ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ফেব্রুয়ারী ২৪, ২০১৫

ঢাকা মঙ্গলবার, ৬ ফাল্গুন, ১৪২৬ , বসন্তকাল, ২২ জমাদিউস-সানি, ১৪৪১

মতামত পাবলিক কেন নামে না!

পাবলিক কেন নামে না!

পাবলিক কেন নামে না!

পাবলিক কেন নামে না!

চিররঞ্জন সরকার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, নিরাপদনিউজ : আমাদের দেশের পাবলিকই খারাপ। এদের চরিত্র বলে কিছু নেই। প্যাঁদানি খাবে, বাবাগো মাগো বলে চিল্লাবে। এর পর প্যাঁদানি শেষ। অমনি দাঁত কেলিয়ে হাসতে থাকবে। বাঁদরামি শুরু করে দেবে। এরা প্রচণ্ড সুবিধাবাদী। গাছেরটাও খায়, তলারটাও কুড়ায়। এদের বোধবুদ্ধি বলে কিছু নেই। এরা আওয়ামী লীগ-বিএনপির নামে মাতম তোলে। ভোট এলে ভোট দেয়। তারপর সারা বছর গালাগাল করে। আবার ভোট আসে। এক কাপ চা, এক খিলি পান আর এক প্যাকেট বিড়ি পেয়ে এরা অতীত ভুলে যায়। আবার অভ্যস্ত দলের প্রতীকে সিল মেরে ‘কুলাঙ্গার’দেরই জিতিয়ে আনে। আমাদের সমাজে জনতা, জনগণ বা পাবলিক সম্পর্কে এই হলো ‘পাবলিক-পারসেপশান’ বা সাধারণ অভিমত। মজার ব্যাপার হলো- এক পাবলিক আরেক পাবলিকের সংজ্ঞা ও চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়। এ ব্যাপারে সাধারণ পাবলিকও অসাধারণ মত দিয়ে থাকেন! কথা শুনলে মনে হয় যেন কত বড় বুদ্ধিজীবী!
কথা হলো পাবলিক আসলে কারা? আমাদের দেশে এখন তিন ধরনের মানুষের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। প্রথম শ্রেণিতে আছেন, যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। এরা দলের হয়ে সব সময়ই হাততালি দেয়। দল ভালো করলেও জিন্দাবাদ বলে, জঘন্য খারাপ কিছু করলেও জিন্দাবাদ ধ্বনি দেয়। এদের বলা যায় দলবাজ। এই দলবাজদের নিয়ে গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক সমাজ। এর বাইরে একদল ‘গোপাল কলা খায়’ মার্কা মানুষ আছেন, যারা ‘কী করিতে হইবে’ বিষয়ে রেডিও-টেলিভিশনে-সেমিনারে-গোলটেবিল বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। নানা বিষয়ে নসিহত করেন। এরা চমৎকার করে কথা বলেন। ধোপদুরস্ত পোশাক পরেন। রুটি-রুজি নিয়ে তাদের ভাবতে হয় না। কারণ তারা প্রায় সবাই ভালো রোজগার করেন বা করেছেন। এদের অনেকেই আবার ‘অবসরপ্রাপ্ত’। জীবনের তিনকাল আরাম-আয়েশে কাটিয়ে শেষ বয়সে অবসর বিনোদনের উপায় হিসেবে ‘কী করিতে হইবে’ বিষয়ে জ্ঞানদান করতে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এদের অনেকের মনের কোণে একটু পদ-পদবি-সম্মান-পদক-পুরস্কারের মোহও কাজ করে। এই শ্রেণির ব্যক্তিরা নিজেরাই নিজেদের নাম দিয়েছেন- সিভিল সমাজ বা নাগরিক সমাজ বা সুশীল সমাজ। এই রাজনৈতিক সমাজ আর সুশীল সমাজের বাইরে আরও এক শ্রেণির মানুষ আছেন। তারা হলেন আমপাবলিক। সুশীল সমাজ আর রাজনৈতিক সমাজ এদের নাম দিয়েছেন-জনগণ। এই আমপাবলিক বা জনগণকে নিয়েই রাজনৈতিক সমাজ তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালানা করেন। জনগণের দোহাই দিয়ে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যান। জনগণের হয়ে কেউ বা হুঙ্কার ছাড়েন। যদিও জনগণ এসব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না।
পাবলিক বা জনগণও এক আজব চিজ। তারা কারও সাতেও নেই পাঁচেও নেই। আবার তারা সব খানেই আছে। তারা সুশীল সমাজের টিভি টকশো মনোযোগ দিয়ে শোনে। অনেক ক্ষেত্রে সমর্থনও করে। কিন্তু যখন কোন সুশীল ব্যক্তি ভোটে দাঁড়ায় তখন তাকে ভোট দেয় না! ভোট দেয় তাদের, যাদের কারণে দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে, সারা বছর যাদের গালাগাল করে। পাবলিক কখন যে কাকে সমর্থন করে, আর কখন কার উপর ক্ষুব্ধ হয়- এটা গভীর গবেষণার বিষয়। এক জটিল মনস্তত্ত্ব।
তবে রাজনৈতিক সমাজ ও সুশীল সমাজের বাইরে দেশে পাবলিকের সংখ্যাই বেশি। তারা কিল খেয়ে কিল হজম করে। রাজনৈতিক সমাজের একাংশের বদামিতে রাগে ফোঁস ফোঁস করে, কিন্তু গর্জে ওঠে খুব কম। এর অবশ্য কারণও আছে। পাবলিক হলো বাতাসের মত। বাতাস ছাড়া আমরা বাঁচি না। বাতাসের শক্তিও প্রচণ্ড। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা বাতাসের গুরুত্ব খুব একটা অনুভব করি না। এর শক্তিকেও সমীহ করি না। কিন্তু ঝড়ের আভাস পেলে ঠিকই শঙ্কিত হই। পাবলিক ক্ষেপলে যে কী ভয়ানক অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে- সে ব্যাপারে রাজনৈতিক সমাজ অত্যন্ত সচেতন। তাই তারা সারাক্ষণই চেষ্টা করে একে-অপরের বিরুদ্ধে পাবলিককে ক্ষেপিয়ে দিতে। সমস্যা হলো-পাবলিককে গতর খাটিয়ে উপার্জন করে খেতে হয়। তারা রাজনৈতিক সমাজের চালাকির সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। সব সময় চালাকিটা ধরতেও পারে না। পাবলিক যদি নিজেদের রুটি-রুজির ব্যবস্থাটা নির্বিঘ্নে করতে পারে- তাহলে রাজনৈতিক সমাজের খোয়োখেয়ি বা সার্কাস নিয়ে আদৌ মাথা ঘামাতো বলে মনে হয় না। কিন্তু তারপরও ক্ষমতা দখলের নগ্ন যুদ্ধে পাবলিককেই সবচেয়ে বেশি মূল্য গুণতে হয়।
বর্তমান পরিস্থিতির কথাই ভাবুন। পেট্রোল বোমায় মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করে নির্বাচন আদায় এবং ক্ষমতায় বসার যে জঘন্য তামাশা চলছে, তাতে পাবলিকের কোন সায় নেই। সায় থাকার কোন যৌক্তিক কারণও নেই। অথচ রাজনীতির নামে এই হিংস্রতার শিকার পাবলিকরাই হচ্ছে। পাবলিক আছে এখন মহাসংকটে। কোনদিকে তাকাবে, কী করবে- এই ভাবনা ভাবতে ভাবতেই সময় পার করছে। মাসের পর মাস ধরে চলা অনির্দিষ্টকালের হরতাল-অবরোধে কাজকর্মহীন ঘরে বসে সময় পার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
ম্যাডামের ‘গণতন্ত্র রক্ষার’ সংগ্রামে হাত মেলাতে গেলে খুনি রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের দলে নাম লেখাতে হয়। ওদিকে সরকারকে সমর্থন দিলে আবার ‘বাকশালী’ খেতাব জুটে যায়। সরকার তো আছে মহা আরামে। সরকার সব দোষ বিএনপি-জামায়াতের ঘাড়ে দিয়েই খালাস। ক্ষমতাসীনরা প্রতিদিন বলছে, ওরা বোমা মারছে। মানুষ খুন করছে। ওরাইতো রাজনীতিকে পলিটিক্স বানিয়ে দেশের এবং পাবলিকের তেরোটা বাজাচ্ছে। জনগণের উচিত ওদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ওদিকে বিএনপি-জামায়াতওয়ালারাও কম আরামে নেই। তারা মিডিয়ার ঘাড়ে বসে রাজনীতির নামে মানুষ খুনের পলিটিক্স করছে। অজ্ঞাত স্থান থেকে পত্রিকায় বিবৃতি আসে। আর মানুষ মারার, মানুষকে কষ্ট দেয়ার ‘আন্দোলন’ দীর্ঘায়িত হয়। কোথাও কোন নেতা নেই। কর্মী নেই। পেট্রোল বোমা আর ককটেল সাপ্লাইয়ের উপর দিয়ে চলছে ‘আন্দোলন’। কিন্তু পাবলিকের দিন যে কীভাবে যাচ্ছে তা কেউ বুঝতে পারছে না। বুঝতে চাইছেও না।
বিএনপি-জামায়াত পাবলিকের ওপর বোমা মারছে কারণ পাবলিক সরকারের বিরুদ্ধে নামে না কেন? পাবলিক যদি লাখে লাখে কাতারে কাতারে সরকারের বিরুদ্ধে নামে, তাহলে তো এ সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। আর বর্তমান সরকারের পরিবর্তে বিএনপি-জামায়াতওয়ালারা যদি ক্ষমতায় যায় তাহলে আর পাবলিকের ওপর বোমা মারার দরকার হয় না। কাজেই সব দোষ পাবলিকের। হে পাবলিক তোমরা যত দিন এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় না বসাবে ততদিন তোমাদের মরতেই হবে। এর কোন মাফ নাই।
পাবলিকের কপালে সত্যি দুঃখ আছে। এখন যারা ক্ষমতায় যাবার জন্য পাবলিককে বোমা-ককটেলে মারছে, তারা যদি সত্যি সত্যি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যায়, তখন বর্তমান ক্ষমতাসীনরা যদি ক্ষমতা হারিয়ে আবার পাবলিকের উপর বোমা-ককটেল ছুঁড়তে থাকে? আবারও পাবলিক মরবে? পাবলিক মরতেই থাকবে? ক্ষমতায় যাবার জন্য, সংলাপের জন্য, নির্বাচনের জন্য গণতন্ত্রের জন্য পাবলিকের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ আর কতকাল সহ্য করতে হবে?
তবে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, যারা পেট্রোল বোমায় নৃশংসভাবে মানুষ খুন করছে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক সমাজের একাংশ ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। তাদের কথা হলো, যেহেতু ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতা ছাড়ছে না কাজেই পাবলিককে পুড়িয়ে মারা চলবে। এর নাকি কোন বিকল্প নেই। বিকল্প যেহেতু নেই, সরকারও যেহেতু এর প্রতিকার করতে পারছে না, কাজেই পাবলিকের জন্য পুড়ে মরাই নিয়তি!
আমরা ছোটকালে রাক্ষসের গল্প শুনেছি। রাক্ষস মানুষের দেশে পৌঁছে একটি নিয়ম করে দিয়েছিল। রাক্ষসের বাড়িতে প্রতিদিন একজন করে যাবে। রাক্ষস তাকে খেয়ে ‘শান্ত’ থাকবে। আমরা পাবলিকরাও দেশে একটি নিয়ম চালু করতে পারি। প্রতিদিন পাঁচজন বা দশজন করে তথাকথিত আন্দোলনকারীদের বাড়ি গিয়ে আগুনে আত্মাহুতি দিয়ে আসব। তাদের আর কষ্ট করে বোমা-ককটেল ছোঁড়ার জন্য লোক ভাড়া করতে হবে না। যতদিন দেশ পাবলিক শূন্য না হয়- ততদিন এই নিয়ম চলতে থাকবে! পাবলিককে আগুনে পুড়িয়ে মারার জন্য একটি স্থায়ী চুল্লি বানানো যেতে পারে। তথাকথিত আন্দোলনকারীদের প্রধান একটি বেল বা ঘণ্টা বাজিয়ে প্রতিদিন আগুনে ‘পোড়ানো উৎসবের’ উদ্বোধন করবেন। তার সান্ত্রী-সেপাইরা অতঃপর নির্ধারিত পাবলিকদের আগুনের চুল্লিতে নিক্ষেপ করবেন। মিডিয়ায় সরাসরি সেই দৃশ্য দেখানো হবে। বিশ্ববাসী দেখবে আমাদের ‘সোনার বাংলায়’ কীভাবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় যাবার জন্য পাবলিককে সৃজনশীল কায়দায় হত্যা করা হয়। আমাদের দেশের রাজনৈতিক সমাজের একাংশ পাবলিককে উচিত শিক্ষা দিতে চায়। এই শিক্ষা মহান শিক্ষা!
পুনশ্চ : আমার এক নব্যজ্ঞানী বন্ধু সম্প্রতি ফেসবুকে লিখেছে : এতকাল আমরা জেনে এসেছি, দুনিয়ায় নাকি তিন ধরনের মানুষ আছে: ১. শুনে শেখে (নরউত্তম), ২. দেখে শেখে (নর-মধ্যম) এবং ৩. ঠেকে শেখে (নরাধম)। ভেবে দেখলাম, আসলে আরও দুই ধরনের মানুষ দুনিয়াতে আছে। এক, যারা কখনও শেখে না (নরকীট) এবং দুই. যারা নিজে শেখে না এবং অন্যকেও শিখতে দেয় না (নরপশু)। বাংলাদেশের সমাজে নাকি এখন এই ‘নরপশু’র সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
এই লেখার পর একজন লিখেছেন : পশু হলে ভালো হতো; পশু বোমা মারে না। বোমাবাজদের পশু বলা হলে পশুদের অপমান করা হয়!
অপর একজনের মন্তব্য : যারা না শিখেও শেখার ভাব করে, তারা কি?
উত্তর দিয়েছেন আরেকজন, লিখেছেন : এরা নরসুশীল! (সংগৃহীত)

লেখক : কলামিস্ট

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)