আপডেট ১ সেকেন্ড

ঢাকা মঙ্গলবার, ৪ আষাঢ়, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ১৪ শাওয়াল, ১৪৪০

ভ্রমন ভারতের রাজধানীর অন্যতম সর্বাধিক পরিদর্শনীয় স্থাপত্য দিল্লীর লোটাস মন্দির

ভারতের রাজধানীর অন্যতম সর্বাধিক পরিদর্শনীয় স্থাপত্য দিল্লীর লোটাস মন্দির

শফিক আহমেদ সাজীব,নিরাপদ নিউজ:  দিল্লীর লোটাস মন্দির হল বাহাই ধর্মে বিশ্বাসী একাত্ম মানুষদের জন্য ধর্মাচরণের একটি জায়গা, এটি বিশ্বের সবচেয়ে এক অন্যতম সর্বাধিক পরিদর্শনীয় স্থাপত্য বিস্ময়। এটি ১৯৮৬ সালে উন্মুক্ত হয়। এখানে প্রবেশের জন্য কোনও প্রবেশমূল্য লাগে না এবং প্রাঙ্গনটি নির্মল, পরিচ্ছন্ন ও বিপূলাকায়। স্বাভাবিকভাবে, লোটাস মন্দির, ভারতের রাজধানীতে মানুষদের অবশ্য পরিভ্রমণমূলক স্থানগুলির মধ্যে উচ্চ স্থানে রয়েছে।

অটোমোবাইল অ্যসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার আমন্ত্রণে ট্রাফিক আইন নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ আয়োজিত সেফ ড্রাইভ সেফ লাইফ শীর্ষক সেমিনার ও দিল্লিতে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণ এবং ভারতের দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শনে যাওয়া হয়। অটোমোবাইল অ্যসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার আহবানে ভারতের সবচেয়ে অন্যতম সর্বাধিক পরিদর্শনীয় স্থাপত্য ঘুরে দেখতে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সেখানকার স্মৃতি ও গৌরবময় সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যালোচনা সভা এবং দর্শনীয় স্থাপনাগুলো প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা মনে থাকবে আজীবন। আনন্দভ্রমণ বিষয়ে কথা হবে অন্য সময়। ফিরে যাওয়া যাক মূল বিষয় ভারতের এক অসাধারণ স্থাপনা লোটাস টেম্পল প্রসঙ্গে।

বাহাই ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে খুব অল্প জানা গেছে। বাহাই হল বিশ্বের নবীনতম ধর্ম। তবে, অন্যান্য ধর্মের অসদৃশ যারা অনুসরণারীদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আক্রমণাত্মক ধর্মান্তরকরণকে বেছে নেন, সেখানে বাহাই ধর্ম সকল ধর্মের মানুষদের স্বাগত জানায়। এটি একমাত্র ধর্ম যেখানে একযোগে অন্য ধর্মের মানুষরাও এই ধর্ম চর্চা করতে পারবেন। এই অর্থে বাহাই ধর্মবিশ্বাসকে একটি আধ্যাত্মিক আন্দোলন হিসাবে আরোও ভালোভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বাহাই ধর্মে ঐক্যবদ্ধতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বাহাই-য়েরা বাহা’ঊ’ল্লাহ অনুসরণ করেন- সকল বয়সের একতার প্রতিশ্রুতি।

লোটাস মন্দিরটি, বাহাই ধর্মবিশ্বাসীদের আড়ম্বরতার মধ্যে দিয়ে তার নকশার মাধ্যমে তাদের সুন্দর সরলতাকে তুলে ধরার জন্য এক উদ্দেশ্য নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। নকশাটি, যদিও তার নিজস্বতাতেই মহীয়ান হয়ে উঠেছে, তবে আড়ম্বরপূর্ণ সুশোভিতকরণের এক সতেজ হীনতা প্রদর্শিত হয়। নবীনতা এবং বাহাই বিদ্যালয়ের চিন্তাভাবনার স্বচ্ছতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে।

লোটাস মন্দির ভারতীয় স্থাপত্য শৈলীর সঙ্গে তাল মিলিয়েই পরিকল্পনা করা হয়েছিল যা তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভূতির প্রতিফলনে লক্ষ্য করা যায়। মন্দিরের প্রধান স্থাপত্যশিল্পী ছিলেন ফেরীবোর্জ সাহবা। মন্দিরটির নকশার আসন্ন ধারনার সময় সাহবা কয়েকটি জিনিষ মাথায় রেখেছিলেনঃ মন্দির পরিদর্শনে, তার ব্যবহৃত প্রতীকগুলি ভারতীয় মানুষদের নিকট যেন পরিচিত হয়, এটি কোনও বিদ্যমান ইমারতের অনুকরণের মতো দেখতে না হয় এবং চিত্রাবলী, শৈলী এবং প্রতীকী যেন বাহাই বিশ্বাস সম্পর্কে একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। যদিও তার এই কার্যোদ্ধার বেশ কঠিন হয়ে উঠেছিল এবং তেমনি এক উত্তেজনাকর ফলাফল হয়েছিল যার ফলে সাহবার সমকালীন এটি এক ‘বিস্ময়কর’ হিসাবে প্রশংসিত হয়।

বহু যুগ ধরে পদ্ম ফুল ভারতীয়দের কাছে পবিত্র রূপে গৃহীত হয়ে আসছে। প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থে এবং গৌতম বু্দ্ধের জীবনীতে এটির ব্যাপক উল্লেখ পাওয়া গেছে। অনেক ভারতীয় ভাষায় পদ্ম ফুল “পঙ্কজ” নামেও সুপরিচিত। এর অর্থ হল যা পঙ্কিল জল বা পাঁকে জন্মায় এবং তা সত্ত্বেও বিশুদ্ধ ও অকলুষিত থাকে। ভারতীয় পুরাণে, পদ্মফুল হল সৃষ্টিকর্তা, ঈশ্বর ব্রহ্মার আসনস্থান। তাই ফুলটিকে সৃজনশীলতা ও অমরত্বের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। এছাড়াও পদ্ম ফুলের শিল্পপ্রতীক বা মোটিফ জরাথুস্ট্রীয় (পার্সি) স্থাপত্যে লক্ষ্য করা যায়। পদ্মফুল ভারত জুড়ে বিভিন্ন স্থাপত্য শৈলীর মধ্যে আবৃত্ত মোটিফ হওয়ার দরুণ স্থপতিবিদরা তাদের মূল নকশা হিসাবে পদ্মফুলকে বেছে নিয়েছেন।

পরিকাঠামোটি, তিনটি স্তরের প্রত্যেকটিতে ৯টি করে মোট ২৭টি পদ্মফুলের পাপড়ির ন্যায় সমন্বয়ে গঠিত। বহির্ভাগের পাপড়িগুলি আশমানি আলো হিসাবে কাজ করে এবং মৃদু ব্যাপ্ত আলো ছড়ায়। জলের উপর ভাসমন পদ্মফুলের প্রভাব প্রতিভাত করার জন্য নয়টি পুকুর লোটাস মন্দিরটিকে ঘিরে রয়েছে। রাতের বেলায়, উজ্জ্বল কৃত্রিম বহিঃস্থ আলো পদ্মফুলের পাপড়ির বাইরের প্রান্তগুলিকে উদ্ভাসিত করে তোলে, অন্যদিকে ভিতরটিকে আলোকিত করার জন্য স্ফীত মৃদু আলো ব্যবহৃত হয়। এইভাবে একটি পদ্মফুলের ছাপ সম্পূর্ণ করা হয়। পাপড়ি পৃষ্ঠগুলি মার্বেল দ্বারা আবৃত, যেগুলি গ্রীসের পেন্টেল্যি পর্বত থেকে সংগৃহীত হয়েছিল।

যেহেতু এই সুবিশাল জায়গাটিকে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত করা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভবপর ছিল না; তাই এলাকাটি ঠান্ডা করার কাজে প্রাকৃতিক বায়ুচলন প্রযুক্তি (ন্যাচারাল ভেন্টিল্যাশন টেকনিক)-র ব্যবহার করা হয়েছে। মন্দির এবং তার স্রষ্টা উভয়েই, বিভিন্ন স্থাপত্য বিষয়ক পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁরা সারা বিশ্ব জুড়ে, স্থাপত্য, ধর্মীয় এবং শিল্পরুচিসম্মত সংস্থা দ্বারা প্রশংসিত হয়েছেন।

মূখ্য স্থপতিবিদ ফেরীবোর্জ সাহবা নিজেই বাহাই ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী। সারা বিশ্বে পূজার্চনার আরোও ছয়টি অন্যান্য বাহাই স্থল আছে। সেগুলি হল; আপিয়া (পশ্চিমী সামোয়া), সিডনি (অস্ট্রেলিয়া), কামপালা (উগান্ডা), পানামা সিটি (পানামা), ফ্রাঙ্কফুর্ট (জার্মানি) এবং উইলমেট্যে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)। লোটাস মন্দির, গীনেস্ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ ২০০১ সালে বৈশিষ্ট্যযুক্ত হয়েছে। এছাড়াও লোটাস মন্দির ভারতীয় ডাকটিকিট (পোস্টেজ স্ট্যাম্প)-এর ওপর প্রাধান্যের একটি স্থান খুঁজে নিয়েছে। তথসুত্র- উইকিপিডিয়া।

মন্দিরটি, ভারতের রাজধানী দিল্লীর বাহাপুর গ্রামে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক ভ্রমণার্থীদের জন্য নিকটবর্তী বিমানবন্দর হল ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এখান থেকে গাড়ীর মাধ্যমে ভায়া আউটার রিং রোড হয়ে লোটাস মন্দিরে পৌঁছাতে প্রায় ৩৪ মিনিট সময় লাগে। নতুন দিল্লী রেলওয়ে স্টেশন থেকে লোটাস মন্দিরে পৌঁছাতে একজন ভ্রমণার্থী গাড়ী নিতে পারেন। গাড়ীতে ভায়া লালা লাজপত রায় রোড হয়ে এখানে পৌঁছাতে প্রায় ৪০ মিনিট সময় লাগে।

যেহেতু প্রখর গ্রীষ্মকালের সময় দিল্লীতে প্রচন্ড গরম এবং শীতের মাসগুলিতে অত্যন্ত শীত থাকে, তাই বসন্ত ও শরৎ-এর সময় এটি পরিদর্শনের সেরা সময় হিসাবে ধারণা করা যেতে পারে।

ফেব্রুয়ারী থেকে এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের শুরুর সময় হল এই স্থান পরিদর্শনের জন্য আদর্শ। লোটাস টেম্পল, সোমবার ব্যতীত সপ্তাহের সবকটি দিনই উন্মুক্ত থাকে। ১লা অক্টোবর থেকে ৩১শে মার্চ, সকাল ৯:০০টা. থেকে বিকেল ৫:৩০টা. পর্যন্ত। ১লা এপ্রিল থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর : সকাল ৯:০০টা. থেকে সন্ধ্যা ৭:০০টা. পর্যন্ত। লোটাস টেম্পল পরিদর্শনের জন্য কোনও প্রবেশমূল্য লাগে না।

লেখক : শফিক আহমেদ সাজীব, সাধারণ সম্পাদক, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)