আপডেট ৯ মিনিট ১৫ সেকেন্ড

ঢাকা মঙ্গলবার, ৪ আষাঢ়, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ১৪ শাওয়াল, ১৪৪০

ভ্রমন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম উদ্যান সমাধিক্ষেত্র মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিসৌধ

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম উদ্যান সমাধিক্ষেত্র মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিসৌধ

শফিক আহমেদ সাজীব,নিরাপদ নিউজ:  ভারতবর্ষের দ্বিতীয় মোঘল সম্রাট হুমায়ুন ছিলেন আফিম, জাদুবিদ্যা ও বহুনারীতে আসক্ত। ছিলেন খেয়ালী। কারণে-অকারণে অধিনস্তদের দিতেন মৃত্যুদণ্ড। ছিলেন দুর্বল সেনানায়ক। বলা হয় তিনি ছিলেন ভাইদের ষড়যন্ত্রে জর্জরিত, সিংহাসন হারিয়ে বছরের পর বছর বনে-বাদাড়ে ও মরুভূমিতে পালিয়ে বেড়িয়েছেন, রেফুজি নিয়েছেন অন্য সম্রাটের দরবারে, টিকে থাকার জন্য সুন্নি ধর্ম ছেড়ে নিয়েছেন শিয়া ধর্ম, পারস্য সম্রাট ও নিজ সেনাপতি বৈরাম খাঁর সুচারু যুদ্ধকৌশল না থাকলে থেকে যেতেন অথর্ব, পরাজিত সম্রাট হিসেবে। কিন্তু তিনি মোঘল সম্রাজের সর্বশ্রেষ্ঠ বাদশা আকবর দি গ্রেটের বাবা। তাই মোঘল সম্রাটদের যত সমাধি রয়েছে, হুমায়ুনেরটি সবচেয়ে বেশী চাকচিক্যময়, সবচেয়ে বেশী সীমানা নিয়ে গড়া। বাবার সমাধি গড়তে বাদশা আকবর কার্পণ্য করেননি।

শুধু বাংলাদেশিরাই নন, সম্ভবত বিশ্বের সব দেশের মানুষের কাছে ভারতের ‘তাজমহল’ একটি সুপরিচিত দর্শনীয় স্থান। কেনই বা হবে না; এর সৌন্দর্য, নিপুণ কারুকাজ সবাইকে মুগ্ধ করে। এর কাছেই রয়েছে সম্রাট হুমায়ুনের সমাধি। কিন্তু আমরা কজন এ সম্পর্কে অবগত আছি? ভারতীয়দের কাছে হুমায়ুনের সমাধি পরিচিত হলেও এর ইতিহাস ও তাজমহলের সঙ্গে এর যোগসূত্র অনেকেরই অজানা! তাজমহল ও হুমায়ুন টম্ব দুই-ই মোগল আমলের নিদর্শন। তাজমহলের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী মমতাজ স্মরণে এ সমাধি নির্মাণ করেন। আর সম্রাট হুমায়ুনের স্ত্রী হামিদা বানু বেগম নির্মাণ করেন হুমায়ুনের সমাধি। তিনি ‘বেগা বেগম’ নামেই পরিচিত ছিলেন। হুমায়ুন ছিলেন মোগল বংশের দ্বিতীয় অধিপতি ও সম্রাট শাহজাহানের পিতামহ সম্রাট আকবরের পিতা। ১৫৫৬ সালে হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তাকে দিল্লি ফোর্টের পুরোনো কেল্লায় সমাহিত করা হয়।

অটোমোবাইল অ্যসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার আমন্ত্রণে ট্রাফিক আইন নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ আয়োজিত সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণ এবং ভারতের দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শনে যাওয়া হয়। সেই সাথে তাদের আহবানে ভারতের এ অন্যতম সর্বাধিক পরিদর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সেখানের দর্শনীয় স্থাপনাগুলো প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা মনে থাকবে আজীবন। আবার ফিরে যাওয়া যাক মূল বিষয় ভারতের অসাধারণ স্থাপনা মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিসৌধের কথা প্রসঙ্গে।

হুমায়ুনের সমাধিসৌধ হল মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিসৌধ। ১৫৬২ খ্রিষ্টাব্দে হুমায়ুনের পত্নী হামিদা বানু বেগম এই সমাধিটি নির্মাণ করান। এটির নকশা প্রস্তুত করেছিলেন পারসিক স্থপতি মিরাক মির্জা গিয়াথ। হুমায়ুনের সমাধিই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম উদ্যান-সমাধিক্ষেত্র। দিল্লির নিজামুদ্দিন পূর্ব অঞ্চলে হুমায়ুন ১৫৩৩ সালে যে দিনা-পানাহ বা পুরানা কিল্লা নির্মাণ করেছিলেন, তার সন্নিকটেই এই সমাধিসৌধটি অবস্থিত। লাল বেলেপাথরের এত বড় মাপের স্থাপনাগুলির মধ্যে হুমায়ুনের সমাধিসৌধই ভারতে প্রথম। ১৯৯৩ সালে এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘোষিত হয়। তদবধি এই সমাধিসৌধ চত্বরটি বড়ো রকমের সংস্কার কাজ চলছে। হুমায়ুনের মূল সমাধিসৌধটি ছাড়াও, পশ্চিমের প্রধান দরজা থেকে সেই সমাধি পর্যন্ত যে পথটি গিয়েছে তার দুপাশে অনেকগুলি ছোটো ছোটো স্মারক রয়েছে। এটি হুমায়ুনের সমাধিরও ২০ বছর আগে নির্মিত হয়। এই সমাধিচত্বরটি সুরি শাসক শের শাহের রাজসভার আফগান অভিজাত পুরুষ ইসা খান নিয়াজির। উল্লেখ্য, নিয়াজি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। ১৫৪৭ সালে এই সমাধিচত্বরটি নির্মিত হয়।

হুমায়ুনের সমাধিসৌধ চত্বরে হুমায়ুনের সমাধি ছাড়াও রয়েছে তাঁর পত্নী হামিদা বেগম এবং পরবর্তীকালের মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র দারাশিকোর সমাধিস্থলও। এছাড়া রয়েছে জাহান্দর শাহ, ফারুকশিয়ার, রফি উল-দৌলত ও দ্বিতীয় আলমগির প্রমুখ পরবর্তীকালের মুঘল শাসকদের সমাধিও। এই সমাধিসৌধে মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এক বিশেষ উত্তরণ ঘটেছে। সমাধি চত্বরের চারবাগ গার্ডেন পারসিক বাগিচার একটি উদাহরণ, যা ভারতে পূর্বে কখনও দেখা যায়নি। কাবুলে (আফগানিস্তান) বাগ-ই-বাবর নামে পরিচিত মুঘল সম্রাট বাবরের যে সমাধিসৌধটি রয়েছে, তা তুলনামূলকভাবে সাদামাটা। হুমায়ুনের ক্ষেত্রে সেই ধরনের সাধারণ সমাধিসৌধ নির্মিত হয়নি। যদিও নন্দনকানন-প্রতিম উদ্যানে রাজকীয় সমাধি নির্মাণ বাবরের ক্ষেত্রেই প্রথম দেখা যায়। হুমায়ুনের সমাধিসৌধটি সমরকন্দে অবস্থিত তাঁর পূর্বপুরুষ তথা এশিয়া বিজয়ী তৈমুরের সমাধি গুর-ই আমির-এর আদলে নির্মিত। এই সমাধিসৌধ আগ্রার তাজমহল সহ একাধিক সুরম্য রাজকীয় মুঘল স্থাপত্য নিদর্শনের পূর্বসূরি।

হুমায়ুনের সমাধিটি যমুনা নদীর তীরে নির্মিত হয়। কারণ এই জায়গাটি ছিল দিল্লির সুফি সন্ত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সমাধিস্থল নিজামুদ্দিন দরগার নিকটবর্তী। দিল্লির শাসকেরা এই সুফি সন্তকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। এঁর বাসভবন চিল্লা নিজামুদ্দিন আউলিয়া হুমায়ুনের সমাধিস্থলের ঠিক উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। মুঘল শাসনের শেষ পর্বে, ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ তাঁর তিন পুত্রকে নিয়ে এখানে আশ্রয় নেন। পরে ক্যাপ্টেন হডসন তাঁকে বন্দী করেন এবং বিচারের পর তাঁকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়। দাস রাজবংশের শাসনকালে (১২৬৮-৮৭) এই জায়গাটি নাসিরুদ্দিনের পুত্র সুলতান কায়কোবাদের রাজধানী কিলোখেরি দুর্গের অন্তর্গত ছিল।

হুমায়ুনের মৃত্যু হয় ১৫৫৬ সালের ২০ জানুয়ারি। তাঁর দেহ প্রথমে দিল্লিতে তাঁর রাজপ্রাসাদেই সমাহিত করা হয়। পরে খঞ্জর বেগ এটিকে নিয়ে যান পাঞ্জাবের সিরহিন্দে। সেখানে ১৫৫৮ সালে হুমায়ুনের পুত্র তথা তদনীন্তন মুঘল সম্রাট আকবর এটি দেখেন। পরে ১৫৭১ সালে হুমায়ুনের সমাধিসৌধের কাজ সমাপ্ত হলে আকবর এটির পরিদর্শনে এসেছিলেন।

হুমায়ুনের বিধবা পত্নী হামিদা বানু বেগমের নির্দেশে ১৫৬৫ সালে হুমায়ুনের মৃত্যুর নয় বছর পরে এই সমাধিসৌধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৫৭২ সালে। সৌধটি নির্মাণ করতে সেযুগে খরচ হয়েছিল ১৫ লক্ষ টাকা। মনে রাখা দরকার, এই হামিদা বানু বেগম ও হুমায়ুনের প্রথমা পত্নী হাজি বেগম এক ব্যক্তি নন। আইন-ই-আকবরি অনুসারে, জনৈকা হাজি বেগম জীবনের শেষ পর্বে এই সমাধির তদারকি করতেন। তিনি ছিলেন হুমায়ুনের মামাতো বোন।

যে অল্প কয়েকজন সমসাময়িক ঐতিহাসিক এই সৌধের উল্লেখ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম আবদ আল-কাদির বাদাউনি। তিনি লিখেছেন, সৌধটির নকশা প্রস্তুত করেন পারসিক স্থপতি মিরাক মির্জা গিয়াস (যিনি মিরাক গিয়াসুদ্দিন নামেও পরিচিত)। তাঁকে হেরাত (উত্তর-পশ্চিম আফগানিস্তান]। থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ইতঃপূর্বে তিনি হেরাত, বুখারা (অধুনা উজবেকিস্তান) ও ভারতের অন্যান্য অংশে অনেকগুলি ভবন নির্মাণ করেন। তবে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর পুত্র সৈয়দ মুহাম্মদ ইবন মিরাক গিয়াথুদ্দিন পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করেন।

মোগল সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর পর স্ত্রী হাজি বেগম তাঁর স্মৃতিচারণায় দিল্লিতে সুরম্য একটি সমাধি নির্মাণ করেন। ষোড়শ শতকে সমাধিটি নির্মাণ করা হয়। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম উদ্যান-সমাধিক্ষেত্র (গার্ডেন টম্ব) হিসেবে স্বীকৃত। পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম এই স্থাপনা ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। পুরো সমাধিক্ষেত্রটি পুনর্নির্মাণের পর দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় ২০০৩ সালের ১৫ জুলাই। তথসুত্র- উইকিপিডিয়া।

লেখক : শফিক আহমেদ সাজীব, সাধারণ সম্পাদক, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)