ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ১৩ মিনিট ২৬ সেকেন্ড

ঢাকা শনিবার, ৫ কার্তিক, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১৯ সফর, ১৪৪১

বিনোদন, মতামত নোয়াখালি থেকে আসা একজন নরেশ ভূঁইয়াও সাপলুডু ছবিটি দেখে ফেলেছিল

নোয়াখালি থেকে আসা একজন নরেশ ভূঁইয়াও সাপলুডু ছবিটি দেখে ফেলেছিল

নরেশ ভূঁইয়া, নিরাপদ নিউজ: আশির দশকের শেষের দিকেই সম্ভবত, লাখে একটা নামে একটি ছবিতে অভিনয় করে শিশু শিল্পী হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিল গোলাম সোহরাব দোদুল। তবে উত্তর সময়ে সেই দোদুলকে আমরা চিনলাম একজন তরুন তুর্কী টিভি নাট্যনির্মাতা হিসাবে। একক নাটক, টেলি ছবি কিংবা ধারাবাহিক নির্মানে তার বিচক্ষনতা প্রত্যক্ষ করেছি ঈর্ষার চোখে। বড় সাধ ছিল, সমরেশ মজুমদারের সাত কাহন উপন্যাস টি নিয়ে একটি ধারাবাহিক নির্মাণের। কিন্তু একদিন দোদুলই সে কাজ শুরু করে দিলো। বড্ড রাগ হয়েছিল তার ওপর। ডুয়ার্সের পটভূমি তে লেখা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো কি বুঝবে এই ছোকড়া! আমার চেয়ে নূনতম ২০ বছরের ছোট দোদুলের বাবা চাচা আমার বন্ধু। সন্তান সম দোদুলকে এনিয়ে দোষারোপ করতে পারিনি । কেননা সাতকাহন নিয়ে কাজ করার কথা আমি কোন দিন কোথাও কারো কাছে বলিওনি। তারপরে ও সাতকাহন প্রচার শুরু হলে বেশ কিছুদিন আমি তা দেখিনি। পরে যখন দেখতে শুরু করলাম, তখন বোধদয় হলো, বাজেট এবং আনুষঙ্গিক ঝামেলা মোকাবেলা করে আমার পক্ষে এ প্রজেক্ট করা সম্ভব হতো না, এমন কি দোদুলের মানেও না। এই দোদুল, নাম তো মনে করতে পারছি না, সম্ভবত দেশ টিভিতেই প্রচারিত একটি পুজোর নাটক বানিয়েছিলে, সনাতনী মিথকে আশ্রয় করেই, তাতেও প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে দাঁড়িয়ে তুমি যা বলেছ, তা আমি কেবল অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করেছি। অন্য ধর্মে বিশ্বাসী হয়েও, ভেবেছি, বিষয়টি এমন ভাবে তুমি অনুভবে আনলে কি করে!
কেবল নাটকের দর্শক হিসাবে নয়, অভিনেতা হিসাবে তোমার সাথে কাজ করতে গিয়েও বুঝে গেছি, নাটকে তুমি কেবল ভালোভাবে গল্প বলতে পার না, সেই সাথে তুমি দর্শককে চিন্তার খোরাকও দিতে পার। এমন গুণ এদেশের নাট্য নির্মাতাদের খুব একটা দেখা যায় না।

আশির দশকের শুরুর দিকে বিটিভিতে প্রচারিত সকাল সন্ধ্যা ধারাবাহিকে দুলাল চরিত্রে অভিনয় করে তারকা খ্যাতি পাওয়া দোদুল সময়ে প্যাকেজ ওয়ার্লড চষে বেড়িয়ে এসে দাঁড়ালো বৃহত্তর সিনেমা শিল্পের বারান্দায়।
ঘোষনা দিল, আমি গোলাম সোহরাব দোদুল এবার সিনেমা বানাবো। সাপলুডু – যা সবাইকেই খেলতে হবে।

বাব্বা ছেলের সাহস আছে। যেখানে শাকিব খানের ছবি চালিয়ে প্রায় সময় প্রযোজক পূঁজি ফেরত পান না সেখানে দোদুল বানিজ্যক ছবি বানাবার কথাই বুক চিতিয়ে বললো। এবং টিভি মাধ্যম থেকে উঠে আশা সব শিল্পীদের নিয়ে বানিয়েও ফেললো টান টান উত্তেজনায় ঠাসা একটা থ্রিলার ছবি সাপলুডু।

সত্য কথা বলতে কি, দোদুল তো নাটক বানায়, ছোট বেলায় অভিনয় করা ছাড়াতো সিনেমা বানানোর বিষয়ে তার তো কোন অভিজ্ঞতা নাই, তাই তার প্রতি আস্হা থাকলেও কিছুটা দ্বিধা ছিল, মাধ্যম তো দুটো ভিন্ন, সিনেমা বানাতে পারবে তো সে? তাও আবার বানিজ্যিক ছবি!

নাটক বানিয়ে নাম করা অনেকেই ছবি বানিয়েছেন। তারা সাফল্য পেয়েছেন কম জনই। তাদের একজনকেই আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, সিনেমা বানাতে গিয়ে আপনারা কিছু পারেন না কেন?

অনুজপ্রতিম সেই নির্মাতা স্পষ্টই বললো, বলতে দ্বিধা নেই, ছবি বানাতে এসে আমরা মূলধারার চিত্রনির্মাতাদের ভালোগুন গুলো উপেক্ষা করলেও ওদের বদ অভ্যাসগুলো আয়ত্বে আনতে চেষ্টা করি। তার চেয়ে বড়কথা, বিজ্ঞাপন নির্মাতারা যেমন তাদের সৃজন ক্ষমতা দেড় দুইমিনিটের বেশি ভাবতে পারেন না আমরাও তেমনি ৪০ মিনিট পেরুলেই খেই হারিয়ে ফেলি।

দোদুল সিনেমা বানাবার ঘোষনা দিলে উল্লেখিত বিষয়গুলো ও আমার মনে আসছিল। আশা নিরাশার দোলায় দুলতে দুলতে সাপলুডু মুক্তি পাবার দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম দিনেই আমি হলে ঢুকলাম। অসুস্হছিলাম বলে আগে যেতে পারিনি। ইতিমধ্যে ছবির প্রচারনার উপকরন যা কানে এসেছে অথবা চোখে দেখেছি তা আমার কাছে খুব একটা ভালো লাগেনি। তারপরেও সাপলুডু দেখতে উৎসাহ হারাইনি একারনেই, আমি নরেশ ভূঁইয়া নোয়াখালি থেকে আসা প্রায় ৭০ বছর বয়েসী একটা মানুষ, আমার মত দর্শককে টার্গেট করে ভাতিজা ছবি বানায় নি। হয়তো তরুন প্রজন্মের কাছে এগুলো ভালো লাগবে। তাই নিজস্ব অনুভুতি মনে না রেখে সাপলুডু দেখতে হলে যাবার সুযোগ খুঁজছিলাম।

অবশেষে সুযোগ এলো। আমার স্ত্রী শিল্পী সরকার অপু সাপলুডু ছবিতে ছোট্ট একটি চরিত্র অভিনয় করেছিল।ছবিটি সে দেখতে পারছিল না অন্য স্যুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারনে। সপ্তাহের মাঝখানেই দোদুলের ফোন এলো তার কাছে, চাচী শুক্রবার একটা বিশেষ শোর আয়োজন করা হয়েছে। কাকা আর ভাইকে ( আমাদের মেজ ছেলে ইয়াশ রোহান) নিয়ে চলে এসো। এবং আমরা তিনজনই চলে গেলাম বসুন্ধরার স্টার সিনেপ্লেক্সে দোদুলের সাপলুডু সিনেমা দেখতে।

নাটক সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে আমার কিছু বাতিক রয়েছে। একান্তই নিজস্ব ধারনার ভিত্তিতে যার জন্ম।
নাটক দেখি আমি মিলনায়তনের একেবারে শেষ সারিতে বসে। আর সিনেমা দেখি আমি কেবল সিনেমা হলে ইউটিউবেও নয়, সিনেপ্লেক্সে ও নয়। আসলে সাধারণ দর্শকদের সাথে, বেশি টাকার টিকেটের কথা বাদ দিলেও,আমার সিনেমা দেখতে ভাল লাগে। সিনেপ্লেক্সে বেশির ভাগ দর্শক যায় বেশি দাম দিয়ে পপকর্ন খেতে।
এটা আমার নিজস্ব ধারনা, যা নোয়াখালির মানুষের বিশেষত্ব হতে পারে।
তারপরেও হলে যখন ঢুকলাম এবং ছবি যখন শুরু হলো, প্রথম শট থেকেই একেবার টান টান উত্তেজনায়
পড়েগেলাম।দৃশ্যের পর দৃশ্য খালি অতিক্রান্ত হচ্ছিল। কোথায় আছি কিভাবে আছি তা খেয়ালই আসছিল না।
বুঝতে পারছিলাম না গল্প কোন দিকে যাবে। এই যে আমার নিমগ্নতা, তাতে ছেদ পড়লো এক ঘন্টারও পরে যখন বিরতিতে সারা হলে আলো জ্বলে উঠলো।
একটা থ্রীলার ছবি দেশে বিদেশে যেমন দেখেছি, কিংবা এমন ছবি যেমন হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি,মানে চিত্রনাট্য, শর্ট টেকিং, সাউন্ড ইফেক্ট, লোকেশান, অভিনয় রীতি সব কিছুই আমার কাছে যথাযথ মনে হচ্ছিল। ভাবতে পারছিলাম না,এমন উন্নত কারিগরি মান সমপন্ন ছবি আমাদের দেশে তৈরি হয়। এমন প্রচেষ্টা বাংলাদেশে একেবারেই দেখা যায়নি সে কথা বলবো না, তবে সে সব ছবিতে বিদেশ থেকে আগত টেকনেশিয়ান ছিল। তাই নিজস্ব বলে দাবী করতে পারিনি। কিন্তু সিনেমা বানাতে নতুন আসা গোলাম সোহরাব দোদুল সাপ লুডু বানিয়ে দেখিয়ে দিল বাংলাদেশে বাংলাদেশের শিল্পী কুশলীদের দিয়েই আন্তর্জাতিক মান সমপন্ন ছবি নির্মান সম্ভব। সাব্বাস দোদুল, সাধুবাদ তোমার জন্য।

প্রসংগক্রমে আরেকটি কথা বলতে হয়। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরী বোর্ডের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম। পুরস্কারের জন্য বাছাই তো দূরের কথা , বেশির ভাগ ছবিই পুরোটা দেখার ধৈর্য ছিল না জুরীবোর্ডের। যে সব নির্মাতা আগে ভালো ভালো ছবি বানিয়েছেন তাদেরও দেখেছি অধপতন। মনে হয়েছে, আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট নয়, দেশীয় নির্মাতাদের নিম্নমানের ছবি বানাবার কারনেই দর্শক সিনেমা হল বিমুখ হয়ে পড়েছে।
ভালো মানের নতুন নতুন বিষয়ের ছবি বানানো গেলে দর্শক অবশ্যই আবার ফিরে আসবে। দোদুলের সাপলডু, কিংবা হালের আরেকটি ছবি অরুন চৌধুরীর মায়াবতী দেখে ক্ষীন হলে আমার মনে তেমন আশা জেগেছে। আমার ধারনা,চলচ্চিত্র শিল্প টিকে থাকার মত অবস্হানে তখনই যেতে পারবে যখন নির্মাতারা আন্তরিকভাবে যথাযথ মানের ছবি নির্মানে সচেষ্ট হবেন। দোদুলের কাজে সে চেষ্টা আমি দেখেছি বলেই আমি বলতে পারি, দোদুল তুমি এগিয়ে চলো দর্শক তোমার সাথে থাকবে। সাপলুডুতে সে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দেশীয় সিনেমাশিল্পের জন্য এটাও কম প্রাপ্তি নয়।

সাপলুডু বানিয়ে গোলাম সোহরাব দোদুল অনেক প্রসংশা পাচ্ছে, পাবেও। দেশীয় সিনেমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে আমি ও তার প্রশংসা করবো সত্য তবে আরো কিছু কথা বলবো এবং তা সাপলুডু বিষয়ে।
এই ছবি ইন্ডাস্ট্রির উপকার করবে সত্য কিন্তু আমি যে নাটকে দেখা দোদুলকে এই সিনেমায় পেলাম না সে আক্ষেপ টা যে আমার থেকে গেল। টান টান উত্তেজনা নিয়ে আমি ছবিটি দেখেছি সত্য কিন্তু ছবি শেষে আমি ভাববার কিছু পাইনি। বরং ভাবতে গিয়ে পেয়েছি অসংলগ্ন তা, পেয়েছি অযৌক্তিকতা হয়তো অবাস্হবতাও। বলা যেতে পারে, বানিজ্যিক ছবি নির্মানে এসব বিবেচনার বিষয় নয়। মানি তা, আমি ব্যক্তিগত ভাবে যে একজন দোদুলের ক্ষেত্রে তো বটেই, একজন গোলাম সোহরাব দোদুলের জন্য ও তা মেনে নিতে পারি না। আরো একটি বিষয় আমার ভালো লাগেনি দোদুল। তুমি পার বলে নির্মান সংশ্লিষ্ট অনেক কাজ তোমাকে একা করতে হবে কেন? আমি নিশ্চিত সাপলুডু ছবির যে কোন চরিত্রে তুমি অভিনয় করলে এখন যারা করেছে তাদের চাইতে খুব একটা খারাপ করতে না। কিন্তু ভালো করার জন্য তুমি পেশাদারদের নিয়েছ। তাহলে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করার ক্ষেত্রে তুমি তা করলে না কেন? আর আমার মনে হয়, চারজন মিউজিক ডিরেক্টর থেকে চারটা গান এনে আরেকজন কে দিয়ে ব্যক গ্রাউন্ড করালে, আজকাল যদিও অনেকে করছে, তাতে প্রকৃত অর্থে সংগীত পরিচালনা হয়না। কেন জানি না, দোদুলদের সময়ের নির্মাতারা বিষয়টিকে গুরুত্বই দিতে চান না।

নোয়াখালী থেকে আসা নরেশ ভূঁইয়া সাপলুডু দেখে আবল তাবল অনেক কথা বলার পরও আরো একটি গুরুত্বহীন কথা লিখবে।
দোদুল যেদিন সাপলুডু ছবির শিল্পী কুশলীর নাম ঘোষনা করলো সেদিন কোন যথাযথ কারন ছাড়া আমার মনে হয়েছিল, ষাট নম্বর পাবার মত একটি ছবি অবশ্য সে বানাবে। ৪০ নম্বর কম পাবে নায়িকা মীম এবং ডিওপি রাজু রাজের কারণে। ছবি দেখার পরও আমি বলছি দোদুল ৬০ নম্বরই পেয়েছে তবে তাকে তাই পেতে অসাধারণ সহায়তা করেছে রাজু আর মীম। প্রথম ছবি সম্ভবত রাজুর তারপরেও কাজ হয়েছে বলার মত আর মিমকে এই প্রথম আমার বলতে ইচ্ছে করছে, এমন আন্তরিক ভাবে কাজ করলে তোমার অভিনয় ক্ষমতায়ও নির্মাতারা আস্তা রাখতে পারবে। এখন বাকী ৪০ নম্বর কেন পাওয়া হলো না ( আমার মতে) তা বিবেচনার ভার ভাতিজার ওপর ই ছেড়ে দিলাম।
আর পাঠক আপনারাও, নোয়াখালীর নরেশ ভূঁইয়া সত্য কি মিথ্যা বললো তা সিনেমা হলে সাপলুডু একবার দেখেই সিদ্ধান্ত নিন।

ঢাকা
৬ অকটোবর,২০১৯

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)