সংবাদ শিরোনাম

২০শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং

00:00:00 শুক্রবার, ৫ই কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ , হেমন্তকাল, ১লা সফর, ১৪৩৯ হিজরী
সাহিত্য যুদ্ধমুক্ত পৃথিবীর স্মারক-শান্তিকন্যা সামান্থা স্মিথ ॥ কাব্যময় খোলা চিঠি

যুদ্ধমুক্ত পৃথিবীর স্মারক-শান্তিকন্যা সামান্থা স্মিথ ॥ কাব্যময় খোলা চিঠি

পোস্ট করেছেন: লিটন এরশাদ | প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১২, ২০১৭ , ১০:৩৪ অপরাহ্ণ | বিভাগ: সাহিত্য

 


যুদ্ধমুক্ত পৃথিবীর স্মারক-শান্তিকন্যা সামান্থা স্মিথ ॥ কাব্যময় খোলা চিঠি

সালেম সুলেরী, নিরাপদনিউজ: কী পটভূমি, কী কবিতা- দুটোই ঘটনাবহুল। পাতাঝরার মাস অক্টোবর যেন তা বরণে ব্যাকুল। ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক ‘কন্যাশিশু’ দিবস। ইউনেস্কোর মাধ্যমে চালু হয় ২০১২ সালে। অন্যদিকে অ্যামেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস ‘কলম্বাস ডে’। প্রতিবছর পালিত হয় অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সোমবার। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের নিমিত্তে এই দিবস। ইতিহাসটি ১৪৯৪ সালের ১২-১৩ অক্টোবরকে ঘিরে । দেশকে উন্মোচনের এই বাৎসরিক লগ্নটি মূলত আনন্দের। বাঁধ ভাঙ্গা উৎসবের। প্রতিবছর তেমনটিই ঘটে থাকে। সরকারিভাবে অ্যামেরিকায় এটি ছুটির দিন। বহুমাত্রিক আবেদনে সববয়েসীদের আনন্দদিবস। অবশ্য প্রতিবারের আনন্দ-উচ্ছাস সব বছরেই হয় না। ২০০১ সালে হয়নি ‘নাইন ইলেভেন’-এর ধ্বংসযজ্ঞের কারণে। আর ১৯৮৫ সালে শান্তিকন্যা সামান্থা স্মিথের মৃত্যুপতনে।
প্রতিবছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার ‘বিশ্ব শিশু দিবস’। শিশু-কিশোরদের সার্বিক কল্যাণে নিবেদিত। তাদের নিয়ে অবিভাবকদের মহানন্দের দিন। কিন্তু ১৯৮৫ সালে দিবসটি সারাবিশ্বেই ছিলো বেদনাঘন। কারণ, কিশোরী সামান্থা পৃথিবীকে চিরবিদায় জানিয়েছিলো।
পুরো নাম : সামান্থা রীড স্মিথ। একজন মার্কিন কিশোরী। পরিচিতি পেয়েছিলো সামান্থা স্মিথ নামে। জন্ম হল্টন, মেইনে ২৯ জুন, ১৯৭২। ঘটিয়েছিলো এক বিস্ময়কর ঘটনা! সালটি ছিলো ১৯৮২। তখন বড়ো দেশগুলোতে পারমাণবিক যুদ্ধের প্রস্তুতি। পোশাকি নাম : ‘কোল্ড ওয়ার’! হুমকির মুখে চলে যায় বিশ্বশান্তি। সে সময় সামান্থা একটি চিঠি লিখলো। লেখাটি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপ্রধান বরাবর। প্রেসিডেন্ট ইউরি আন্দ্রপভ তখন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান।
সম্মিলিত রাশিয়া ছিলো এক সুবিশাল দেশ। পারমাণবিক অস্ত্রের কারখানা বানিয়েছে। গবেষণা ও প্রস্তুতি চালাচ্ছে সমানে। ১০ বছর বয়েসী সামান্থা অনুরোধপত্র পাঠালো। সরাসরি প্রেসিডেন্ট আন্দ্রপভকে লিখলো হৃদয়ের দাবিনামাগুলো। পারমাণবিক যুদ্ধের প্রস্তুুতি বন্ধ করতে হবে। সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীকে সাজিয়েছেন বসবাসের জন্যে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা তা ধ্বংস করছে। তাই বোমামুক্ত বিশ্বের বিকাশ চাই। শান্তির পৃথিবী উপহার দিতে হবে আগামী দিনগুলোকে। আমরা বুড়ো পৃথিবীর নতুন প্রজন্ম। যুদ্ধ, নির্যাতন ও হয়রানিমুক্ত নতুন পৃথিবী চাই।
প্রেসিডেন্ট আন্দ্রপভ এ চিঠি পেয়ে চমকিত হলেন! ভীষণ ব্যস্ততা, তারপরও জবাব দিলেন। রাশিয়ায় আমন্ত্রণ জানালেন সামান্থাকে। এসে দেখতে বললেন যে, বাস্তবতা ভিন্ন। শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার দেশে অনেক ভালো কর্মসূচিও রয়েছে। বিষয়টি মার্কিন সরকারও গুরুত্বের সাথে নিলো। তারা সামান্থাকে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ঘোষণা করলো। এর পোশাকি নাম ‘গুডউইল অ্যাম্বাসেডর’। সামান্থাকে পাঠিয়ে দিলো রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে।
কিন্তু আন্দ্রপভের সাথে সাক্ষাত হয়নি সেই সমাজকন্যার। তবে রাজধানী মস্কোর মেয়র বিমান বন্দরে অভ্যর্থনা জানান। শান্তি প্রতিষ্ঠায় সামান্থার ভ্রমণ অবশ্য বেশ আলোড়ন তুলেছিলো। সোভিয়েত রাশিয়া তাকে ‘শান্তিকন্যা’ উপাধিতে সম্মানিত করে। বিশ্ববাসী তাকে ‘শান্তির দূত’ নামে ডাকতে থাকে। সামান্থাও দেশে ফিরে শুরু করে নিত্য-নতুন কাজ। লিখে ফেললো নতুন একটি বই। টিভিতে চালাতে থাকলো সিরিজ অনুষ্ঠান। ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’- জাতীয় ব্যাপক কর্মকান্ড। এই শ্লোগানের ওপর একটি ছবি তৈরি হচ্ছিলো। সামান্থা তাতে অভিনয় করছিলো মূল ভূমিকায়। কিন্তু শেষ অংকে পৌঁছাতে পারলো না! সেবার শ্যুটিং করতে যেতে হচ্ছিলো গ্রামে। বয়েস তখন আনলাকি ১৩-এর কোঠায়। বাবা আর্থার স্মিথসহ রওনা দিলো হেলিকপ্টারে। কিন্তু মাঝ পথেই রহস্যময় দুর্ঘটনা! বার হারবার এয়ার লাইনস-এর উড়ান। স্মৃতিময় ফ্লাইটটির নম্বর ১৮০৮। সাতজন আরোহীসহ পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়লো। সেই সাথে মৃত্যুকোলে ঢলে পড়লো শান্তিকন্যা সামান্থা! কালো সেই তারিখটি ছিলো ২৫ আগস্ট, ১৯৮৫। এরপর সারা বিশ্বেই তোলপাড়, শোকের মাতম! বিশ্বনেতারা নিবেদন করলেন অমিয় শোকবার্তা।
শোকের সে মাতম নিয়ে বাংলাদেশে অনেক লেখালেখি হয়। তারুণ্যের আলোড়নে আমিও নির্মাণ করি ভাবসহজ কবিতা। শিরোনাম: ‘সামান্থা স্মিথের জন্যে খোলা চিঠি’। ছাপা হয় দৈনিক সংবাদ-এ। পাঠকও ব্যাপকভাবে আলোড়িত হন। এ কবিতাটির জন্যে পেয়েছিলাম একাধিক সম্মাননা। জাতীয় যুব ইউনিয়ন ‘জাতীয় পদক’ তুলে দিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল টিএসসি বা ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তন। সেখানেই ১৯৮৫ সালে সমাদৃত হলাম। তৃতীয় জাতীয় সম্মেলন উদযাপিত হলেছিলো সাড়ম্বরে। যুব ইউনিয়ন নেতৃবর্গ ঘটা করে পুরস্কার তুলে দেন। সম্মাননা গ্রহণকালে দর্শকদের দাবি একটাই। সে মতে তুলে দিতে হলো স্বকণ্ঠ আবৃত্তি।
উল্লেখ্য, ঐ সময়ে যুব ইউনিয়ন অত্যন্ত সক্রিয় সংগঠন। সারা বাংলাদেশেই ছিলো প্রতিনিধিত্ব। যেন প্রগতিশীল যুব নেতাদের চাঁদেরহাট। সভাপতি হয়েছিলেন প্রকৌশলী আবুল কাশেম। সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন কবি বদিউজ্জামান নাসিম।
কবি নাসিম পরবর্তীতে আমেরিকার বস্টনে স্থায়ী বাসিন্দা হন। ‘ভিনগোলার্ধ’ নামের একটি সাহিত্য-প্রধান সংগঠনের কর্ণধার। বস্টনে ভারতীয় বাঙালিদের সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ‘লেখনী’। ২০১০-এ ‘ভিনগোলার্ধ-লেখনী’ গ্রহণ করে যৌথ-উদ্যোগ। আয়োজন করে ‘এপ্রিল পোয়েট্টি ফেস্টিভ্যাল’। তাতে অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম কবি ড. মাহবুব হাসানসহ। পদ্য দিয়ে কাব্য-উৎসবের উদ্বোধনও করেছিলাম। সেখানেও সামান্থা স্মিথ বিষয়ক কবিতাটির প্রসঙ্গ ওঠে। হার্ভার্ড-ম্যাসাচুয়েটস-বস্টন-কানেকটিকাট-এমআইটি’র ছাত্র-শিক্ষকে ভরা অনুষ্ঠান। সামান্থা স্মিথের শান্তি আন্দোলন নিয়ে দেখেছি ব্যাপক কৌতুহল।
আরেকটি অনুষ্ঠানে পেলাম বিস্ময়কর তথ্য। মেলে ধরলেন প্রখ্যাত অভিনেতা, আবৃত্তিশিল্পী পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১২-এর মধ্য এপ্রিলের ঘটনা। ঢাকার উত্তরায় এক আবাসিক মিলনায়তনে সংস্কৃতি উৎসব। উপলক্ষ পয়লা বোশেখ উদযাপন। বেশ কজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব উৎসবে সামিল। জাতিসংঘে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মি. ফণিভূষন। ‘সুন্দরবনের সম্রাট’-খ্যাত মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিন। সচিব ব্যক্তিত্ব উজ্জল বিকাশ দত্ত। সাবেক উপসচিব অধ্যাপক আরিফ উদ্দিন প্রমুখ। অনুষ্ঠানের আয়োজক মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব) শচীন কর্মকার। এক সময়ের নিউইয়র্ক প্রবাসী, কলামিস্ট।
সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের মূল কুশীলব দু’জন। সঙ্গীত পরিবেশনে কণ্ঠশিল্পী মনোরঞ্জন ঘোষাল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রবীণ কণ্ঠযোদ্ধা। আর স্বরচিত কবিতা পাঠে আমি, সালেম সুলেরী। অনুষ্ঠান আয়োজক এমনটিই ঘোষণা করলেন। আর সঞ্চালনার দায়িত্বে ডাকলেন সর্বপরিচিত পীষুষ বন্দোপাধ্যায়কে। সঙ্গে অভিনেত্রী-স্ত্রী জয়া বন্দোপাধ্যায়।
পীযূষ বন্দোপাধ্যায়ের সুকণ্ঠ ভূমিকাকথনে শুরুতেই আমার প্রসঙ্গ। উঠলো সামান্থা স্মিথ প্রসঙ্গও। তিনি নাটকীয় ভঙ্গিতে কিছু পুরনো স্মৃতি মেলে ধরলেন। বললেন, ১৯৮৫-৮৬ তে আমরা যুব ইউনিয়ন পুরষ্কার দিলাম। সালেম সুলেরী তখন ঢাকায় নবাগত। সাহিত্য-সাংবাদিকতায় নিবেদিত সজীব তরুণ। তার ‘সামান্থা স্মিথ’ কবিতাটি নির্বাচিত হলো। জাতীয় সম্মেলনে পুরষ্কারও তুলে দেওয়া হলো। আনুষ্ঠানিকতার শেষ অবশ্য সেখানেই ছিলো না। আরেকটি বিশেষ পুরষ্কার অপেক্ষায় ছিলো। যা তাকে আমরা সেবার দিতে পারিনি। সেটি হলো রাশিয়া সফরের ব্যবস্থা। সামান্থা স্মিথ যেভাবে রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়েছিলো, সেভাবেই। আমরা নামে নামে আমন্ত্রণপত্র এনেছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন পাইনি। তখন জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার ক্ষমতায়। আর তরুণ সালেম সুলেরী ছিলেন সরকারবিরোধী সাহিত্য আন্দোলনে।
সঞ্চালক পীযূষ বন্দোপাধ্যায় বললেন, তথ্যটি এতোদিন গোপন ছিলো। ২৫/২৬ বছর পর প্রকাশ করলাম। সামান্থা স্মিথকে ঘিরেও এমন অজানা তথ্য থাকতে পারে। বিশেষ করে রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাটি। অক্টোবরে বিশ্ব শিশু দিবস আর কলম্বাস ডে। এর আগে শান্তিকন্যা সামান্থার নির্মম দেহত্যাগ। তাও আবার একাকী মৃত্যু নয়। পুরো হেলিকপ্টারই একযোগে বিধ্বস্ত। অর্থাৎ নেপথ্যে কিছু থেকে থাকলে ধরার উপায় কম। তিনি বলেন, সামান্থা শুধু শান্তিকন্যা ছিলেন না। টিভি উপস্থাপিকা আবার লেখিকাও। বড়ো পর্দায় অভিনয়ও শুরু করেছিলেন। শান্তির স্বপক্ষে ছবির শ্যুটিং করতে গিয়ে প্রাণ হারালেন। তাকে কাব্যভাষায় জীবিত করে রেখেছে কবি সালেম সুলেরী। এখন এই কবি অ্যামেরিকারও অভিবাসী। সামান্থা স্মিথ-দের দেশের বাসিন্দা। হয়তো নতুন অনেককিছু আমরা তার লেখনী থেকে পাবো। সেই প্রত্যাশায় আজকে শুনবো কিছু কথা। শুনবো স্বলিখিত কয়েকটি কবিতাও। সালেম সুলেরীর একক কবিতা পাঠের পরই গান। মুক্তিযুদ্ধ ও বোশেখের মন-রাঙানো কবিতা-গান। কণ্ঠ-কারুকার্য দিয়েই মূলত আজকের সান্ধ্য-আয়োজন। প্রথমেই স্বাগত জানাচ্ছি কবি-কথাশিল্পী সালেম সুলেরীকে।
মানবাধিকার, বিশ্বশান্তিসহ যুক্তিহীন যুদ্ধের বিরুদ্ধে অনেক লিখেছি। এখনও লেখার ট্রেন ধাবমান, চলমান। তবে সামান্থা স্মিথ কবিতাটি বিশিষ্টতা পেয়েছে নানা কারণে। প্রধান বৈশিষ্ট কবিতাটির ভাষণ সহজ, সাবলীল। সব বয়েসের পাঠককে একযোগে আলোড়িত করতে পারে।
আরেকটি বিশাল বৈশিষ্ট্য- এই কফিন-কান্নার কবিতাটির। ‘সামান্থা স্মিথ’ কাব্যপাঠে গবেষকেরা তা উন্মোচন করেছেন। জানিয়েছেন, এটি বিশ্বলোকের একটি আবেগঘন সার্বজনীন পদাবলী। পাশাপাশি বাংলা ভাষার প্রথম পূর্ণাঙ্গ কিশোর গদ্যকবিতা। অক্ষরবৃত্ত নামের প্রচলিত ছন্দের কাঠামো রয়েছে। তবে সমিল ধারার অন্তঃমিল, প্রান্তমিল নেই। সুর করে পুঁথি জাতীয় পাঠের ব্যবস্থাও নেই। গদ্য কবিতা হলেও যথেষ্ট সমাদর পেয়েছে। আবৃত্তিকার বা বাচিক শিল্পীরাও অবহেলা করেননি। এই পদ্যটিকে বরং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। পৃথিবীর বহু মঞ্চে, অসংখ্য আয়োজনে পাঠিত হয়েছে। সংকলিত হয়েছে নানাবিধ প্রকাশনায়। কবিতাটি অনূদিত হয়েছে একাধিক ভাষায়। শান্তির সপক্ষে যুদ্ধবিরোধী আয়োজনে হয়ে চলেছে সমাদৃত।
দৈনিক ইত্তেফাকে নিবন্ধ লিখেছিলেন কবি-গবেষক ড. বিমল গুহ। আমার শান্তিবাদী কবিতাসমূহে ছিলো পুরো আলোকপাত। তাতে চলমান কবিতাটিও পেয়েছিলো গুরুত্ব। ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গে হলো সুবিশাল ‘হলদিয়া উৎসব’। সে এক বিশাল বপুর শিল্প-সংস্কৃতি মেলা। ১০ হাজার মহিলা শংখ বাজিয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে ‘পিকাসো মঞ্চে’ কবি-সমাবেশ। সেখানে স্ব-কণ্ঠে ‘সামান্থা স্মিথ’ পাঠ করেছি। সুনীলদা বলেছিলেন, যুদ্ধময় নয়, কাব্যময় হোক পৃথিবী। শান্তিময়তাই কবিদের আরাধ্য, প্রার্থনা। ঢাকায় কবি-বুদ্ধিজীবীরাও পোষণ করেন সহমত। বাংলা একাডেমি পদকপ্রাপ্ত কবি নাসির আহমেদও তা জানান দেন। সামান্থা স্মিথ স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন। কবিতাটিকে ‘অমূল্য স্মারক’ বলে আখ্যা দেন। খ্যাতিমান কবি-লেখক-গবেষকবৃন্দও মতামত দেন। বলেন, কবিতাটি যুদ্ধমুক্ত পৃথিবীর আকুলতায় ঋদ্ধ।
যদিও পৃথিবীতে যুদ্ধ চলছেই। হত্যাযজ্ঞের করুণ ক্রন্দন থামানো যায়নি। মিডিয়ায় রক্তমাখা লাশের ছবি থামছে না। সমুদ্রতীরে শিশু আয়নাল কুর্দির লাশ সে কথাই বলেছে। বার্মার রোহিঙ্গাজীবন ছুঁয়েছে ‘রোজ কিয়ামত’। শিশু ও নারীরা সর্বাধিক নির্যাতনের শিকার। অনেক ভূখন্ডেই যুদ্ধের মুখে পিতৃভূমি থেকে পলায়ন। অতঃপর অনিশ্চিতযাত্রা অথবা অকাল দেহাবসান। সর্বত্র শিশু-কিশোর-কিশোরীরাই অস্ত্রের শিকার। বিশ্বে আণবিক, পারমাণবিক, পাশবিক যুদ্ধ থামানোর আকুলতা সর্বাধিক। মার্কিন শান্তিকন্যা সামান্থার আবেদন যেন অটুট, অবিচল। চলমান প্রেক্ষাপটে যেন সতত নিহত গোলাপ। তারপরও, বিশ্বশান্তির জন্যে দিয়ে চলেছে নীরব তাগাদা। আমি প্রায়শ সেই ডাক শুনতে পাই। স্মৃতিতে সদা ভাস্বর সেই কন্যাশিশু, প্রতিবাদী প্রিয়মুখ। যার আকুলতাকে ছাপিয়ে গর্জন তুলেছে জঙ্গীবাদ, মৌলবাদ। যাদের বিরুদ্ধে সতত সংগ্রামী শ্লোগান : শান্তিবাদ, শৃঙ্খলাবাদ।
সামান্থা স্মিথ কোন বেদনার নাম নয়। একটি রক্তগোলাপের জন্ম- চেতনার নাম। একটি মন-জাগরণ আকুলতা উদ্দীপনা প্রান্ত-অভিধান। সেই সুদিন অনুসন্ধানেই আমার এই কাব্য-নিবেদন। হয়তো বেদনাহত, তবে আশাহত নয়। ♣♦♣

সামান্থা স্মিথের জন্যে খোলা চিঠি
সুপ্রিয় সামান্থা
তোমার সমীপে লেখা এই চিঠি জানি কোনোদিন
পৃথিবীর কোনো মেইল বা ডাকবিভাগ পৌঁছাতে পারবে না।
ঠিকানা বদল করে উড়তে উড়তে
তুমি আজ চলে গেছো বহুদূরে,
মাঝ আকাশে হঠাৎ কালো মেঘের টক্করে
ফেটে গেলে এক কিশোরী বেলুন।
সহিষ্ণু সামান্থা,
মৃত্যুর জন্যেই জন্ম আমাদের,
যেমন মাটিতে একবার ফিরে আসতেই হয়
উড়ন্ত দূরন্ত বিমানগুলোকে,
তোমার বিমানটিও ফিরে এসেছিলো
তবে তাতে শক্তি ছিলো না, বিধ্বস্ত বিকলাঙ্গ।
তোমার শরীরটিও ফিরে এসেছিলো
তবে তাতে প্রাণ ছিলো না, বিবর্ণ বাকশূন্য।
কৈশোরে, যখন শুধু হাসি-খুশির মিছিলসহ
ভাবনাবিহীন বয়েসের সড়কে হাঁটার কথা,
পেত্নী-ডাইনী ও ডাইনোসরের গল্প শুনতে শুনতে
শুনে ফেলো হিরোসিমা-নাগাসাকি পারমাণবিক বোমা,
তোমার বাদামী চোখ সুদূর ভবিষ্যতের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়,
কি দারুণ কৈশোর ক্রমশ নিদারুণ বারুদ-বাতাসে দোল খায়।
তোমার স্কুলটি একদিন সামরিক ঘাঁটি হবে,
তোমার বাগানে ফুল থাকবে না এবং কেউ এসে
হাতে গুঁজে দেবে একটি সচল আগ্নেয়াস্ত্র;
গির্জার ভেতর থেকে ফাদারের পাঠরত বাইবেল
আর্ত চিৎকারে হু হু কেঁদে উঠবে এবং
বুড়ো সমুদ্রের সাজে চলতে থাকবে লাশের মিছিল।
স্কী-ট্রাভেল- অর্থ বা রুলেত খেলার নিছক আবেদন নয়,
যুদ্ধ-লাশ-পারমাণবিক বোমা বন্ধ থাক আর
শান্তির মিছিল চেয়ে লিখলে একটি চিঠি,
আমরা বিস্ময়ে তাকালাম সামান্থা তোমার দিকে-
এইবার, বুঝি এইবার পৃথিবীর রাষ্ট্রনায়কেরা
তাবৎ অস্ত্রচুক্তির কাগুজে দলিলগুলো ছিঁড়ে ফুঁড়ে
সেই চিঠির জবাবে তোমাকে বানিয়ে দেবে
একটি শান্তির ফুল, সম্প্রীতি সম্ভার।
এক রোববারে
তুমি উঠেছিলে প্লেনে মুক্ত আকাশ দেখতে,
শান্তির সপক্ষে ছোটা ছায়াছবির কান্তি-কিশোরী নায়িকা,
কপালের চুল সরিয়ে তাকালে পৃথিবীর দিকে,
বোমামুক্তময় তোমার কাঙ্খিত সবুজ সাম্রাজ্য কতো রূপময়।
আগামীকালের আঙিনা ঐ ডাকছে দু’হাতে এসো,
ভাষাহীন ভালোবাসা তোমাকে দেখালো স্বপ্ন-
তুমিই শান্তির দূত…
কিন্তু কালো মেঘ, সঘন সফেন রহস্যের ভূত,
হঠাৎ মেঘের ঘনঘটা যুদ্ধের আদলে হানলো আঘাত!
সুপ্রাণ সামান্থা,
প্রশান্তির প্রিয় পাখি
রক্তাক্ত দেহটি রেখে চলে গেলে মৃত অভিমানে…
সেই ভালো, স্বপ্নরা স্বপ্নই থেকে গেলো
এখানে এমন কোনো শক্তি-সহিস দেখি না
তোমাকে প্রশান্তি এনে দেবে।
তবুও আশায় বুনি জাল
সুখমৃত্যুপ্রত্যাশায় বেঁচে আছি অসংখ্য আমরা।
তোমার শবের পাশে আজ আহাজারি, ক্ষোভের মিছিল
কালো অক্ষরে তোমার জন্যে লেখা এই চিঠি
জানি কোনোদিন
পৃথিবীর কোনো মেইল বা ডাকবিভাগ পৌঁছাতে পারবে না।
তাই আজ এই খোলা চিঠি
বিশ্বমানবতার বিশাল ডাকবাক্সে পোস্ট করলাম।
সুপ্রিয় সামান্থা, সুগর্ব সুকন্যা-
তোমার সফেদ সংযান শবমিছিলের পথ আজ
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর।
এতো মৌলবাদ, জঙ্গীবাদ আতংকবাদের পাশে
শান্তিবাদ, শৃঙ্খলাবাদের মূর্চ্ছা-শোক,
তবুওতো বারবারের বদলে প্রতিদিন ভোরে ভোরে
একবার দেখি- তোমার প্রশান্ত মুখ, শান্তিকন্যাসম
আলোছায়া-সূর্যালোক, সুকৃতির সুগর্ব দু’চোখ।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Digg thisShare on Tumblr0Email this to someonePin on Pinterest0Print this page

comments

Bangla Converter | Career | About Us