ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৭ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড

ঢাকা রবিবার, ৬ শ্রাবণ, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ১৭ জিলক্বদ, ১৪৪০

জীবনযাপন, রংপুর যুদ্ধের সেই যোদ্ধা মজনু মিয়ার বসবাস গুচ্ছগ্রামে!

যুদ্ধের সেই যোদ্ধা মজনু মিয়ার বসবাস গুচ্ছগ্রামে!

তোফায়েল হোসেন জাকির, নিরাপদ নিউজ :  জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করলেও, সেই যোদ্ধা মজনু মিয়া এখন গুচ্ছগ্রামে বসবাস করে আসছে। ৭১’এ মজনু মিয়া ছিলেন টগবগে একজন যুবক। সেই সময় দেশটা ছিল উত্তাল, বাংলাকে নিজের রূপে রূপ দেওয়ার নেশায় কাপছিল পুরো দেশ। পাকিস্থানীদের শোষণ আর ব্যবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন এদেশের আপামর জনগণ। ঠিক তখনই মজনু মিয়া জীবনে মায় ত্যাগ করে দেশকে রক্ষার্থে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীকার আদায়ের জন্য। তার অদম্য সাহস আর দেশপ্রেম তাকেও নিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে।

গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের জয়েনপুর গ্রামের মৃত খবির উদ্দিনের ছেলে মজনু মিয়া। তার বয়স এখন প্রায় ৬৪ বছর। বসতভিটা হারিয়ে বর্তমানে তিনি জয়েনপুরস্থ একটি গুচ্ছগ্রামে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর বসবাস করে আসছেন।

যুদ্ধকালীন ১১নং সেক্টরে মজনু মিয়ার সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন-আবেদ আলী, সুলতান গিয়াস ও আলতাফ হোসেন। এই মহাবীরের এমন অনেক সফল সাহসী অভিযান হয়েছিল মুক্তি যুদ্ধকালীন সময়ে। দেশ হয়েছিল স্বাধীন। জনগণ পেয়েছে স্বাধীনতার সুখ। এক্ষেত্রে তৎকালীন সময়ের অধিনায়ক মহম্মদ আতাউল গনি ওসমানী স্বাক্ষরীত দেশ স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র প্রাপ্ত হয় মজনু মিয়া। যার সনদ নম্বর ১৬৫৮৮৫। অতি দুঃখের বিষয় যে, মজনু মিয়া দেশ স্বাধীনতার সংগ্রামের সনদ পেলেও, অদ্যবদিও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি।

সেই সময়ে জীবন বাজী রেখে দেশ স্বাধীন করলেও, জীবন যুদ্ধে তিনি আজ পরাজিত সৈনিক। মজনু মিয়ার জায়গা জমি না থাকায় বর্তমানে তিনি সাদুল্লাপুর উপজেলার জয়েনপুরস্থ গুচ্ছগ্রামে ১১ বছর ধরে মানবেতর জীবনে বসবাস করে আসছেন। দেশ স্বাধীনের ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও কোন সরকারি সুযোগ-সুবিধা কিংবা মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাননি বলে তার অভিযোগ।

তিনি জানান, ভারতের কাকড়ীপাড়া প্রশিক্ষণ শিবিরের আজিম মাহবুর এর নিকট প্রশিক্ষণ গ্রহন করে নিজ জেলা গাইবান্ধার কামারজানি, কঞ্চিবাড়ী ও দক্ষিণ দূর্গাপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় ক্যাপ্টেন হামিদ উল্লার নেতৃত্বে ওইসব এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন মজনু মিয়া। তার অধিনায়ক ছিলেন আব্দুল হামিদ পালোয়ান।

এর পর ওই যুদ্ধে সফল ভাবে অংশ গ্রহন করার ফলে মজনু মিয়াকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন- বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গাইবান্ধা জেলা ইউনিটিরে সাবেক কমান্ডার নাজমুল আরেফিন তারেক, সাদুল্লাপুর উপজেলা ইউনিটের কমান্ডার মেছের উদ্দিন সরকার ও ইউপি চেয়ারম্যান শাহীন সরকার।

সেই যুদ্ধে অংশ গ্রহনকারী মজনু মিয়া যুদ্ধের সকল প্রমানপত্রাদি দিয়ে গেজেটধারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে গত বছরে অনলাইন আবেদন করাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আবেদন করেন। এরই প্রেক্ষিতে সাদুল্লাপুর উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক মজনু মিয়াকে বাতিল করে “গ” তালিকা ভুক্ত করেন। ওই কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, মজনু মিয়ার সংগ্রামী সনদপত্র থাকলেও, ক্রমিক নম্বর নেই। এ কারণে তাকে বাতিল করা হয়েছে। অথচ ওই সনদপত্রের অপর পৃষ্ঠায় ক্রমিক নম্বর ছিল। যার নম্বর ১৬৫৮৮৫। তবুও মজনু মিয়াকে বাতিল করেছেন যাচাই-বাছাই কমিটি। বাধ্য হয়ে মজনু মিয়া জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আপীল আবেদন করেন।

যার আবেদন নম্বর ২২০০৮। তিনি আপীল আবেদন করলেও অদ্যবধিও কোনো ফলশ্রুতি পায়নি। এরপর মাস দুয়েক আগে মজনু মিয়ার সনদের ক্রমিক নং ১৬৫৮৮৫ অর্ন্তভূক্তির জন্য ৩১, গাইবান্ধা-৩ আসনের সাংসদ ডা. ইউনুস আলী সরকার সাদুল্লাপুর ইউএনও’র নিকট ডিও লেটার দেন। ইউএনও রহিমা খাতুন ওই ক্রমিক নম্বর যাচাইয়ের জন্য সাদুল্লাপুর উপজেলা সমাজসেবা অফিসারকে দায়িত্ব দেয়। এর ফলে মজনু মিয়ার যুদ্ধকালীন যাবতীয় কাগজপত্রাদি যাচাই-বাছাইকালে ক্রমিক নং ১৬৫৮৮৫ খুঁজে পায়। যার ফলে উল্লেখিতে ক্রমিক নম্বরটি অর্ন্তভূক্তকরণে ইউএনও রহিমা খাতুনকে একটি প্রতিবেদন ২৭ নভেম্বর/১৮ইং দাখিল করেছেন সমাজসেবা অফিসার মানিক চন্দ্র রায়। যার ডকেট নং ৭২৪ তারিখ ১৬/০৮/১৮ইং এবং স্মারক নং ৪১.০১.৩২৮২.০০০.০১১.০০১.১৮.২৩৯।

বর্তমানে এই মহা যোদ্ধা মজনু মিয়া স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গুচ্ছগ্রামে অসহায় জীবন জাপন করে আসছেন। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া মজনু মিয়া পেটের তাগিদে স্ত্রী লাইলী বেগমকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে শ্রম বিক্রি করে কোনমতে দিনাতিপাত করছেন। যেন থমকে গেছে তার জীবন। মজনু মিয়া দেশ স্বাধীন করে শুধুই পেয়েছে একটি সাটিফিকেট। এটাই এখন স্মৃতি হয়ে আছে! শেষ বয়সে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়ে মৃত্যুবরণ করতে চান, এটাই এখন মজনু মিয়ার আঁকুতি।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)