ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৩৩ মিনিট ২২ সেকেন্ড

ঢাকা শুক্রবার, ২১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ৮ রবিউস-সানি, ১৪৪১

উপসম্পাদকীয় কবে শহীদ ও শহীদ ভূমিগুলোকে যথার্থ মর্যাদা দিতে শিখব?

কবে শহীদ ও শহীদ ভূমিগুলোকে যথার্থ মর্যাদা দিতে শিখব?

উপসম্পাদকীয়

আহমদ রফিক,নিরাপদ নিউজ : ১৯৭১, ২৫ মার্চ। ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালিবিরোধী গণহত্যা শুরু মধ্যরাত থেকে। যথারীতি এর বিস্তার সারা পূর্ববঙ্গের শহরে শহরে। হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের নীলনকশায় প্রাধান্য পেয়েছিল বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় এবং হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতের অভিযান সে প্রমাণ রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে।

গণহত্যার যে ভয়ংকর চিত্র ঢাকায় ২৫ মার্চ রাতের, তা প্রকাশ পেয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক হত্যায়, শহীদ মিনার ধ্বংসে, পরদিন হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত মহল্লাগুলোতে নিকাশ অভিযান চালনায়। ফলে মৃত্য আর মৃত্যু তাদের বাঙালি নিধন অপারেশনের মূল লক্ষ্য অর্জনের বিষয় হয়ে ওঠে। বিদেশি সাংবাদিকরা অকুস্থল পরিদর্শনে বিস্মিত, স্তম্ভিত, হতবাক। তাঁদের প্রতিবেদনে সেই বীভৎস অপারেশনের শব্দচিত্র দৃশ্যচিত্রের চরিত্র অর্জন করে পরবর্তী ৯ মাস ধরে।

সামরিক শাসকদের ধারণা জন্মেছিল, বাঙালি জতীয়তাবাদের বিচ্ছিন্নতাবোধের পেছনে রয়েছে হিন্দু শিক্ষিত শ্রেণির প্ররোচনা।
ফলে বাঙালি ছাত্রসমাজে ভাষিক জাতিচেতনার উন্মাদনা এবং তাতে শিক্ষক ও রাজনীতিকদের প্রকাশ্য সমর্থন। তাদের ভাষায়, এসবই পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র। কাজেই কঠোর নিষ্ঠুরতায় এদের মোকাবেলা করে উচিত শিক্ষা দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতার চিন্তা মাথায় না আসে।

এ তৎপরতায় আপাত সাফল্য সত্ত্বেও বলতে হয় তাদের হিসাবে ভুল ছিল। একটি জাতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল-নির্বিশেষে যুদ্ধ ঘোষণা চাট্টিখানি কথা নয়। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় শক্তির অবস্থান থেকে ওই বিচ্ছিন্নতাবাদী ভূখ-ের দূরত্ব যদি হয় হাজার মাইলেরও অধিক। আর ওই শেষোক্ত ভূখন্ডের পাশে যদি থাকে তাদের বিরুদ্ধপক্ষীয় শক্তিমান রাষ্ট্র। পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল গেরিলা যুদ্ধের পক্ষে আদর্শ-চরিত্রের। এসব সমরসূত্র পাকিস্তানি সামরিক শাসন বিবেচনায় আনেনি। আনার প্রয়োজন বোধ করেনি। এতটাই ছিল তাদের সামরিক শক্তিবিষয়ক আত্মবিশ্বাস। এটা পাকিস্তানি বৈশিষ্ট্য।

আর এ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে গণহত্যাকে অপারেশনের মূলধন করে পূর্ব বাংলায় চলেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বর বাঙালি হত্যাযজ্ঞ। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তারা এ অসম যুদ্ধে জিতবেই। কারণ তাদের আরো ধারণা, বাঙালিরা পাঞ্জাবিদের মতো যোদ্ধা জাঁতি নয়। তা ছাড়া পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। আর বেসামরিক বাঙালিদের মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতাও নেই। তাই বিজয় অনিবার্য।

আরো একটি ঘটনা তাদের বিজয়ের পক্ষে আত্মবিশ্বাসী করেছিল, তা হলো স্থানীয় ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার পক্ষে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে সক্রিয় সমর্থন। তাদের মধ্যে সর্বাধিক সক্রিয় ছিল জামায়াতে ইসলামি ও তাদের তরুণ যোদ্ধাবাহিনীÑআলবদর, আলশাম্স। আর অনুরূপ পাকিস্তানবাদী বাঙালি ও বিহারি গোষ্ঠী। তাদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল রাজাকার বাহিনী, স্বাধীনতাকামী বাঙালি নিধনে তাদের বর্বরতা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। তাদের নিষ্ঠুরতার কুখ্যাতিও ছিল প্রবাদপ্রতিম। বধ্যভূমি তৈরির ক্ষেত্রে তাদের অবদান ছিল সর্বাধিক। কারণ তারা স্থানীয় অধিবাসী। সব পথ তাদের চেনা, কে কোন রাজনীতির অনুসারী, তা-ও তাদের জানা।

সমাজ ও ভূখ-ের প্রতি তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল সীমাহীন। কথাটা সবাই স্বীকার করেন যে রাজাকার ও ইসলামি যোদ্ধাদের কারণে শহীদের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে নারী নির্যাতনের সংখ্যা। একই কথা খাটে হিন্দু নাগরিকদের সম্পর্কে। দেশের সর্বত্র গণকবর ও বধ্যভূমির ব্যাপকতার পেছনে রয়েছে রাজাকার ও অনুরূপ দুর্বৃত্তদের দেশদ্রোহী আচরণ।

পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বাঙালিদের ওপর হামলার পরিকল্পনায় ছিল একাধিক লক্ষ্য। তা যেমন নিষ্ঠুর, তেমনি অমানবিক, আন্তর্জাতিক বিবেচনায় যুদ্ধাপরাধতুল্য। গণহত্যার পেছনে লক্ষ্য ছিল একটি জাতিসত্তাকে দুর্বল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত করা। বর্বর আচরণে জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা। সর্বোপরি সামরিক জান্তার কারো কারো, বিশেষ করে জেনারেল নিয়াজির ন্যক্কারজনক স্বঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিসত্তার চরিত্রবদল ঘটানো। আর সেই উদ্দেশ্যে ব্যাপক হারে বাঙালি নারী ধর্ষণ, বিশেষ করে তরুণী ধর্ষণে সামরিক কর্মকর্তা ও জওয়ানদের প্ররোচিত করা। আন্তর্জাতিক বিচারে এ দুষ্কর্ম যুদ্ধাপরাধের শামিল। কিন্তু নিয়াজির বিচার করা যায়নি।

যায়নি দুর্বৃত্ত সামরিক কর্মকর্তা ও জওয়ানদের বিচার করা। তদের আরেকটি ঘোষিত লক্ষ্য ছিল বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হামলা চালানো, তাদের বিনা অপরাধে হত্যা করা, বাস্তুচ্যুত করে পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যার হ্রাস ঘটানো। তা ছাড়া এর পেছনে বিধর্মীজনিত ঘৃণা তো ছিলই। শাসকদের এ চিন্তা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেখা গেছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় শাসকদের উসকানিতে এবং দাঙ্গায় বিহারিদের ব্যাপক সংখ্যায় অংশগ্রহণে। পাকিস্তানি শাসকদের এ গূঢ় উদ্দেশ্যের কথা প্রাক-একাত্তর পর্বে স্পষ্ট করে প্রকাশ করা হয়নি, কিন্তু তৎপরতা ঠিকই চলেছে। তবে একাত্তরে এসে তা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে নানা ভাষ্যে। বিদেশি পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনে তা প্রকাশ পেয়েছে। সেই সঙ্গে পাকিস্তানিদের চেষ্টা বাঙালি শিক্ষিত সমাজকে মেধাহীন করা ষড়যন্ত্রমূলক হত্যাকা-ে। এটাই বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের প্রধান কারণ।

পাকিস্তানি সেনাদের আলাপ-আলোচনায় ও কর্মনির্ধারক সভার সিদ্ধান্তে, তাদের দু-একজনের লেখা বইয়ের ভাষ্যে এবং কদাচিৎ দু-একটি বিদেশি পত্রিকার প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সেনাশাসকদের গভীর গোপন ষড়যন্ত্র ও উদ্দেশ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে। বিষয়টি যে ঠান্ডা মাথায় হিসাব-নিকাশ করা সিদ্ধান্তের ফল, তা যেমন নিকটজনদের মধ্যে নিয়াজির নির্দেশমূলক বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি দেখা গেছে আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তাদের জওয়ানদের প্রতি নির্দেশে। সর্বোপরি রাও ফরমান আলীর মতো একজন শীর্ষস্থানীয় জেনারেলের ডেস্ক ক্যালেন্ডারে লেখা টুকরা নোটে বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়কে নিঃস্ব করার চিন্তা প্রকাশ পাওয়ার ঘটনা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। পরবর্তীকালে তাঁর লেখা আত্মজীবনীতেও রাও ফরমান এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের বাঙালি হত্যায় উল্লাস ও মন্তব্য তাদের নিষ্ঠুরতা ও মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দেয়। যুদ্ধে গণহত্যা, ব্যাপক নারী ধর্ষণ ও হত্যা আন্তর্জাতিক নীতিমালায় যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এ বিষয়ে সংশিষ্টজন অপরাধী। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে অনুরূপ অপরাধে জার্মান নািসদের বিচার হয়েছিল। যেমন অনেক রাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে অনেক দেরিতে বিচার হচ্ছে বসনিয়া-হারজেগোভিনার নিষ্ঠুর সার্বিয়ান ঘাতক দু-একজন সামরিক কর্মকর্তার আন্তর্জাতিক হেগ আদালতে। বিচার ও শাস্তি, যা তেমন জোরালো ও যৌক্তিক হবে বলে মনে হয় না। সবই সা¤্রাজ্যবাদী মাহাত্ম্য!
সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতে বা বিশ্বদরবারে কতটা সুবিচার পাবে বলা কঠিন। তবু আমরা একাধিক রচনায় যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের বিচার চেয়েছি আন্তর্জাতিক আদালতে, পরিণাম নিয়ে আশঙ্কা সত্ত্বেও। কারণ তখন অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। দাবার ছক একটু ভিন্নতা পেয়েছে। তা না হলে একজন নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর স্বদেশে, এমনকি নিজ দলের সদস্যদের মন্তব্যে কঠোরভাবে সমালোচিত হন! এমনকি এ বিষয়ে একটি অবিশ্বাস্য শিরোনাম : ‘জাতিসংঘের তোপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র’। বশংবদ জাতিসংঘের এমন সাহস হয় কোত্থেকে? এসব কি সামান্য হলেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত?

তাই আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য, ৯ মাসের নিষ্ঠুর অমানবিক যুদ্ধের অপরাধী পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার, পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হোক বাংলাদেশ। জোর প্রচার চালানো হোক স্বদেশে-বিদেশে। কারণ বিচারবিষয়ক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে পাকিস্তান এবং তার চতুর শাসক জুলফিকার আলী ভুট্টো। ভুল আমাদেরও ছিল। এখন তা শুধরে নেওয়ার সময়। দেরিতে হলেও স্থানীয় অপরাধী রাজাকারদের বিচার ও চরম শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে। এখন তা বন্ধ হলেও বাকিদের বিচার ও শাস্তির বিধান চালিয়ে চাওয়া উচিত। এবং তা জাতিকে দায়মুক্ত করতে।

পাকিস্তানিরা অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করে ২৫ মার্চ (১৯৭১) ঢাকায় ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী হত্যার নিষ্ঠুরতায়। যুদ্ধ শেষে পরাজয়ের গ্লানি শোধের প্রতিহিংসাপরায়ণতায় তারা আবারও পরিকল্পিতভাবে শিক্ষক-সাংবাদিক-চিকিৎসক-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের হত্যার জন্য নিয়োগ করে জামায়াতের ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের। তখন পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, সঙ্গে বাংলাদেশ বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা তরুণ দল।

সে সময় কিনা ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে কারফিউর মধ্যে আটক শহরবাসীর অসহায়তার সুযোগে এক এক করে তুলে নেওয়া হয় চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের। সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন ও নিজামউদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন অধ্যাপকÑআনোয়ার পাশা, গিয়াসউদ্দিন, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাহিত্যিক সেলিনা পারভীন, সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফা, চিকিৎসাবিদ ফজলে রাব্বী, আলীম চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী প্রমুখ জাতির মেধাবী সদস্যদের। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা শহরে ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ঘটনা দেখা গেছে। নির্মম অত্যাচারে একাধিক বধ্যভূমিতে তাঁদের মৃত্যু কার্যকর করা হয়। এ নিষ্ঠুরতা তুলনাহীন। এর মধ্যে অন্তত তিন তিনটি মৃত্যুর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট।
আমরা ঘটা করে ১৪ ডিসেম্বর ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস’ পালন করি। অনেকে রায়েরবাজার, মিরপুরের বধ্যভূমিতে যান শহীদদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। তখন বধ্যভূমি পরিচ্ছন্নই থাকে, থাকে চিহ্নিত গণকবরগুলো। কিন্তু আমরা এমনই এক জাতি, অদ্ভুত জাতি, বাঙালি মুসলমান যে যাদের অবদানে বহু আকাক্সিক্ষত স্বাধীন বাংলাদেশ, সেই শহীদদের প্রতি যথাযথ সম্মান-মর্যাদা প্রদর্শনে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আমরা কয়েকটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় তাঁদের ঋণ শোধ করি, দায়মুক্ত হই।
তাই দেখা যায় সারা বছর বধ্যভূমিগুলো, গণকবরগুলো অসহায়, নোংরা পরিবেশ, কোথাও আবর্জনা বুকে নিয়ে দিন কাটায়। এবং তা সারা বছর ধরে, নির্দিষ্ট দু-তিনটি দিন বাদে। রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রযন্ত্রের কিংবা সংশ্লিষ্ট বিভাগের কোনো দায় নেই এগুলোর পরিবত্রতা, পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করার। সম্প্রতি যমুনা টিভির এক অনুষ্ঠানে এক উপস্থাপিকার কল্যাণে দেখা গেল দেশের একাধিক বধ্যভূমি ও গণকবর কী দুরবস্থায় আছে। স্থানীয় দেশপ্রেমী যুবকের প্রতিবাদ প্রচার করা হয়েছে প্রতিটি ক্ষেত্রে। এত অকৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি? শহীদ মিনার ও জাতীয় স্মৃতিসৌধ নিয়েও নিয়মিত সমালোচনা, প্রতিবাদ। কিন্তু ‘অবস্থা যথাপূর্বম তথাপরম’। মনে পড়ছে নব্বইয়ের দশকে রবীন্দ্র ্রসাহিত্য সম্মেলন উপলক্ষে আগত কলকাতার প্রতিনিধিদলের নেতা দেবব্রত পালিত সাভার স্মৃতিসৌধের প্রবেশপথে সাঁটা বিজ্ঞপ্তিটিতে বানান ভুলের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে লজ্জা পেয়েছিলাম।
আমাদের ঐতিহ্যবোধ, বুদ্ধিবৃত্তিক মানসিকতা এতটাই স্থূল, এতটা জড়তাপ্রাপ্ত যে এ জাতীয় সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক নৈরাজ্য নিয়ে মাথা ঘামাই না। তাই রায়েরবাজার, মিরপুরসহ দেশের বধ্যভূমি ও গণকবরগুলোর দুরবস্থা আমাদের মননশীলতায় আঘাত করে না। আমরা এসব অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে-প্রতিকারে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হই না, রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলি না। জাতির মুক্তিসংগ্রামে আত্মদানকারী শহীদদের প্রতি অসম্মানে ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ হই না। তাঁদের শেষ আশ্রয়স্থানের পবিত্রতা রক্ষায় প্রতিবাদ দূরে থাক, বিন্দুমাত্র তৎপর হই না। অথচ এমন সমালোচনা কানে আসে, বিদেশে এ ধরনের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা যথাযথভাব রক্ষা করা হয়েছে। এ ঐতিহ্য আমাদের নয়।
এসব দিকে বাঙালি সত্যই ভাগ্যহত, নিন্দাযোগ্য জাতি। যাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সমালোচনার যোগ্য। অথচ এরা প্রতিবাদী মিছিলে বা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিতে দ্বিধা করেনি। এক অদ্ভুত স্ববিরোধী মানসিকতার একটি জাতি, নাম তার বাঙালি, এদের রাষ্ট্রটি যুদ্ধশেষে বাংলাদেশ নামে নতুন করে চিহ্নিত। শেষ কথা, কবে আমরা দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন জাতিতে পরিণত হব, যে জাতির সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র জাতীয় শহীদদের, তাঁদের শেষ আশ্রয়স্থলগুলোকে, সংশ্লিষ্ট প্রতীকগুলোকে (শহীদ মিনার) প্রকৃত মর্যাদা দিতে শিখব। মযহারুল ইসলাম বাবলা ঠিকই লিখেছেন, এজন্য দরকার সমাজবদলের। আমি তাঁর সঙ্গে একমত।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)