ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৪৮ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড

ঢাকা বুধবার, ১১ আশ্বিন, ১৪২৫ , শরৎকাল, ১৫ মুহাররম, ১৪৪০

নিসচা সংবাদ, লিড নিউজ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে সড়ক পরিবহন আইনের অসঙ্গতি তুলে ধরলেন ইলিয়াস কাঞ্চন

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে সড়ক পরিবহন আইনের অসঙ্গতি তুলে ধরলেন ইলিয়াস কাঞ্চন

নিরাপদনিউজ : দেশের সড়ক দুর্ঘটনারোধে আমাদের করণীয় কি হতে পারে এবং সম্প্রতি মন্ত্রীসভায় উত্থাপিত পরিবহন আইন দুর্ঘটনারোধে কতটা কার্যকর ভূমিকা বহন করবে এসব নানা বিষয়ে আজ নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন কথা বলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হকের সাথে।

বর্তমানে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা অত্যন্ত হতাশাজনক আখ্যায়িত করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক নিসচা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনের কাছে প্রশ্ন করেন এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি হতে পারে? কি করলে আপনি মনে করেন এই দুর্ঘটনারোধ করা সম্ভব হবে এবং মন্ত্রীসভায় উত্থাপিত পরিবহন আইন নিয়ে আপনার মতামত কি?

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছি আমি। মানুষ শুরুতে আমাদের এই কাজটিকে ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। সময়ের ব্যবধানে আজ দেখা যাচ্ছে আমাদের এই দাবি এখন সমগ্রদেশের মানুষের দাবিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি দেখেছেন নিরাপদ সড়কের দাবিটি আমাদের শিক্ষার্থীরাও উপলব্ধি করতে পেরেছে। তারাও আন্দোলনে নেমেছে। শুরু থেকে আমি যে কথাগুলো বলে আসছিলাম এতদিন এই কথাগুলো যদি সরকার শুনতো, পরিবহন শ্রমিক-মালিকরা শুনতেন তাহলে আজকের এই পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না।


ইলিয়াস কাঞ্চন আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, সড়ক পরিবহন আইন যেটি পাশ হতে যাচ্ছে এই সড়ক পরিবহন আইনে আমাদের মতের প্রতিফলন ঘটেনি। আমরা এ আইনের উপর যে সাজেশন দিয়েছি তা গ্রহণ করা হয়নি। প্রথমেই আমার আপত্তি ছিল আইনটির শিরোনাম নিয়ে। আমরা বলেছিলাম সড়ক দুর্ঘটনা নিরসন করতে হলে সড়কের নিরাপত্তার কথা প্রথমে আসে। এজন্য আইনটির শিরোনাম চেয়েছিলাম ‘সড়ক নিরাপত্তা ও সড়ক পরিবহন আইন’ আমরা মনে করি সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালক, মালিকের জেল জরিমানাতে সমাধান নয়। দুর্ঘটনার কারণ জানার পরে তা লাঘবে প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ, ত্রুটি সংশোধন ও চালককে দক্ষ করে গড়ে তুলতে ইনস্টিটিউশনের বিকল্প নেই। এ জন্যে গড়ে তুলতে হবে ইনস্টিটিউশন। যার জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা ও বাজেটের- যা সড়ক নিরাপত্তার মাধ্যমেই সম্ভব।

এ আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছিলাম ১০ বছর, হাইকোর্টের নির্দেশনা ছিল ৭ বছর কিন্ত করা হয়েছে ৫ বছর। সর্বোচ্চ শাস্তির কথা বলা হলেও সর্বনিম্ন শাস্তির কথা বলা হয়নি- এতে আমি মনে করি শুভঙ্করের ফাঁকি আছে।আমি মনে করি এখানে একটা শ্রেনীকে টার্গেট করা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু চালকের শাস্তির কথা বলা হয়েছে, মালিক অথবা মালিক কর্তৃপক্ষ ছাড় দেয়া হয়েছে- চালকের যেমন জেল-জরিমানা হবে তেমন মালিক বা মালিক কর্তৃপক্ষ এমনকি যাদের কারনে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছিল সকলকেই আইনের আওতায় আনতে হবে। এই আইনে তা উল্লেখ করা হয়নি। এটাও পরিস্কার করতে হবে। এছাড়া মালিক বা মালিক কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, চালক-হেলপার নিয়োগে ত্রুটি যেমন গাড়ীর ধরন অনুযায়ী চালকের লাইসেন্স না থাকা, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের নিয়োগ করা এসব বিষয়ে আইনে যথাযথ ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। আমি মনে করি এ ক্ষেত্রে আইনের কঠোর বিধান থাকতে হবে।
বেপরোয়া গাড়ী চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটালে চালকের ৫ বছর জেল ও জরিমানা মেনে নেয়া যায় না। যেখানে ১৯৮৩সালের আইনে বলা হয়েছে লাইসেন্স না থাকলে এবং দুর্ঘটনা ঘটালে ৩০২ ধারা প্রযোজ্য হবে। সেখানে বেপরোয়া গাড়ী চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটালে ৫ বছর জেল বা জরিমানা যুক্তিসঙ্গত নয় বলে মনে করি। আমার কথা হলো আইনের যে কোন ধারা লঙ্ঘিত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে তাহলে দুরঘটনার জন্য যেই দায়ী সেই দায়ী দোষীকে ১০ বছরের শাস্তি প্রদান করতে হবে। এ শাস্তির বিধান উল্লেখ করে প্রণীত আইন সংশোধন করে ধারা সংযোজন করতে হবে।

আর একটি অসঙ্গতি আমার চোখে পড়েছে। আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেনীর কথা বলা হয়েছে আর হেলপারের ক্ষেত্রে পঞ্চম শ্রেনীর কথা বলা হয়েছে। আমার প্রশ্ন একজন হেলপার শুধু গাড়ীর সহকারীর কাজ করতে আসেনা তার টার্গেট থাকে চালক হওয়ার। এখন প্রশ্ন হলো সে চালক হতে চাইলে তার শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন বিষয়টি নির্ণয় হবে-আইনে তার পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা থাকতে হবে। আমাদের দাবী হলো চালক ও হেলপারের শিক্ষাগত যোগ্যতা একই থাকতে হবে।

আইনে সড়ক কি কাজে ব্যবহার হবে বা সড়ক ব্যবহার বিধি সম্পর্কে এ আইনে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকতে হবে। ফুটপাত কি কাজে ব্যবহার করা হবে, এবং সড়কের পার্শ্ব ভুমির ব্যবস্থাপনা আইনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট করতে হবে।

সড়ক তো ধান পাট শুকানোর জন্য নয়, মিছিল মিটিং করার জন্য নয়, সড়কের পাশের ভুমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করার জন্য নয়-এ বিষয়ে আইনের যথাযথ ব্যাখ্যা রেখে শাস্তির বিধান রাখতে হবে। সড়কের পাশ থেকে পর্যায়ক্রমে হাট-বাজার ও বাড়ীঘর সরিয়ে ফেলতে হবে এ ব্যাপারেও আইনে ব্যাখ্যা থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো সড়কের দুইপাশে অধিগ্রহণকৃত জায়গা লিজ দেয়া যাবে না। প্রয়োজনে তাও গুরুত্ব বুঝে চাষাবাদের অনুমতি দেয়া যেতে পারে। শহরের রাস্তার ফুটপাত কাদের জন্য এবং ব্যবহার কারা করবে তা উল্লেখ থাকতে হবে এই আইনে। ফুটপাত যদি পথচারীর চলার জন্য হয় এর বাহিরে অন্য কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হলে প্রণীত আইনে ধারা সংযোজন করে শাস্তির কথা উল্লেখ করতে হবে। রাস্তার পাশে অবৈধ পার্কিং এর বিষয়ে আইনে কঠোর ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করতে হবে।

ক্ষতিপূরণের জন্য যে ট্রাষ্টি বোর্ড গঠন করা হবে সেখানে সরকার, চালক ও মালিকের প্রতিনিধি থাকলেই চলবে না, ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ পেতে ও কারণ নির্ণয়ে সেখানে থাকতে হবে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের প্রতিনিধি। আমি বলব যে আইনই প্রণীত হোক তার যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে শক্তিশালী মনিটরিং টীম যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন হবে। থাকবে সড়ক, নৌ, রেল, বিমান, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, পরিকল্পনা, অর্থ, আইন, সিটি কর্পোরেশন এবং সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যারা কাজ করছে তাদের প্রতিনিধি। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়ে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিনিধি থাকতে হবে। এক কথায় আমি বলব এ আইন বাস্তবমুখী ও কার্যকর করতে হলে সংশোধন ও সকল মহলের পরামর্শ গ্রহণ জরুরী।  এ ব্যাপারে আশা করি সরকার স্বদিচ্ছার পরিচয় দিবেন।

ইলিয়াস কাঞ্চনের কথায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, পরিবহন আইন নিয়ে আপনার যে প্রস্তাবনা সবগুলোই যৌক্তিক । আপনার এই প্রস্তাবনা নিয়ে আমরা আগামী জাতীয় সংসদ অধিবেশনের আগেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাব যেন আইনটি পাশ হবার আগে এসব বিষয় সেখানে যোগ করা হয়। এছাড়া নিসচার দীর্ঘদিনের কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করে ইলিয়াস কাঞ্চনকে ধন্যবাদ জানান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)