ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট জুন ১১, ২০১৯

ঢাকা বুধবার, ৯ কার্তিক, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ২৪ সফর, ১৪৪১

মতামত, লিড নিউজ সোনালী দিনের নক্ষত্র ইলিয়াস কাঞ্চন

সোনালী দিনের নক্ষত্র ইলিয়াস কাঞ্চন

আকবর খসরু,নিরাপদ নিউজ: আমি ১৯৮৬-তে ঈদ উপলক্ষে তওবা ছবি দেখি। এই প্রথম ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি দেখি। এই ছবিতে রাজ্জাক-ববিতা’র সন্তানের চরিত্রে অভিনয় করেন ইলিয়াস কাঞ্চন। ইলিয়াস কাঞ্চনের বিপরীত ছিলো দোয়েল। তওবা ছবির লোকেশন ছিলো চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা। ইলিয়াস কাঞ্চন বন্দর শ্রমিক ছিলেন। রাজ্জাকের পর ইলিয়াস কাঞ্চনই ছিলেন ছবির প্রাণ। রাজ্জাক মান্নার পিতাকে ভুলবশত হত্যার দায়ে জেলে ছিলেন। দোয়েলের সাথে একটি চটুল রোমান্টিক গান আছে- “ও প্রিয়া প্রিয়ারে যাস না গিয়ারে প্রেমেরি ধাক্কায়” গানটি বন্দরের কর্ণফুলির তীরে চিত্রায়িত। প্রথম ছবিতেই ইলিয়াস কাঞ্চনের অভিনয়ে মুগ্ধ হই। ১৯৯১তে সাপ্তাহিক ছুটি’তে তিনি পাঠকদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন।বেশ ক’য়েক সংখ্যায় তিনি উত্তর দিয়েছেন।আমিও তিন সংখ্যায় প্রশ্ন করি এবং উত্তর পাই। এই প্রশ্নোত্তর পর্বগুলো পড়ে জানতে পারলাম, উনার আসল নাম ইদ্রিস আলী। উনার মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি বসুন্ধরা। আলাউদ্দিন আল আজাদ এর প্রথম উপন্যাস “তেইশ নাম্বার তৈলচিত্র ” অবলম্বনে বসুন্ধরা। আরো জানতে পারি বসুন্ধরা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।

প্রথমেই সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্রে অভিনয় আর প্রথম চলচ্চিত্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত! সত্যি তিনি ভাগ্যবান। রোমান্টিক ছবি হিসাবে আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে সহযাত্রী ও ভেজাচোখ।ছবিগুলো যখন দেখি তখন আমার বয়ঃসন্ধিকাল। আর ভেজাচোখ তখন আলোড়ন সৃষ্টিকারী ছবি। যুব সমাজের সাথে সাথে প্রবীণদেরও নজর কাড়ে ভেজাচোখ। ইলিয়াস কাঞ্চনের চরিত্রটি আমাকে সম্মোহন করে। আমি তখন মনে মনে আল্লাহকে বলতাম, চাম্পার মতো কেউ আমাকে ভালোবাসুক আর আমি ক্যান্সারে মারা যাই। ইলিয়াস কাঞ্চনের এই প্রেমিক চরিত্র অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সেই সময় অনেকে নিজের নামের সাথে “জীবন” নামটি যোগ করে। জীবন নামের খুব জনপ্রিয়তা দেখা যায়।

শেষ উত্তর নামে একটি ছবি বিটিভিতে দেখে চমকে উঠেছিলাম।আমি ছবিটি দেখার আগে কল্পনাও করি নি ইলিয়াস কাঞ্চন শাবানার বিপরীতে অভিনয় করেছেন। ছবিতে তিনটি চমক পেলাম। একঃ ইলিয়াস কাঞ্চন। দুইঃকাহিনীতে নতুনত্ব। তিনঃ ছবির শেষ দৃশ্য। ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম নায়িকা ববিতার ছেলে হয়ে আসলেন তওবা’য় আবার মা,বড়বোন,ভাবী শাবানার বিপরীতে অভিনয় করেছেন।

সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে “বেদের মেয়ে জোসনা”, এই ছবি চলাকালে সিনেমা হলে দর্শকদের ভিড় দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম।১৯৮৬ থেকে আমি সিনেমা দেখি। ১৯৮৯ এর মাঝামাঝি ছবিটি মুক্তি পায়।আমি বিগত চার বছরে এতো ভীড় দেখেনি। আমার পরিচিত এক টিকেট ব্ল্যাকার বেদের মেয়ে জোস্নার টিকেট ব্ল্যাক করার লভ্যাংশ দিয়ে দেশে জমি কিনেছে।আমি তখন টিকেট ব্ল্যাক করা খারাপ বুঝতাম না। মনে মনে ভাবছিলাম আমিও ব্ল্যাকার হবো।


আমি ছবিটি মুক্তি পাওয়ার অনেকদিন পরে(ছবিটি মুক্তি পায় ঈদুল ফিতরের পরে,আমি ঈদুল আযহার পরে দেখি) নেভাল অডিটোরিয়ামে। নারী-পুরুষ,তরুণ-তরুণীর ভীড় দেখে অবাক হয়েছিলাম। আমার প্রতিবেশী এক পরিবার আত্মীয় হাতিয়া থেকে আসে বেদের মেয়ে জোসনা দেখতে।  অনেকে ফোক-ফ্যান্টসী ছবি নিয়ে হাসাহাসি করে। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না উপকথা/রুপকথা/লোক কাহিনী উন্নত মানের একটি সাহিত্য।
রাখাল বন্ধু’র কাহিনী শেক্সপিয়র এর ম্যাকবেথ নাটক। শেক্স পিয়র অনেক নাটকের সুত্র খুঁজে পাওয়া যাবে আমাদের ফোক-ফ্যান্টাসি ছবিগুলোয়।
বেদের মেয়ে জোসনা ছবির কাহিনীর সাথে পল্লীকবি জসিম উদ্দিনের একটি গীতি নাটকের মিল আছে। কবিকন্যা হাস্না জসিমউদ্দিন মওদূদ যখন দাবী করে বেদের মেয়ে জোসনা ছবির কাহিনী উনার বাবার রচনা। তখন আমি পল্লীকবি জসিমউদ্দিন এর সাহিত্য ঘাটাঘাটি করে দেখি ঘটনা সত্য। বেদের মেয়ে জোসনা’র কাহিনী ফেলনা না, যে হাসাহাসি করতে হবে। এই কাহিনীর সাহিত্যমান আছে। ইলিয়াস কাঞ্চনের ক্যারিয়ার শুরু সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র দিয়ে।সেই ধারাবাহিকতায় ডুমুরের ফুল,নিরন্তন,সুন্দরী,পরিণীতা আয়না বিবির পালা ছবিতে অভিনয় করেন। সৈয়দ শামসুল হক এর উপন্যাস যখন সিনেমা হয়, সেই সিনেমায় সাধু চরিত্রে ইলিয়াস কাঞ্চন নিজেকে নিবেদিত করেন। আমি ছবি দেখার আগে উপন্যাস পড়েছিলাম। সাধু চরিত্র অনেক কঠিন চরিত্র। সেই চরিত্রে নিজেকে সুন্দর করে মিশিয়েছেন।


হুমায়ূন আহমেদ সেবাপ্রকাশনী’র দুটি উপন্যাস লিখেন।প্রকাশনী দিয়েছিলো অনুবাদ করতে। কিন্তু তিনি নিজের মতো করে রুপান্তর করেন।যা অনুবাদ না হয়ে ছায়া অবলম্বন হয়েছে। বিদেশী উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে লিখিত উপন্যাস দুটি হলো- সম্রাট ও অমানুষ। ইলিয়াস কাঞ্চন অভিনীত একটি ছবিতে আমি “অমানুষ” এর ছায়া দেখতে পাই। তবে ছবিটির নাম এই মূহুর্ত মনে পড়ছে না।  ইলিয়াস কাঞ্চন আজ থেকে পঁচিশ /ছাব্বিশ বছর আগে চট্টগ্রাম লালদিঘীর ময়দানে দেখি সকাল দশটা বা এগারোটা হবে।তিনি “নিরাপদ সড়ক চাই” আন্দোলন সম্পর্কে বক্তৃতা দেন। ইলিয়াস কাঞ্চন সাহিত্য নির্ভর, ফোক ফ্যান্টাসী,সামাজিক অ্যাকশান,রোমারন্টিক সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন। আমি ইলিয়াস কাঞ্চন অভিনীত ৯০% ছবি দেখেছি। ছবি ব্যবসা যেমনি করুক।তিনি অভিনয় পারফেক্ট করতেন। আশি ও নব্বই দশকে ইলিয়াস কাঞ্চন যুব সমাজে আইডল ছিলেন। ইলিয়াস কাঞ্চন সেই সময়ে অনেক তরুণীর স্বপ্ন পুরুষ ছিলেন।


আমি ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রতিভায় মুগ্ধ। এখনো ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে ইলিয়াস কাঞ্চন এর ছবি দেখি। সোনালী দিনের নক্ষত্র ইলিয়াস কাঞ্চনের নাম চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে লেখা থাকবে।

যখনি বসুন্ধরা’র নাম আসবে।যখনি ডুমুরের ফুল এর নাম আসবে। যখনি সহযাত্রী’র নাম আসবে। যখনি বেদের মেয়ে জোসনার নাম আসবে।যখনি সুন্দরী’র নাম আসবে। তখনি ইলিয়াস কাঞ্চনের নাম আসবে। আরো অনেক ছবি আছে যে ছবির চরিত্রের কারণে দর্শক আমরা যারা দেখেছি, তাঁরা যুগযুগ মনে রাখবো এই নায়ককে।

-স্মৃতি নির্ভর লেখা।তথ্যগত ভুল হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন ।

লেখক: আকবর খসরু,নিরাপদ নিউজ এর পাঠক ও ইলিয়াস কাঞ্চনের ভক্ত।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)