধ প্রত্যাহারের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আরও প্রায় আধাঘণ্টা সময় লেগেছে। সবমিলিয়ে মহাসড়কে দুই ঘণ্টা যানজট ছিল। উল্লেখ্য, গত ২০ মে থেকে শুরু হওয়া সাগরে মাছ ধরা বন্ধের এই সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে ২৩ জুলাই।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)