আপডেট এপ্রিল ২, ২০১৯

ঢাকা শুক্রবার, ৬ আশ্বিন, ১৪২৬ , শরৎকাল, ২০ মুহাররম, ১৪৪১

সম্পাদকীয় পথে পথে নিষ্ঠুরতা: মানবপাচার ঠেকাতেই হবে

পথে পথে নিষ্ঠুরতা: মানবপাচার ঠেকাতেই হবে

নিরাপদ নিউজ: বেঁচে থাকার আশায় কিংবা একটু উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় মানুষ এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাড়ি জমায়। এর ক্ষুদ্র একটি অংশ যায় বৈধভাবে, বেশির ভাগই পাড়ি জমায় অবৈধভাবে। তদুপরি অর্থনৈতিক সংকট, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যুদ্ধ-বিবাদসহ নানা কারণে অবৈধ পথে পাড়ি জমানো মানুষের সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে। আর তাদের প্রধান গন্তব্য হচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা বা উন্নত দেশগুলো। দীর্ঘ যাত্রাপথের প্রতিটি পর্যায়ে তারা যেভাবে নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতনের শিকার হয়, তা বর্ণনার অতীত। তা সত্ত্বেও ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ছয় লাখের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করেছে।

এই সময়ে সাগরে ডুবে মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী। লিবিয়া হয়ে যাওয়া এসব মানুষের অনেকের মৃত্যু হয় মরুভূমিতে অনাহারে বা তৃষ্ণায়। মৃত্যু হয় নিপীড়নেও। শুধু তা-ই নয়, পথে পথে এবং গন্তব্য দেশগুলোতে পৌঁছেও এদের প্রায় সবাইকে (নারী-পুরুষ-শিশু-নির্বিশেষে) নানা ধরনের বিকৃত যৌনাচারের শিকার হতে হয়। আর তা করা হয় যেমন যৌনক্ষুধা মেটাতে, তেমনি অভিবাসনবিরোধী আক্রোশ মেটাতে। গত শুক্রবার এমনই এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন ও জেনেভাভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা উইমেন্স রিফিউজি কাউন্সিল (ডাব্লিউআরসি)।

সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অভিবাসন ঠেকানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেসব দেশের নাগরিকদের মধ্যেও অভিবাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ-অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। আর তার শিকার হচ্ছে নিরীহ অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। অথচ দুনিয়াব্যাপী অভিবাসনের যে জোয়ার তৈরি হয়েছে তার জন্য কমবেশি দায়ী উন্নত দেশগুলোও। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায় একসময় লাখ লাখ বিদেশি শ্রমিক কাজ করত। পরিকল্পিতভাবে সেই দেশগুলোকে ধ্বংসস্তূপ বানানো হয়েছে। নিছক বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সেই দেশগুলোর মানুষকেও আজ অভিবাসন-স্রোতে গা ভাসাতে হয়েছে।

উন্নত দেশগুলো কোনোভাবেই সেই দায় নিতে চাইছে না; এমনকি যারা অনেক বছর ধরে সেসব দেশে বাস করছে, তাদেরও বের করে দেওয়ার নানা রকম ফন্দি আঁটা হচ্ছে। কিন্তু এসব করে এই ¯্রােত আটকানো যাবে কি? প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে আফ্রিকার ক্ষুধার্ত মানুষ কিংবা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ডুবে যাওয়া দ্বীপাঞ্চলের যে বাসিন্দারা আজ অভিবাসী হতে চাইছে, তাদের রুখে দেওয়া সহজ নয়।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া মানুষের তালিকায় ৫৭ জন বাংলাদেশি ছিল। উৎস দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আছে শীর্ষস্থানে।

বিষয়টি আমাদের জন্য সম্মানের নয়। লিবিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানো নিষিদ্ধ থাকলেও মানবপাচারকারীরা তাদের প্রথমে লিবিয়ায় নেয়। তারপর ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপে পাঠায়। অনেকের সলিল সমাধি হয়। লিবিয়ায়ও অনেকের মৃত্যু হয়। একইভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার এবং মাঝপথে অনেকের করুণ পরিণতি ঘটার খবর এখনো পাওয়া যায়। এই পাচারকারী চক্রকে যেকোনো মূল্যে রুখে দিতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের রক্ষায়।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)