আপডেট মে ৮, ২০১৯

ঢাকা মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ , গ্রীষ্মকাল, ১৫ রমযান, ১৪৪০

ভ্রমন লাল উঁচু প্রাচীরে ঘেরা প্রাসাদ নান্দনিক আগ্রা ফোর্ট

লাল উঁচু প্রাচীরে ঘেরা প্রাসাদ নান্দনিক আগ্রা ফোর্ট

শফিক আহমেদ সাজীব,নিরাপদনিউজ: ভারতের রাজধানী দিল্লি। পুরাতন শহর এই দিল্লির রয়েছে অনেক ইতিহাস। অনেক ঐতিহ্যবাহী মসজিদ, কেল্লা, স্থাপত্য রয়েছে এখানে। তাই পুরাতন দিল্লি অথবা নয়া দিল্লি উভয় স্থানেই বেড়ানোর আছে অনেক জায়গা। আসুন জেনে নিই ঐতিহ্যবাহী দিল্লির ইতিহাস। এই ইতিহাসের কিছু ঘটনা তুলে ধরছি।

অটোমোবাইল অ্যসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার আমন্ত্রণে ট্রাফিক আইন নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ আয়োজিত সেফ ড্রাইভ সেফ লাইফ শীর্ষক সেমিনার ও দিল্লিতে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণ এবং আজমির শরীফ জেয়ারত, তাজমহলসহ কলকাতা ও দিল্লির দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শনে আসা ১১দেশের ১১২জন প্রতিনিধিদের মধ্যে আমিও ছিলাম।

আগ্রার তাজমহল দেখে মুগ্ধ মাতোয়ারা যখন সবাই তখন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল মুগ্ধতার আরেক খনি আগ্রা ফোর্ট। অপূর্ব এই দূর্গের গল্প শুনেছি অনেক। অনেক বলেন তাজকেও নাকি হার মানায় এটি। একবার আগ্রা ফোর্ট দেখলে আর ভালো লাগে না কোন কিছুই। মনের মাঝে অদম্য কৌতুহল। অটোমোবাইল অ্যসোসিয়েশন অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার আহবানে বাংলাদেশ থেকে পরিবহন শ্রমিক নেতা আনোয়ার হোসেনসহ ভারত ভ্রমণে যায় আমি। আগ্রা ফোর্ট ভ্রমণ ছিল আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ইচ্ছাপূরণ।

লাল ইটে মোড়ানো পথ বেয়ে লাল উঁচু প্রাচীরে ঘেরা প্রাসাদে প্রবেশ করলাম আমরা। তাজে যে সম্রাট-সম্রাজ্ঞীর সমাধি দেখে এলাম তাদের বাস ছিল এই প্রাসাদে। নাটকে, উপন্যাসে, চলচ্চিত্রে, ইতিহাসের বইয়ে কতবার কতভাবে জেনেছি তাদের কথা। এ যেন সেই সময়ের সংস্পর্শে আসা, সময়কে দেখা খুব কাছ থেকে। আগ্রা ফোর্টের দেয়ালে দেয়ালে কারুকাজ। আবাসনের পাশাপাশি রাজ পরিবারের বিনোদন, গান-নাচের আসর, রাজকার্যের জন্য দরবার হল কী নেই এখানে। তবে এই প্রাসাদের নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল একেবারে ভিন্ন। যদিও তাজমহল আর আগ্রা ফোর্টের নাম একই সাথে শোনা যায় তবে এর নির্মাণ হয়েছে আরও অনেক আগে। প্রকৃত অর্থেই, আগ্রা দূর্গ ছিল একটি দূর্গ। এর ইতিহাস বদলেছে সেই ইব্রাহিম লোদী থেকে শুরু করে বাবর, হুমায়ূন, আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, আওরঙ্গজেবের হাত ধরে। একে দূর্গের জটিল অবয়ব দেন সম্রাট আকবর। তবে এর গঠন সর্বোচ্চ নান্দনিকতা পায় শাহজাহানের হাতে। সেনাদের দূর্গকে তিনি পরিণত করেন রাজপ্রাসাদে।

যমুনার তীরে নির্মিত দূর্গটির চারদিকে এমনভাবে দেয়াল তোলা হয়েছে যাতে বোঝা না যায় কোনটা ঠিক এর প্রবেশ পথ। দেয়ালের গঠন আর নকশার চাতুর্যই এর কারণ। রাজা মানসিং এর রাজপুত ফোর্টের নির্মাণ শৈলীর সাথে এর মিল রয়েছে। পরে আবার আগ্রা ফোর্টের আদলে তৈরি হয় দিল্লীর লাল দূর্গ। আকবর যখন শাসনভার নেন তখন তিনি পেয়েছিলেন এর ধ্বংসাবশেষ। তার ইতিহাসবিদ আবুল ফজল জানান এর নাম ছিল বাদলগর। এরপর রাজস্থান থেকে লাল বেলেপাথর এনে তিনি পুনর্নির্মাণ করেন এটি। তবে শাহজাহানের ভালবাসা ছিল সাদা মার্বেলের প্রতি। তাই দূর্গের ভেতরে ভবন নির্মাণে তিনি ব্যবহার করেছেন শ্বেতপাথর। সম্রাজ্ঞী যোধা বাই এর ভবনটি লাল, কারণ এর নির্মাতা আকবর। অন্যান্য ভবনগুলোর নাম জাহাঙ্গীর-ই মহল, খাস মহল, দরবারই খাস, আর শীষ মহল।

আগ্রা ফোর্টের আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে এর শিষ মহল। হাম্মাম অর্থাৎ রাজ গোসলখানায় অসাধারণ ওয়াটার ইঞ্জিয়ারিং করা হয়েছে। সম্ভবত পানি গরম করার জন্য ল্যাম্প ব্যবহার করা হত এখানে। মার্বেলের চেয়েও দামী আয়না দিয়ে খচিত শিষ মহলের দেয়াল। শতকোটি প্রতিবিম্ব চোখ ধাঁধিয়ে দেবে আপনার।

আগ্রা ফোর্টের নিচে আছে ফাঁপা সুড়ঙ্গ, যার মধ্য দিয়ে যমুনার পানি বয়ে যেত। ফলে সমগ্র মহলটি থাকত ঠান্ডা। বিশাল এলাকা জুড়ে দূর্গের বিস্তার। রানীরা থাকতেন নিচের দিকের ঘরগুলোতে, যাতে ঠান্ডা আবহাওয়া পেতে পারেন সবসময়। দূর্গের ছাদে বসত গান নাচের আসর। সম্রাটের এবং শিল্পীর জন্য বাঁধানো মঞ্চ দেখতে পাবেন এখনো।

আগ্রা ফোর্টেই বন্দী ছিলেন শাহজাহান, সন্তান আওরঙ্গজেব বন্দী করে রেখেছিলেন তাকে। নিজ প্রাসাদ থেকে তিনি দেখতে পেতেন যমুনার ওপারে তাজমহলকে। স্মৃতিচারণ করতেন প্রিয় সহধর্মিনী মমতাজকে। যোধা বাই এর মহল থেকেও তাজকে দেখা যায়। তবে কালের বিবর্তনে যমুনার জল আর নেই তেমন।

আগ্রা ফোর্টের নির্মাণ শৈলীতে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে সুস্পষ্ট। হাতি, পাখি, ড্রাগনের প্রতিমূর্তি বা ছবি ইসলাম স্থাপত্যে দেখা যায় না। কিন্তু আগ্রা ফোর্টে আপনি পাবেন তার দেখা।

আগ্রা ফোর্টের আরেকটি বিশেষত্ব হল, এটির মাঝে শুধু নারীদের নামাজ পড়ার জন্য আলাদা মসজিদ আছে। এর নাম নাগিনা মসজিদ।

আগ্রা ফোর্টে সানন্দ্যে ঘুরে বেড়ায় কাঠবিড়ালী। খুবই বন্ধুবাৎসল এরা। একটু সময় দিলেই চলে আসে হাতে। সব মিলিয়ে আগ্রা ফোর্টে একদিন একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

লেখক : নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিক আহমেদ সাজীব।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)