ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ফেব্রুয়ারী ৩, ২০১৫

ঢাকা রবিবার, ৬ মাঘ, ১৪২৬ , শীতকাল, ২২ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪১

মতামত দুই দেশের এক নদী : সমরেশ মজুমদার

দুই দেশের এক নদী : সমরেশ মজুমদার

সমরেশ মজুমদার

সমরেশ মজুমদার

ঢাকা, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, নিরাপদনিউজ : চাবাগান থেকে শহরে আসার পথে প্রথম যেদিন তিস্তা নদীকে দেখেছিলাম সেদিন মনে হয়েছিল আদিগন্ত শুধু জল আর জল, ওপারে কি আছে দেখাই যাচ্ছে না। নৌকো যখন শহরের দিকে এগোতে লাগল তখন ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিলাম। প্রায় আধামাইল জুড়ে ফুঁসে ওঠা সাপের মতো ছোবল মারছিল বিশাল ঢেউগুলো। শহরে আমাদের বাড়ি ছিল ওই তিস্তা নদীর ধারে। থাকতে থাকতে তিস্তার চরিত্র বুঝে গেলাম। হিমালয় থেকে দুটি জলের ধারা নামছিল যারা কালিম্পং-এর ওপরে এসে এক হয়ে গেল। একটির নাম রক্ষিত; অন্যটি নারী, নাম তিস্তা।
রক্ষিত জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তিস্ থা?’
অর্থাত, ‘এতদিন কোথায় ছিলে?’
সেই থেকে নাম হয়ে গেল ওই জলধারার। পাহাড়িরা নাম দিল— ‘তিস্তা’। এসব গল্পকথা, তবে ভাবতে মন্দ লাগে না।
তিস্তার শরীর শীর্ণ হতো শীত নামলেই। ছোট হতে হতে সে বয়ে যেত বার্নিশের গা দিয়ে। তখন ওই আধামাইল চরে শুকনো বালি উড়ত, কাশবনে ছেয়ে যেত। তারপর যেই জুন মাস এল, আকাশে মেঘ জমল, তখন এক মাঝ রাত্রে শুনতে পেতাম তিস্তার বুক থেকে বোমা ফাটার শব্দ ভেসে আসছে। ভোর হতেই ছুটে যেতাম তিস্তার পাশে। দেখতাম আধামাইল চওড়া নদীর চরের বালি ভিজে ভিজে হয়ে গেছে। দুপুর গড়াতেই সেই ভিজে বালির ওপর এক ইঞ্চি জল নিচ থেকে উঠে আসত। জানতে পারলাম ওপর দিয়ে জল আসার আগেই নিচের বালির ভেতর দিয়ে জল আসা শুরু হয়। বালির ভেতরে গর্ত থাকলে সেই গর্তে গ্যাস জমলে জলের ধাক্কায় বোমা ফাটার শব্দ হয়। জুলাই মাসে ওপরের জল চলে এলে নদী আবার ভরাট। সেই জল উপচে প্রতি বছর অন্তত তিনবার শহরে বন্যা হয়। শহর বাঁচাতে সরকার বাঁধ তৈরি করলেন। তবু সেই বাঁধ ভেঙে আটষট্টি সালে তিস্তা শহরটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিল। তখন বর্ষায় তিস্তায় নৌকো চলত কিং সাহেবের ঘাট থেকে বার্নিশ পর্যন্ত।
শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম কলকাতায়। কয়েক বছর বাদে ফিরে গিয়ে অবাক হলাম, তখন জুন মাস কিন্তু তিস্তার চরে প্রচুর ঘর বাড়ি তৈরি হয়ে গেছে। ইটের দোতলা বাড়িও চোখে পড়ল। শুনলাম তিস্তা থেকে আশিভাগ জল অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেচক ব্রিজ পার হতেই বিভিন্ন প্রকল্প করে তিস্তাকে দুর্বল করা হয়েছে। তিস্তার বুকে চর পড়েছে; গুল্ম জন্মেছে, ভর বর্ষাতেও তিস্তা বার্নিশের গা দিয়ে কোনোরকমে শীর্ণ চেহারায় বয়ে যাচ্ছে মণ্ডলঘাট পেরিয়ে বাংলাদেশের দিকে।
বর্ষা পার হলে সেই তিস্তায় স্রোত থাকে না বললেই চলে। লোভী মানুষ সাহসী হয়ে সেই নদীর চরটাকে কলোনী বানিয়ে নিয়েছে। তিস্তার ওপর ব্রিজ হয়েছিল অনেক আগে, কিন্তু এমন পরিণতির কথা কখনও ভাবিনি।
বিস্ময় বাড়ল আজ স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরে বাংলাদেশ সরকার সরব হলেন। তিস্তা বাংলাদেশেরও নদী। পানি ছাড়া তো নদী হয় না। সেই নদীতে পানি চাই। তিস্তার সব পানি ভারত দখল করে নিতে পারে না। নদী যখন আন্তর্জাতিক হয় তখন কোনো বিশেষ দেশের অধিকার থাকে না তার সব পানি সরিয়ে নেয়ার!
আমরা দেখলাম, আলোচনার পর ভারত ও বাংলাদেশের সরকার একমত হলেন। তিস্তাচুক্তি হয়ে গেলে বাংলাদেশের মানুষ উপকৃত হবে। মানবিক দৃষ্টিতে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে গিয়েও ওই চুক্তিতে সই করতে পারলেন না। কারণ ভারতের একটি প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আপত্তি করেছেন। পর্যবেক্ষকরা অবাক হলেন, ‘এটাও সম্ভব?’
আর আমরা, সাধারণ মানুষরা, ভাবলাম, যে নদীতে এখন জল বয়ে যায় না সেই নদীর জল দিতে আপত্তির কারণ কি? সেই বিখ্যাত লাইন মনে পড়ল, ‘নেই তাই খাচ্ছ, থাকলে কি করবে? কহেন কবি কালিদাস পথে যেতে যেতে।’
তিস্তাচুক্তি না হওয়াটা যদি স্রেফ আবেগের কারণে হয়, তাহলে বলব, সেই আবেগে অন্ধ স্বার্থপরতা আছে। আমি বলবো, মানুষের কথা ভেবে এই আপত্তি তুলে নেয়া জরুরি। (সংগৃহীত)

লেখক : ভারতের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)