ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ২১ মিনিট ১১ সেকেন্ড

ঢাকা বুধবার, ১৮ চৈত্র, ১৪২৬ , বসন্তকাল, ৭ শাবান, ১৪৪১

পরিবেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ পদকে ভূষিত ভ্যালেরি এ. টেইলর

প্রকৃতি সংরক্ষণ পদকে ভূষিত ভ্যালেরি এ. টেইলর

নিরাপদ নিউজ: ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন’ প্রদত্ত ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক-এ ভূষিত হলেন পক্ষাঘাতগ্রস্তদের সেবা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের দিকপাল বাংলাদেশের সেবামাতা ভ্যালেরি এ. টেইলর। মহীয়সী এই নারী ১৯৪৪ সালে ইংল্যান্ডের কেন্ট শহরে টেইলর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শুধু সেবকই নন, নীরবে কাজ করে চলেছেন প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে। ১৯৬৯ সালে একজন শিক্ষানবীশ ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে তিনি প্রথম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডে ফিরে যান। স্বাধীনতার পরে আবার ফিরে আসেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে। মাত্র চারজন রোগী নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের দুটি পরিত্যক্ত গোডাউন সংস্কার করে শুরু করেন চিকিৎসা সেবা। অসংখ্য রোগী আর সেবার সুযোগ কম থাকায় ১৯৭৯ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে সিআরপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালে ঢাকার অদূরে সাভারে সিআরপির স্থায়ী কেন্দ্র স্থাপিত হয়। প্রতিবন্ধীদের সেবা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সিআরপির কর্মকা- বর্তমানে দেশের ১১৫টি উপজেলায় বিস্তৃত। ৪ জানুয়ারি চ্যানেল আই ভবনে জমকালো এক অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে পদক তুলে দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রী মোঃ শাহাব উদ্দিন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন’র চেয়ারম্যান ও ইমপ্রেস গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু এবং ইমপ্রেস গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান, ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লি., চ্যানেল আই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর প্রমুখ। এরপর ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন’র পথচলার এক দশক উপলক্ষে ‘এক দশকে পথচলা’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং ‘প্রকৃতি ও জীবন’র বিশেষ ৩০টি পর্বের একটি পেনড্রাইভের মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় ‘প্রকৃতি মেলা’র উদ্বোধন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং ইমপ্রেস গ্রুপের পরিচালক মুকিত মজুমদার বাবু এবং জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন, পরিবেশবিদ, গবেষক, নিসর্গীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এবারের প্রকৃতি মেলার প্রধান পৃষ্ঠপোষক পিএলজি। মেলায় প্রদান করা হয়েছে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে এনভাইরোমেন্ট সিটি অব দ্যা ইয়ার পুরস্কার। এ পুরস্কার গ্রহণ করেছেন রাজশাহীর মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন এবং সেভ ন্যাচার অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়েছে আরণ্যক ফাউন্ডেশনকে। পুরস্কার তুলে দেন তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদ।
মেলা উদ্ধোধন শেষে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন ‘মানুষ বাড়ার সাথে সাথে মানুষের হিংস্র থাবা প্রকৃতির উপর পড়ছে। যে দেশে মানুষের ঘনত্ব পৃথিবীতে সর্বোচ্চ, সেখানে প্রকৃতি প্রচন্ড হুমকির মুখে। এ ধরণের মেলার মাধ্যমে প্রকৃতি রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে আমরা প্রকৃতির প্রতি যে বৈরী আচরণ করছি তা আমাদের নিজেদের জীবনের জন্যই হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণমাধ্যমের পাশাপাশি সবাইকে পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় কাজ করতে হবে। প্রকৃতি নিয়ে সারা বছর জনসচেতনতা তৈরী করায় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রশংসা করা উচিত বলেও মনে করেন তথ্যমন্ত্রী।’
উদ্যোগক্তা মুকিত মজুমদার বাবু বলেন ‘আমরা বৈরী জলবায়ুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বাঁচতে হবে আমাদের। বাঁচাতে হবে পৃথিবী। এ জন্য আমাদের এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সচেতনতা তৈরি’। আমরা প্রকৃতি ভালবাসি, কিন্তু নানা ব্যস্ততার কারণে প্রকৃতির প্রতি আমাদের ভালবাসা হারিয়ে গেছে। ছোট দেশ হিসেবে আমরা জনসংখ্যা অনেক। একই সাথে জীববৈচিত্র্যও অনেক। এই জীববৈচিত্র্যকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। পরিবেশ বাঁচলে আমরা বাঁচবো কথাটি শত ব্যবস্থার মাঝেও আমাদের মনে রাখতে হবে।’
মেলা দেখতে আসেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলামসহ বিশিষ্টজনেরা। দিনভর মেলায় ছিল প্রকৃতি রক্ষায় সচেতনতাবিষয়ক সঙ্গীত, ক্যারেক্টার শো, জলতরঙ্গ, চিত্রাঙ্কন, গম্ভীরা, কবিগান, পুতুল নাচ, মূকাভিনয়, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও নৃত্য পরিবেশনা। পরিবেশবান্ধব প্রকৃতির সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, নার্সারি, হস্ত ও কুটির শিল্প, নানাপ্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, পিঠা-পুলির স্টল। খ্যাতিমান চিত্রশিল্পীদের পাশাপাশি প্রকৃতি নিয়ে ছবি এ্যাঁকেছে শিশুরা। মেলা শেষ হয়েছে বিকেল ৩.৩০ মিনিটে।
২০১১ সাল থেকে প্রকৃতি সংরক্ষণের অনন্য উদ্যোগ মূল্যায়ন করতে ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন-চ্যানেল আই প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক’ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের বহুমাত্রিক পরিকল্পনা নিয়ে ২০০৯ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন। এ যাবৎ ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক’ পেয়েছেন দ্বিজেন শর্মা, ড. রেজা খান, ইনাম আল হক, ড. আইনুন নিশাত, অধ্যাপক ড. নূর জাহান সরকার, ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ, কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ এবং ড. মিহির কান্তি মজুমদার।
ভ্যালেরি এ. টেইলর পরিচিতি: পক্ষাঘাতগ্রস্তদের সেবা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের দিকপাল ভ্যালেরি এ. টেইলর। বাংলার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন মাতৃত্বের ছায়া নিয়ে। ভ্যালেরি এ. টেইলর শুধু মানুষের দুঃখ-বেদনায় বটবৃক্ষ হননি, ছায়ার মায়া দিয়ে পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণেও অবদান রেখে চলেছেন। এই মহীয়সী নারী ১৯৪৪ সালে ইংল্যান্ডের কেন্ট শহরে টেইলর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে একজন শিক্ষানবীশ ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে তিনি প্রথম তৎকালীণ পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডে ফিরে যান। কিন্তু মাতৃভূমির বন্ধন তাকে আটকে রাখতে পারেনি। ফিরে আসেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে। মাত্র চারজন রোগী নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের দুটি পরিত্যক্ত গোডাউন সংস্কার করে শুরু করেন চিকিৎসা সেবা। অসংখ্য রোগী আর সেবার সুযোগ কম থাকায় ১৯৭৯ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে সিআরপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালে ঢাকার অদূরে সাভারে সিআরপির স্থায়ী কেন্দ্র স্থাপিত হয়। প্রতিবন্ধীদের সেবা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সিআরপির কর্মকা- বর্তমানে দেশের ১১৫টি উপজেলায় বিস্তৃত।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি ভ্যালেরি এ. টেইলর প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে সিআরপি চত্বর করে তুলেছেন মনোলোভা সবুজ। উইলিয়াম ও মেরী টেইলর স্কুলে পরিবেশশিক্ষার প্রসারে শিশুদের পরিবেশবান্ধব খেলনা সরবরাহ করছেন। বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য পরিবেশ শিক্ষাসহায়ক পাঠ্য-পুস্তক বিতরণ করছেন। দেশজুড়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশ সংরক্ষণে নার্সারির মাধ্যমে গাছের চারা উৎপাদন, বিনামূল্যে বিতরণসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুুক্ত হয়ে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ অভিযানে অংশগ্রহণ করছে। পাশাপাশি তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্প, হুইলচেয়ার ও শিশুদের জন্য খেলনা তৈরি হচ্ছে। সিআরপিতে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করা হচ্ছে। বাগান করা, মাশরুম চাষসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের আত্মনির্ভরশীল হতে। ভ্যালেরি এ. টেইলরকে ১৯৯৩ সালে ব্রিটেনের রানী বিশেষ খেতাব ‘Order of the British Empire’ প্রদান করেন। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে নাগরিকত্ব প্রদান করে। ২০০৪ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। পরিবেশ রক্ষায় বর্জ্য রি-সাইক্লিংয়ের জন্য তিনি এইচএসবিসি ক্লাইমেট চ্যাম্পিয়ন এ্যাওয়ার্ড-২০১৭ লাভ করেন।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)