ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ২১ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড

ঢাকা মঙ্গলবার, ৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ , হেমন্তকাল, ১১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০

জীবনযাপন, লিড নিউজ, সড়ক সংবাদ স্বেচ্ছাসেবী ট্রাফিক পুলিশ আজাহার আলীর মানবেতর জীবন

স্বেচ্ছাসেবী ট্রাফিক পুলিশ আজাহার আলীর মানবেতর জীবন

নিরাপদনিউজ : পরনে ট্রাফিক পুলিশের পোশাক আর হাতে লাঠি নিয়ে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন আজাহার আলী। আজহার আলী স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ট্রাফিক আজহার নামে। ১২ বছর ধরে পুলিশের পুরনো রংচটা পোশাক পড়ে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের মান্দা ফেরীঘাটের চৌরাস্তায় ট্রাফিক সেবা দেন।এর আগে, পাশের মহাদেবপুর ব্রীজের মোড়ে ৮ বছর ট্রাফিক সেবা দিয়েছেন।

দেখলে পুলিশ সদস্য মনে হতে পারে কিন্তু আজাহার আলী কেবলই একজন স্বেচ্ছাসেবী ট্রাফিক। সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও নির্বিঘ্নে যান চলচলে সহযোগিতা করার কাজ করেন। হুইসেল বাজিয়ে শিক্ষার্থী, নবীন-প্রবীণ সব বয়সের পথচারীকে সড়ক পারাপারে সহযোগিতা করেন। রোদ, বৃষ্টি ঝড় মাথায় নিয়ে পুরোদস্তুর ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি। পোশাকের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহৃত টুপি-বাঁশিও পুরোনো। তাতে আক্ষেপ নেই দরিদ্র আজাহারের। কারণ তার লক্ষ্য-  নিরাপদ সড়ক নিশ্চত করা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আজাহার আলী ২০ বছর আগে মহাদেবপুর ব্রীজের পাশে একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা দেখেছিলেন। ওই ঘটনায় হতাহতাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। আহতদের হাসপাতালে নেয়ার কাজটি করেছিলেন। নিহতের মৃতদেহ পাহারা দিয়েছেন। এরপরই আর ঠিক থাকতে পারেননি। ঘটনার পর দিন থেকেই সেখানে আনসারের পোশাক পড়ে নিজের কাঁধে তুলে নেন ট্রাফিকের দায়িত্ব। তার স্বপ্ন এখন আর কেউ যেন এভাবে সড়কে অকালে ঝরে না যায়। এর আগে করতেন দিন মজুরের কাজ। কিছু দিন ঢাকা শহরে রিকশা চালিয়েছেন। সেখানে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালনের কৌশল শিখেছেন তিনি। হত দরিদ্র আজাহার আলীর বাড়ি নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার লক্ষীরামপুর গ্রামে।

প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সেখান থেকে তিনি প্রতিদিন সেবা দিতে ফেরীঘাটে আসেন। ভ্যান-রিকশা কিম্বা অটোতে আসা যাওয়া করেন। পকেটে পয়সা না থাকলে কখনও কখনও পায়ে হেঁটেই চলতে হয়।

স্থানীয়রা জানান, ব্যস্ততম ফেরীঘাট চৌরাস্তায় একজন ট্রাফিক নিয়োগের দাবি অনেক দিনের। আজাহার স্বেচ্ছাশ্রমে সেটি পূর্ণ করেছে। ফলে দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন পথচারী। একইসাথে যানবাহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বজায় থাকছে। এর বিনিময়ে তিনি সহযোগিতার জন্য কারো কাছে হাতও পাতেন না। তবে কেউ কেউ ৫/১০ টাকা করে বকশিস দিয়ে থাকেন। এতেই আজাহার মহা খুশি।

আজাহারের বয়স প্রায় ষাট বছর। পরিবারে রয়েছে স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে, ছেলের বউ ও দুই নাতি-নাতনি। মাটির ছোট্ট দুটি ঘরে খুব কষ্টে থাকতে হয় তাদের। ঘরের মধ্যেই ছাগল রেখে এক পাশে রাতে ঘুমাতে হয় জানান আজাহারের স্ত্রী শেফালী খাতুন। ছেলে আশরাফুল মাছ ধরে সংসার খরচে যোগান দেন। কিন্তু বছরের অধিকাংশ সময়েই মানবেতর জীবন কাটাতে হয় জানান ছেলের বউ সায়মা।শেষ জীবনে ভাল কাজের স্বীকৃতি আর তাকে একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়ার আবেদন জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও আজাহারের পরিবারের সদস্যরা।

এদিকে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে এক যুগ ধরে বিনা পারিশ্রমিকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে আশা ৫৫ বছরের আজাহার আলীর অর্থকষ্টে থাকার বিষয়টি নিরাপদ সড়ক চাই এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নজরে এলে তিনি ভীষনভাবে আবেগে আপ্লুত হন। এরপর নিজ উদ্যোগে তিনি আজহার আলীর সঙ্গে নিরাপদ নিউজ এর মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন এবং আজহার আলীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর নেন। নিরাপদ নিউজের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, আজাহার আলীকে নতুন ইটের বাড়ি, যাতায়াতের জন্য সাইকেল ও জেলা পুলিশের রেশন থেকে সহযোগিতার ব্যবস্তা করা হবে বলে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

আজাহার আলী বলেন, আমার অসহায়ত্ব দেখে এসপি স্যার (পুলিশ সুপার) যে সহযোগিতা করার উদ্যোগ নিয়েছেন তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আশা করছি পরিবার পরিজন নিয়ে একটু মাথা গোজার ঠাঁই হবে।

মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) মাহবুব আলম নিরাপদ নিউজকে বলেন, এসপি স্যার নিজেই আজাহারকে বাড়ি তৈরি করে দেয়ার জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে তার বাড়িতে ইট, বালু ও অন্যান্য জিনিসপত্র পৌঁছানো হয়েছে। ২/১ দিনের মধ্যেই দুই ঘর বিশিষ্ট বাড়ি নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

নওগাঁর পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন থেকে স্বেচ্ছায় ট্রাফিক পুলিশের সেবা দিয়ে মহৎ কাজ করেছেন আজাহার আলী। মহৎ কাজে পুলিশ সবসময় সহযোগিতা করবে। প্রাথমিক অবস্থায় তার জন্য একটি ইটের বাড়ি তৈরি করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে অন্যান্য সহযোগিতা করা হবে।

সড়ক দুর্ঘটনারোধে আজহার আলীর এমন কাজকে ইলিয়াস কাঞ্চন প্রসংশনীয় বলে অভিহিত করেন এবং তাকে ব্যক্তিগতভাবে এই কাজের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আজহার আলীকে আর্থিক সহযোগীতা করার আহবান জানান। সমাজের বিত্তবান মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষন করে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, নিঃস্বার্থভাবে আজহার আলী যে কাজটি করছে তা সমাজের জন্য অত্যন্ত উপকারজনক। আজহার আলী ব্যক্তিজীবনে আর্থিকভাবে অসচ্ছল,আপনারা যারা সমাজে বিত্তবান মানুষ আছেন তারা সকলে এক সাথে এগিয়ে এলে আজহার আলীকে সহযোগীতা করলে তার এই অভাব আর থাকবে না। সেই সাথে তিনি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, পুলিশ প্রশাসন আজহার আলীর জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন সেটি যেন দ্রুত বাস্তবায়ন হয় এবং সড়ক দুর্ঘটনারোধে নি:স্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়া এই মানুষটির একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয় তার মুখে হাসি ফোটে এই আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

যদি কোন সহৃদয় ব্যক্তি আজহার আলীকে আর্থিক ভাবে সহযোগীতা করতে চান তাহলে নিম্নে দেওয়া নম্বরে সরাসরি আজহার আলীর সাথে যোগাযোগ করেত পারেন 01734445141

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)