ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট নভেম্বর ২৯, ২০১৯

ঢাকা রবিবার, ৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ১৭ রবিউস-সানি, ১৪৪১

জীবনযাপন চট্টগ্রামের স্কুল শিক্ষিকা হাতবিহীন সুমির জীবন যুদ্ধের গল্প

চট্টগ্রামের স্কুল শিক্ষিকা হাতবিহীন সুমির জীবন যুদ্ধের গল্প

শফিক আহমেদ সাজীব,নিরাপদ নিউজ : যে হাত দিয়ে যাপিত জীবনের সব কাজ করতে হবে, সেই হাত দু’টিই নেই সুমির। দুটি হাত ছাড়াই জন্মেছিলেন সুমি। তারপরও সুমি থেমে যাননি। মায়ের হার না মানা যুদ্ধ আর নিজের মেধা আর অদম্য ইচ্ছা শক্তিতে স্বাভাবিক মানুষের মতো অনেক দূর এগিয়ে গেছেন সুমি।

সুমি এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। একই বিষয়ে অনার্সেও প্রথম শ্রেণি ছিল তার। পড়ালেখা শেষে দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর চাকরির এখন তিনি চট্টগ্রামের কুলগাঁও সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত আছেন। সুমির এবারের লক্ষ্য ৪১ তম বিসিএস। হতে চান প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।

সুমি নিরাপদ নিউজকে শুনিয়েছেন তার জীবন যুদ্ধের গল্প। হাত বিহীন শৈশব কৈশোর তার অন্য দশজন স্বাভাবিক শিশুর মতো ছিলনা।

নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার ফাজিলপুর গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম সুমি’র। বাবা আনোয়ার হোসেন পেশায় কৃষিজীবী, মা আমেনা বেগম গৃহিনী। ৪ ভাই বোনের মধ্যে সুমি দ্বিতীয়। ভাই বোনদের অন্য সবারই জন্মগ্রহণ স্বাভাবিক, ব্যতিক্রম কেবল সুমি। জন্মের পর বড় ভাইকে পড়তে দেখেই পড়ালেখার প্রতি সুমির আগ্রহ। বিষয়টিকে বুঝতে পারেন তার মা।

প্রথমে গ্রামের স্কুলে সুমিকে ভর্তি করতে চাইলেও সুমির হাতবিহীন প্রতিবন্ধকতার কারণে স্কুলের শিক্ষক ও অন্যান্যরা সন্দিহান ছিলো সুমি পড়তে লিখতে পারবে কি-না। কিন্তু সুমি’র মা আমেনা বেগম ছিলেন অবিচল। হাতবিহীন তার কন্যা সন্তানকে পড়ালেখা করিয়ে উচ্চশিক্ষিত করবেন এটাই ছিল তার লক্ষ্য।

সুমি জানান, মায়ের তীব্র আকাঙ্খা, সাহসী ভূমিকার কারণেই তিনি পড়ালেখায় এতোদূর আসতে পেরেছেন। ২০০৭ সালে বেগমগঞ্জ কেবি ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি এবং ২০০৯ সালে নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ থেকে ব্যবসা শিক্ষা বিভাগ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর তার স্বপ্ন ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ভর্তি হওয়া।

নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়া সুমির জন্য ছিল আরেক বড় যুদ্ধ। পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধু বান্ধবদের অনেকেই এতে তাকে নিরুৎসাহিত করলেও সুমি ছিলেন অদম্য। ২০১০-১১ শিক্ষা বর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। ওই সময়ে একটি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল ২২৫ জনের। এই পরীক্ষায় সুমি সফল হন। ভর্তির সুযোগ পান অর্থনীতি বিভাগে। দু হাত ছাড়াই সুমিকে থামানো যায়নি। সব প্রতিদ্বন্দ্বিতা হার মেনেছে সুমি’র মেধা আর ইচ্ছেশক্তির কাছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে সুমি প্রথম শ্রেণিতে অনার্স শেষ করেন ২০১৪ সালে এবং মাস্টার্স শেষ করেন ২০১৫ সালে। দুটি পরীক্ষাতেই সুমি মেধার স্বাক্ষর রেখে প্রথম শ্রেণি অর্জন করেন। মাস্টার্স শেষ করে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের দুটি বৃহৎ শিল্পগ্রুপে এইচ আর এবং মার্চেন্ডাইজিং বিভাগে চাকরি করেন। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে যোগ দেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন কুলগাঁও সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে। তিনি এই স্কুলে অর্থনীতি ছাড়াও ইংরেজী ও অন্যান্য বিষয়ও পড়িয়ে থাকেন।

সুমি জানান, তিনি এখন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলেও তার লক্ষ্য ৪১ তম বিসিএস। এর জন্য তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিসিএস-এ তিনি প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। ভূমিকা রাখতে চান দেশের উন্নয়ন এবং কল্যাণে।

হাতবিহীন সুমিকে উচ্চ শিক্ষিত নারী হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখায় সুমি’র মা আমেনা বেগমকে শ্রেষ্ঠ জয়িতার সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। সম্প্রতি মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা সুমি’র মায়ের হাতে জয়িতা সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান নিরাপদ নিউজকে বলেন, ‘জয়িতা সম্মাননা অনুষ্ঠানে সুমি এবং তার মায়ের জীবন যুদ্ধের গল্প জেনে আমি অভিভুত, বিস্মিত। দুই হাত ছাড়াই সুমি জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা সকল নারীর জন্য অনুপ্রেরণার।

সুমি আগামীতে যাতে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়ে দেশের জন্য কাজ করতে পারে এ ব্যাপারে সাফল্য কামনা করেন তিনি।

কুলগাঁও সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম আহসান উদ্দিন নিরাপদ নিউজকে বলেন, ‘সুমি অত্যন্ত মেধাবী। হাত না থাকার বিষয়টিতে প্রথমে শিক্ষার্থীরা কৌতুহলি থাকলেও পরবর্তীতে বন্ধুত্বপূর্ণ শিক্ষাদান এবং শিক্ষা কার্যক্রমে তার মেধা ও সৃজনশীলতার কারণে সে সবার কাছে জনপ্রিয় শিক্ষক। সে এখন স্কুলে সবার প্রিয় শিক্ষক।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)