ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ডিসেম্বর ১১, ২০১৪

ঢাকা সোমবার, ৩০ আশ্বিন, ১৪২৬ , শরৎকাল, ১৪ সফর, ১৪৪১

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সড়ক সংবাদ সড়ক পথে মরণ নয়, নিরাপদ জীবন চাই

সড়ক পথে মরণ নয়, নিরাপদ জীবন চাই

ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার

ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার

যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ, নিরাপদনিউজ ডেস্ক, ১১ ডিসেম্বর ২০১৪: ব্লাকস্পট ২০৯টি: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণায় এসেছে, দেশে সারা বছর যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে এর ৩৫ শতাংশ ঘটে জাতীয় মহাসড়কের ৪ ভাগ এলাকায়। মহাসড়কের ২০৯টি স্থানকে অতি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে এগুলোকে ‘ব্লাকস্পট’ নাম দিয়েছে এআরআই। এসব ব্লাকস্পটের তালিকা ২০০৯ সালেই যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ১১টি স্থান বাদ দিলে আর কোথাও তেমন কোনো কাজই হয়নি। স্পটগুলোতে সতর্কতামূলক কোন ব্যবস্থা চোখে পড়ে না।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগরে জাতীয় স্মৃতিসৌধ থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার পথে মাত্র ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কের বাঁক প্রশস্ত করার মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা যথেষ্ট কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) হিসাব মতে, এ মহাসড়কের ওই অংশে ২০১১ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছিল ১৭৫টি। ১১টি বাঁক প্রশস্ত করার পর ২০১৩ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা নেমে আসে ২৫টিতে। ২০১১ সালে মারা যায় ৯৬ জন। আর ২০১৩ সালে মৃতের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৫ জনে। আহতের সংখ্যাও কমেছে প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ। ২০১০ সালের চেয়ে ২০১২ সালেও একইভাবে দুর্ঘটনা এবং হতাহতের সংখ্যা কমেছে নবীনগর থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত।

এ দৃশ্য যেন নিত্যদিনের

এ দৃশ্য যেন নিত্যদিনের

৫৭ কিলোমিটারেই ঘটছে
৯৫ ভাগ দুর্ঘটনা
প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ৩ হাজার ১৩৭ মারা যায়। সম্প্রতি একটি গবেষণায় জানা যায়, এর মধ্যে নির্দিষ্ট ৫৭ কিলোমিটার সড়কের মধ্যেই ঘটছে ৯৫ ভাগ দুর্ঘটনা। ব্র্যাক ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত সড়কে নিরাপত্তা : ‘বাস্তবতা এবং প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুুর রহমান। তিনি জানান, সড়ক দুর্ঘটনা-সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনা, স্থানীয় মানুষ, যানবাহনের মালিক, সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে দলীয় আলোচনা, চালকদের ওপর একটি জরিপ এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ দুটি এলাকায় নিবিড় অনুসন্ধানের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়েছে। ২০১৩ সালের শেষের দিকে শুরু হয়ে চলতি বছরের প্রথমদিকে এ গবেষণা কাজটি পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় বলা হয়, ২০০০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতি বছর তিন হাজার ১৩৭ মারা গেছেন। এ সময় ৪৭ হাজার ৫৮৯টি দুর্ঘটনা ঘটে। এ ১৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা যায় ২০০৮ সালে তিন হাজার ৭৬৫।
দেশে জাতীয় মহাসড়কের দৈর্ঘ্য তিন হাজার ৫৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার, নগরবাড়ী-বাংলাবান্ধা ৭ দশমিক ৯ কিলোমিটার, নগরবাড়ী-রাজশাহী ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার, দৌলতদিয়া-ঝিনাইদহ-খুলনা ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার, ঢাকা-সিলেট ৫ দশমিক ১ কিলোমিটার, গাজীপুর-টাঙ্গাইল-জামালপুর ২ দশমিক ৬ কিলোমিটার, বঙ্গবন্ধু সেতু সংযোগ সড়কে ১ দশমিক ২ কিলোমিটার এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত। বাসস্ট্যান্ড এলাকার কাছাকাছি সবচেয়ে বেশি প্রায় ৪১ ভাগ দুর্ঘট ঘটে। এরপর বাজারের কাছের এলাকায় ২৮ দশমিক ৪০ ভাগ। সংযোগ সড়কে ঘটে দুর্ঘটনার প্রায় ১৮ ভাগ।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের পাঁচটি জেলা সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ। এগুলো হল- কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকা। ২০১২ সালে কুমিল্লায় সর্বোচ্চ ১২৪ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। এরপর ঢাকায় ১০৫, টাঙ্গাইলে ১০২, সিরাজগঞ্জে ৯৬ ও চট্টগ্রামে ৯৫। ২০১২ সালের গবেষণায় বলা হয়েছে, মহাসড়কের সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে ৫৪ দশমিক ৭ কিলোমিটার এলাকায়। ওই বছরে সারা দেশে মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬৩৭। এতে মারা গেছেন ২ হাজার ৫৩৮। এর মধ্যে ওই সাড়ে ৫৪ কিলোমিটারে ১ হাজার ৫০৫টি দুর্ঘটনা ঘটে এবং মারা গেছে ১ হাজার ২৮৪জন।

কাকে দুষবো আমরা?

কাকে দুষবো আমরা?

সড়ক দুর্ঘটনায় ঝুঁকিপূর্ণ
তিলোত্তমা ঢাকা
জনসংখ্যার ভারে অচল ৪ শত বছরের তিলোত্তমা নগরী ঢাকা। জনসংখ্যা আর যানবাহনের নগরী ঢাকা এখন সড়ক দুর্ঘটনার চরম ঝুঁকিতে আছে। গত বছর সারা দেশে যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে তার ৪২ ভাগই ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। আর এ বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির প্রায় অর্ধেক ঘটেছে ঢাকা মহানগরে এলাকায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০২০ সালের মধ্যে দেশে দুর্ঘটনার হার দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এ অবস্থায় জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরকার ২০২০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনার হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে। তবে তা নানা জটিলতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

এই যদি হয় রাস্তার দৃশ্য তাহলে আপনার বিবেককে প্রশ্ন করুন কিভাবে কমবে সড়ক দুর্ঘটনা

এই যদি হয় রাস্তার দৃশ্য তাহলে আপনার বিবেককে প্রশ্ন করুন কিভাবে কমবে সড়ক দুর্ঘটনা

রাজধানীর ৫১ স্পট
দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট ঢাকা নগরীর ৫১টি পয়েন্টকে দুর্ঘটনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব পয়েন্টের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, সোনারগাঁও, বিজয় সরণি, শনির আখড়া, জসিমউদ্দীন রোড ক্রসিং, শাহবাগ, সায়দাবাদ ও জিপিও মোড়। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ঢাকায় দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনার কারণে প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ ফিটনেসহীন যানবাহন ও প্রশিক্ষণহীন গাড়িচালক। একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্র্রতিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ প্রশিক্ষিত গাড়িচালকের অভাব। গাড়িচালকদের বেশিরভাগের কাছে নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স। এ অবস্থায় ৬ লাখ অবৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স জব্দ করাসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার ও দ্রুত চিকিৎসা দেয়ার কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। মহাসড়কের পাশে কয়েকটি ট্রমা সেন্টার নির্মিত হলেও এগুলো আহতদের যথাযথ সেবা দিতে পারছে না। ফলে মফস্বল এলাকা থেকে বড় শহর বা রাজধানীতে যাওয়ার পথেই আহত অনেকের প্রাণহানি ঘটছে।
অভিযুক্ত আসামিদের
৮৩ ভাগ অধরা
সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় জড়িত চালকদের শনাক্ত করা এখন বহুগুণ সহজ হয়ে এলেও গত পাঁচ বছরে আসামি গ্রেফতারের হার বাড়েনি। ২০১৩ সালে সারা দেশে চার শতাধিক থানায় সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত ২ হাজার ২৯টি মামলা করা হয়। আসামি করা হয় ২ হাজার ৫৭। তবে পুলিশ মাত্র ৩৫২ জনকে গ্রেফতার করেছে। বাকি ১ হাজার ৭০৫ রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অর্থাৎ অভিযুক্তদের মাত্র ১৭ ভাগকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অধরা প্রায় ৮৩ ভাগ।
দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও পুলিশ প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। নথিপত্রে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটায় দায়ী ব্যক্তিদের বেশিরভাগই গাড়ির চালক।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৮ সালে সারা দেশের বিভিন্ন থানায় সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলা করা হয় ৪ হাজার ৪২৬টি। আসামি করা হয় ৪ হাজার ৪৩৬। এর মধ্যে ১৫৬ ছাড়া বাকি ৪ হাজার ২৮০ ছিল গাড়ির চালক এবং তাদের বেশিরভাগই ছিল বাস ও ট্রাকের। ওই বছরের পুলিশ প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, আসামিদের মধ্যে মাত্র ৭৬১ ধরা পড়ে। সেবারও ৮৩ ভাগ আসামিই ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ থেকে বলা যায়, ৫ বছরেও গ্রেফতার পরিস্থিতির অগ্রগতি হয়নি।
৫০ ভাগ দুর্ঘটনায়
দায়ী চালকরাই
দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে গত বছর ৩৪০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসবের মধ্যে ১৬৯টি দুর্ঘটনার নেপথ্যে ছিল বাসচালকরা। অর্থাৎ রাজধানীর ৪৯ ভাগ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ছিল বাসচালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো।
পুলিশ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ৩৪০ আসামির মধ্যে মাত্র ১৯৬ আসামিকে গ্রেফতার করতে পেরেছে পুলিশ। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ২০১৩ সালে ৩৪০টি সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে ১৬৯টি দুর্ঘটনার নেপথ্যে ছিল বাসচালকরা।
চালকদের ওপর করা জরিপে দেখা গেছে, বাসের চালকরাই সবচেয়ে বেশি (৪৮ দশমিক ৭ ভাগ) দুর্ঘটনা ঘটান। চালকদের ৮১ ভাগ প্রশিক্ষণ ছাড়া, শুধু ওস্তাদদের কাছ থেকে শিখেই হেল্পার থেকে চালক বনে যান। চালকদের ৪৮ ভাগই মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষিত। চালকদের সবাই অধিক রোজগারের জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করেন। জরিপে দেখা গেছে, ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালান ৪৮ ভাগ চালক। ১৯ ভাগ চালক গাড়ি চালান ১৩ থেকে ১৬ ঘণ্টা। আবার এসব চালকের গ্রামে বাড়ি থাকলেও ৪১ ভাগই ঘুমান গাড়িতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বেশিরভাগ চালক লেখাপড়া জানেন না। তাদের রোডসাইন সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। গাড়ি চালানোর সময় কোথায় ওভারটেক করা যাবে এবং কোথায় যাবে না, সে বিষয়ে তাদের ধারণা নেই।
চলতি বছর ৬ মাসে নিহত
প্রায় ৪ হাজার
২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে দেশে ৩ হাজার ২৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৭৭০ যাত্রী, চালক ও পরিবহন শ্রমিক নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটি দেশের জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ পর্যবেক্ষণ করে এ দাবি করে।
সংগঠনটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে ৩ হাজার ২৫৬টি। নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৭০। আহত হয়েছেন ১০ হাজার ২৭৮। এর মধ্যে হাত-পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন ৯২৩। সড়ক দুর্ঘটনায় ৮১২টি বাস, ১ হাজার ২২টি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ৩৪২টি হিউম্যান হলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া ১৩৫টি প্রাইভেট কার-জিপ-মাইক্রোবাস, ৫১৪টি অটোরিকশা, ৮৪৯টি মোটরসাইকেল, ৩১৫টি ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৫১৩টি নসিমন-করিমন দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুর্ঘটনায় শিকার হয়েছেন ৩৬১ ছাত্র, ৭০ শিক্ষক, ২৬ সাংবাদিক, ২৭ ডাক্তার, ১৭ আইনজীবী, ১৭ ইঞ্জিনিয়ার ও ১৪৮ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। এছাড়া ১০৮ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ৭৭ সরকারি কর্মকর্তা, ১ হাজার ১৫৯ নারী ও ৬৯৮ শিশু এসব দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। দুর্ঘটনায় বেশিরভাগ পরিবারই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার।
সংগঠনটি জানায়, জানুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় ৪ হাজার ১৮০টি, এসব দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪ হাজার ৭১৬ এবং আহত হন আরও প্রায় ১৩ হাজার।
বিশেষজ্ঞের অভিমত
মালিক আর গাড়ি দেখেই ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয় বিআরটিএ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, পুলিশের রিপোর্টে দুর্ঘটনার জন্য মাত্রাতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া গাড়ি চালানোকে দায়ী করা হয়। অথচ এ দুটির বাইরেও দুর্ঘটনার আরও অনেক কারণ থাকে। সঠিক কারণ চিহ্নিত না হলে এবং সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, বিআরটিএ থেকে হাস্যকর প্রক্রিয়ায় গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়া হয়। একটি গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার জন্য ৪১টি আইটেম পরীক্ষা করতে হয়। অথচ মালিক আর গাড়ি দেখেই বিআরটিএ’র পরিদর্শক ফিটনেস সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছেন। এটা করলে নিরাপদ সড়ক কখনোই পাব না। ফিটনেস দেয়ার বর্তমান প্রক্রিয়াটা বিজ্ঞানভিত্তিক নয় মন্তব্য করে তা সংস্কারের দাবি জানান তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে ড. শামসুল হক বলেন, গাড়ির ফিটনেস দেবে সরকার, কিন্তু টেস্টগুলো করবে বেসরকারি কোম্পানি। সরকার ও বিআরটিএ নজরদারির ভূমিকায় থাকবে। সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে সেফটি অডিট চালু হয়নি। দুই স্তরের সড়ক নির্মাণ করলে কম গতি ও বেশি গতির গাড়ি আলাদাভাবে চলতে পারবে। এতে দুর্ঘটনা কমে আসবে। এ ছাড়া মহাসড়কের পাশের ভূমির নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করার পরামর্শ দেন তিনি।
নিরাপদ সড়ক চাইয়ের (নিসচা) চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন এক সাক্ষাৎকারে  বলেছেন, সড়ক দুর্ঘটনার দায় একক কোনো সংগঠনের নয়। সড়ক দুর্ঘটনা যেমন একক কারণে নয়, তেমনি দুর্ঘটনা রোধ করার দায়িত্বও একক কোনো কর্তৃপক্ষের নয়। সড়ক দুর্ঘটনায় সড়কের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক মন্ত্রণালয় রয়েছে। এসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কিন্তু সেতুমন্ত্রীর একার নয়। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সাধারণ মানুষ, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, সংগঠন, সবারই দায়িত্ব রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব সরকারের।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৫০টির মতো কারণ রয়েছে। এর মধ্যে মহাসড়কে গাড়ি চালানোর নিয়মগুলো না মানা, অদক্ষ ড্রাইভার বিশেষ করে প্রশিক্ষণ ছাড়া হেলপার থেকে ড্রাইভার বনে যাওয়া, অশিক্ষিত ড্রাইভার, ওভারলোড, ওভারটেকিং, পুলিশের নানা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাওয়া, গতি সম্পর্কে ধারণা না থাকা অন্যতম।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শুধু সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিলে হবে না। এজন্য প্রত্যেকে নাগরিককেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ড্রাইভারদের সামাজিক মর্যাদা দিতে হবে। রাস্তা পারাপারসহ গাড়ি চলাচলে ট্রাফিক আইন মেনে আচরণ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে ট্রাফিক আইন মেনে না চলার যে মানসিকতা মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে, তার পরিবর্তন আনলেই দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং রাস্তার পাশের ভূমি ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার কমাতে দক্ষ রেসকিউ টিম প্রয়োজেন। দুর্ঘটনার কারণে বছরে জিডিপির দেড় থেকে দুই শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে উল্লেখ করে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এ কারণে প্রতি বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এজন্য সড়ক দুর্ঘটনা রোধে একটা আলাদা বিভাগ তৈরি করার দাবি জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কাজ করে যাচ্ছি
সড়কপথে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় শত শত প্রাণহানি প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যুগান্তরের গোলটেবিল বৈঠকে বলেছেন, আমি চাই সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নেমে আসুক, সহনীয় পর্যায়ে আসুক। সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। সাধারণ মানুষের উন্নয়নে কাজ করতে চাই। আমি চাই সড়কপথে প্রতিটি মানুষের জীবন হোক নিরাপদ। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ব্লাক স্পটগুলো আগেই চিহ্নিত করেছি। অনেক ‘যুদ্ধ’ করে বাকি ১৪৪টি স্পটের জন্য ১৬৫ কোটি টাকা একনেকে অনুমোদন করানো হয়েছে। এগুলো সারাতে জানুয়ারি থেকে টেন্ডার আহ্বান করা হবে। এ সড়কে মাত্র ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা ঠিক করা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনা ৯৫ ভাগ কমে এসেছে। মাত্র ২১ কোটি টাকায় অনেক প্রাণ বেঁচে যাচ্ছে বলে দাবি করেন মন্ত্রী।
সড়ক নিরাপত্তার জন্য ইউএনডিপির সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এ চুক্তি অনুযায়ী ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনাকে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে। ইউএনডিপি এ কাজে অর্থসহ সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।
সম্প্র্রতি নাটোরের মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, একটি দুর্ঘটনায় ৩৬ মানুষ মরে গেল। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির চালক লাইসেন্সহীন, গাড়ির ফিটনেসও নেই।
অবৈধ যানবাহন ও চালকের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিশেষ অভিযানের তথ্য তুলে ধরে ওবায়দুল কাদের জানান, ১০ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৬ হাজার ১৫০টি, জরিমানা হয়েছে ৪৭ লাখ ৫০ হাজার, ডাম্পিং হয়েছে ২৬২টি , ৪৯ জেলে যেতে হয়েছে। এ ১৭ দিনে মারা গেছেন ২৪। তুলনামূলকভাবে এ মৃত্যু হার কম বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার আবদুল জলিল বলেন, পুলিশের তথ্য অনুযায়ী দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ ভাগের কারণ হচ্ছে ওভারস্পিডিং বা মাত্রাতিরিক্ত গতি। এ কারণে ছুটির দিনে দুর্ঘটনা বেশি হয়। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির মালিক ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে সমঝোতা হয়। তাই অনেক ক্ষেত্রে মামলা হয় না। এসব কারণে দুর্ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি আরও বলেন, এ দেশে আইন প্রয়োগে কঠোর হওয়া খুব কঠিন। আইন প্রয়োগে বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার দায় সবার। কাউকে প্রতিপক্ষ করে এ অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, রাস্তার বাঁকের কারণে দুর্ঘটনা হয়, নসিমন-করিমনের কারণেও হয়। শুধু চালকের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। তিনি বলেন, আমরা সঠিকভাবে চালকের লাইসেন্স নিতে চাই। কোনো চালকের লাইসেন্স না থাকলে দুর্ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ৩০৪ ধারায় মামলা হয় না। তখন ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা হবে। আমরা নিয়ম মেনে লাইসেন্স নিতে চাই। সঠিক নিয়মে চালকের লাইসেন্স দেয়ার দাবি জানান তিনি।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কালাম বলেন, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যে মরণফাঁদ ছিল, তার ৪০টি পয়েন্টে কাজ করা হয়েছে। এখন দুর্ঘটনা ৯৫ ভাগ কমে গেছে। হাইওয়েতে দুর্ঘটনা হলে স্পট থেকে ১০-১৫ মাইল দূরে থানায় গিয়ে মামলা করতে হয়। এ কারণে প্রত্যক্ষদর্শী ও গাড়ির যাত্রীরা চলে যান। আহত ব্যক্তি যান হাসপাতালে। অনেক সময় মামলা হয় না, হলেও সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকে না।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, চাহিদা থাকা সত্ত্বেও গণপরিবহনের ভয়াবহ সংকট চলছে। এ কারণে লক্কড়-ঝক্কড় বাসে উঠতে যাত্রীরা বাধ্য হচ্ছেন। পথচারীদের ফুটপাথ ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে বাধ্য করা হচ্ছে। অথচ শত শত পয়েন্টে ফুটওভার ব্রিজ নেই, জেব্রা ক্রসিং নেই। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বেশিরভাগ দুর্ঘটনার জন্য চালকদের দায়ী করা হচ্ছে। এজন্য পাঁচ বছর আগে চালক তৈরির জন্য সরকার একটি প্রকল্প নিয়েছিল। কিন্তু সেটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি।-দৈনিক যুগান্তর

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)