ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট এপ্রিল ১৪, ২০১৭

ঢাকা রবিবার, ১০ আষাঢ়, ১৪২৫ , বর্ষাকাল, ৯ শাওয়াল, ১৪৩৯

লিড নিউজ, শিল্প-সংস্কৃতি সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ হোক

সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ হোক

সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ হোক

নিরাপদ নিউজ : সংস্কৃতি হলো জাতির মানস দর্পণ। যে দর্পণে প্রতিফলিত হয় সামগ্রিকভাবে গণমানুষের চিন্তা, চেতনা তথা তাদের জীবন ও মূল্যবোধ। জাতির আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, আহার-বিহার থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে পরিপূরক যে চেতনা তার অন্য নামই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি আপন জাতিসত্তার পরিচয় তুলে ধরে। মানুষের অতীত বিদায়ী ইতিহাসকে চুম্বকের মতো কাছে এনে দেয়। হৃদয়ে হারিয়ে যাওয়া কাল স্মরণের বাতাস দেয়। সংস্কৃতি চর্চা মানুষকে মর্যাদা দেয়। পরিচিত করে। সমাদৃত করে। তবে সে সংস্কৃতি হতে হবে শুদ্ধ ইতিহাসের। কালের সাক্ষীর। জীবনের বাস্তবতার। শিক্ষণীয় এবং থাকতে হবে শিকড়ের সম্পর্ক। ভিনদেশি সংস্কৃতির পরিতোষক যারা তারা কোনো সংস্কৃতি দিয়েই তাদের যাপিত জীবনকে পরিপূর্ণ করতে পারে না।
তুর্কি বিজয়ের পর বঙ্গা দেশে হিজরি সন চালু হয়েছিল। চান্দ্রবর্ষের হিসাবে হিজরি সন ধরা হয়। চান্দ্রবর্ষে দিন ও মাস প্রতি ৩৩ বছরে একবার করে আবর্তিত হয়। যেমন রমজান মাসের রোজা, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সব ঋতুতেই ঘুরে আসে। চান্দ্রমাস বা হিজরি সনের দিন ও মাস নির্দিষ্ট ঋতু বা ফসল তোলার মৌসুমে স্থির না থাকায় খাজনা তোলার নির্দিষ্ট তারিখের সঙ্গে ফসল তোলার সময়ে হেরফের হয়ে যায়। তাই ৯৬৩ হিজরি সনে (১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ) ভারতবর্ষে আকবরের শাসনামলে খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে প্রজাদের ফসল তোলার সময়ের প্রতি দৃষ্টি রেখে ফসলি সন হিসেবে বাংলা বর্ষপঞ্জি সৃষ্টি করা হয়। সম্রাট আকবরের উপদেষ্টা আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজীর হিজরি সনের চান্দ্র বছরের হিসাবের পরিবর্তে সৌরবর্ষের হিসাব সংযোজন করে বাংলা সনের উদ্ভাবন করা হয়েছিল।
১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দের বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ১৫৮৫ খ্রিস্টব্দের ১০ মার্চ সম্রাট আকবর বাংলা সন সংক্রান্ত এক ফরমান জারি করেন। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষক চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূস্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। তখন থেকেই নববর্ষকে ঘিরে বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে চলে রকমারি আয়োজন। বাড়িঘর, চাতাল, উঠানজুড়ে চলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান।
কারও ঘরে হয় বাড়তি কিছু ভালো খাবারের আয়োজন। দাওয়াত দেয়া হয় আত্মীয়স্বজনকে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে দেখা হয় দূরের কুটুম ও বন্ধুদের সঙ্গে। গল্প-আড্ডায় মেতে থাকে অনেক দিন পর একসঙ্গে হওয়া মানুষ। নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা বলে পরিচিত। বাংলা সনের প্রথম দিন পালিত হয় বাঙালির সর্বজনীন লোকজ উৎসব। বাংলাদেশের পাড়া-মহল্লায় জমে ওঠে নববর্ষের তোড়জোড় আয়োজন। মেলায় শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের হাতে বানানো নানা বিপণিতে সাজানো থাকে মেলার ভ্রাম্যমাণ স্টলগুলো। গ্রামীণ মেলাগুলোতে থাকে ভিন্ন আমেজ। সেখানে দেখা মেলে বৈশাখী মেলার মূল চিত্র। মেলাজুড়ে থাকে মাটির বানানো ঘোড়া, হাতি, পুতুল বউ, বাচ্চাদের চড়–ইভাতি খেলার সরঞ্জাম এবং নানা যাতের মিঠাই-মন্ডা। তবে মন্ডা যেন মেলার প্রধান মিষ্টান্ন খাবার। কিন্তু আজকাল মেলার স্টলগুলোতে খুব একটা দেখা যায় না স্বাদের বাতাসা।
পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক বৈশাখের এসব মেলাকে ঘিরে শুরু হয় নানা অসামাজিক কার্যকলাপ। বিশেষত এ মাসে মিডিয়ায় দেখা যায় অনেক মেলায় হাউজি, জুয়া ও অশ্লীল যাত্রাপালা হয়। যেখানে স্থানীয় অভিভাবক মহলকে বাধ্য হয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করতে হয়। উপরন্তু নববর্ষকে বরণ করতে এমনসব বিষয় নিত্যনতুন যোগ করা হচ্ছে, যা আমাদের আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের পরিপন্থী। এসবের কিছু আছে ধর্মের দৃষ্টিকোণে যথেষ্ট আপত্তিকর।
বাংলাদেশের লেখক-চিন্তকরা জানান, সংস্কৃতি ঐতিহ্যের দিক দিয়ে বৈশাখ উদযাপনের সঙ্গে পান্তা ও ইলিশ খাবার দুইটির কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাননি তারা। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হতে ব্যবসায়ীরা শহুরে নাগরিকদের কাছে পান্তা-ইলিশকে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
অধ্যাপক যতীন সরকার বলেন, ‘পান্তা-ইলিশকে বৈশাখের উপলক্ষ করা বানোয়াট ও ভণ্ডামির অংশ। এসব উদ্যোগ যারা নিয়েছে তারা সংস্কৃতি চোর।’ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার এক লেখায় বলেন, ‘গরিব মানুষের খাবার পান্তা ভাত। রাতের ভাত নষ্ট হওয়া থেকে ভালো রাখার জন্য ভাতে পানি দিয়ে এটিকে ভালো রাখা হয়। কিন্তু বড়লোকেরা আয়েশ করে সকালে পান্তা-ইলিশ খাওয়া মানে গরিবের সঙ্গে উপহাস করা।’ শুদ্ধ সংস্কৃতির বারিধারায় ধুয়ে-মুছে লীন হয়ে যাক অসত্য-অসভ্য বানোয়াট ভিনদেশি সংস্কৃতি।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)