আপডেট মার্চ ৯, ২০১৯

ঢাকা বুধবার, ৪ আশ্বিন, ১৪২৬ , শরৎকাল, ১৮ মুহাররম, ১৪৪১

উপসম্পাদকীয় শৃঙ্খলা যেভাবে সফলতায় প্রভাব ফেলে

শৃঙ্খলা যেভাবে সফলতায় প্রভাব ফেলে

আবুল হোসেন,নিরাপদ নিউজ:  সমাজে নিয়ম-শৃঙ্খলা, অধ্যবসায়, দায়িত্ববোধ, সততা ও কাজ করার প্রবল ইচ্ছে সেই সমাজকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যায়। ফলে একটি পরিবার, সমাজ, দেশ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে এবং সে দেশকে উন্নতির চরম শিকড়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে দেশ ও জাতির সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করেন একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী। দক্ষতা, পেশাগত নৈপুণ্যতা, চৌকস, সাংগঠনিক কাঠামো, নিয়ম-শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণাবলীতে সমৃদ্ধ দেশের সশস্ত্র বাহিনী। কর্মজীবনের শুরু থেকেই শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত থাকেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। যার প্রভাব পড়ে ব্যক্তি ও পরিবার জীবনের সফলতায়। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অধিকাংশের সন্তান স্ব-স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিতও হয়ে থাকে এই শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনের ফলে। যার সুফল পেয়ে থাকে সমাজ ও দেশ। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে এই বাহিনীর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন যেভাবে সফলতায় প্রভাব ফেলে তার পক্ষে কিছু যুক্তি উপস্থাপন করলাম।

১. বিমান বাহিনীতে প্রবেশের আগে বিভিন্ন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। আইকিউ, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান, শারীরিক যোগ্যতা পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হতে হয় তাদের। ফলে বিমান বাহিনীতে যেসব সদস্য প্রবেশ করেন তাদের অবশ্যই মেধাবী হতে হয়।

২. বিমান বাহিনীতে প্রবেশ করা অধিকাংশ সদস্যই এমন যে তাদের জ্ঞান অর্জন ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দরিদ্রতার কারণে সে আকাক্সক্ষা পূর্ণ করতে পারেননি। তাই তারা বিমান বাহিনীতে যোগদানের পরে পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে মনোনিবেশ করেন। ফলে এইচএসসি পাস করে চাকরিতে যোগদান করা এসব সদস্যদের অধিকাংশই পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করতে সমর্থ হন। ফলে বিমান বাহিনীর সদস্যদের মেধাবী ও শিক্ষিত পরিবারের শিক্ষিত মেয়েদের সঙ্গে বিয়ে হয়।

৩. পরিবারের উভয়ে (মা-বাবা) শিক্ষিত ও মেধাবী হওয়ার কারণে তারা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে ছোট থেকে খুব যত্ন নেন এবং তাদের শিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারে মা-বাবা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তারা অর্থসম্পদের দিকে নজর না দিয়ে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখেন, তাদের শিক্ষিত হয়ে বেড়ে ওঠার জন্য স্বল্প আয় দিয়েই চেষ্টা করেন। এ সচেতনতাই ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত হয়ে গড়ে ওঠার জন্য সাহায্য করে।
৪. বিমান বাহিনীর ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত হয়ে গড়ে ওঠার আরেকটি কারণ, ভালো স্কুলগুলো বাসস্থানের কাছাকাছি থাকে। স্কুলগুলোর কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকম-লী ও প্রশাসনের সুশৃঙ্খল নিয়মকানুনের পাশাপাশি মা-বাবা সর্বক্ষণ পড়াশোনার ব্যাপারে যতœ নেন। সব মিলিয়ে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে তা সহায়ক ভূমিকা রাখে। যেমন শাহীন স্কুল, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, শহীদ আনোয়ার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ইত্যাদি। আর এমন ধরনের স্কুল-কলেজগুলো সব ঘাঁটিতেই আছে। ফলে স্কুল-কলেজ জীবন শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলোয় অধিকাংশ ছেলেমেয়েই ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়।
৫. সে কারণে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সদস্যদের অধিকাংশের সন্তান সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কমিশন অফিসার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশে ও বিদেশে স্ব-স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত।
৬. বিমান বাহিনীর নির্মিত সরকারি বাসস্থানগুলো একই মানের। বাসস্থানগুলোর আশপাশে খেলার মাঠ, সবুজ গাছ, প্রশস্ত রাস্তাÑ সব মিলিয়ে একটি মনোরম পরিবেশ বিরাজ করে। আর সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি তা হলো, ইচ্ছে করলেই কারো উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করার সুযোগ নেই। সবাইকেই একটি সুশৃঙ্খল জীবন পরিচালনা করে চলতে হয়। মানুষ সমাজে অনুকরণপ্রিয়। তাই পূর্বসূরীদের অনুসরণ করে সবাই উচ্চশিক্ষা নেয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
৭. বিমান বাহিনীতে যদিও উচ্চবিত্তশালী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কিন্তু অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো সুযোগ আছে। তাদের ওই মৌলিক চাহিদা সম্পূর্ণ পূরণ হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে। উল্লিখিত কারণগুলো বিমান বাহিনী সদস্যদের সন্তানদের শিক্ষিত হয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়।
এসব বিষয়গুলোর প্রভাব ফেলেছে আমার ব্যক্তি ও পরিবার জীবনেও। মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান আমি। স্কুলজীবনে প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত মেধা তালিকায় প্রথম থেকে তৃতীয় জনের মধ্যে ছিলাম। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আমার জীবনের শুরু থেকেই ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এসএসসি পাস করার পর ঢাকায় কবি নজরুল সরকারি কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হই। এইচএসসি পাস করার পর প্রবল ইচ্ছে ছিল উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার, সেই লক্ষ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ভর্তি হই। কিন্তু পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। বলতে গেলে বাধ্য হয়ে আমি বিমান বাহিনীতে এয়ারম্যানে যোগদান করি। বিমান বাহিনীতে যোগদানের পর ট্রেনিং শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিরাগত পরীক্ষার্থী হিসেবে বিএ (পাস) ডিগ্রি অর্জন করি।

পরবর্তীতে মনোযোগ ও নিষ্ঠার সঙ্গে বিমান বাহিনীতে কাজ করতে থাকি। বিয়ের দেড় বছর পর আমার প্রথম পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। জন্মের পর থেকে আমার সন্তানকে আদর-যত্ন করে লালন-পালন করতে থাকি। পাঁচ বছর বয়সে ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে ভর্তি করানো হয় তাকে। বড় ছেলে যখন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে, তখন ছোট ছেলের জন্ম। বড় ছেলে সপ্তম শ্রেণীতে বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়। ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করে। আর দ্বিতীয় ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে সম্মান ডিগ্রি অর্জন করে। সেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি করার পর বাইরের দেশে অর্থাৎ কানাডা অথবা আমেরিকায় পিএইচডি করতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমার স্ত্রী বিএড করার পরও কোনো স্কুলে কাজ না করে সন্তানদের পড়াশোনা ও লালন-পালনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। আর এর সবই সম্ভব হয়েছে বিমান বাহিনীর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনের কারণে।

লেখক: বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)