আপডেট জুন ২৬, ২০১৯

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৪ শ্রাবণ, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ১৫ জিলক্বদ, ১৪৪০

আইন-আদালত, লিড নিউজ ‘বাসচাপায় পা হারানো রাসেলকে মাসে ৫ লাখ টাকা না দিলে ব্যবস্থা’

‘বাসচাপায় পা হারানো রাসেলকে মাসে ৫ লাখ টাকা না দিলে ব্যবস্থা’

নিরাপদ নিউজ: গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসচাপায় পা হারানো রাসেল সরকারকে আর কোনো টাকা গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ না দেওয়ায় হাইকোর্ট চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। টাকা কমিয়ে দিতে গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষের আবেদন খারিজ করে প্রতি মাসে ৭ তারিখের মধ্যে পাঁচ লাখ টাকা করে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গ্রিন লাইনকে উদ্দেশ করে আদালত বলেছেন, ‘যদি আপনারা আদেশ লঙ্ঘন করেন, তাহলে আমরাও অন্য ব্যবস্থা নেব। আদালতের আদেশ লঙ্ঘনের জন্য ফন্দি-ফিকির করলে সরকার কিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে তা আমরা দেখব।’

আদালত বলেন, ‘আপনারা হরতাল, ধর্মঘটে যেতে পারেন, যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। কিন্তু আমাদের নির্দেশ পালন না করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

গতকাল রাসেলের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন খোন্দকার শামসুল হক রেজা। গ্রিন লাইনের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. অজিউল্লাহ। ওই সময় রাসেল সরকারও উপস্থিত ছিলেন। বিআরটিএর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট এম রাফিউল ইসলাম।

গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষের পক্ষে আইনজীবী ক্ষতিপূরণের টাকা কমিয়ে দিতে আবেদন করেন। আবেদনে কিস্তিতে টাকা দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়। ওই আবেদন আদালতে দাখিল করে ডায়াসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন আইনজীবী। আদালত আবেদনটি দেখে বলেন, ‘কী চাচ্ছেন? চুপ করে আছেন কেন?’ জবাবে অ্যাডভোকেট অজিউল্লাহ বলেন, ‘আবেদনের ৯ নম্বর প্যারা দেখুন।’ তখন আদালত বলেন, ‘যা চাচ্ছেন তা মুখে বলেন না কেন?’ এর পরও অজিউল্লাহ চুপ করে থাকেন। ওই সময় আদালত বলেন, ‘আমাদের আগের আদেশের বিরুদ্ধে আপনারা আপিল বিভাগে গিয়েছিলেন। কিন্তু আপিল বিভাগ আমাদের আদেশে হস্তক্ষেপ করেননি। এরপর আমাদের কাছে আপনারা লিখিতভাবে বললেন এক মাসের মধ্যে টাকা দেবেন। কিন্তু তাও পালন করলেন না। আপনারা এই ছেলেটার (রাসেল) সঙ্গে আপস করতে পারতেন। আপনাদের অনেক সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এখন এসে এই আবেদন দিচ্ছেন। আপনাদের আচরণ শুভ নয়।’ আদালত আরো বলেন, ‘আপনারা অসহায় এই ছেলেটির একটি ব্যবস্থা করতে পারতেন। কোনো না কোনোভাবে তাকে সহযোগিতা করতে পারতেন। মানুষ হিসেবেও ছেলেটির জন্য কিছুই করেননি। এখন ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কমানোর কোনো সুযোগ নেই। মনে রাখবেন, এ ঘটনা যে অবহেলাজনিত ছিল তা নয়, ইচ্ছা করে তার ওপর দিয়ে গাড়ি উঠিয়ে দিয়েছেন।’

রাসেলের আইনজীবী বলেন, ‘আজ যে আবেদন দিয়েছে তার এক জায়গায় ঘটনা অস্বীকার করেছে। আরেক জায়গায় টাকা কমানোর আবেদন করেছে। আজ যা আদালতে বলা হচ্ছে তা এত দিন বলেনি। গ্রিন লাইন প্রতিদিন এক কোটি টাকার ব্যবসা করছে।’

আদালত গ্রিন লাইনের আইনজীবীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘টাকা কমানো হবে না। যদি কিস্তিতে দিতে চান তবে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’ আদালত বলেন, ‘ছেলেটা যদি আপনাদের ক্ষমা করে দেয় তবে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। আপনাদের মতো গরিব পরিবহন রাস্তায় চলার প্রয়োজন নেই।’ আদালত আরো বলেন, ‘আপানারা তো দেওলিয়া হয়ে যাননি। কিছু টাকা দিলে কী হতো! ছেলেটার সামনে এখনো অনেক সময় পড়ে আছে।’ আদালত বলেন, ‘আমরা শপথ নিয়েছি, রাগ-অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে থাকব। এই কারণে আমরা সব সহ্য করেছি। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব। আপনারা মনে রাখবেন সেও (রাসেল) একজন গাড়িচালক, পরিবহন শ্রমিকের বাইরের কেউ নন।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৮ এপ্রিল মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে কথা-কাটাকাটির জের ধরে গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসচালক ক্ষিপ্ত হয়ে প্রাইভেট কার চালকের ওপর দিয়েই বাস চালিয়ে দিয়েছিল। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাইভেট কার চালক রাসেল সরকারের (২৩) বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ওই ঘটনায় গাইবান্ধার একই এলাকার বাসিন্দা জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সরকারদলীয় সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতি রিট আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গত বছর ১৪ মে রুল জারি করেন। রুলে কেন রাসেলকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। এই রুলের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট গত ১২ মার্চ এক রায়ে ৫০ লাখ টাকা দিতে নির্দেশ দেন। পরে এ নিয়ে আরো কয়েক দফা আদেশ হয়েছে। এসব আদেশের ধারাবাহিকতায় গত ৪ এপ্রিল হাইকোর্ট এক আদেশে ১০ এপ্রিলের মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে রাসেল সরকারের অনুকূলে ৫০ লাখ টাকা দিতে নির্দেশ দেন। অন্যথায় ১১ এপ্রিলের টিকিট বিক্রি বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন আদালত। এরপরই গত ১১ এপ্রিল পাঁচ লাখ টাকার চেক দেয় গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ। আদালত বাকি ৪৫ লাখ টাকা এক মাসের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেন। কিন্তু রাসেলকে আর এক টাকাও দেয়নি গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)