ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৫ মিনিট ২৪ সেকেন্ড

ঢাকা সোমবার, ৭ শ্রাবণ, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ১৮ জিলক্বদ, ১৪৪০

ফিচার রাজধানী শহর ফতেপুর সিক্রির ভাগ্যবিড়ম্বিত নর্তকী জরিনার গল্প

রাজধানী শহর ফতেপুর সিক্রির ভাগ্যবিড়ম্বিত নর্তকী জরিনার গল্প

শফিক আহমেদ সাজীব,নিরাপদ নিউজ:  ভারতের আগ্রা থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে সম্রাট আকবরের একসময়ের রাজধানী শহর ফতেপুর সিক্রি। সেখানে আকবর গড়ে তোলেন এক অনুপম নগরী। ছয় মাইল দীর্ঘ এক পাহাড়চূড়ায় তৈরি হয়েছিল ফতেপুর সিক্রি। অনুপম ভাস্কর্যমণ্ডিত বুলন্দ দরওয়াজা দিয়ে প্রবেশ করলে সামনেই জামে মসজিদ। মসজিদ চত্বরের মাঝে মুসলমান ফকির শেখ সেলিম চিস্তির সমাধির ওপর শ্বেতপাথরের তৈরি অপরূপ কারুকার্যময় দরগা। ফতেপুর সিক্রির উত্তর দিকের মহলটি সম্রাট আকবরের ইবাদতখানা। এখানেই আকবর বিভিন্ন ধর্মের বোদ্ধাদের ধর্মবিষয়ক আলোচনার জন্য ডাকতেন। যেখান থেকেই আসে দীন-ই-ইলাহির ধর্মচিন্তা। ‘অনুপ তালাও’ জলবেষ্টিত এই জায়গায় বীণা বাজাতেন তানসেন। ‘বুলন্দ দরওয়াজা’এখান দিয়ে ফতেপুর সিক্রি থেকে বের হওয়া যায়। ১৫৫৭ সালে গুজরাট জয়ের প্রতীক এই বুলন্দ দরওয়াজা।

বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী হিসেবে ধরা হয় ফতেপুর সিক্রিকে। সারা বছর ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো পর্যটক যেমন আসেন, তেমনি বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে এখানে। অটোমোবাইল অ্যসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার আমন্ত্রণে ট্রাফিক আইন নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ আয়োজিত সেফ ড্রাইভ সেফ লাইফ শীর্ষক সেমিনার ও দিল্লিতে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণ এবং কলকাতা ও দিল্লির দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শনে আসা ১১দেশের ১১২জন প্রতিনিধিদের মধ্যে আমিও ছিলাম। ভারতের আগ্রার সম্রাট আকবরের একসময়ের রাজধানী শহর ফতেপুর সিক্রির অপূর্ব এই দূর্গের গল্প শুনেছি অনেক।

অনেকে বলেন বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী হিসেবে ধরা হয় ফতেপুর সিক্রিকে। একবার ফতেপুর সিক্রি দেখলে আর ভালো লাগে না কোন কিছুই। মনের মাঝে অদম্য কৌতুহল। অটোমোবাইল অ্যসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার আহবানে বাংলাদেশ থেকে পরিবহন শ্রমিক নেতা আনোয়ার হোসেনসহ ভারত ভ্রমণে যায় আমি। ফতেপুর সিক্রি ভ্রমণ ছিল আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের ভ্রমন গাইড অমল কুমার থেকে বিস্তারিত জানার চেষ্টা এবং ইন্টারনেটের সহযোগিতার মাধ্যমে রাজধানী শহর ফতেপুর সিক্রির ভাগ্যবিড়ম্বিত নর্তকী জরিনার গল্প আপনাদের শুনাতে চেষ্টা করছি। অমল কুমার বলেন আমি তেমন বিস্তারিত জানিনা। তবে অনেক গল্প শুনেছি। আমি যেটুকু জানি আপনাদের বিস্তারিত বলছি শুনুন। আগ্রার দক্ষিণ-পশ্চিমে ১৫৬৯ সালে আকবর এখানেই তাঁর রাজধানী স্থানান্তরিত করেছিলেন। সম্ভবত জলাভাবের কারনে বছর পনেরো বাদে এই নতুন রাজধানী পরিত্যক্ত হয়। জনশ্রুতি এই যে সন্তানহীন আকবর ফতেপুরের ফকির সেলিম চিস্তির শরণাপন্ন হয়ে পুত্রসন্তান লাভ করেন। ফকিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ফতেপুরের শৈল্যশিখরে হিন্দু ও মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর সমম্বয়ে গড়ে তোলেন দুর্গ ও একাধিক প্রাসাদ। আকবরের গুজরাত বিজয়ের স্মৃতিতে ১৫৭৫ সালের এপ্রিলে সমাপ্ত হয় ১৭৬ ফুট (৫৪ মিটার) উঁচু এশিয়ার উচ্চতম প্রবেশদ্বার ‘বুলন্দ দরওয়াজা’। ফতেপুর সিক্রি নিয়ে একটা গল্প প্রচলিত আছে। ধারনা করা হয় নর্তকী জরিনার জন্যই ফতেপুর সিক্রি ধ্বংস হয়। সম্রাট আকবরের প্রাসাদে নাচার স্বপ্ন ছিল নর্তকী জরিনার। একদিন সেই সুযোগও পেল জরিনা। আকবরের প্রাসাদে নাচলো সে। আকবর খুশি হয়ে তাকে প্রাসাদেই রেখে দিলেন।

সম্রাটের প্রিয় হয়ে উঠায় রানির দাসী মাধবীর হিংসার কারণ হলো জরিনা। এরপরই ধ্বংস হয় ফতেহপুর সিক্রি। সম্রাট আকবরের ছেলে সন্তান ছিলনা। তিনি দরবেশ সেলিম চিশতির দরবারে গিয়ে ছেলে সন্তান চাইলেন। সেলিম চিশতি সম্রাট আকবরকে বললেন, খুব শিগগিরই তিনি ছেলে সন্তানের বাবা হবেন। একবছর পর রানির কোলজুড়ে আসলো ছেলে সন্তান। আকবর তার নাম রাখলেন সেলিম। আকবর খুব খুশি হলেন। তিনি দরবেশ চিশতিকে সম্মান জানিয়ে একটি শহর গড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৫৬৯ সালে আকবর সিক্রি নামে এক গ্রামের কাছে সুন্দর সুরক্ষিত একটি শহর বানালেন। তার নাম দিলেন ফতেহপুর সিক্রি। শহরটি আগ্রা থেকে খুব দূরে ছিল না। ফতেহপুর সিক্রি এখনো আছে। গ্রামের কাছে সম্রাটের শহর হওয়ায় সিক্রির লোকেরা খুব খুশি হলেন। আকবরের সব রানির জন্য শহরের ভেতর আলাদা প্রাসাদ ছিল। সেসব প্রাসাদে কাজের জন্য সিক্রি গ্রাম থেকে অনেক মানুষ ফতেহপুর শহরে যেতেন। সিক্রিতে জরিনা নামে এক নর্তকী ছিল। তার স্বপ্ন ছিল বান্ধবীদের মত প্রাসাদে কাজ করবে। কিন্তু তার বাবা রাজি ছিলেন না। একদিন সম্রাট আকবর তার কাছে অতিথিদের জন্য এক অনুষ্ঠান আয়োজন করলেন। তিনি গায়ক তানসেনকে ডাকলেন সেই অনুষ্ঠানে গান গাইতে। সম্রাট তানসেনকে বললেন, আপনার গানের সঙ্গে সেখানে কাউকে নাচতে হবে। তানসেন বললেন, আচ্ছা। আমি চেষ্টা করব নর্তকী রাখতে, কিন্তু আমি এখানে কোন নর্তকীকে চিনি না। দাসীদের মধ্য থেকে কেউ একজন সম্রাট আর তানসেনের এ আলাপ শুনেছিলেন। সম্রাট চলে গেলে সেই দাসী তানসেনকে জরিনার কথা বললেন। পরামর্শ দিলেন তানসেন যেন জরিনাকে নাচার প্রস্তাব দেন। তানসেনের মত বিখ্যাত গায়ক জরিনাকে সম্রাট আকবরের জন্য নাচার প্রস্তাব দিলে জরিনার বাবা আর না করতে পারলেন না।

জরিনা ফতেহপুর শহরে যাওয়ার আগে বাবার কাছে থেকে বিদায় নেয়। বাবা জরিনাকে পরামর্শ দিলেন, একটা ব্যাপার মাথায় রাখবে, যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে বিপদও আছে। সাবধানে থাকবে, আর মনে রাখবে তোমার জন্য আমি সবসময়ই আছি। জরিনা প্রাসাদে গিয়ে আকবর ও তার সভাসদদের সামনে সারারাত নাচলো। জরিনার কাছে এটা ছিল স্বপ্ন সত্যি হওয়ার ব্যাপার। সম্রাট জরিনাকে পছন্দ করলেন। তিনি জরিনাকে প্রাসাদে রেখে দিলেন। প্রয়োজন হলেই সম্রাট তাকে ডাকেন। প্রাসাদের সবাই জরিনাকে পছন্দ করলেন। কিন্তু রানি যোধা বাঈয়ের দাসী মাধবী জরিনাকে পছন্দ করল না। সম্রাটের কাছ থেকে জরিনা বেশি মনোযোগ পাওয়ার কারণে মাধবী জরিনার প্রতি ঈর্ষাকাতর ছিল। জরিনাকে সম্রাটের চোখে অপরাধী বানাতে চাইল সে। রানি যোধা বাঈ গোসল করছিলেন। ওই সময় মাধবী তার গয়নার বাক্স থেকে একটি সোনার বালা চুরি করে জরিনার জিনিসপত্রের মধ্যে লুকিয়ে রাখল। যোধা বাঈ যখন দেখল যে তার একটি বালা নেই তখন তিনি মারাত্মক রাগান্বিত হলেন। পুরো প্রাসাদ তল্লাশির নির্দেশ দিলেন। মাধবী তখন রানি যোধা বাঈকে বলল, আমি জরিনার ঘরে সেই বালাটি দেখেছি। বালাটি যখন জরিনার ঘরে পাওয়া গেল। যোধা বাঈ তখন রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি সম্রাট আকবরের কাছে গেলেন। সম্রাট আকবরের কাছে গিয়ে যোধা বাঈ কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আপনার আদরের নর্তকী একটা চোর। এ ব্যাপারে আপনি কী করবেন? জরিনা আকবরের সামনে কাঁদতে কাঁদতে বললো, হুজুর, আমি বালা চুরি করিনি।

আমি নাচার সময়ে এর চেয়ে সুন্দর বালা পরি, আমি কেন বালা চুরি করব। এর জবাবে রানি যোধা বাঈ বললেন, তুমি বলতে চাও আমার গয়না সুন্দর না? সম্রাট আকবর তখন বললেন, তোমার ঘরে বালা কিভাবে পাওয়া গেল সেই ব্যাখ্যা কি তুমি দিতে পারবে? স্বাভাবিকভাবেই জরিনার তখন বলার কিছু ছিল না। সে জানত না বালা কিভাবে তার ঘরে গেল। সম্রাট খুব দুঃখের সঙ্গে মাথা নেড়ে বললেন, প্রমাণ যেহেতু দেখাই যাচ্ছে, চুরি করার শাস্তি তুমি জানো। জরিনা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তখন চুরির শাস্তি হিসেবে চোরের হাত কেটে দেওয়া হত। জরিনা তখন বলল, কিন্তু হুজুর, আমি একজন নর্তকী। আমার হাত কেটে ফেললে আমি নাচব কিভাবে? আর তাছাড়া আমি চুরি করিনি। সম্রাট আকবর চিৎকার করে উঠলেন, চুপ সবাই। আগামীকাল সকালে তোমাকে শাস্তি দেওয়াই হবে প্রথম কাজ। সম্রাট আকবর এরপর দরবার ত্যাগ করলেন। তিনি রাগে ও দুঃখে হতাশ হয়ে পড়লেন। তার কাছে জরিনাকে খুবই ভাল একটি মেয়ে মনে হয়েছিল। আর মাধবী চুপ করে সব দেখছিল ও খুশি হয়েছিল। জরিনা সারাদিন কাঁদলেন। রাতে জরিনা অন্যান্য দিনের মতই সম্রাটের সামনে নাচলেন। কিন্তু এটা আনন্দের নাচ ছিল না, এটা ছিল খুবই ধীরগতির দুঃখের একটি নাচ। আকবরের সভাসদদের কেউই এত সুন্দর নাচ জীবনে দেখে নি। তার নাচ আর দেখতে পারবেন না ভেবে আকবরও খুব দুঃখ পেলেন। পরের দিন সকালে আকবর তার সকল সভাসদদের ডাকলেন। তিনি একজন রক্ষীকে পাঠালেন জরিনাকে নিয়ে আসার জন্য। সারা প্রাসাদ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই রক্ষী কোথাও জরিনাকে পেল না। সে এসে সম্রাটকে এ কথা জানালো।

সম্রাট আকবর জিজ্ঞাসা করলেন, কেউ কি জরিনাকে দেখেছে? সভায় উপস্থিত সবাই একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। তখন সভায় এক বৃদ্ধ লোক প্রবেশ করলেন। সিংহাসনে বসা সম্রাট আকবরের সামনে গিয়ে তিনি বললেন, হুজুর, কোন প্রমাণ ছাড়াই জরিনাকে অভিযুক্ত করে আপনি ভুল করেছেন। আকবর জরিনার বাবাকে চিনতে পারলেন। তিনি বললেন, জরিনা কোথায় আমাকে বলুন, আমি দেখব তার সঙ্গে যেন ন্যায় বিচার ঘটে। জরিনার বাবা মাথা নেড়ে বললেন, অনেক দেরি করে ফেলেছেন। আর কিছুই করা যাবে না। আপনি আমার মেয়ের জীবনে অনেক দুঃখ এনে দিয়েছেন, আর ফতেহপুর সিক্রি অবশ্যই এ বেঈমানির শাস্তি পাবে। বৃদ্ধ লোকটির কথার অর্থ কী, আকবর জিজ্ঞাসা করার আগেই লোকটি ভিড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। দুই সপ্তাহ পরে ফতেহপুর সিক্রির কুয়াগুলো শুকিয়ে গেল। সম্রাটের উট ও ঘোড়ার এবং মানুষের জন্য কোন পানি কুয়াগুলোতে অবশিষ্ট ছিল না। সম্রাট আকবর তার স্ত্রীদের ও সন্তানদের নিয়ে আগ্রার দুর্গে গিয়ে উঠলেন। তারা আর কখনোই ফতেহপুরে ফিরে আসেননি। সিক্রি গ্রামে এই গল্প এখনো প্রচলিত আছে। গ্রামের কেউ কেউ বলে যে পূর্নিমা রাতে ফতেহপুর সিক্রির প্রধান ফটক, বুলন্দ দরজাতে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তারা বলে যে এটা আসলে মাধবী, সে জরিনার জন্য অপেক্ষা করে যাতে তার কাছে ক্ষমা চাইতে পারে।

লেখক : শফিক আহমেদ সাজীব, সাধারণ সম্পাদক, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)