ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট নভেম্বর ২২, ২০১৯

ঢাকা শনিবার, ২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১৫ রবিউস-সানি, ১৪৪১

নিসচা সংবাদ, মতামত, লিড নিউজ ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি বিকৃতি ও অপমান: প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে গোটা দেশ

ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি বিকৃতি ও অপমান: প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে গোটা দেশ

নিরাপদ নিউজ:  মোটরযান আইন ২০১৮ কার্যকর হয়েছে। নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে সারাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে চলছে সড়ক ধর্মঘট। ফলে দূরপাল্লার রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। শ্রমিকেরা রাস্তাঘাটে নেমে ভাঙচুর করছেন। আন্দোলন করছেন।

তবে গাজীপুর জেলার চালক মালিক সমিতির যত ক্ষোভ ইলিয়াস কাঞ্চনের ওপর। কারণ তার তৎপরতায় নাকি এই আইন হয়েছে। আর এ কারণেই ইলিয়াস কাঞ্চনের গালে জুতা মারার কথা লিখে ব্যানার টানানো হয়েছে। ছবিটি ফেসবুকে কেউ একজন পোস্ট করে, এরপরেই ভাইরাল হয়ে যায়।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ দুই যুগ ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। সড়ক দুর্ঘটনায় নিজের স্ত্রীকে হারিয়ে পথে নেমেছেন তিনি।প্রশ্ন জাগতে পারে,তিনি যা হারাবার তা তো হারিয়েছেনই,তবে কেনো এই রাত দিন এক করা নিরাপদ সড়ক চেয়ে? তাঁর পরিবারের মতো আর কোন পরিবার যেনো স্বজন হারা না হয়,তাঁর সন্তান দের মত আর কোন শিশুর শৈশব যেন মাতৃহারা না কাটে।

সংগঠনগুলোর ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি নিয়ে এমন কাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়েছে সাধারণ মানুষেরা। বিশেষ করে যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন তারা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। বলছেন, ‘এই দেশে গুণীদের কদর এভাবেই করা হয়।’  ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি বিকৃতি ও অপমানের প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে যেন গোটা দেশ। সোশাল মিডিয়া সহ গ্রামগঞ্জ শহর হাট বাজার চায়ের দোকান সর্বত্র চলছে এখন শুধু একটাই আড্ডা সমাজের জন্য ভালো কাজ করা একজন মানুষ যিনি নিজের জীবনের সব কিছু ত্যাগ করে দীর্ঘ ২৬বছর ধরে সড়ককে নিরাপদ করার আন্দোলন করে যাচ্ছেন এমন সন্মানিত মানুষকে অপমান মেনে নিতে পারছেনা কেউ।

নেটিজেনরা বলছেন, ‘এদেশে কেউ যখন ভালো কাজ করতে চায় তখন তার কপালে জুটে অপমান,লাঞ্চনা,হামলা,মামলা।জনগণের ভালো করতে গিয়ে কেউ যদি ক্ষমতাসীনদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তার কপালে জুটে মৃত্যু। এই লোকটি প্রায় ২৬ বছর ধরে নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে অথচ তার কপালে জুটছে কেবল অপমান আর লাঞ্চনা।’

একজন ইলিয়াস কাঞ্চন। সড়ক দুর্ঘটনার নির্মম স্মৃতির সাক্ষ্য বয়ে চলেছেন বছরের পর বছর। ১৯৮৯ সালে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবন। কিন্তু ১৯৯৩ সালে সড়ক কেড়ে নেয় তার স্ত্রীর জীবন। প্রিয় হারানোর শোক শক্তিতে পরিণত করেন বাংলা চলচ্চিত্রের এই জনপ্রিয় নায়ক।

এদিকে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ স্লোগান নিয়ে ছুটে বেড়ান দেশের একপ্রাপ্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। এরপরই বাংলাদেশের সড়কে ফোরলেন, সড়কে ডিভাইডার তৈরি, মহাসড়ক থেকে নসিমন-করিমন উঠিয়ে নেওয়া, প্রতিবছর নিরাপদ সড়ক দিবস পালন করা- এমন অসংখ্য সাফল্য এসেছে।

আর ঠিক তেমনি সড়ক পরিবহণ শ্রমিকদের তোপের মুখেও পড়তে হয়েছে এই ‘নিঃস্ব শেরপা’কে। কিন্তু সময়ে-অসময়ে কখনোই নিজেকে রাজপথে থেকে উঠিয়ে নেয়নি। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চেষ্টা করেছেন একটি যুগোপযোগী ও সবার স্বার্থরক্ষাকারী আধুনিক আইন প্রণয়নের জন্য জনমত গড়ে তুলতে। আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে টানা আন্দোলনের পর কাক্ষিত সেই পরিবহণ আইন এখন সড়কে।

যদিও নতুন এই সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে গত কয়েকদিন বাংলাদেশের বাস-ট্রাক শ্রমিকরা ‘কর্মবিরতি’ পালন করেছেন। আর সেখানে চলচ্চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিকে হেয় প্রতিপন্ন করার অভিযোগ উঠেছে।সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি সম্বলিত ব্যানার টাঙিয়ে কিংবা কুশপুত্তলিকা তৈরি করে সেখানে জুতার মালা দেয়া হয়েছে।

অঘোষিত কর্মবিরতি চলার সময়ে বুধবার দুপুর থেকে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর চেয়ারম্যান ও অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের কুশপুতুল বানিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে ভূঞাপুর বাসস্ট্যান্ড চত্বরে দাঁড় করিয়ে সড়ক অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকরা

শ্রমিকদের এসব কর্মকাণ্ডে ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চনের ভক্তকুলসহ সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষেরা। তাই আজ মহানায়ক সড়ক যোদ্ধা ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি পুড়িয়ে বিক্ষোভ করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সারাদেশে চলছে প্রতিবাদের ঝড়। সাধারন জনতা থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, চারকীজীবি,মিডিয়া অঞ্জনের কর্মি,সাংবাদিক কর্মি সকলে নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন নিজেদের মতো করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে নেয়া কিছু প্রতিবাদি স্টাটাস নিরাপদ নিউজে তুলে ধরা হলো:

নিরাপদ সড়ক চাই’র যুগ্ম-মহাসচিব লিটন এরশাদ তার ফেইসবুক প্রোফাইলে একটি স্টাটাসে লিখেছেন-

বাহ্ বেশতো… কাকে অসম্মান করছেন? রাস্তায় জড়ো হয়ে অযৌক্তিক দাবিতে কয়েকখানা ছবি পুড়িয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে দিনশেষে কি পেলেন? যাদের প্ররোচণায় নিজেকে সমাজে নিন্দিত করছেন, ঘরে ভাতের চাল আছে কিনা ঐ ইন্ধনদাতারা কখনও খোঁজ নিয়েছেন কি? বলতে পারেন… আপনারা যাকে মাটিতে নামিয়ে আনতে চাইছেন তিনি হিমালয়ের মত ব্যক্তিত্ব নিয়ে আকাশচূড়ায় অবস্থান করছেন সবার ভালবাসায়… কারণ তিনি অন্যায়ের কাছে কখনই মাথা নত করেন নি… আর ভয় দেখাবেন? সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাদ আস্থা ও বিশ্বাসে সত্যের পথে চলছেন… একমাত্র সৃষ্টিকর্তার কাছেই তিনি দায়বদ্ধ… অতএব এসব ঠুনকো ভয় তিনি কখনও করেন নি… ২৬ বছরে জল কম ঘোলা হয়নি! কিন্তু তিনি সড়কের মড়ক বন্ধে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বদ্ধ পরিকর… তিনি একজন যোদ্ধা… যোদ্ধারা জানেন লড়াই করে বিজয় ফিরিয়ে আনতে… লড়ছেন তিনি, লড়বেন তিনি, লড়েই যাবেন তিনি… স্যালুট যোদ্ধা আপনাকে।

রূপন্তী নামে একজন লিখেছেন, ইলিয়াস কাঞ্চন একজন এমন মানুষ যাকে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ার সব মানুষ সৎ ও ভাল নিষ্ঠাবান হিসেবেই চেনেন ও মানেন(শুধু যারা এখন উনার বিরুদ্ধে মিথ্যে নোংরামি করছে,করেছে আগে এরা ছাড়া)। আর এতে বিচলিত হবার কিছুই নেই।কারণ,ভাল মানুষের ভাল কাজে কিছু অমানুষ পিছু লেগে থাকবেই সেগুলি পেরিয়ে কিভাবে সফলতার শিখরে পৌঁছাতে হয় তা ইলিয়াস কাঞ্চনেরা জানেন।আর এসব কিছু বর্বর কীট ও বকলম মুর্খদের কাছে এর চেয়ে কি ই বা হোপ করা যায়।এসব পায়ে পিসে এগিয়ে যান সুপারস্টার সুপার হিউম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন।আল্লাহ আপনার ভাল কাজের সহায় হবেন ইনশাআল্লাহ।ভালবাসা নিরন্তর।

মুজাহিদ খান নামে একজন লিখেছেন,  ছোটবেলা ইলিয়াস কাঞ্চনের সিনেমার একনিষ্ঠ দর্শক ছিলাম শুধু অভিনয় নয় মূলত তার জীবন কাহিনী এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে। ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন নিহত হয়েছিলেন ১৯৯৩ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায়।
তার মৃত্যুকে ঘিরে সেদিন সারাদেশে আলোড়ন উঠেছিলো যেমন তেমনি সেই ঘটনায় পাল্টে গেছে স্বামী ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবন।এরপর থেকে গত প্রায় আড়াই দশক ধরে তিনি চালাচ্ছেন নিরাপদ সড়কের সংগ্রাম।

বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন “যাদের ভালোবাসায় আমি ইলিয়াস কাঞ্চন তাদের বাঁচাতে যদি আমি জিরো হয়ে যাই তাতে আমার কিছু যায় আসেনা”।এমন ভাবনা থেকেই শুরু করলেন নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন যা চালিয়ে যাচ্ছেন।তার মতে, “পরিবহন সেক্টরে যারা আছে তাদের মধ্যে তখন বদ্ধমূল ধারণা ছিলো যে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে মানুষের কিছু করার নেই”।এমন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে শুরু করলেন সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে তার সংগ্রাম।

সেই সংগ্রাম দীর্ঘদিন পর আলোর মুখ দেখে সব প্রতিকূলতার অবসান ঘটিয়ে সরকার সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করেন। কিন্তু এখানেই বিপত্তি পরিবহন মালিক সমিতি এই আইন মানবে না বলে দাবি তুলেছেন এবং ইলিয়াস কাঞ্চনের বিরুদ্ধে অশালীন শ্লোগান পোস্টিং করেছে যা খুবই দুঃখজনক।দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পক্ষে কথা বলা লোকটির বিরুদ্ধে এরকম অশালীন শ্লোগান এবং পোস্টিং হতাশার। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের নিরাপত্তার হুমকি। এখন দেখার বিষয় সরকার জনগণের নাকি পরিবহন মালিক শ্রমিকদের!

সুমন চৌধুরী নামে একজন লিখেছেন, একজন মানুষ যখন ভাল কাজ করবে তখন কিছু দুষ্টু লোক জঘন্যতম কাজ করবে এটাই দুনিয়ার নিয়ম আর এই ছবিই তার প্রমান। একবার ভাবুন ইলিয়াস কাঞ্চন কি কারো ক্ষতি করেছে? ভাবুন তার পর বলুন কাজটি কতটা ঘৃণিত, আর যারা এমন কাজ করেছে তারা যদি বিন্ধুমাত্র চিন্তা করত তাহলে তারা বুঝতো এটা ইলিয়াস কাঞ্চনের সাথে নয় ওরা এই কাজটি নিজের সাথেই করেছেন। বাংলায় একটি প্রবাদ রয়েছে “উর্ধ মুখে থু থু ফেললে সেটা নিজের উপরেই এসে পড়ে” আজ এমন একটা ঘটনার জন্মনিল যেটা এই প্রবাদেরই মতন। আমাদের দেশ দেশে গত কিছু দিন আগে চাল হয়েছে “সড়ক নিরাপত্তা আইন” আর সেটা মানতে নারাজ আমাদের দেশের কিছু লোক। যেখানে আমাদের দেশে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করছে অগনিত মানুষ। যার কোন সঠিক হিসেব নেই। আর সেই দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে দির্ঘ ২৬ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন ও উনার সংগঠন “নিরাপদ সড়ক চাই” আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই সংগঠন প্রতিষ্টা করে তিনি কি কারো ক্ষতি করছেন? নিজে ভাবুন উত্তরটা নিজেই পেয়ে যাবেন। নিরাপদ সড়ক চাই আমাকে / আমাদের শিখিয়েছে কিভাবে রাস্তায় চলাচল করলে নিরাপদের রাস্তায় চলা যাবে। হোক সে গাড়ি চালক হোক সে পথচারী, কিন্তু কেই কিছুই মানছেন না, তাই তৈরি করা হল “নিরাপদ সড়ক আইন” আমি একজন বাংলাদেশের নগন্য নাগরিক এই আইন মানি। আমি দেশের মঙ্গল চাই। আপনি উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর দিকে তাকান সেখানেও এমন আইন রয়েছে। রাস্তায় অনিয়ম করে গাড়ি চালালে রয়েছে জরিমানা ও শাস্তির বিধান তেমনি পথচারীদের অনিয়ম করে রাস্তায় চলাচলের জন্যে ও রয়েছে জরিমানা ও শাস্তির বিধান। সরকার তো আমাদের বলেন নি তোমরা সড়কে উলটা পালটা গাড়ি চালাও কিংবা চলাফেরা কর আর আমাদের জরিমানা দাও। আরে করতে চাইলে আসুন প্রতিজ্ঞা করি সরকার কে একটি টাকাও জরিমানা দেব না আমরা নিয়ম মেনে চলব। তাহলেই বুঝব আমি বাহাদুর। “সড়ক নিরাপত্তা আইন” প্রতিষ্টিত করতে যারা সাহায্য করেছেন তাদের সকল কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি ধন্যবাদ জানাচ্ছি বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি সংশ্লিষ্ট সকল কে। আর যারা এমন ঘৃণিত কাজ করেছে তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দাবি করছি। আর আমাদের প্রিয় জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন স্যার আপনি একা নন আমরা আপনার সাথেই ছিলাম আছি ইনশাল্লাহ থাকব।

ফারজানা নামে একজন লিখেছেন, দু:খ, রাগ, ক্ষোভ বা অভিমান কিছুই মনের ভেতর কাজ করছেনা। সব স্বাভাবিক ঘটনা এটাই মেনে নিয়েছি। দিন শেষে এখন শুধু গর্বে বুকটা ভরে যাচ্ছে! ছবির মধ্যে জুতার মালা পরাল কিছু মানুষ রূপি অমানুষ তাতে কি বা যায় আসে। মূল বিষয় হলো এই জুতার মালা পরিয়ে তারা কি পেলো বা না পেলো কিন্তু আমরা আম জনতা আবারও বুঝতে পারলাম ইলিয়াস কাঞ্চন কতটা আকাশচুম্বি জনপ্রিয়। দিনব্যাপী সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের টাইম লাইনে শুধু একটাই পোস্ট সবার প্রিয় মানুষটাকে অপমান করায় সবার প্রতিবাদ। আবারও আজ প্রমাণ হলো ইলিয়াস কাঞ্চন হিমালয়ের মত ব্যক্তিত্ব নিয়ে আকাশচূড়ায় অবস্থান করছেন সবার ভালবাসায়….। স্যালুট যোদ্ধা আপনাকে,আপনি আছেন ১৮কোটি জনতার অন্তরে…।

অরন্য নামে একজন লিখেছেন, অদ্ভুত জাতিকে ক্ষমা করবেন ইলিয়াস কাঞ্চন। ছোটবেলায় বিটিভির সেই সাদাকালো বা রঙিন ছবি দেখার জন্য সপ্তাহে শুক্রবার দুপুর থেকে অপেক্ষায় থাকতাম ৩টায় বাংলা ছবি শুরু হবে।সেইসময় এন্টিনায় আমাদের সাথে ছলনা করতো বারবার, বাঁশের ডগায় থাকা এন্টিনার নেটওয়ার্ক পেতে একটু বেগ পেতে হতো আমাদের তখন।এরপরে শুরু হতো সবাই মিলে ছবি দেখা,প্রতিবার নায়ক-নায়কদের নাচ-গান আর ফাইট দেখে অবাক হতাম যে ছোট একটু টিভির ভিতরে এরা থাকে কি করে ? সব আজব চিন্তা -ভাবনা কাজ করতো তখন।আসতে আসতে বয়স বাড়তে থাকে আর ছবির সম্পর্কে আরো জানতে পারি।তবে এখন টিভি চ্যানেলের সংখ্যা বেশি সাথে সাথে নায়ক-নায়িকা শিল্পী -ও,শিল্পীও যেন বেড়ে গেছে।আমাদের সময় তখন ওমর সানি ,রিয়াজ ,বাপ্পারাজ ,আমিন খান,রুবেল,ফেরদৌস ,সাথে দেখতাম আরো ছবি দেখতাম রাজ্জাক ,সোহেল রানা ,ফারুক ,ইলিয়াস কাঞ্চনদের।একটা সময়ে হলে দলবেঁধে রাজ্জাক ,সোহেল রানা ,ফারুক ,ইলিয়াস কাঞ্চনদের ছবি দেখতে যেতাম।ছবির পোস্টার দেখলে মন ভরে যেত।

এবার আসি একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে গত বিষ বছরে রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে যে কত মানুষ তার নিশ্চিত হিসাবটি বলা মুশকিল তবে এই রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনার প্রবণতা থেকে রেহাই বা সড়ক সচেতনতা নিয়ে কথা বলতে খুব কম মানুষকেই দেখেছি।এর মধ্যে ইলিয়াস কাঞ্চনকেই দেখেছি রাস্তাঘাটে প্রচার প্রচারণা করতে।আর এই মানুষটাকে আমরা এখন দেখতে পারছি আমাদের সমাজের অদ্ভুত কিছু মানুষদের চালচলনের জন্য।কথায় আছে ভালো কাজ করলে বাংলাদেশে যে অন্তত সেটার প্রতিদান পাওয়া যায় না, বরং কিছু মানুষের চক্ষুশূলে পরিণত হতে হয়।সেটা আরও একবার প্রমাণীত হলো। নিরাপদ সড়কের দাবীতে ঘরের খেহে বনের মোষ তাড়িয়ে নিঃস্বার্থভাবে আন্দোলন করে যাওয়া একটা মানুষকে নিয়ে যেসব নোংরামি আজ চোখে পড়লো, সেগুলো দেখে হতভম্ভ হয়ে গেছি। হ্যাঁ, নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের কথা বলছি, গত ছাব্বিশ বছর ধরে যিনি ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন, বিনিময়ে যার ঘরে একটি পয়সাও যায়নি, বরং আন্দোলনটা তাকে চালাতে হয়েছে নিজের পয়সার, সেই মানুষটাকে দলবেঁধে আক্রমণ করেছে একপাল হায়েনা। কাঞ্চনের ছবি নিয়ে প্ল্যাকার্ড-ব্যানার বানিয়েছে তারা, সেখানে পরিয়েছে জুতার মালা।

পরিবহন শ্রমিক আর মালিকদের কাছে ‘ইলিয়াস কাঞ্চন’ নামটা চক্ষুশূল হয়ে আছে অনেক বছর ধরেই। বিভিন্ন সময়ে তাকে হেনস্থা করার চেষ্টা করেছে এসব সংস্থার লোকজন। রাজপথে তার কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে, তার ছবি পোড়ানো হয়েছে। পরিবহন শ্রমিকদের বিভিন্ন সমাবেশ থেকে তার ওপরে হামলা চালানোর উস্কানিও দেয়া হয়েছিল নানা সময়ে, এমনকি তার গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে তাকে প্রচ্ছন্ন হুমকিও দেয়া হয়েছে।

ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘অপরাধ’ একটাই, তিনি পরিবহন শ্রমিক আইনের সংশোধন চেয়েছেন, নিরাপদ সড়কের দাবীতে রাস্তায় নেমেছেন, চালক-যাত্রী-পথচারী সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যুর পর থেকেই নিরাপদ সড়কের আন্দোলন গড়ে তুলেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন, আর কেউ যায়ে চালকের অসাবধানতায় মৃত্যুর কোলে ঢলে না পড়ে, কোন মানুষকে যেন তার মতো সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে না হয়, সেজন্যেই নিজের ক্যারিয়ারকে একপাশে ফেলে রেখে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন এই জনপ্রিয় অভিনেতা।

নিজের ব্যস্ত শিডিউল, চাকরি, শুটিং, তারকাখ্যাতি- সবকিছু সামলে নিয়মিত রাস্তায় ছুটে গেছেন কাঞ্চন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। চালকদের বুঝিয়েছেন, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি না চালানোর অনুরোধ করেছেন। যাত্রীদের বলেছেন সড়ক আইনের কথা, পথচারী পারাপারের নিয়মের কথা। নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে সংগঠন চালিয়েছেন, অফিসের ভাড়া দিয়েছেন, লিফলেট ছাপিয়ে বিলি করেছেন সেগুলো। অনেকেই তাকে নিয়ে হেসেছে, মশকরা করেছে, ইলিয়াস কাঞ্চন তাতে দমে যাননি একটুও, নতুন উদ্যোমে কাজ শুরু করেছেন বারবার।

একটা সময়ে পরিবহন শ্রমিকেরা তাকে শত্রু ভাবতে শুরু করেছে, মালিকপক্ষ তাদের বুঝিয়েছে, এই ইলিয়াস কাঞ্চন লোকটা ড্রাইভার-হেল্পারদের বিচার চায়, তারা তাই কাঞ্চনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রও করা হয়েছে, উড়ো ফোনে হুমকি দেয়া হয়েছে মেরে ফেলার। কাঞ্চন সেসবে ভয় পাননি, আন্দোলন থামানোর কথা মাথায় আনেননি। যতোবার হুমকি এসেছে, কাঞ্চনের চোখে ভেসে উঠেছে তার স্ত্রী জাহানারার রক্তে ভেসে যাওয়া দেহটার ছবি। প্রিয়জন হারানোর এমন পরিণতি যেন আর কারো ভাগ্যে না জোটে, সেই মিশনে আরও জোর কদমে চলতে শুরু করেছেন তিনি।

কিন্ত দিনশেষে কাঞ্চনের সেই কাজগুলোর মূল্যায়ন হয়েছে খুব কম। এত ঝড়-ঝাপটার পরে আজ যখন সড়ক আইন বাস্তবায়ন হয়েছে, তখন পরিবহন ব্যবসার ফ্র‍্যাংকেনস্টাইনেরা জনগনের টুঁটি চেপে ধরতে চাইছে, গাড়ি বন্ধ করে দিয়ে মানুষকে জিম্মি করতে চাইছে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স তাদের দিতে হবে, মানুষ মারার অধিকার তারা চায়! আর তাই গাড়ি বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়েও নোংরামী শুরু করেছে পরিবহন শ্রমিকেরা।

কাঞ্চনের ছবি নিয়ে ব্যানার বানিয়ে টানিয়ে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থানে, সেই ছবির সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে ঝাড়ু আর জুতা। ব্যানারে লেখা হয়েছে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা। অবশ্য, খুনিদের মুখের ভাষা তো আর সুন্দর কিছু হবে না। ইলিয়াস কাঞ্চমের গালে গালে জুতার বাড়ি মারতে চেয়েছে তারা, কারণ তাদের মানুষ খুনের বিরুদ্ধে কাঞ্চনই সবার আগে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, সড়ক আইন নিয়ে তিনিই সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন, লাইসেন্স এবং ফিটনেস টেস্ট ছাড়া যাতে একটা গাড়িও রাস্তায় নামতে না পারে, এই দাবী বারবার তুলেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সেজন্যেই আজ তাকে নিয়ে এই নোংরামিগুলো করা হচ্ছে।

অথচ ইলিয়াস কাঞ্চন কখনও সড়ক দুর্ঘটনার জন্যে একতরফা ভাবে চালকদের দায়ী করেননি। তিনি সচেতন করেছেন পথচারীদের, বলেছেন, গাড়ির মালিককেও দৃষ্টি রাখতে হবে গাড়ির ফিটনেসের দিকে, দায় আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও, লাইসেন্স ছাড়া যাতে কেউ গাড়ি চালাতে না পারে সেটা দেখার দায়িত্ব তাদের। অথচ মাথামোটা কিছু মানুষকে ভুলভাল বুঝিয়ে কাঞ্চনের বিরুদ্ধে মাঠে নামানো হয়েছে, কারা এসব করছে সেটাও আমরা জানি। ইলিয়াস কাঞ্চনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কারা তৃপ্তিতে ভোগে, সেটা বুঝে নিতে তো কষ্ট হয় না।

এই দেশ আসলে ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো কাউকে ডিজার্ভ করে না, এই দেশ ভালো মানুষের জন্যে না। প্রিয় ইলিয়াস কাঞ্চন, আপনি আমাদের জন্যে অনেক করেছেন, কিন্ত আপনাকে প্রাপ্য সম্মানটা আমরা দিতে পারিনি, বরং অসম্মানটাই বেশি উপহার পেয়েছেন আপনি। যদি সম্ভব হয়, আমাদের এই অদ্ভুত জাতিকে ক্ষমা করে দেবেন।

যদি সম্ভব হয়, আমাদের ক্ষমা করে দেবেন প্রিয় ইলিয়াস কাঞ্চন

‘স্যালুট যোদ্ধা আপনাকে’

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)