ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট August ১৭, ২০১৯

ঢাকা শুক্রবার, ৩০ কার্তিক, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১৭ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১

উপসম্পাদকীয় নদীর নাম ‘রেফ্রিজারেটর’!

নদীর নাম ‘রেফ্রিজারেটর’!

হাসান ইমাম ,নিরাপদ নিউজ: ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ সম্পর্কে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ছড়াটা যেন শৈশবের মেঘদূত। এখনকার এই প্রযুক্তিময় বিশ্বের শিশুদের শৈশবের আকাশজুড়ে বৃষ্টিবাদলা নিয়ে কোনও মেঘদূত কি আসে? আজকের শিশু যখন আগামি দিনে হয়ে উঠবে মস্ত মানুষ, তখন কি মনে পড়বে তার ছেলেবেলাকার কোনও গান? ‘বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলেবেলার গান/বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান।’ শিশুমনে উঁকি দেওয়ার ফুরসত পায় কি এমন কোনও ইচ্ছা: ‘যখন যেমন মনে করি তাই হতে পাই যদি,/আমি তবে এক্ষুনি হই ইচ্ছামতী নদী।’ কোনও ‘ইচ্ছা-নদী’ কি শিশুর মনোজগতের বাঁকে বাঁকে বয়ে চলে আজও; এই ডিজিটাল ডামাডোলের কালে?

মানুষ নাকি তার শৈশবের নির্মল রোমাঞ্চকর ব্যাপ্তিকে বাকি জীবন দিয়েও ছাড়িয়ে যেতে পারে না। শৈশবেই এক এক করে হাজারো অবাক দরজা খুলতে থাকে শিশুমনে, সেই দরজায় উঁকি দেয় বিচিত্র সব খায়েশ-বাসনা-আকাক্সক্ষা। কত শত না বিস্ময়কর জিজ্ঞাসা জাগে মনে; কল্পনার সীমা তখন ¯্রফে আকাশছোঁয়া। প্রজাপতি, পাখি খেলার সঙ্গী; সাথী ফুলের মালা, কাগজের নৌকো, ঘুড়ি। মগডালে পাখির বাসায় ডিম আবিষ্কারের যে নির্মল আনন্দ কিংবা ঝড়ের পরে আম কুড়োনোর যে সতেজ সুখ, হয়তো স্বর্গের সঙ্গেই কেবল তার তুলনা চলে! শিশুস্বর্গের বালাই কি আজও আছে শৈশবে, আজকের ছোটদের ছোটবেলায়?

বিশ্ব থেকে বিশ্বায়নের যুগও গত হতে চললো বলে! ‘ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড-এরই এখন জয়জয়কার। হাতের মুঠোয় দুনিয়া। শহর দিয়ে ঘেরা দেশের প্রাণ, বিশ্বহৃদয়ে প্রাযুক্তিক ধুকধুক! শহুরে আগ্রাসনে গ্রাসিত হচ্ছে গাঁও-গেরাম। এই পরিচয়চিহ্ন মুছে দেওয়া রেসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াই ‘আধুনিকতা’। যারা পারেন না তারা ‘ব্যাকডেটেট। গ্রাম-মফস্বলেও ক্যাবল টিভি, মুঠোফোন, ইন্টারনেট। নির্জন স্থান, নিভৃত কোণ বলে কিছু নেই আর! এমন আবহে ‘দাও ফিরিয়ে অরণ্য, লও হে নগর’ উচ্চারণ বাড়াবাড়ি শোনায় বইকি।

আখেরে লাভালাভের খতিয়ানে না গিয়েও বলা যায়, মানুষের জীবনযাত্রার ‘মান’বাড়ছে। সবখানে কমবেশি সব ধরনের ভোগের বন্দোবস্ত এই বাজারি বিশ্ব করেই ছেড়েছে। আর তাই তো মুঠোফোনের হঠাৎ ‘আগমনী-ঝংকারে’থেমে যায় আত্মমগ্ন ঝিঁঝিঁর ডাক, ত্রস্ত হয় চঞ্চল বাছুর, উল্লম্ফন দেয় বেসামাল ছাগলছানা! তবু বাংলার পল্লিতে পল্লিতে দিগন্তবিস্তৃত খোলা ফসলের মাঠ, টলটলে জলাশয়, আকাশের অঢেল নীল, চাঁদের আবেশী আলো শিশুদের জীবন থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যায়নি। এখনও শিশুরা স্বপ্নডানা মেলে ফড়িংয়ের পিছু ধাওয়া করে। প্রজাপতির বর্ণিল পাখা দেখে খোকার বিস্ময়ভরা চোখে জিজ্ঞাসা উঁকি দেয়, ‘প্রজাপতি, প্রজাপতি, কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা?’ নিষ্পাপ খুকুর অবাক চোখের সামনে ধরা দেয় চঞ্চল কাঠবেড়ালীর উঁচিয়ে থাকা বঙ্কিম লেজ! দুরন্তপনায় ছেলেমেয়েরা মেতে ওঠে দাড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট বা ডুবসাঁতারে। প্রকৃতির পাঠশালায় এই দস্যিদের জীবন-বর্ণমালার ‘অ আ ক খ’পরিচয় কমবেশি ঘটে, এখনও।

কিন্তু যে শিশুর শৈশব শহর-ঘেরা, প্রযুক্তির ঘেরাটোপে ছটফটায় যার জীবন; তার গুমোট শৈশবে কি বিস্ময়-রোমাঞ্চ ধরা দেয় স্বাভাবিক রূপ-রসে, সৌরিক বর্ণ-গন্ধে?

ঘটনা-১. পাঁচ বছরের পূর্ণিয়া সবে স্কুলে যেতে শুরু করেছে। ক্লাসে একদিন শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে বলতে পারবে, মাছ কোথায় থাকে?’ পূর্ণিয়ার ঝটপট জবাব, ‘ফ্রিজে থাকে!’ পূর্ণিয়ার উত্তর শুনে শিক্ষক তো থ! হতবিহ্বলতা কাটিয়ে তিনি বলেন, ‘না না পূর্ণিয়া, মাছ ফ্রিজে থাকে না, মাছ থাকে পানিতে। নদী, খাল-বিল, পুকুরে থাকে। সমুদ্রেও থাকে, বুঝেছো?’

কিন্তু জানা জিনিসের বেলায় শিক্ষকের এ কথা মেনে নিতে বাধে পূর্ণিয়ার! ফ্রিজে মাছ তো সে প্রতিদিনই দেখে। বাড়ি ফিরে মাকে পূর্ণিয়া বলে, ‘মা জানো টিচার বলে, মাছ নাকি নদীতে থাকে।’মেয়ের কথা শুনে মাও যারপরনাই অবাক হন, ‘তবে মাছ কোথায় থাকে?’ পূর্ণিয়ার একই উত্তর: ‘ফ্রিজে থাকে!’

মা এবার আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করেন, ‘তাহলে বাঘ কোথায় থাকে?’ ‘কেন চিড়িয়াখানায়’, পূর্ণিয়ার তুরন্ত জবাব!

ঘটনা-২: বাবার সঙ্গে ধানমন্ডি লেকে বেড়াতে গেছে ছয় বছরের রাহা। এমন সবুজ, খোলামেলা জায়গা পেয়ে বাবার হাত থেকে বারবার ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে সে। দৌড়-ঝাঁপ, লম্ফ-ঝম্ফ চলছে ইচ্ছেমতো। বাবা সামলাতে পারছেন না, আবার ঠিক চাইছেনও না। সারাদিন তো ঘরবন্দি, করুক না একটু মাতামাতি! হঠাৎ আবিষ্কার করেন, ছেলে পানিতে নেমে গেছে। দৌড়ে গিয়ে টেনে তোলেন, ‘আর একটু হলে তো পানিতে ডুবে যেতে তুমি!’ রাহার পাল্টা প্রশ্ন, ‘কেন পানিতে ডুবে যাবো?’ বাবা অবাক বিস্ময়ে ছেলের মুখে দিকে তাকান। সত্যিই তো সাঁতার না জানলে মানুষ পানিতে ডুবে যায়, এমন ভাবনার সঙ্গে ছেলের পরিচয় হওয়ার ফুরসতই ঘটেনি।

নতিকেতার একটি গানে আছে, ‘ছোট ছোট শিশুদের শৈশব চুরি করে গ্রন্থকীটের দল বানায় নির্বোধ।’ কতটা নির্বোধ হচ্ছে সে তর্কে না গিয়েও বলা যায়, তারা বঞ্চিত হচ্ছে অনেক জানা ও বোঝার ‘স্বর্গসম’ আনন্দ থেকে। মুঠোফোন, ভিডিও গেম, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট দূরদর্শনে শিশুদের ‘নিকট’ চলে যাচ্ছে দূরে, রীতিমতো অদর্শনে। বিজ্ঞাপনের লালিত্যে শিশুমনে মুঠোফোন, ল্যাপটপ কেনার খায়েশ জাগে; ঘুড়ি ওড়ানো, লাটিম ঘোরানোর কথা তারা জানতেও পারে না।

অসুখে ঘরবন্দি থাকলেও অমলের খোলা জানালায় ধরা দিতো সাত-সমুদ্দুর, আর তার মনের জানালা দিয়ে প্রবেশ করতো সেই সাগরের হাওয়া। কিন্তু আজকের অমলদের জানালাটাও কি খোলা আছে?

ইটের পরে ইট, নেইকো ভালোবাসা, নেইকো খেলার আদলে গড়েছি নগর। মাঠ নেই, গাছ নেই, বাগান নেই, সবুজ নেই, এমনকি নেই আকাশও! তাই খেলা নেই, প্রজাপতি নেই, পাখি নেই, ফুল নেই, চাঁদ-তারা-মেঘ কিচ্ছু নেই। তাই এতসব ‘নেই’-এর পেছনে ছোটার ছেলেমানুষি আনন্দও নেই শিশুদের জীবনে।

কে অস্বীকার করতে পারেন, পাঠশালার রোমাঞ্চকর অধ্যায় এখন পরিণত হয়নি নম্বর পাওয়া বা গ্রেড হাসিলের যুদ্ধক্ষেত্রে? গেমসের নানা খুনোখুনি-রক্তারক্তি পর্বে শিখছে নির্মমতা। ট্যাব-মুঠোফোনে আবদ্ধ জীবনে স্বার্থপরতাই যেন শেষ কথা! কারও সঙ্গে কোনও কিছু ভাগাভাগি করার মানসিকতাই তৈরি হচ্ছে না শিশুদের। ইন্টারনেটে পর্নোছবি, ভিডিওর মাধ্যমে ঘটছে স্খলন। ঠাকুমার ঝুলি, আবোলতাবোল, দৈত্যদানো বা রূপকথার ডালিম কুমারদের চেনে না আজকের শিশুরা। অপরিণত বয়সে বড়মানুষি ‘পক্বতা’র আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের অবুঝ শিশুবেলা।

‘একটি শিশু, একটি প্রাইভেট কার’ প্রকল্পের আওতায় সপ্তাহের একটা দিনও শিশুদের গায়ে একফোঁটা সূর্যের আলো বসারও সুযোগ পায় না! তাই মেঘের কোলে রোদ হাসলে বা বাদল টুটে গেলেও তারা যেমন ‘দেখতে’ পায় না, তেমনি বুঝতেও পারে না ছুটির কুহকি উপলক্ষ, তোমার ছুটি নীল আকাশে, তোমার ছুটি মাঠে/তোমার ছুটি থইহারা ওই দিঘির ঘাটে ঘাটে।’

প্রযুক্তির ঘেরাটোপ থেকে একটু ছুটি কি আমরা বরাদ্দ করতে পারি না আমাদের সন্তানদের জন্য?

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)