ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৩ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড

ঢাকা রবিবার, ৩ আষাঢ়, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ১৩ শাওয়াল, ১৪৪০

শিল্প-সংস্কৃতি ভারতীয় জনপ্রিয় নৃত্যগুলো সংস্কৃতিতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়ানো হচ্ছে

ভারতীয় জনপ্রিয় নৃত্যগুলো সংস্কৃতিতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়ানো হচ্ছে

শফিক আহমেদ সাজীব: ভারতে নৃত্য অনেক ধরনের নৃত্য নিয়ে গঠিত, যা সাধারণত ধ্রুপদী বা লোক নৃত্য হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যান্য দিকের মত, ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রকারের নৃত্যের উদ্ভব হয়েছে, যা স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী উন্নত হয়েছে এবং দেশের অন্যান্য অংশ থেকে উপাদান আত্নভূত করেছে। সংগীত নাটক একাডেমী, নাট্যকলার জন্য ভারতের জাতীয় একাডেমী, ৮ প্রকারের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যকে ভারতের ধ্রুপদী নৃত্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যেখানে অন্যান্য পণ্ডিত ও সুত্রসমূহ আরও নাচকে ধ্রুপদী নৃত্যতে অন্তর্ভুক্ত করে। এইসব নাচের উৎস সংস্কৃতি গ্রন্থ নাট্য শাস্ত্র এবং হিন্দুধর্মের ধর্মীয় শিল্প কলায় পাওয়া যায়। অনেক সংখ্যায় এবং শৈলীর লোকনৃত্য পাওয়া যায় যা নিজ নিজ রাজ্য, জাতিগত বা ভৌগলিক অঞ্চলের স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী পরিবর্তিত। সমসাময়িক নাচের মধ্য বিভিন্ন ধ্রুপদী, লোক ও পাশ্চাত্য ধরনের পরিমার্জিত ও পরীক্ষামূলক মিশ্রন অন্তর্ভুক্ত। ভারতের নাট্য ঐতিহ্য শুধু পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নাট্য ঐতিহ্যকে প্রভাবিত করেনি, বরং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নাট্য ঐতিহ্যকেও প্রভাবিত করেছে। ভারতীয় সিনেমায় নাচ প্রায়ই তাদের মেজাজের বৈশিষ্ট্যর জন্য প্রসংশিত হয়, এবং ভারতীয় উপমহাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে থাকে।

ভারতীয় নৃত্য সাধারণত ধ্রুপদী এবং লোক নৃত্যের, পাশাপাশি মাঝেমধ্যে আধাধ্রুপদী ও উপজাতীয় নৃত্যে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। একটি ধ্রুপদী নাচ হচ্ছে সেই যার তত্ত্ব, প্রশিক্ষণ, অর্থ এবং ভাবপূর্ণ অনুশীলনের জন্য যুক্তি প্রাচীন শাস্ত্রীয় গ্রন্থে, যেমন নাট্য শাস্ত্র, নথিভুক্ত এবং তা অনুসরণ করা হয়। ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য ঐতিহাসিকভাবে একটি বিদ্যালয় বা গুরু- শিষ্য পরমপরা ঘিরে আবর্তিত হয় এবং থিয়েটারে নৃত্য মঞ্চস্থ করার জন্য নাচের সাথে তার অন্তর্নিহিত খেলা বা রচনা, গায়ক এবং অর্কেস্ট্রার ধারাবাহিকভাবে সুসংগত রাখার জন্য শাস্ত্রীয় গ্রন্থের অধ্যয়ন, শারীরিক চর্চা এবং ব্যাপক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

লোক নৃত্য হচ্ছে মূলত একটি মৌখিক প্রথা, যার ঐতিহ্য ঐতিহাসিকভাবে শিখানো হয়েছে এবং বেশীরভাগ সময় মুখে মুখে ও অনিয়মিত যৌথ অনুশীলনের মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে গেছে। আধা ধ্রুপদী নাচ হচ্ছে সেই নাচ যার একটি শাস্ত্রীয় ছাপ রয়েছে কিন্তু একটি লোকনৃত্যে পরিণত হয়েছে এবং তার গ্রন্থ বা বিদ্যালয় হারিয়েছে। একটি উপজাতীয় নাচ হচ্ছে লোকনৃত্যের একটি স্থানীয় রূপ, সাধারণত যা একটি নির্দিষ্ট উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে পাওয়া যায়; সাধারণত সময়ের সাথে উপজাতি নাচ লোকনৃত্যে পরিণত হয়।

ভারতে নাচের উৎপত্তি হয়েছে প্রাচীন কালে। বেদে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সাথে অনেক শিল্পকলাকে সংযুক্ত করা হয়েছে যেমন নাটকে, যেখানে দেবতাদের প্রশংসা কেবল শুধু আবৃত্তি করা বা গাওয়া হয় না বরং বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বিষয় নাটকীয় উপস্থাপনায় সংলাপ আকারে বলা হয়। শতপথ ব্রাহ্মণের (৮০০- ৭০০ খ্রিস্টপূর্ব) সাংস্কৃতিক শ্লোক ১৩.২ টি দুই অভিনেতার মধ্যে একটি নাটক আকারে লেখা হয়ছে। বৈদিক উৎসর্গের অনুষ্ঠানকে এক ধরনের যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে এর অভিনেতার সংলাপ, এর অংশকে এর গর্ভাভিনয় ও চরম মুহূর্ত অনূসারে নির্ধারণ করা হয়।

আদিতম নাচ সম্পর্কিত গ্রন্থ হচ্ছে নটসূত্র, যার উল্লেখ পাওয়া যায় পাণিনির লেখায়, একজন ঋষি যিনি শাস্ত্রীয় সংস্কৃত ব্যাকরণ লিখেছিলেন এবং যার অস্তিত্ব খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালে ধরা হয়। এইরকম শিল্পকলা সম্পর্কিত সূত্রের কথা অন্যান্য প্রাচীন বৈদিক গ্রন্থে পাওয়া যায়, যেমনটি শৈলালিন এবং কৃষসভ নামক দুইজন পণ্ডিতকে প্রাচীন নাটক, গান গাওয়া, নাচ ও এই শিল্প কলার সংস্কৃত রচনার ওপর গবেষণার অগ্রদূত হিসেবে কৃতিত্ব দেয়া হয়। রিচমন্ড এট অ্যালের অনুমান যে নটসূত্র ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রচনা করা হয়েছিল যার পাণ্ডুলিপি আধুনিক যুগে এসে হারিয়ে গিয়েছে। নাচ ও শিল্প কলার যে শাস্ত্রীয় গ্রন্থটি টিকে থাকতে পেরেছে সেটি হচ্ছে হিন্দু শাস্ত্র নাট্য শাস্ত্র, যার রচিয়তা হিসেবে ধরা হয় ঋষি ভাড়তকে। তিনি তার লেখায় বলেছেন এই কলা তার সময়ের আগে সৃষ্টি হয়েছে, যার স্বীকৃতী তিনি ব্রহ্মাকে দিয়েছেন যিনি ঋগ্বেদ থেকে শব্দ, সামবেদ থেকে সুর, যজুর্বেদ থেকে মূকাভিনয়, অথর্ববেদ থেকে আবেগনিয়ে নাট্য বেদ সৃষ্টি করেছেন। নাট্য শাস্ত্রের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সংকলন ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং ২০০ খ্রিষ্টাব্দ মধ্যে সংকলিত হয়, কিন্তু ধারনা করা হয় ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং ৫০০ খ্রিষ্টাব্দর মধ্যে। নাট্য শাস্ত্রের বহুল চর্চিত সংস্করণ ৬০০০ শ্লোক যা ৩৫ অধ্যায়ে বিভক্ত। ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের মূল নাট্য শাস্ত্র বলে ধরা হয়।

ভারতের অনেক প্রকারের ধ্রুপদী নৃত্য আছে, যা দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে উদ্ভত হয়েছে। ভারতীয় ঐতিহ্য, মহাকাব্য ও পুরাণ থেকেও ধ্রুপদী ও লোক নৃত্যের উদ্ভব হয়েছে। ভারতের ধ্রুপদী নৃত্য একপ্রকারে নৃত্য-নাট্যের সৃষ্টি করেছে যা নিজে একটি পরিপূর্ণ থিয়েটার। নর্তকীরা শুধুমাত্র অঙ্গভঙ্গি দ্বারা একটি গল্প উপস্থাপন করে। ভারতের ধ্রুপদী নৃত্যের অধিকাংশই হিন্দু পুরাণের গল্প উপস্থাপন করে। প্রতিটি নৃত্যই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের তত্ত্ব ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। ধ্রুপদী হিসেবে বিবেচিত হবার প্রধান মানদণ্ড হচ্ছে নাট্য শাস্ত্রে উল্লেখিত নির্দেশিকা মেনে চলা, যা ভারতীয় অভিনয় শিল্প ব্যাখ্যা করে। সংগীত নাটক একাডেমী ৮ প্রকারের ভারতের ধ্রুপদী নৃত্যকে ধ্রুপদী নৃত্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়: ভারতনাট্যম (তামিল নাড়ু), কত্থক (উত্তর, পশ্চিম ও মধ্য ভারত), কথাকলি (কেরল), কুচিপুডি (অন্ধ্র প্রদেশ),ওড়িশি (ওড়িশা), মণিপুরি (মণিপুর), মোহিনীঅট্টম (কেরল), এবং সত্রীয়া (আসাম)। ভারতের সকল ধ্রুপদী নৃত্যের মূলে হিন্দু ধর্মীয় আচার ও শিল্পকলা রয়েছে।

নৃত্যের ঐতিহ্য নাট্যশাস্ত্রের মধ্যে বিধিবদ্ধ হয়েছে এবং একটি নাচ সম্পন্ন হয়েছে বলে তখনই ধরা হবে যখন একটি নির্দিষ্ট ভাব (অঙ্গভঙ্গি বা মুখভঙ্গি) এর মাধ্যমে নর্তকী দর্শকদের মাঝে একটি রস (আবেগ) তৈরি করতে পারে। ধ্রুপদী নৃত্য লোকনৃত্য থেকে আলাদা করা হয় কারণ এটি নাট্য শাস্ত্রের নিয়মানুযায়ী পরিচালনা করা হয় এবং শুধুমাত্র এর অনূসারে সঞ্চালন করা হয়।

১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পুরানো, ভরতনাট্যম দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর একটি ধ্রুপদী নৃত্য, যা আধুনিক সময় প্রধানত নারীদের দ্বারা চর্চা করা হয়। এই নাচ সাধারণত শাস্ত্রীয় কর্ণাট সঙ্গীতের সাথে চর্চা করা হয়। ভরতনাট্যম ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের এক প্রধান ধারা যা তামিল নাড়ু এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের হিন্দু মন্দির হতে উৎপত্তি হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে, ভরতনাট্যম একটি একক নাচ যা কেবলমাত্র নারীদের দ্বারা সঞ্চালন করা হয় এবং হিন্দু ধর্মীয় বিষয় ও আধ্যাত্মিক ধারণা, বিশেষত শৈবধর্ম, কিন্তু বৈষ্ণব এবং শাক্তধর্মও, প্রকাশ করে। ভরতনাট্যম এবং ভারতের অন্যান্য ধ্রুপদী নাচ ব্রিটিশ রাজের ঔপনিবেশিক আমলে অবহেলিত এবং দমন করা হয়েছিল। ঔপনিবেশিক যুগের পরে, এটা ভারতে এবং বিদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের শৈলীতে পরিণত হয়েছে, এবং অনেক ভারতীয় সংস্কৃতির নাচ এবং শিল্পকলার বৈচিত্র্য সম্পর্কে অজ্ঞ বিদেশিদের দ্বারা এটিই ভারতীয় নাচের সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কথাকলি (কথা মানে “গল্প”; কালি মানে “অভিনয়”) একটি অত্যন্ত শৈল্পিক ধ্রুপদী নৃত্য-নাট্য যা ১৭ শতকের মধ্যে কেরল থেকে উদ্ভব হয়েছে। এই ধ্রুপদী নাচের ধরন আরেক প্রকারের “গল্প অভিনয়” শিল্পের ধারা, এটিকে সাধারণত আলাদা করা হয় রঙিন-মেক আপ, পরিধানসমূহ এবং মুখের মুখোশ দ্বারা যা অভিনেতা-নর্তকীরা পরে থাকে, যারা ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষ হয়ে থাকে।

হিন্দু কলা হিসেবে কথাকলির উৎপন্ন হয়েছিল, যাতে হিন্দুধর্মের পৌরাণিক কিংবদন্তি ও নাটক অভিনয় করা হত। যদিও এর উৎপত্তি আরো সাম্প্রতিক কালে হয়েছিল, এর উৎস সধারনত মন্দির এবং লোকশিল্পে যেমন কুটিয়াত্তম এবং ধর্মীয় নাটক যার উৎস ১ম সহস্রাব্দে। একটি কথাকলি সঞ্চালনে প্রাচীন দক্ষিণ ভারতীয় মার্শাল আর্ট এবং খেলাধুলার উপাদান সংযুক্ত থাকে। যদিও প্রাচীন মন্দির নাট্য ঐতিহ্য যেমন কৃষ্ণনাট্যম, কুটিয়াত্তম , এবং অন্যান্যের সাথে তাকে সংযুক্ত করা হয়, কথাকলি এদের থেকে আলাদা কারণ প্রাচীন কলা যেখানে অভিনেতা-নর্তকী-গায়ক একজন ব্যক্তি হয়ে থাকে সেখানে তাদের মত না করে, কথকলিএই ত্রয়ী ভূমিকাকে বিচ্ছিন্ন করে অভিনেতা নর্তকীকে নৃত্যপরিকল্পনা উপর মনোযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তার নাচের সঞ্চালনের ঊর্ধ্বসীমা অতিক্রম করতে সাহায্য করে এবং অন্যদিকে গায়ককে তার গায়কীর উপর মনোযোগের মাধ্যমে ভালো গান গাইতে সাহায্য করে। কত্থক ঐতিহ্যগতভাবে সংযুক্ত করা হয় প্রাচীন উত্তর ভারতের ভ্রাম্যমান গায়ক-কবিদের সংগে যারা কথাকার বা গল্পকার নামে পরিচিত। কত্থক শব্দটি এসেছে বৈদিক সংস্কৃত শব্দ কথা থেকে যার অর্থ “গল্প”, এবং সংস্কৃততে কথাকার শব্দটির অর্থ হচ্ছে “যিনি গল্প বলেন” বা “গল্পের সাথে কাজ করা”। ভক্তি আন্দোলনের সময় কত্থক প্রসূত হয়েছিল, বিশেষ করে হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের শৈশব কালের প্রণয় কাহিনীগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার দ্বারা, পাশাপাশি স্বাধীনভাবে উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলোর রাজদরবারে। এটি ১৬ ও ১৭ শতকের মোঘল রাজদরবার দ্বারা প্রভাবিত রুচি ও ফার্সি কলাকে রুপান্তর, উপযোগী করে এবং অংশভুক্ত করেছিল, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে এর অবহেলা ও হ্রাস ঘটেছিল, কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর এর নবজন্ম ঘটে।

কত্থকের তিনটি স্বতন্ত্র রূপ খুঁজে পাওয়া যায়, যার নামকরণ করা হয়েছে শহরগুলোর নামের সাথে মিল রেখে যেখানে কত্থক নাচের ঐতিহ্য বিকশিত হয়েছিল – জয়পুর,বারাণসী ও লখনউ। শৈলীগতভাবে, কত্থক নাচ ছোট ঘন্টাধ্বনির (ঘুঙরু) সাথে নাচুনে পায়ের ছন্দময় নড়নের উপর জোর দেয়, সেই নড়ানোকে সংগীতের সাথে একতান করানো হয়, পা এবং ধড় সাধারণত সোজা হয়, এবং গল্প এক উন্নত শব্দভাণ্ডারের মাধ্যমে যার ভিত্তি হচ্ছে বাহুর অঙ্গভঙ্গি ও শরীরের উপরের অংশের চালনা, মুখের অভিব্যক্তি, মঞ্চে অবস্থান পরিবর্তন, বাঁকের ও পালাবদন দ্বারা।

কুচিপুডি ধ্রুপদী নাচের উৎপত্তি হয়েছে বর্তমান ভারতীয় রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষ্ণা জিলার একটি গ্রামে। এর শিকড় প্রোথিত আছে প্রাচীন যুগে এবং ভারতের অন্যান্য ধ্রুপদী নৃত্যের মত এটি ভ্রাম্যমান গায়ক-কবি,মন্দির ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস সম্পর্কিত ধর্মীয় কলা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। এর ইতিহাসে কুচিপুডি নর্তকীরা ছিল সব পুরুষ, সাধারণত ব্রাহ্মণ,যারা উপযুক্তভাবে অনুযায়ী পোষাক পরে গল্পের নারী ও পুরুষের ভূমিকা পালন করত। আধুনিক কুচিপুডি ঐতিহ্য বিশ্বাস করে যে তীর্থ নারায়ণ জাতী ও তাঁর শিষ্য সিদ্ধেন্দ্র যোগী নামক একজন এতিম ১৭শ শতকে এই শিল্প প্রতিষ্ঠা ও নিয়মাবদ্ধ করেন। কুচিপুডি মূলত হিন্দু দেবতা কৃষ্ণ ভিত্তিক একটি বৈষ্ণব ঐতিহ্য হিসেবে গড়ে উঠেছিল, এবং এটা সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে তামিলনাড়ু পাওয়া যায় ভাগবত মেলা নামক শিল্পকলার সাথে সম্পর্কযুক্ত। কুচিপুডি সঞ্চালনে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিশুদ্ধ নাচ (নৃত্য), এবং সঞ্চালনের ভাবপূর্ণ অংশ (ব্যাখ্যামূলক নাচ “ন্রিত্য”), যেখানে ছন্দময় অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে একটি চিহ্ন ভাষা দ্বারা মূকাভিনয় করা হয়। গায়ক এবং সঙ্গীতশিল্পীরা শিল্পীর সংগে থাকে, এবং তাল ও রাগ কর্ণাট সঙ্গীতের নির্ধারণ করা হয়। আধুনিক যুগে, কুচিপুডি নর্তকী নারী ও পুরুষ উভয়ই হয়।

ওড়িশি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় রাষ্ট্র উড়িষ্যার হিন্দু মন্দির হতে উত্পত্তি হয়েছে। ওড়িশি, তার ইতিহাসে,প্রধানত নারী দ্বারা সঞ্চালিত হত, এবং ধর্মীয় গল্প এবং আধ্যাত্মিক ধারণা বিশেষ করে বৈষ্ণব (জগন্নাথ যেমন বিষ্ণু) কিন্তু এর পাশাপাশি অন্যান্য যেমন হিন্দু দেবতা শিব ও সূর্য এবং হিন্দু দেবী (শাক্তধর্ম) সম্পর্কিত ঐতিহ্য প্রকাশ করতো। ওড়িশি ঐতিহ্যগতভাবে নাট্যকলার একটি নাচ-নাটক রীতি, যেখানে শিল্পী এবং সঙ্গীতশিল্পীরা একটি পৌরাণিক কাহিনী যেমন একটি আধ্যাত্মিক বার্তা বা হিন্দু গ্রন্থে থেকে ভক্তিমুলক কবিতা, প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য অনুযায়ী প্রতীকী পরিচ্ছদ,অভিনয় (অভিব্যক্তি) এবং মুদ্রার (অঙ্গভঙ্গি এবং চিহ্ন ভাষা) মাধ্যমে অভিনয় করে বলতে থাকেন।

সত্রীয়া একটি ধ্রুপদী নৃত্য-নাট্য নাট্যকলা যা আসামের কৃষ্ণ-কেন্দ্রিক বৈষ্ণব আশ্রম থেকে উদ্ভব হয়েছে এবং ভক্তি আন্দোলন এর পণ্ডিত এবং সন্ত শ্রীমন্ত শংকরদেব ১৫ শতকে এর প্রচলন করেন। সত্রীয়ার একটি একাঙ্ক নাট্য হচ্ছে অংকীয়া নাট যা চারণকাব্য, নাচ ও নাটকের মাধ্যমে নান্দনিকতার ও ধর্মের মিশ্রন বলা যেতে পারে। এই নাচ সাধারণত আশ্রম মন্দিরের (সত্ৰ) কমিউনিটি হলে (নামঘর) নাচা হয়। এর প্রধান বিষয়বস্তু হচ্ছে কৃষ্ণ ও রাধা কিন্তু বিষ্ণুর অন্য অবতারসমূহ যেমন রাম ও সীতার কথাও বলা হয়।

মণিপুরি যা জাগই নামেও পরিচিত, মায়ানমারের (বার্মা) সীমান্তে ভারতের উত্তরপূর্ব রাজ্য মনিপুরের নামে নামকরণ করা হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে আসামের সিলেট অঞ্চলে এ নাচের উৎপত্তি । এটা বিশেষ করে তার হিন্দু বৈষ্ণব বিষয়াবলী, এবং রাস যাত্রা নামক রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-অনুপ্রাণিত নৃত্যনাট্যের সঞ্চালনের জন্য পরিচিত। তবে এই নাচ এইছারাও শৈবধর্ম, শাক্তধর্ম ও অন্যান্য স্থানীয় দেবতা যেমন লাই হারাউবার সময় উমাং লাই এর বিষয়ের উপরও নাচা হয়। মণিপুরি নাচ হচ্ছে দলগত নাচ, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল তার নিজস্ব অনন্য পরিধানসমূহ (একটি পিপা আকৃতির, সূচারূভাবে সজ্জিত স্কার্ট),এর নান্দনিকতা, নিয়মাবলী এবং নাট্যসংঘের কর্তৃক নিয়মিত নাচ মঞ্চস্থ করা। মণিপুরী নৃত্যনাট্য, বেশীরভাগভাগ সময়ে শোভাময়, চপল, সর্পিল হাত ও দেহের উপরের অংশের অঙ্গভঙ্গি সহ সঞ্চালনের উপর অধিক জোর দেওয়া হয়।

মোহিনীঅট্টম কেরল রাজ্য থেকে বিকশিত হয়েছে , যার নামকরণ করা হয়েছে বিষ্ণুর সম্মোহিনী অবতার মোহিনী থেকে, যিনি হিন্দু পুরাণ মতে তার সম্মোহিনী শক্তি ব্যবহার করে ভালো এবং মন্দের মধ্যে যুদ্ধে দেবতাদের জয়ী হতে সাহায্য করেছিলেন। মোহিনীঅট্টম নাট্য শাস্ত্রে বর্ণিত লাস্য শৈলী অনুসরণ করে, একটি নাচ যা নাজুক, নমনীয় চলন এবং মেয়েলী ভাবে নাচা হয়। এটা ঐতিহ্যগতভাবে একটি একক নাচ যা ব্যাপক প্রশিক্ষণের পরে নারীদের দ্বারা নাচা হয়। মোহিনীঅট্টম সাধারণত আবৃত্তি সহ সোপান (ধীর সুর) শৈলীর গানের সাথে বিশুদ্ধ এবং ভাবপূর্ণ নৃত্য-নাট্য হিসেবে মঞ্চস্থ করা হয়। গীতিকাগুলি সংস্কৃত ও মালয়ালম ভাষার সংমিশ্রণে গঠিত মণিপ্রভালম-এ রচিত, ভারতের লোকনৃত্য ও নাটক গ্রামাঞ্চল সমূহে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এইগুলো গ্রাম সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন কাজের অভিব্যক্তি এবং ধর্মানুষ্ঠান প্রকাশ করে। মধ্যযুগের সংস্কৃত সাহিত্য বিভিন্ন প্রকারের দলনৃত্যের বর্ণনা করে যেমন হাল্লিসাকা, রাসকা, দান্ড রাসকা এবং চরচরি। নাত্যশাস্ত্রে নাটক শুরু হবার পূর্বে মহিলাদের দলগত নাচও অন্তর্ভুক্ত। ভারতে অনেক লোকনৃত্য রয়েছে। প্রতিটি রাজ্যের তার নিজস্ব লোকনৃত্য আছে যেমন কর্ণাটকের বেদারা ভেশা, দল্লু কুনিঠা নাচ, কেরলের থিরায়াত্তম এবং থাইয়াম নাচ, গুজরাটের গার্বা,গাগারী,গোধাখূন্ড,এবং ডান্ডিয়া নাচ, রাজস্থানের কালবেলিয়া,ঘুমর,এবং রাসিয়া নাচ, জম্মু ও কাশ্মীরের নেইয়োপা,এবং বাচা নাগমা নাচ, পাঞ্জাবেরভাংরা ও গিদ্ধা নাচ, উত্তরাখণ্ডের ছুলিয়া নাচ, আসামের বিহু এবং বাগুরুম্বা নাচ,পশ্চিম উড়িষ্যার সাম্বালিপুরী নৃত্য এবং একইভাবে প্রতিটি রাজ্য এবং এর ছোট অঞ্চল সমূহের বিভিন্ন নাচ। লাভানি ও কলি নাচ মহারাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাচের মধ্যে অন্যতম। ভারতে বর্তমানে সমসাময়িক নাচ হিসেবে ব্যাপক পরিধির নাচ মঞ্ছস্থ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য নৃত্যপরিকল্পনা, আধুনিক ভারতীয় ব্যালে এবং বিভিন্ন শিল্পীদের দ্বারা বিদ্যমান ধ্রুপদ ও লোকনৃত্যের পরীক্ষা নিরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত। উদয় শংকর ও শোবানা জয়সিংহকে আধুনিক ভারতীয় ব্যালের নেতৃত্বস্থানীয় হিসেবে ধরা হয় কারণ তারা ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য ও গানের সাথে পশ্চিমা মঞ্চ কৌশলকে সংমিশ্রিত করেছেন। তাদের প্রযোজনার বিষয়বস্তু ছিল শিব-পার্বতী, লঙ্কা দহন, পঞ্চতন্ত্র, রামায়ণ ও অন্যান্য। সারা ভারতব্যাপী নাচ ও গানের দৃশ্য চলচ্চিত্রের একটি অবিচ্ছেদ অংশ। ১৯৩১ সালে আলম আরা চলচ্চিত্রের দ্বারা চলচ্চিত্রে শব্দ প্রবর্তনের সঙ্গে, নৃত্য পরিকল্পনার সহিত নাচ ক্রমে হিন্দি এবং অন্যান্য ভারতীয় চলচ্চিত্রে সর্বব্যাপী হয়ে ওঠে। প্রথম দিকের হিন্দি চলচ্চিত্রে নৃত্য প্রাথমিকভাবে ভারতীয় ধ্রুপদ নৃত্য শৈলী হিসেবে যেমন কত্থক বা লোক নৃত্য অনুসারে পরিচালিত হত। আধুনিক ছায়াছবিতে প্রায়ই পশ্চিমা নৃত্য শৈলীর (এমটিভি বা ব্রডওয়ে থিয়েটারের মধ্যে) সঙ্গে এই পুরনো শৈলীর মিশ্রন ঘটানো হয় ,যদিও একই চলচ্চিত্রে পশ্চিমা নৃত্যের সাথে পরিবর্তিত ধ্রুপদী নাচ পাশাপাশি দেখতে পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। সাধারণত, নায়ক বা নায়িকারা একদল পার্শ্ব নর্তকীদের সাথে নেছে থাকে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে অনেক গান ও নাচ দৃশ্যের মধ্যে গানের কলির সাথে পোশাক বা জায়গার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। নায়ক ও নায়িকাদের সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ বা স্থাপত্যে দিয়ে তৈরি বিশাল মঞ্চে বা দৃশ্যে,যাকে “পিকচারাইজেশন” বলে, একটি পাস ডি ডিউক্স (একটি ফরাসি ব্যালে শব্দটি, যার অর্থ “দুই এর নাচ”) গাওয়া ও নাচা খুবই জনপ্রিয় ব্যাপার। বর্তমানে ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রায় একটি “আইটেম নম্বর” থাকে যেখানে একজন নায়িকা অতিথি চরিত্র হিসেবে একটি গানের দৃশ্য নেচে যান। চলচ্চিত্রের ধারা এবং দৃশ্যের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে আইটেম নম্বরের জন্য নৃত্যপরিকল্পনা পরিবর্তিত হয়। চলচ্চিত্র অভিনেত্রী এবং নৃত্যশিল্পী হেলেন তার সরাইখানার নাচগানের সংখ্যার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। বেশীরভাগ সময় চলচ্চিত্রে, অভিনেতারা যে গানের উপর নেচে থাকেন তা তারা গেয়ে থাকেন না, কিন্তু অন্য শিল্পীরা পটভূমিতে গেয়ে থাকেন। একজন অভিনেতার গানটির গাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম কিন্তু বিরল নয়। বলিউডের নাচ ধীর নাচ থেকে শুরু করে দ্রুত হিপ হপ শৈলীর নাচ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। নাচটি সকল নাচের সংমিশ্রণ হতে পারে।এটা হতে পারে ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য, ভারতীয় লোকনৃত্য, ব্যালী ড্যান্সিং, জ্যাজ, হিপ হপ এবং অন্য সব কিছু যা আপনি কল্পনা করতে পারেন। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারতের স্বাধীনতার পর, উচ্চশিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিকতা বা শুধুমাত্র ব্যায়াম এবং সুস্থতার একটি উপায় হিসেবে নৃত্য শিক্ষার জন্য অনেক বিদ্যালয় খোলা হয়েছে। ভারতের প্রধান শহরগুলোতে এখন অনেক বিদ্যালয় আছে যারা নাচের যেমন ভরতনাট্যম নৃত্যের শিক্ষা দেয়, এবং এই শহরগুলো সারা বছর জুড়ে অনেক নৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নৃত্য সমূহ যা শুধুমাত্র এক লিঙ্গের লোকের একচেটিয়া ছিল, এখন নারী ও পুরুষ উভয়ই অংশগ্রহণ করে। অ্যানি-ম্যারি গেস্টন এর মতে, ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের অধুনিক প্রশিক্ষণের অনেক উদ্ভাবন ও উন্নয়ন একটি আধা ধর্মীয় ধরনের হয়ে থাকে। ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য কিছু ঐতিহ্য পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে চর্চা করা হয়, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সহ, যারা ভারতের অন্যান্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের অংশীদার। ভারতীয় পুরাণ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর নাচ শৈলীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, একটি উদাহরণ হচ্ছে জাভার নাচ যা রামায়ণ উপর ভিত্তি করে মঞ্চস্থ হয়। তথসুত্র- উইকিপিডিয়া।

লেখক : শফিক আহমেদ সাজীব, সাধারণ সম্পাদক, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)