ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ১ মিনিট ৩২ সেকেন্ড

ঢাকা মঙ্গলবার, ৮ মাঘ, ১৪২৬ , শীতকাল, ২৫ জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪১

মতামত, সড়ক সংবাদ প্রসঙ্গ সড়ক দুর্ঘটনা: দায়ী কে?

প্রসঙ্গ সড়ক দুর্ঘটনা: দায়ী কে?

সিরাজুম মুনির, নিরাপদ নিউজ: দায়ী কি শুধুই জনগণ/চালক? নাকি দেশের মহাসড়কগুলোর পরিকল্পনাহীন গড়ে ওঠা ও বর্তমানের বেহাল দশাও সমানভাবে দায়ী?
বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে এ দেশের মহাসড়কগুলোয় গাড়ী চালানোর অভিজ্ঞতা আমার। ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম হয়ে কক্সবাজার কিংবা রাঙামাটি, সিলেট হয়ে জাফলং কিংবা তামাবিল, উত্তরবঙ্গের নীলফামারী কিংবা পঞ্চগড়, যাওয়া হয়েছে অসংখ্য জেলায়।
আমি চালক হিসেবে সচেতন ও সময়ের সাথে সাথে দক্ষ হয়েছি বলেই মনে করি। গাড়ী চালানোর জন্য বোধশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির যে সমন্বয় প্রয়োজন, সেটি আল্লাহ পাকের মেহেরবানীতে আমার আছে।
কিন্তু এ দেশে শুধু এই কয়েকটি বিষয়ে দখলদারিত্ব, একজন চালকের জন্য যথেষ্ট নয়। আরও যেই কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য একজন চালকের থাকা প্রয়োজন সেগুলো হলো,
– দুই লেনের মহাসড়কে (জ্বি, দুই লেনের মহাসড়ক!!! যেমন ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক!) অপরপ্রান্তের চালকের সাথে দারুণ বোঝাপড়া প্রয়োজন। নাহলে মুখোমুখি সংঘর্ষ।
– রাস্তার দু’পাশে অবস্থিত অসংখ্য লোকে লোকারন্য বাজার কিংবা ঘরবাড়ি থেকে ছুটে আসা বিভিন্ন বয়সের মানুষ সামলানো।
– ধানক্ষেত, পাটক্ষেত থেকে উঠে আসা জীবজন্তু তো আছেই।
– রাস্তার অসংখ্য উঁচু-নীচু টিউমার, ভাঙ্গা সব রাস্তার পাশ, অনাকাঙ্ক্ষিত সব গর্ত।
– মহাসড়কে চলাচল করা ঠেলাগাড়ি, রিক্সা, ভ্যান, স্কুটার, ব্যাটারিচালিত রিক্সা, অটোরিকশা ইত্যাদি।
– বাজার এলাকায় অসংখ্যা অচিহ্নিত ডিভাইডার, যা রাতে অদৃশ্যমান।
– সবচেয়ে বড় কারণ, মাত্র দুই লেনের ডিভাইডার ছাড়া মহাসড়ক। যেখানে বিভিন্ন গতির গাড়ী একই লেন ধরে চলাচল করে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এর কোনো শেষ নেই।
ঢাকা সিলেট মহাসড়ক সবচেয়ে বেহাল দশায় আছে এই সবকিছু বিবেচনায়।
আমার এক ছোট ভাই, সাইয়িদ রিমন হাতে ব্যানার নিয়ে অফিস যাওয়া আসার পথে সাধারণ মানুষদের সচেতন করে বেড়ায়। নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এক উদ্যোগ। কিন্তু আমার মতে এটি শুধুমাত্র সচেতনতার অর্ধাংশ কভার করছে। পুরোটা ততদিন কভার করবে না যতদিন না আমাদের দেশে চলাচলের সড়ক, মহাসড়কগুলো আমাদের আশকারা দিয়ে যাবে।
আরেকটু বুঝিয়ে বললে, আমাদের দেশের জনগণ স্বভাবতই নিয়মভঙ্গ, শর্টকাট, তাড়াহুড়োয় অভ্যস্ত। একদিনে তো সবাই সচেতন হবে না। রিমনের মতো এরকম অসংখ্য ছেলে কোটি মানুষের কতজনকে সচেতন করতে পারবে! তাও ধরলাম সে বা তার মতো কয়েকজন, লক্ষ মানুষকে সচেতন করলো। আর বাকিটা তৈরি করতে হবে, ঘরে ঘরে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয়। প্রত্যেক ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ক অধ্যায় পড়ানো হলে, তারাই দেখা যাবে তাদের বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্যদের সচেতন করছে। তখন চক্ষুলজ্জার কারণে হলেও মানুষ নিয়মভঙ্গ করবে তুলনামূলকভাবে কম।
শহরের সব সড়কগুলো কিংবা দেশের মহাসড়কগুলো সাধারণ জনগনদের একপ্রকার উস্কানি দেয়, নিয়ম ভঙ্গের। যেমন ধরুন,
– শহরের অনেক জায়গাতে ডিভাইডার নেই। বড় রডের ডিভাইডার থাকলে জনগণ ওভারব্রীজ কিংবা আন্ডারপাস ব্যবহার করতে বাধ্য। কাওরানবাজার থেকে ফার্মগেটের বড় অংশ, কিংবা মহাখালী থেকে কাকলীর বড় একটা অংশ উৎকৃষ্ট উদাহরণ। যদিও বা অতি নির্লজ্জ জনগণ এসবের মধ্যেও দিয়েও রড কেটে, ভেঙ্গে, নিজের নিকৃষ্ট সৃজনশীলতা প্রদর্শন করেন।
– আবার নেই জনগণকে বাধা দেয়ার কিংবা শাস্তি প্রদানের নিয়ম কানুন। যাও হুজুগে শুরু হয়, সেটিও কয়েকদিনে শেষ।
– পথচারী পার হবার জন্য জেব্রা ক্রসিং, সিগন্যাল অথবা ওয়াকওয়ে নেই শহরের অধিকাংশ স্থানে। মানুষ কি করবে তাহলে!
– এমনকি কোন গাড়ী চলাচলের জন্যও শহরের অধিকাংশ স্থানে সিগন্যাল মেনে চলার নিয়ম নেই। ম্যানুয়াল ট্রাফিক কন্ট্রোল করা হয়। যা কিনা সাধারন মানুষদের কানেক্ট করার সাধ্য নেই।
এরকম বললে হয়তো আরও অনেক উদাহরণ বলা যাবে, যা কমবেশি আমরা সবাই জানি। প্রথমত মানুষদের নিজের বিবেক জাগাতে হবে, দ্বিতীয়ত সড়ক মহাসড়কগুলোকে নিরাপদ করতে হবে। এই দুয়ের সমন্বয় না ঘটলে কখনোই সড়কে মৃত্যুর খেলা থামবে না।
আরও কিছু বিষয়ে আলোকপাত করা যায় যা হয়তো সবাই কমবেশি জানি,
-ড্রাইভার প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদানে বিআরটিএ কে দুর্নীতিমুক্ত করা আরেকটি প্রধান কাজ।
-ফিটনেসবিহীন গাড়ীর অনুমোদন কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা। ফিটনেস ছাড়া চালালে ব্রেকে পা দিলেও গাড়ী থামবে না। তাই এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
-একই রুটে বিভিন্ন কোম্পানির বাস না চালিয়ে পুরো শহরে মানসম্পন্ন সরকারি বাস চালু করা। জানি রাজনৈতিক ক্ষমতাধর অনেকেই তা হতে দিবেন না। তাই সর্ষের ভুত আগে তাড়ানো।
-বাস বে তৈরি করা, যত্রতত্র বাস না থামানো।
-চালকদের নির্দিষ্ট বেতনে নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। ট্রিপ ধরে টাকা দিলে তাড়াহুড়ো থামবে না।
-বালক চালকদের কঠোর হাতে দমন। লেগুনা ভরে গিয়েছে কিশোর চালকে। ট্রাফিক কন্ট্রোলার টাকা খেয়ে চুপ থাকেন। হায়রে দুর্নীতি!
-শহর থেকে সব বাসস্ট্যান্ড সরিয়ে ফেলা। মহাখালি বাসস্ট্যান্ড অপসারণ করে আব্দুল্লাহপুর নিয়ে গেলে ঢাকা শহরের উপর বড় বাসের চাপ দৃশ্যমান হারে কমে যাবে। সাথে দুর্ঘটনাও।
-যখনই কোনো ফ্লাইওভার বা ওভারপাস তৈরি করা হয়, সেটি আরেকটু মাথা খাটিয়ে তৈরি করা। যেমন ধরুন বিজয় স্মরণীর ওভার পাস আরেকটু এগিয়ে সোজা ও ডানে নামিয়ে দিলে যানজট অনেক কমতো। একইভাবে, মগবাজার-মহাখালি ফ্লাইওভার, বনানী ওভারপাস ইত্যাদি শুধু যানজট বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবেই তৈরি হয়েছে। যার আফটারশকের কবলে পরে চালক, যাত্রী সহ পথচারী। কারন যানজট ছাড়তেই প্রতিযোগিতা, তাড়াহুড়ো শুরু।
পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতার আরেকটা উদাহরন দিয়ে লেখাটা শেষ করি। এই যে প্রতিটা দিন আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তার যানজটে কতশত গাড়ী আটকে থাকে। কারন কি কি ভেবেছেন কখনো? আমি ভাবলাম ও ভেবে যা পেলাম তা হলো,
– আব্দুল্লাহপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত পুরোটা রাস্তা চার লেনের হলেও অনেক জায়গায় রাস্তার পাশ ঘেষে ডোবা নালা, অবৈধ দোকানপাট, বৈদ্যুতিক খাম্বা দিয়ে ভরপুর। তাই বেশিরভাগ স্থানে ব্যবহৃত হচ্ছে দুই ধারে দুই লেন। চৌরাস্তা ময়মনসিংহ চারলেন প্রকল্পের সময় আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত টেনে দিলে কি হতো!
– রাস্তার মাঝে ডিভাইডার একেবারে নাম কা ওয়াস্তে। প্রচুর লোকজন এথলেটিক্স প্রদর্শন করে হাই জাম্প, লং জাম্প দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। যার দরুণ গাড়ি চলে খুড়িয়ে খুড়িয়ে।
– গাউছিয়া কিংবা চন্দ্রা মোড়ে ক্রসিং ওভারপাস তৈরি করার পর চেহারাই পাল্টে গিয়েছে এলাকার। কোন যানজট নেই। গাজীপুর চৌরাস্তায় এরকম একটি ওভারপাস করলেই চেহারা আমুল বদলে যেতো। শর্ট টার্ম প্ল্যান বাদ দিয়ে এয়ারপোর্ট টু গাজীপর এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। যার দরুণ ঐ রাস্তায় চলাচল করা একপ্রকার নাভিশ্বাস ওঠার সামিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
-রাস্তার পাড় ঘেষে এতো দোকানপাট, বাজার, গার্মেন্টস, ভাবতেই বিস্মিত হই! তার উপর ডিভাইডার নীচু, ওভারব্রীজ অপর্যাপ্ত। কোনভাবেই কাম্য নয়।
তাছাড়াও ময়লার স্তুপ, ড্রেনের পানি দিয়ে সড়কের একাংশ ভরে গিয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে এইসব সীমাবদ্ধতাগুলো নিয়ে কাজ করলে এক্সপ্রেসওয়ের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু ছিলো সেটাই ভাবনার বিষয়।
এরকম অসংখ্য অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খলতা, দুর্নীতি ও অসচেতনতার বেড়াজালে আটকে আছে সড়কব্যবস্থা। তাই জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন কিংবা সায়্যিদ রিমনের মতো মানুষরা যুগ যুগ ধরে মাইক হাতে সচেতন করেই যাবেন মানুষদের, কিন্তু ফলাফল আসবে খুব ধীরলয়ে।
ততদিনে হয়তো মরবে আরও কয়েক লক্ষ মানুষ, উজার হবে কতশত পরিবার, একেকটা ভবিষ্যত, স্বপ্নের জীবন। আপনি বা আমিও মরতে পারি যে কোন সময়।
আমরা সাধারণ মানুষ প্রতিটা দিন জীবনযুদ্ধে নেমে সন্দিহান থাকি, গন্তব্যে যেতে কত সময় লাগবে, কত টাকা লাগবে, বাস পাবো কি পাবো না, অফিসে লেট হলে চাকরি থাকবে কি থাকবে না, বাচ্চার স্কুলে লেট হলে ঢুকতে দিবে না যখন কি হবে! এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যেনো চারপাশ আঁধার হয়ে জীবন প্রদীপ নিভে যায়। আমাদের পথ চলার জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা দরকার, সুসংহত ব্যবস্থা প্রয়োজন। সামাজিক অসংগতি রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। অন্তত সড়ক মহাসড়ক হোক নিরাপদ।
তাই সরকার ও জনগণ মিলে খুব দ্রুতলয়ে সঠিক পরিকল্পনায় ছক কেটে আগাতে হবে। তাহলেই যদি পরিবর্তন আসে। আমি অন্তত সিগন্যাল অমান্য করি না, ফুট ওভারব্রীজ ছাড়া রাস্তা পার হই না, হুটহাট রাস্তার মাঝে দৌড়ঝাপ করি না, হাত দেখিয়ে গাড়ী থামানোর চেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত রাখি, গাড়ী চালানোর সময় স্থান বুঝে গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি, মোবাইলে কথা বলে বলে অমনোযোগী হওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখি। আপনিও শুরু করুন। নিজের খেয়াল ও পরিবারের খেয়াল তো রাখেনই সবসময়, তাই না? সড়কে নেমে তবে কেন এতোটা উদাসীন হবেন?
নিজেকে প্রশ্ন করুন, নিজেই উত্তর খুঁজুন। কাজে দিবে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে, চলুক। আন্তরিক শুভকামনা রইলো।

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)