সংবাদ শিরোনাম

১৭ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং

00:00:00 বুধবার, ৩রা কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ , হেমন্তকাল, ২৮শে মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী
উপসম্পাদকীয় স্বাধীনতার মাস: তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য

স্বাধীনতার মাস: তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য

পোস্ট করেছেন: Nsc Sohag | প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১, ২০১৭ , ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: উপসম্পাদকীয়

উপসম্পাদকীয়

মাহমুদুল বাসার, নিরাপদ নিউজ : শুরু হয়েছে ঐতিহাসিক মার্চ মাস।এই মাসের ১৭ তারিখ বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন দ্বিঘল পুরুষ। তার অবয়ব ছিলো বিশ্বের সেরা সুদর্শন ও নান্দনিক। বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রনায়ক ই এতটা নিখুতঁ সুন্দর নয়। এক মাত্র স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গেই তার সৌম্যকান্তি চেহারার তুলনা চলে। তার গায়ের রং ছিলো বাংলাদেশের মাটির মতো, তার মাথার চুল ছিলো বাংলার কাল বৈশাখী ঝড়, তার দুই চোখ ছিলো বাংলার সবুজ দিগন্ত, তার গায়ের মাংস ছিলো বাংলার কাদামাটি, তার গায়ের রক্ত ছিলো নদী-জল। তিনি এসেছিলেন বাংলার প্রাচীন জনপদ ‘বঙ্গ’ থেকে। নেতাদের মধ্যে একমাত্র শেরে বাংলা-ই এ জনপদে জন্মগ্রহণ করেছিলেনা। তিনি এসেছিলেন বাংলার দক্ষিণ প্রান্ত থেকে, প্রান্তিক জনপদ থেকে। অনভিজাত, মধ্যবিত্ত ও ধান্য পরিবার থেকে। তার পিতামাতা ছিলেন সরল, অনাড়ম্বর, সাদা সিদে। রবীন্দ্র-নজরুলের মতো তিনি ছোটকাল থেকে রাজনীিত চর্চা শুরু করেন, যেমন মহন দুই কবি ছোটবেলা থেকে কাব্য চর্চা শুরু করেছিলেন। তৃণমূল থেকে লড়াই করে উঠে এসেছিলেন। তার ছিলো সরলতা, রাজনৈতিক সততা, ছিলো সাহস, ছিলো ঝুঁকি নেবার প্রবণতা। ছিলো নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা ছোটকাল থেকে, ছিলো লক্ষ্যবিন্দু। তিনিও তার মুরুব্বীদের অনুকরন করেছেন, তিনি তার নেতাদের মান্য করতেন। তারা যা বলতেন তিনি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডের রাজনীতি করতেন না, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করতেন। তার রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। শেরেবাংলা এবং মওলানা ভাসানীর প্রভাব ও ছিলো তার ওপর। নিজস্ব সাংগঠনিক প্রতিভার জোরে তিনি সকলকে ছাড়িয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে গিয়েছিলেন। তিনি তিলে তিলে ধীরে ধীরে বাংলার মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তার রাজনীতিতে কোনো অপকৌশল ছিলো না। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ যে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি বাংলার রাজনীতিতে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। দুই জনই স্থপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন আজীবন বাংলাভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির জন্য পরিশ্রম করেছেন ও লড়াই করেছেন, অন্যজন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য, বাঙালির মুক্তির জন্য লড়াই করতে করতে জীবন বির্সজন দিলেন সপরিবারে। একরাতে তার পরিবারের ৩২ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়।তার মধ্যে ছিলো সদ্য বিবাহিতা নারী, ছিলো শিশু, সন্তান সম্ভাবনা জননী। যিশুখ্রিস্টের চেয়েও নির্মম ছিলো তার হত্যাযজ্ঞ। তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ১৫ আগস্টের আগের দিন পর্যন্ত তাকে কেউ রোধ করতে পারেনি। বলেছিলেন তার অগ্নিগর্ভ ভাষণে সে ‘এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ তাই করেছিলেন, কেউ রোধ করতে পারেনি। সকল প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ চুরমার করে, সকল ভ্রুকুঠি উপেক্ষা করে তিনি ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা রাখেন। তিনি পাপেট নন। ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে তিনি সাম্রাজ্যবাদকে তোয়াক্কা না করে বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুভাগে বিভক্ত, এক ভাগে শোষক অন্য ভাগে শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে।’ তিনি আমৃত্যু শোষণহীন সোনার বাংলা কায়েম করার লড়াই করে গেছেন। জাতিসংঘের মতো বিশ্ব সভায় তিনি মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। এটাও তার অপ্রতিরোধ্যতা। এ জন্যই মহান, কমরেড ফিডেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, মুজিবকে দেখেছি।’
বাংলাদেশের স্বাধীনতার উষালগ্নে তিনি ভিয়েতনাম ও প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছিলেন। এটাও তার অপ্রতিরোধ্যতা। বাংলাদেশ ও বাঙালির শত্রু ড. কিসিঞ্জার বিদ্রুপ করে বলেছিলো, ‘বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি।’ তিনি মার্কিনের মাটিতে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের মাধ্যমে এই উপহাসের উত্তর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘বাংলাকে শোষণ করে ইসলামাবাদ ও লন্ডনের ডান্ডি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদেরও সম্পদ আছে, আমরাও উঠে দাড়াবো।’ এটা যেমন তার অপ্রতিরোধ্যতা, তেমনি আত্মপ্রত্যয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই তিনি জেনে গিয়েছিলেন যে সাম্রাজ্যবাদ তাকে বাচঁতে দেবে না। সাম্রাজ্যবাদ তার পিছনে এজেন্ট লাগিয়ে দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে মৌলবাদী ডানেরা ও হঠকারী বামেরা অস্ত্র তাক করে ফেলেছে। এম, আর আখতার মুকুল যখন লন্ডনে যান দায়িত্ব নিয়ে, তখন তিনি মুকুলকে বলেছিলেন, ‘দ্যাখতো, আমার বুকে কয়টা গুলি লাগবে।’ অসংকোচ প্রকাশের দূরন্ত সাহসে বলেছিলেন, ‘আমার অবস্থা আলেন্দের মতো হলেও আমি পিছপা হবো না, তাতে যা হয় হবে।’ এটাও তার অপ্রতিরোধ্যতা। বাংলার মাটিতে পা দেবার আগেই তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, মহিয়সী নারী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন। অন্য নেতারা একবারই দেশ স্বাধীন করেছেন, তিনি দুইবার দেশ স্বাধীন করেছেন। তিনি যখন ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডনে এসে নামলেন, তখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত কাজ ফেলে দৌঁড়ে চলে এসেছিলেন বাংলাদেশের বিজয়ী নেতাকে স্বাগত জানাতে, নিজ হাতে তার গাড়ির দরজা খুলে দিয়েছিলেন। এতে বাঙালির মাথা উঁচু হয়েছিলো। লন্ডনে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলার মুক্তিসংগ্রামে আজ আমি অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এই মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিলো স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রপতি’ হিসাবে ঘোষণা করেছে তখন আমি রাষ্ট্রদোহের দায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত, আসামি হিসেবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছি। জেলখানায় আমাকে এক নিঃসঙ্গ ও নিকৃষ্টতম কামরায় বন্দি করে রাখা হয়েছিলো। রেডিও, কোন চিঠিপত্র দেয় নাই।’ অধ্যাপক আবু সাইয়িদের এক কলাম থেকে জানতে পারি, ইয়াহিয়া খান গ্রেফতারের পূর্বে ভূট্টোকে অনুরোধ করেছিলেন শেখ মুজিবের মৃত্যুদন্ডা দেশ কার্যকর করতে। কোন ব্যবস্থাই তার মনোবল চিড় ধরতে পারেনি। তার জিহব্বা থেকে এমন শব্দ আদায় করতে পারেনি যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বিভ্রান্ত ও বিপদগামী করতে পারে। তার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিলো। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষতো একবারই মরে।’ এটাও তার অপ্রতিরোধ্যতা। এতবড় রাষ্ট্র চীন। আমাদের বিরোধিতা করেছে। জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভেরও বিরোধিতা করেছে। কিন্তু তিনি তার ক্যারিশমা দিয়ে জাতিসংঘের সদস্যপদ ছিনিয়ে এনেছেন। সেই জাতিসংঘে তিনি মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। এটাও তার অপ্রতিরোধ্যতা। মহাকবি মাইকেল মাত্র সাড়ে তিন বছরে বাংলার কাব্যকে ৫০ বছর এগিয়ে দিয়ে গেছেন, আর তিনি ৩ বছরে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন। আমেরিকার এক পত্রিকা, তাকে বলেছে ‘রাজনীতির কবি।’ বাঙালি কবি নির্মালন্দু গুনও ৭ মার্চের ভাষণকে বলেছেন, ‘অমর কবিতা খানি।’ এদেশের প্রতিটি মানুষকে, প্রতি ইঞ্চি মাটিকে, প্রতিটি পাখ-পাখালিকে, প্রতিটি বৃক্ষ-পলবকে ভালোবাসতেন তিনি। তার ভালোবাসা শুকতারা হয়ে আকাশে জল জল করছে। জয় বাংলা।

মাহমুদুল বাসার
কলাম লেখক, গবেষক।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Digg thisShare on Tumblr0Email this to someonePin on Pinterest0Print this page

comments

Bangla Converter | Career | About Us