ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৪ মিনিট ১২ সেকেন্ড

ঢাকা বুধবার, ১২ আষাঢ়, ১৪২৬ , বর্ষাকাল, ২২ শাওয়াল, ১৪৪০

উপসম্পাদকীয় লংকায় লংকাকান্ড হবে ভাবা যায়নি

লংকায় লংকাকান্ড হবে ভাবা যায়নি

উপসম্পাদকীয়

আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ ,নিরাপদ নিউজ : ‘লংকায় লংকাকা-‘ এই শ্রেণির একটি বাগধারা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকলেও সাম্প্রতিককালের বেশির ভাগ মানুষই এটা মনে রাখেননি। মানুষ সব স্মৃতি, সব কথা মনে না রাখলেও মাঝে মাঝে লংকাকান্ড শুধু লংকাতেই নয়, অনেক জায়গার লংকাকান্ডই মানুষকে গভীরভাবে চিন্তিত করে তুলেছে। বিশেষ করে মিয়ানমারে ধর্মীয় উগ্রতা যেভাবে মানুষের সব অধিকার ও মানবতাবোধকে ভূলুন্ঠিত করে জেনোসাইড চিত্রের অবতারণা করেছে। তা অতিক্রান্ত হতে না হতেই শ্রীলংকায় হ্রস্ব আকারে যে ধর্মান্ধতার ঘটনা ঘটেছে, তাতে মানুষের চিন্তিত হওয়ারই কথা।

মিয়ানমারের পর মার্চ মাসে শ্রীলংকার ধর্মীয় উগ্রতার ঘটনা ঘটেছে তার সঙ্গে একটা মিল আছে। উভয় দেশেরই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যালঘু ইসলাম ধর্মের মানুষের ওপর আঘাত করেছে। শ্রীলংকায় সাম্প্রতিকালের ঘটনার অল্প সময় আগেই সেখানকার বৌদ্ধদের মধ্যে উগ্রতা লক্ষ করা গিয়েছিল, কিন্তু তখন কোনো অঘটন ঘটেনি। কিন্তু অতিসম্প্রতি শ্রীলংকার কান্ডিতে একশ্রেণির বৌদ্ধদের উগ্রতা আর নিবৃত করা যায়নি। সেখানকার একশ্রেণির মানুষ মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করে বাড়ি-ঘর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নষ্ট করে দিয়েছে।

অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে, তবে মৃত্যুর হার নগণ্যই। এই ঘটনার পর শ্রীলংকা সরকার দ্রত ঘটনা নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে এসে সারাদেশে ইমার্জেন্সি ঘোষণা করেছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে অনেক বৌদ্ধও রাস্তায় নেমে এসেছেন। এমনকি অনেকে শুক্রবার মসজিদে গিয়ে মুসলমানদের সঙ্গে একাত্মতা জানাতেও ভুল করেননি। পুলিশ ধর্মান্ধ-বৌদ্ধদের একশ ছেচলিস্নজ জনকে গ্রেপ্তারও করেছেন। কান্ডির এই ঘটনার নায়ক হলেন উগ্রবাদী মুসলিম বিরোধী অমিত ওয়েরাসিংহে। অমিত সাধারণভাবে উগ্রবাদী হিসাবে পরিচিত। মিয়ানমারের ঘটনাই তাকে সাম্প্রদায়িকতার পথে অগ্রসর করেছে বলে মনে করলে ভুল হবে না। তবে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে উগ্র বৌদ্ধরা অগ্রসর হলে শ্রীলংকার বেশি ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা।

তার কারণ, কান্ডি বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় শহর। শ্রীলংকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভাব হলে এখানে পর্যটকদের সংখ্যা শুধু হ্রাসই পাবে না, অর্থনৈতিক ও রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। শ্রীলংকায় দীর্ঘদিন তামিলদের বিরুদ্ধে শ্রীলংকান বাহিনীকে যুদ্ধ করার কারণে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। বর্তমানে শ্রীলংকায় সাধারণ মানুষের আয় ও বেতন আগের তুলনায় অনেক হ্রাস পেয়েছে। শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রেও অনেক বিঘ্নের কারণে শিক্ষার হারও খানিকটা হ্রাস পেয়েছে। তা ছাড়া, তামিলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে অসংখ্য তামিলদের হত্যা করার কারণে তামিলদের মধ্যে সে ক্ষত শুকিয়েছে বলে মনে করার কারণ নেই।

এই অবস্থায় সংখ্যাগুরু বৌদ্ধরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলে সেখানে নতুন করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তা ছাড়া, তামিলদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় শ্রীলংকার মুসলিম সম্প্রদায় শ্রীলংকার সরকারের পাশে এসেই দাঁড়িয়েছিল। শ্রীলংকায় সাম্প্রতিক সম্প্রীতির অভাব দেখা দিলে তামিলরা যে নতুন করে সুযোগ নিয়ে যুদ্ধে অগ্রসর হবে না, তা বলার উপায় নেই বলে মনে করার কারণ অনুপস্থিত। শ্রীলংকার মানুষের ভদ্রতা, কোমল স্বভাব, সততা, বন্ধুপ্রীতি, আতিথেয়তা সবার কাছে তাদের একটা বিশেষ ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা একাধিক প্রশ্ন মানুষের মনে জন্ম হয়েছে। তাহলে কি ধর্মীয় সহাবস্থান সম্ভব হবে না?

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রতি বৌদ্ধদের নৃশংসতা, শ্রীলংকায় একই ধর্মাবলম্বীদের (বৌদ্ধ) মধ্যে বিভেদের ঘণ্টাধ্বনি, থাইল্যান্ডেও একই অবস্থা, এই অবস্থা প্রসারিত হয়েছে ফিলিপিনস পর্যন্ত। ধর্মীয় বিভেদ আগে সৃষ্টি হয়েছিল হিন্দু ও মুসলমাদের মধ্যে, বর্তমানে তা মোড় পরিবর্তন করেছে বৌদ্ধ ও মুসলমানদের মধ্যে। কিন্তু পৃথিবীতে অশান্ত্মি শুধু বিপরীত দুটো ধর্মের মধ্যেই ঘটেনি, ঘটেছে এবং বর্তমানে ঘটতে শুরম্ন করেছে সমধর্মীদের মধ্যেও। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুুলোর দিকে তাকালে এই দিকটা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়। আফগানিস্তান থেকে শুরু করে ইরাক, লিবিয়া, সৌদি আরব, সিরিয়া সর্বত্রই সমধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিরোধ।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ক্রিশ্চান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে। এই চিত্র একটি দিক স্পষ্ট করে যে, মানবিক সংঘাত শুধু দুটো বিরোধী ধর্মীয় মানুষের মধ্যেই সংঘটিত হয় না, সমধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও অনুষ্ঠিত হতে পারে। কারণ দ্বিবিধ, সমধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিরোধ অনুষ্ঠিত হয় সাম্রাজ্যবাদ ও অসাম্রাজ্যবাদের মধ্যে আদর্শিক বিরোধের কারণে। অন্য একটি দিকেও আদর্শবাদের বিরোধ আছে- কমিউনিজম ও অকমিউনিজমের মধ্যে। তবে এই বিরোধ মারাত্মকভাবে প্রসারিত হতে পারেনি সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে পূর্ব ইয়োরোপের কয়েকটি দেশ দখল ও প্রভাব বিস্ত্মার ছাড়া। অন্যদিকে ক্রিশ্চানদের বিশ্বযুদ্ধের ঘটনার মতো মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কারণ অধিকার প্রতিষ্ঠা বা সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের মনোভাব থেকে। এছাড়াও আরও দুটি ধর্মীয় বিভেদ দেখা গেছে ইসলাম ও জুডাইজমের মধ্যে এবং ক্রিশ্চান ও মুসলমানের মধ্যে বসনিয়া-হার্জেগোভিনায়।
একশ্রেণির মানুষ মনে করেন ধর্মীয় অনৈক্যের কারণে, সংঘাত বৃদ্ধির কারণে সমাজে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিভেদ দূর করে মানবিকতাপ্রধান সমাজ গঠনের মাধ্যমে ঐক্য আনা সম্ভব। কিন্তু পৃথিবীর সংখ্যাগুরু মানুষ এই দিকটি সমর্থন করবে না, কারণ র্ধর্ম তাদের জীবনে ও সমাজে যে আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছে, তাকে দূরে সরিয়ে রাখা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। অন্যদিকে, অসংখ্য মানুষ বিশ্বাস করেন যে, কোরআন শরিফে ইঙ্গিত করা হয়েছে একদিন শেষ নবী পৃথিবীতে একটি ধর্ম প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করে মানবসমাজে সার্বিক বিভেদ দূর করতে সক্ষম হবেন।

ভবিষ্যতের পরিবর্তন পৃথিবীতে নতুন দিক সূচনায় সক্ষম হতে পারে মেনে নিয়ে শ্রীলংকার সাম্প্রদায়িক সংঘাত থেকে অনেকগুলো দিক আবিষ্কার করা সম্ভব, যেগুলো মানুষের বর্তমান জীবনে কম গুরুত্বের অধিকারী নয়। শ্রীলংকার অনেকেই সাম্প্রতিককালে মুসলিম নাগরিকদের জন্মসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে তাদের প্রাধান্য ঘটতে পারে বলে খানিকটা চিন্তা করতে থাকেন। দ্বিতীয় একটি দিক হলো মুসলমানদের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে দরিদ্র সিংহলী ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে নিজেদের প্রসারে বিঘ্ন হয় বলে মনে করতে শুরু করেছেন। সিংহলী রাজনীতিবিদদের একটা অংশের ধারণা হতে থাকে যে, তামিলরা বর্তমানে নিষ্ক্রিয় হলেও তামিল-মুসলমানদের সংখ্যা একেবারে কম নয় বলে তারাও ভবিষ্যতে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, যা সিংহলীদের জন্য কল্যাণকর নয়।

এছাড়াও শ্রীলংকার মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রতিককালে আরবদের প্রভাবের কারণে একাধিক মসজিদ নির্মাণ এবং সেই সঙ্গে নিকাব ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। শ্রীলংকার বৌদ্ধ সমাজ এই দিকটি গ্রহণ করতে পারেননি এই কারণে যে, আরব সংস্কৃতির প্রভাবে সিংহলী মুসলিম নারীরা তাদের ঐতিহ্যত পোশাক থেকে ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছিলেন। এসব কারণে ২০১৭ সাল থেকেই কান্ডির আমপারা অঞ্চলে স্থানীয় অধিবাসীদের মুসলমানদের মধ্যে একটা বৈরীভাব সৃষ্টি করতে শুরু করে।

১৯৮৩ সালে তামিল ও শ্রীলংকান বৌদ্ধদের মধ্যে ব্যাপক অসন্ত্মোষের আগে ব্রিটিশ শাসনামলের প্ররোচনায় ১৯১৫ সালে বৌদ্ধ ও মুসলমানদের মধ্যে দাঙ্গার সূত্রপাত হয়েছিল। শ্রীলংকায় বর্তমান বৌদ্ধ ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক অসন্ত্মোষ শুরু হয় সামান্য কারণে। একজন সিংহলী বৌদ্ধ গাড়ি চালকের ট্রাফিকজনিত ভ্রান্তির কারণে কয়েকজন মুসলিম তরুণ তাকে আঘাত করার পরই কান্ডির কয়েকটি অঞ্চলে দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। এই দাঙ্গা শ্রীলংকার জন্য শুভ নয় বলে সেখানকার অধিবাসীরা মনে করেন। কারণ, তিন দশক ধরে তামিলদের সঙ্গে সংঘর্ষে দেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মকভাবে আঘাত করে। সে আঘাত সামলাতে না সামলাতে নতুন করে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে দাঙ্গা দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর আবার নতুন করে অশুভ প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা। তাছাড়া এখানকার ধনিক বা সচ্ছল মুসলমানদের সংখ্যাও শ্রীলংকানদের সঙ্গে সংখ্যানুপাত হারে একেবারেই বেশি নয়। তাছাড়াও এখানে ৭৫ ভাগ বৌদ্ধদের অনুপাতে মুসলমানদের সংখ্যা মাত্র নয় ভাগ। বাকি সতেরো ভাগ তামিল হিন্দু ও সিংহলী ক্রিশ্চান।

কোনো দেশেই সাম্প্রতিক নৃশংসতা আকাক্সিক্ষত নয়। কারণ, সাম্প্রদায়িকতা দেশের মানুষের মধ্যে শুধু বিভেদ বা সন্দেহ সৃষ্টি করে না, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা নষ্ট করে দিয়ে দেশের উন্নতি ও অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। শ্রীলংকাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যে দেশে প্রায় একশ ভাগ শিক্ষিত ছিল, পর্যটকদের আনন্দবিহারের কেন্দ্র ছিল- সে দেশ তিন দশক ধরে তামিলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অনেক কিছু হারিয়েছে। শ্রীলংকায় এখানো গ্রামে মন্টেসরি পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদানের বড় বড় সাইনবোর্ড আছে, কিন্তু শিক্ষার্থী নেই আগের মতো অথবা শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। যে দেশের সুনাম ছিল শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে, সে দেশের পক্ষে তিন দশক সংঘাতের পর নতুন কোনো ধরনের সংঘাতই কারোর পক্ষে প্রার্থনীয় হতে পারে না।

তামিলদের সঙ্গে তিরিশ বছর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পরও তাদের শ্রীলংকা থেকে বিতাড়নের কথা শ্রীলংকার সরকার চিন্তাই করতে পারেননি। মিয়ানমার সরকারের মতো শান্তিতে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়নের অমানবিক ঘটনা ঘটায়নি। শ্রীলংকা সরকার দাঙ্গা-প্রতিরোধে নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে অগ্রসর হবে- এটাই সবার কামনা।

ড. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ: কথাসাহিত্যিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)