ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ১০ মিনিট ০ সেকেন্ড

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ২৩ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১

অপরাধ, লিড নিউজ স্ত্রীর সামনে স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যা: ফেসবুকে ঘৃণার ঝড়

স্ত্রীর সামনে স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যা: ফেসবুকে ঘৃণার ঝড়

নিরাপদ নিউজ:  বুধবার (২৬ জুন)। সকাল সাড়ে ১০টা। আলো ঝলমলে একটি দিনের সূচনা। রাস্তাঘাটে লোক চলাচলও স্বাভাবিক। অন্যদিনগুলোর মতোই এদিনটাও স্বাভাবিক-সুন্দরভাবেই শুরু হয়েছিল তরুণ দম্পতি রিফাত ও মিন্নির। বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু সেখানে আগে থেকেই ওঁৎ পেতে ছিল সন্ত্রাসী-মাদক ব্যবসায়ী নয়নসহ একদল দুর্বৃত্ত। রিফাত তার স্ত্রীকে নিয়ে ওই পথে আসতেই খুনিরা তাদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রকাশ্যে রাম দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে রিফাত শরীফকে (২৫)। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তখন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নীরব দর্শক মাত্র। ব্যতিক্রম কেবল মিন্নি। কখনও স্বামীকে আড়াল করার চেষ্টা, রাম দা হাতে উদ্যত দুই জল্লাদকে ঝাপটে ধরার চেষ্টা।

কিন্তু  স্বামীকে বাঁচানোর প্রাণপণ সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয় তার। রাম দা’র ক্রমাগত আঘাতে ততক্ষণে রিফাতের সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে নিস্তেজ প্রায়। খুব অল্প সময়ে অপারেশন শেষ করে অস্ত্র উঁচিয়ে বীরদর্পে এলাকা ত্যাগ করে খুনিরা। গুরুতর অবস্থায় রিফাতকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রথমে বরগুনা সদর হাসপাতালে এবং পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বুধবার বিকালে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রিফাত।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিও’র নির্মম দৃশ্যগুলো মানুষকে হতবাক করে দেয়। এমন দৃশ্য মেনে নেওয়া কষ্টের। ক্ষোভে ফেটে পড়েন তারা। এর পরপরই ফেসবুকে বইতে থাকে নিন্দার ঝড়। ক্ষোভ, ঘৃণা, প্রতিবাদ ও খুনিদের শাস্তির দাবি জানিয়ে বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজ নিজ ওয়ালে স্ট্যাটাস দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন লিখেছেন—‘‘চুল খোলা আয়েশা…’’ নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়, দেহভঙ্গিমাই বলে দেয় তারা Second Line of support. এটা আমার মতো আম বুঝতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তারক্ষাকারী ঝুনো নারকেলরা বুঝতে পারছেন না বলে মনে করেন?

সাংবাদিক ও কলামিস্ট প্রভাষ আমিন তার পোস্টে লিখেন, ‘একটি ভিডিও নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে। আমি এখনও দেখিনি, দেখার সাহসও পাচ্ছি না। দুই সন্ত্রাসী প্রকাশ্য রাজপথে কুপিয়ে এক যুবককে হত্যা করেছে। হতভাগা যুবকের স্ত্রী চেষ্টা করেও তার স্বামীকে বাঁচাতে পারেনি। স্বামীকে বাঁচাতে না পারা সেই নারীর অসহায়ত্ব আমাদের সবাইকে গ্রাস করেছে। এভাবেই কী সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে? আর কতদিন? আর কতদিন? কবে এই নির্বিকারত্বের, প্রতিবাদহীনতার অবসান ঘটবে?’

সাংবাদিক লুৎফর রহমান হিমেল লিখেছেন, ‘রামদা হাতে দুই খুনি কোপাচ্ছে রিফাত শরীফ নামের এক যুবককে। পেছনে তার স্ত্রী জাপটে ধরে আটকানোর চেষ্টা করছে খুনিদের। স্বামীকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা তার ব্যর্থ হয়। রিফাত লুটিয়ে পড়েন।

ঘটনাটি রাত-বিরাতে নয়, সকাল দশটার। বরগুনা সরকারি কলেজের গেটে শত লোকের চোখের সামনে একটা তরতাজা যুবককে এভাবে কুপিয়ে মেরে ফেলা হলো। ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে তার হত্যার ভিডিও। আমি দেখার সাহস পাইনি। স্ক্রিনশটের ছবিগুলো শুধু দেখলাম। এই স্থিরচিত্র দেখেই আমি কিছুসময় বাকরুদ্ধ ছিলাম।

আমাদের প্রশাসন চলছে ব্রিটিশ আমলের আইনে। কিছুটা সংশোধন-বিয়োজন অবশ্য হয়েছে। কিন্তু মূল আইন সেগুলোই আছে। নাহলে অপরাধ প্রমাণ হলে শাস্তি দিতে দেরি হবার কথা না। ব্রিটিশ আমলে ভিডিও ছিলো না, সিসি টিভি ক্যামেরা ছিলো না। প্রযুক্তির পরিবর্তনে আইনও বদলানো দরকার। এই যেমন, বরগুনার এই ঘটনার ভিডিও বড় প্রমাণ। এই ভিডিওকে সামনে নিয়ে বিশেষ আদালত বসিয়ে অপরাধীদের তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে বিচারপ্রার্থীদের মনে কিছুটা শান্তনা মিলতো। সংসদ অধিবেশন চলছে, এই অধিবেশনেই এমন একটি আইন তৈরি করা হোক। এ ধরণের অপরাধ ৯০% কমে যাবে, গ্যারান্টি।

যেহেতু প্রমাণ আছে, তাই রিফাতের দাফনের আগেই দুই অপরাধীকে ধরে এনে ফাঁসির কাষ্টে ঝুলিয়ে দেওয়া হোক। সুবিচারের নজির সৃষ্টি হোক।

আর নাহলে ৫ বছর, ১০ বছর, ২০ বছর আদালত-শুনানি-টাকা পয়সার গচ্চা দেওয়ার পর সেই বিচার দিয়ে কী হবে?  সেই বিচারকে নজিরবিহীন বলবো কী করে? আমি ব্যক্তিগতভাবে অমন বিচারের পক্ষে না।’

বাকি বিল্লাহ লিখেছেন — তুলনা কইরেন না। বিশ্বজিৎ, অভিজিৎ কারও সঙ্গেই তুলনা কইরেন না। তুলনা করলেই ঘটনাগুলো পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়— আর মনে হয়, আপনি বুঝি এবার প্রতিশোধ নিয়ে নিলেন। ধারালো অস্ত্র হাতে প্রতিটি খুনির একই চেহারা, অভিন্ন মুখ। বিপরীতে মরতে থাকা রক্তাক্ত শার্ট অথবা পাঞ্জাবি গায়ের মানুষগুলোও একই মানুষ।

দাঁড়িয়ে থাকা নির্বিকার মানুষগুলোকে গালি দিয়েন না। ওরা আপনার আমারই আয়না। এই ডাকাত রাষ্ট্র-সংস্কৃতি এরচেয়ে ভালো কিছু পয়দা করতে সক্ষম না। বাস্তবতা বদলাতে চাইলে সবগুলো দেয়াল আর আড়াল ছিড়ে ফেলে ওই আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাতে হবে আমাদের; পরস্পর বিশ্বাস ফিরে পেতে হবে। চিৎকার করে বলতে হবে— আয়রে ভাই, আয়রে বইন, আর কত! আয় এবার হাতে হাত বাইন্ধা দাঁড়াই। একজন যেদিন জানবে, সে রুখে দাঁড়ালে এগিয়ে আসবে অন্যরাও— সেদিন আর কেউ নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকবে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী জাকারিয়া হোসাইন অনিমেষ তার ওয়ালে লেখেন— ‘খুন করা ঠেকাতে মানুষ এগিয়ে আসেনি কেনো? তার চাইতে বড় প্রশ্ন— দেশে কোন কোন রাজনৈতিক শক্তি ও চিন্তা এবং আদর্শের সমন্বয়ে এমন এক অবিচার-বিচারহীনতার অবস্থা তৈরি হইছে যে, খুনিরা মুখ না ঢেকেও দিনের আলোয় প্রকাশ্যে এত সময় ধরে খুন করতে পারে। খুনিরা কারা? তাদের এই সুপার পাওয়ারের উৎস কী? কীভাবে এই সুপার পাওয়ার খুনিদের পেছনে জমা হলো? যারা খুন করা ঠেকাতে যাবে, তারা কি ওই সুপার পাওয়ারওয়ালা খুনিদের কাছে নিরাপদ?’

শিশু সাহিত্যিক হুমায়ুন কবির ঢালী লিখেছেন— ‘কোনও কথা হবে না। রিফাতের খুনিদের ধরে ডাইরেক্ট ক্রসফায়ারে দেওয়া হোক। এই নিয়ে কোনও যুক্তিতর্ক, ছগড়া-বিবাদ, নীতি-রাজনীতি শুনতে চাই না। শান্তিতে সববাস করতে চাই। যারা দাঁড়িয়ে থেকে বেকুব দর্শক হয়ে এই হত্যাকাণ্ড দেখেছে, তাদের প্রতি ঘৃণা।’

রিফাত হত্যাকাণ্ডের ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিক গোলাম মওলা লিখেছেন— ‘আসুন আমরা সবাই তাকিয়ে থাকি। আর ওরা কোপাতে থাকুক।’

কানাডা প্রবাসী ক্রিড়া সাংবাদিক ফরহাদ টিটোর স্টাটাস— ‘প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা… তখনই হয়, যখন অপ্রকাশ্য অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে আইন আর বিচার প্রক্রিয়া।’

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)