ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট নভেম্বর ২১, ২০১৭

ঢাকা বুধবার, ২৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১৩ রবিউস-সানি, ১৪৪১

উপসম্পাদকীয় কেমন হবে আগামি সংসদ নির্বাচন

কেমন হবে আগামি সংসদ নির্বাচন

উপসম্পাদকীয়

আবুল কাসেম ফজলুল হক,নিরাপদ নিউজ :  একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ক্রমেই কাছে আসছে। বিভিন্ন মহল ও সরকার থেকে বলা হচ্ছে যে নির্বাচন হবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। নির্বাচন কি হবে? বিএনপি কি নির্বাচনে সত্য সত্যই আসবে? এ রকম প্রশ্নও শুনতে পাই।

বিএনপির নির্বাচনে আসা নিয়ে আওয়ামী লীগ যে সংশয়ের মধ্যে আছে, তা বোঝা যায় আওয়ামী লীগের কথাবার্তায়। কখনো কখনো মনে হয়, আওয়ামী লীগ কৌশলে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে তৎপর। বিএনপি সম্পর্কে বিএনপিরই কেউ কেউ বলে থাকেন যে বিএনপি গতবার ভুল করেছে নির্বাচনে না গিয়ে, এবার ভুল করবে নির্বাচনে গিয়ে।

আওয়ামী লীগ কথা চালাচালিতে অত্যন্ত পারঙ্গম। বিএনপি কথা চালাচালিতে পেরে ওঠে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের আগের কয়েক মাসের আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কথা চালাচালি লক্ষ করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে কথা চালাচালিতেই বিএনপি সম্পূর্ণ পরাজিত। কথায় ও কাজে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি দলই গণতান্ত্রিক মন-মানসিকতার পরিচয় কমই দিয়ে থাকে।

দীর্ঘদিন পর বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার অনুমতি পেয়েছে এবং জনসভা করেছে।
এ উপলক্ষে আওয়ামী লীগ যেসব কথাবার্তা বলেছে তার সবই কি গণতন্ত্রের জন্য উপযোগী? বিএনপি কি পাল্টাপাল্টিতে যথেষ্ট এগিয়েছে? জনসভায় বিএনপি তো অনেক ভালো ভালো কথা বলেছে। কিন্তু ভালো ভালো কথা তো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে! কাজ হবে কিভাবে?

সাত-আট বছর ধরে আওয়ামী লীগ বিএনপির বিরুদ্ধে ক্রমাগত যেসব অভিযোগ উত্থাপন করেছে, সেগুলো সম্পর্কে বিএনপি তো জনসাধারণকে সন্তুষ্ট করার মতো কোনো জবাব দেয় না। বলা হয়, বিএনপি পাকিস্তানপন্থী, পাকিস্তান ফিরিয়ে আনতে চায়। বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি বলে অভিহিত করা হয়। বলা হয়, জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, পাকিস্তানের গুপ্তচর হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে এসেছিলেন। এমনি আরো কিছু অভিযোগ আওয়ামী লীগ উত্থাপন করে থাকে। বিএনপিকে আগুন-সন্ত্রাসী বলেও অভিহিত করা হয়। এসব সম্পর্কে বিএনপি কি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার প্রয়োজন বোধ করে না? জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি ও বক্তব্য কী? যে দল এসব সম্পর্কে নিজের বক্তব্য পরিষ্কার করে না, সেই দল দুর্বল থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক।

গণতন্ত্র কী এবং কী নয়, সে সম্পর্কে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য অল্পই আছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি দলই গণতন্ত্র বলতে শুধু ভোটাভুটি বোঝে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে জতীয় পার্টি শেষ হয়ে গেছে। দলটি এখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতায় আছে। জাতীয় পার্টির যে রাজনীতি, তা নিয়ে দলটি কি আগামি নির্বাচনে ভালো করতে পারবে?

বাম দলগুলো কী রাজনীতি করছে? যারা রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠার ঘোষণা দিচ্ছে, তাদের অবস্থা কি আশাপ্রদ? ইসলামপন্থী দলগুলো কি আগের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিএনপির সঙ্গে থাকবে? তবলিগ জামাত, সুফি সম্মেলন, হেফাজতে ইসলামের আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ ও মুসল্লিরা কি আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থানে অটল আছে? আওয়ামী লীগ তো ইসলামি শক্তিগুলোকে সঙ্গে টানছে। সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলোর বিশিষ্ট নাগরিকরা, এনজিও কর্তারা, বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার স্থানীয় কর্তাব্যক্তিরা, বৃহৎ শক্তিগুলোর স্থানীয় দূতাবাসগুলো ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে আসছে।

এর মধ্যে ভারতও বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ভীষণভাবে তৎপর হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কর্তৃত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে পেরে ওঠে না। সামনে কী হবে? দৃশ্যের অন্তরালে কী চলছে কে বলতে পারবেন? যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একমত হয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির গতি নির্ধারণ করবে এটাও অসম্ভব নয়।

সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলোর বিশিষ্ট নাগরিকরা লেভেল প্লেইং ফিল্ড, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠান ইত্যাদি কথা অনেকটা ভাঙা রেকর্ড বাজানোর মতো বলে চলেছেন। তাঁদের তৎপরতায় কমতি নেই। তবে তাঁরা আগের মতো পারছেন না। তাঁদের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, বৃহৎ শক্তিদের প্রভাবমুক্ত, কালো টাকামুক্ত, পেশিশক্তিমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত এসব কথা নির্বাচন উপলক্ষে আগের মতো আর বলা হচ্ছে না। কোনো রকমে নির্বাচনটা যদি হয় এই তাঁদের তৎপরতার মূলে। নির্বাচন হওয়া মানে গণতন্ত্র হওয়া এই তাঁদের মত।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রতিবার যে হুজুগ সৃষ্টি করা হয়, এবার এখনো তা করা যাচ্ছে না। তবে হুজুগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এ দেশের মানুষ হুজুগপ্রিয় শেষ পর্যন্ত হয়তো তারা হুজুগে মাতবে। প্রচারমাধ্যম ব্যবহৃত হবে।

গণতন্ত্রকে পর্যবসিত করা হয়েছে নির্বাচনতন্ত্রে। প্রচার এমনভাবে চালানো হয় যে নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র হয় এবং এভাবে গণতন্ত্র হলেই জনগণ পরম কল্যাণের দিকে যাবে। নির্বাচন সুষ্ঠু হোক এটাই চাই। কিন্তু চাইলেই তো আর হয়ে যায় না। চেষ্টা লাগে, প্রস্তুতি লাগে, সততা লাগে। এসব না থাকলেও সুষ্ঠু নির্বাচন সোনার পাথরবাটির মতো ব্যাপার। নির্বাচন হবে। ১৯৯১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত নির্বাচনগুলো যে রকম হয়েছে সে রকমই হবে। হঠাৎ অন্য রকম হওয়ার মতো কিছু দেখা যায় না।

শুধু নির্বাচন দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির উন্নতি সূচিত হবে না। রাজনীতির উন্নতি একান্ত দরকার। যে সামাজিক শিথিলতা, অসামাজিক কার্যকলাপ ও অবক্ষয় দ্রুত বেড়ে চলছে তা জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সব কিছুকেই বিনষ্ট করবে। কিন্তু সে বিষয়ে কারো মনোযোগ দেখা যায় না। পুলিশ কর্তৃপক্ষ থেকে জনসাধারণকে শান্ত থাকার জন্য বলা হচ্ছে এসব তো সব সময়ই ছিল! সব সময় থাকা আর বিশেষ সময়ে অনেক বেড়ে যাওয়া এক নয়। র‌্যাব ছাড়াই তো চলত। র‌্যাব কেন গঠন করা হলো? ক্লিনহার্ট অপারেশন, এনকাউন্টার, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ এসব তো দরকার হতো না।

বিশেষ সমস্যা বড় হয়ে দেখা দিলে তার প্রতিকারের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়। বাংলাদেশে যেসব সমস্যার সমাধানের জন্য শুধু পুলিশ, র‌্যাব ও আইন-আদালতের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে, সেগুলোর দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য রাজনৈতিক ও আদর্শগত ব্যবস্থা দরকার। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদিকে ব্যর্থ করে শুধু নির্বাচন দ্বারা রাজনৈতিক অবস্থা উন্নত করা যাবে না। রাজনৈতিক অবস্থার উন্নতির জন্য আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সব বিষয়েই বিবেচনা দরকার এবং সেটা করতে হবে রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে। সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলো থেকে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমস্যাবলি সমাধানের যে পথ প্রদর্শন করা হয়, সে পথ আলোর দিকে নয়, জনগণের জন্য অন্ধকারের দিকে যাওয়ার পথ।

আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ফব-ঢ়ড়ষরঃরপরুধঃরড়হ বা নিরাজনীতিকরণ বা বিরাজনীতিকরণ বলে যে কথাটা অনেকের মুখে মুখে আছে, তার মর্ম গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখা দরকার। বাংলাদেশ আসলেই নিরাজনীতিকৃত হয়ে গেছে। সরকার কতটা স্বাধীন, বাংলাদেশের ভূভাগে রাষ্ট্র কতটা গঠিত হয়েছে, দেশের প্রশাসনব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিপরিষদ ইত্যাদির রূপ ও প্রকৃতি কেমন, আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে রাজনীতির রূপ ও প্রকৃতি কেমন, রাষ্ট্রের আয় ও ব্যয়ের প্রকৃতি কী, জনমনের অবস্থা কেমন, বহুত্ববাদ অবলম্বন করে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোষ্ঠী বিভেদের মধ্যে পড়েছে, না বন্ধুত্বমূলক ঐক্য অবলম্বন করছে, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের নীতি পরিত্যাগ করে জাতীয় অনৈক্যের মধ্যে পড়ে গেছে কি না, রাষ্ট্র ও জাতির মধ্যে আত্মনির্ভরতার বোধ কেমন এসব বিষয় বিবেচনা করতে গেলেই বোঝা যায় বাংলাদেশ নিরাজনীতিকৃত হয়ে আছে। সর্বত্রই রাজনীতি আছে, কিন্তু তা এতই বিকারপ্রাপ্ত ও স্বল্প যে বাংলাদেশকে নিরাজনীতিকৃত বললে বিশেষ ভুল হয় না।

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে তাঁর প্রতিপক্ষ সম্পর্কে ‘পাগলে কি না কয়, ছাগলে কি না খায়’ এই উক্তি করেছেন। উক্তিটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের ও রাজনীতিতে সক্রিয় বুদ্ধিজীবীদের চিন্তাভাবনা ও মনমানসিকতার পরিচয়জ্ঞাপক এই শব্দগুচ্ছ। নিরাজনীতিকৃত অবস্থারই পরিচায়ক এই উক্তি।

নিরাজনীতিকরণের বাস্তবতার মধ্যে রাজনীতির নবজন্ম, পুনর্গঠন, উজ্জীবন কিভাবে ঘটানো যাবে, সেটাই মূল বিষয়। জনগণের রাষ্ট্র রূপে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে, তার জন্য রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে হবে, যেসব দল আছে তাদের নবায়নের সুযোগ আছে, নতুন দল গঠন করারও প্রয়োজন হতে পারে, রাজনৈতিক আদর্শ লাগবে, বর্তমান গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি দিয়ে হবে না, মূল্যবোধ ও বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ করে রাজনৈতিক আদর্শ উদ্ভাবন করতে হবে, বিশ্বব্যবস্থাকেও পুনর্গঠন করতে হবে।

নির্বাচন সুষ্ঠু হোক এটা চাই। কিন্তু রাজনৈতিক চিন্তা সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, সব দলের জন্য সমান সুযোগ, সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এই কথামালার মধ্যে আবদ্ধ থাকুক এটা চাই না। প্রচলিত বিশ্বাসের বদ্ধ দুর্গে আঘাত হানতে হবে। জনগণের সার্বিক কল্যাণে প্রগতিশীল নতুন বিশ্বাসের ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান চাই।

লেখক : সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক, অধ্যাপক

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)