আপডেট ১৬ মিনিট ৩৩ সেকেন্ড

ঢাকা মঙ্গলবার, ৪ আষাঢ়, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ১৪ শাওয়াল, ১৪৪০

ভ্রমন ভারতের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতিতে দিবারাত্রি জ্বলছে অগ্নিশিখা

ভারতের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতিতে দিবারাত্রি জ্বলছে অগ্নিশিখা

শফিক আহমেদ সাজীব,নিরাপদ নিউজ:  ইন্ডিয়া গেট! ভারতের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। সুবিশাল ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক একটি দর্শনীয় স্থাপনা। এর অবস্থান দেশটির নয়াদিল্লীর কেন্দ্রে। ইতিহাস বলে, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের আর্ক দে ত্রিম্পের নমুনা অনুযায়ী ইন্ডিয়া গেট নির্মিত হয় ১৯৩১ সালে। ১৯১৪ সালের জুলাই থেকে ১৮১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত চলা ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ’ এবং ১৯১৯ সালের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চলা ‘তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধে’ নিহত ভারতীয় সৈন্যদের স্মরণে ইন্ডিয়া গেট স্মৃতিসৌধটি নির্মিত। নব্বই হাজার সেনা জওয়ান এই দুই যুদ্ধে নিহত হন। লাল ও সাদা বেলেপাথর এবং গ্রানাইট পাথর দিয়ে তৈরী স্মৃতিসৌধটির নকশা করেন উনিশশতকের শ্রেষ্ঠ এক বৃটিশ স্থাপত্যশিল্পী স্যার এডউইন লুটিয়েনস। একসময় স্মৃতিসৌধের ছাউনির নীচে পঞ্চম জর্জের একটি মূর্তি ছিলো। এখন তা নেই। অন্যান্য মূর্তির সাথে জর্জের মূর্তিটও দিল্লীর করোনেশন পার্কে রাখা আছে। স্বাধীন ভারতে ইন্ডিয়া গেটে ভারতীয় সেনাবাহিনীর “অনামা সৈনিকদের সমাধি” “অমর জওয়ান জ্যোতি” স্থাপিত হয়েছে যা প্রদীপ্ত শিখায় প্রজ্জ্বল্যমান। ইন্ডিয়া গেট ও ‘অমর জওয়ান জ্যোতি’র সামনে যাওয়ার সাথে সাথে মনে চলে আসে আমাদের গৌরবের সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধের কথা। শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে আসে মস্তক।

২৯টি রাজ্য আর কেন্দ্র শাসিত সাতটি অঞ্চলবিশিষ্ট বিশাল দেশ ভারত ভৌগলিক আয়তনে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম এবং বিশ্বের মধ্যে সপ্তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। জনসংখ্যার দিক থেকে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল রাষ্ট্র। বিভিন্ন সময় নানাভাবে ঐতিহাসিক ইন্ডিয়া গেট সম্পর্কে জানি। জানতে পারি একটু আধটু পঠন পাঠনের মাধ্যমেও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহ চালু হওয়ার পর থেকে প্রায়ই নজরে আসে ইন্ডিয়া গেট সমেত অনেকের ছবি। আরো নানাকারণে ইন্ডিয়া গেটের প্রতি আমার দুর্ণিবার আকর্ষণ বরাবরের।

অটোমোবাইল অ্যসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার আমন্ত্রণে ট্রাফিক আইন নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ আয়োজিত সেফ ড্রাইভ সেফ লাইফ শীর্ষক সেমিনার ও দিল্লিতে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণ এবং ভারতের দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শনে আসা ১১দেশের ১১২জন প্রতিনিধিদের মধ্যে আমিও ছিলাম। অটোমোবাইল অ্যসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার আহবানে বাংলাদেশ থেকে পরিবহন শ্রমিক নেতা আনোয়ার হোসেনসহ ভারতের এ অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সেখানকার স্মৃতি ও গৌরবময় সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যালোচনা সভার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা মনে থাকবে আজীবন। আনন্দভ্রমণ এবং বেড়ানো নিয়ে বলবো অন্যদিন। ফিরে যাওয়া যাক মূল বিষয় ইন্ডিয়া গেট প্রসঙ্গে।

অপূর্বসুন্দর এই পৃথিবীর প্রকৃতির সংস্পর্শে যেতে ভালোবাসি, একবার নয় বার বার। মুগ্ধ করে বনের গভীরতা, পাহাড়ের রহস্য, আকাশের বিশালতা। আর সমুদ্র তো একাধারে অনেক কিছু। সে বিশাল, গভীর, কখনো গম্ভীর, কখনো উদ্যাম…এই বিচিত্র মায়াবী জগৎ নিত্য নতুনকে সৃষ্টি করে চলেছে। আর সেই আবহই হয়ত মানবজাতিকেও করেছে সৃষ্টিশীল। মানুষের বিস্ময়কর সব সৃষ্টিকে উপভোগ করতে হলে চলে যেতে হবে আদিম সভ্যতাগুলোর কাছে। যেতে হবে বর্তমান থেকে পেছনে। আর বাংলাদেশ থেকে প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ভ্রমণ করে দেখতে হলে পাশের দেশ ভারত থেকে শুরু করা হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

বিশালায়তনের দেশ ভারত। পাল বংশ থেকে শুরু করে সেন রাজবংশ হয়ে মোঘল আমল পর্যন্ত শাসনকালে সব রাজা ও সম্রাটই ছিলেন শিল্পচর্চা এবং উন্নত সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। অনন্য অভূতপূর্ব নানান সৃষ্টি যেমন ভারতে হয়েছে, তেমনি অনেক কিংবদন্তীর জন্ম ভারতে। তাদের বেড়ে ওঠা, জীবনযাপনের গল্প সব যেন তাদের সঙ্গে একটা সংযোগ ঘটায়, আত্মার দৃঢ় বন্ধন তৈরি করে।

এসব ভাবনা থেকেই নিজ দেশের পর আমার পছন্দের প্রথমেই ছিল ভারত। আর সুযোগটাও এলো নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের হাত ধরেই। ভারত সরকার সড়কের শান্তি কামনায় সাধারণ মানুষের আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে নানান উদ্যোগ নেয়। এরই একটি হলো অটোমোবাইল অ্যসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার আমন্ত্রণে ট্রাফিক আইন নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ আয়োজিত সেফ ড্রাইভ সেফ লাইফ শীর্ষক সেমিনার ও দিল্লিতে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণ এবং ভারতের দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শনে ১১দেশের ১১২জন প্রতিনিধির একটি দলকে ভারতের ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

দেশের বাইরে এটি ছিল আমার প্রথম সড়ক নিরাপত্তা বিষয় সভায় অংশ নেওয়া। চমৎকার ব্যবস্থাপনা ছিল সবকিছুতেই। আমরা যাই ইন্ডিয়া গেটে। ইন্ডিয়া ভ্রমণে এলে ইন্ডিয়া গেটে যায় প্রায় সবাই, গেটকে পেছনে রেখে নিজেকে ফ্রেমবন্দি বা স্থাপনাটি ভালভাবে দেখতে। কিন্তু ইন্ডিয়া গেট কি এটাই? আরও অনেক কিছু জানার আছে, আছে মজার অনেক বিষয়।

ইন্ডিয়া গেট কিন্তু শাহী আমলের নিদর্শন নয়। এটি নির্মিত হয় ব্রিটিশ আমলে, ১৯৩১ সালে। এটি ভারতের জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ। প্যারিসের আর্ক ডি ট্রায়ম্ফের আদলে এটি নির্মিত। ইন্ডিয়া গেটের পাথরও দেশি নয়, কনটের ডিউক এই পাথরগুলো আমদানি করেন।

এটি একটি স্মৃতিস্তম্ভ, কিন্তু কাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে বছরের পর বছর? স্তম্ভটির কাছে গেলে আপনি দেখতে পাবেন এর দেয়ালে খচিত রয়েছে শহীদদের নাম। এই শহীদেরা আত্মদান করেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আর আফগান যুদ্ধে। আপনি কি জানেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্মৃতির ছোঁয়াও আছে এখানে? ১৯৭১ এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত। ওই যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হয়েছিলেন ভারতের কিছু সেনাও। সেই শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে দিবারাত্রি এখানে জ্বলছে অগ্নিশিখা। শিখাটির নাম জ্যোতি।

ইন্ডিয়া গেট নির্মাণে সময় লেগেছে ১০ বছর। এর উচ্চতা ৪২ মিটার। আমরা ছবিতে দেখি এর সামনের দিকের ভিউ। অধিকাংশ পর্যটক মূল স্তম্ভটির এই দিকটিকেই গুরুত্ব দেন। কিন্তু অন্যান্য দিক থেকেও স্তম্ভটি দেখতে অনন্য। আপনি যখন শুধু একজন পর্যটক নন, একজন জ্ঞানপিপাসু তখন এই স্তম্ভ আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেবে ইংরেজ আমলের সেই সময়ের সঙ্গে। যে সময় পরাক্রম বৃটিশদের হাতে শাসিত হয়েও দেশে জন্য লড়তে পিছপা হতেন না ভারতবাসী। সে সময়ের ভারতের একটি অংশ আজকের বাংলাদেশ। সে সময়ের গর্ব আমাদের জন্যেও গর্বের। আজ দেশের সীমারেখা টেনে সময়ের অনেক সাক্ষীই চলে গেলে গেছে ভিন্ন দেশের অধীনে। কিন্তু এসব ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যখন নির্মিত হয়, তখন তা ছিল আমাদের সবার।
যে কোনো স্থাপনা দেখার আগে সেটি সম্পর্কে জেনে নিতে পারি আমরা। জানা-অজানা মিলিয়ে অনেক গল্প থাকে প্রতিটি নির্মাণের পেছনেই। আপনি যা জানেন, নতুন করে সেগুলোই মিলিয়ে নিতে পারেন আগের জানার সঙ্গে। আবার আগে থেকে জানা থাকায় কোনো কিছু দেখার পর মিস হয় না তার গুরুত্বপূর্ণ কিছুই।

লেখক : শফিক আহমেদ সাজীব, সাধারণ সম্পাদক, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)