ব্রেকিং নিউজ
বাংলা

আপডেট ৩৬ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ , হেমন্তকাল, ৭ রবিউস-সানি, ১৪৪১

উপসম্পাদকীয় ফিলিস্তিন ইস্যুতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বিশ্বশান্তির অন্তরায়

ফিলিস্তিন ইস্যুতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বিশ্বশান্তির অন্তরায়

উপসম্পাদকীয়

ফজলুল হক খান, নিরাপদ নিউজ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন ট্রাম্প।
ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম এই তিন জাতির পবিত্র স্থান জেরুজালেমকে হঠাৎ করে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করায় ফিলিস্তিনসহ পুরো আরব বিশ্বের নেতারা মনে করেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করবে। সৌদি আরব বলেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য এক চরম উসকানিস্বরূপ। ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে পূর্ব জেরুজালেম হবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী এমনটাই ছিল ফিলিস্তিনিদের স্বপ্ন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় তাদের সে স্বপ্ন পুরোপুরি ভেস্তে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা এরইমধ্যে ট্রাম্পকে এই সিদ্ধান্তের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সহিংসতা দেখা দিতে পারে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, জর্দানের বাদশাহ আবদুল্লাহ ও সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান টেলিফোনে ট্রাম্পকে তাঁদের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। কট্টরপন্থী ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস এরইমধ্যে ইনতিফাদা অর্থাৎ বিদ্রোহের হুমকি দিয়েছে। জেরুজালেম মধ্যপ্রাচ্যের একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। প্রাচীন এই শহরটি ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি বিরোধের একদম কেন্দ্রে অবস্থিত।

শুধু এই শহরটি নিয়ে দশকের পর দশক ধরে চলছে সহিংসতা, ঝরছে প্রচুর রক্ত। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই তারা জেরুজালেমের পশ্চিমাংশে দেশের সংসদ ভবন স্থাপন করে। ১৯৬৭ সালে আরবদের সঙ্গে যুদ্ধে জিতে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমও দখল করে নেয় এবং পূর্ব জেরুজালেম শহরটিকে তাদের রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা এটা মানতে নারাজ। কারণ তাদের দাবি পূর্ব জেরুজালেমই হবে তাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী।

ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্মের পটভূমি আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই ইহুদি জাতির অতীত ইতিহাসের প্রতি একটু দৃষ্টি নিবদ্ধ করা প্রয়োজন। মক্কা ও মদিনা থেকে ইহুদিরা বিতাড়িত হওয়ার পর দীর্ঘ ১৩০০ বছর তাদের কোনো আবাসভূমি ছিল না। খাদ্যাভাব ও দারিদ্র্য ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, হাঙ্গেরি, রুমানিয়া, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তারা যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়িয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কি অটোমান রাজ্যের পতনের পর ফিলিস্তিনসহ বেশির ভাগ আরব এলাকা চলে যায় ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ম্যান্ডেটে। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর ইহুদিবাদীদের লেখা এক পত্রে ফিলিস্তিন ভূখন্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিন এলাকায় ইহুদিদের আলাদা রাষ্ট্রের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয় এবং বিপুলসংখ্যক ইহুদি ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপন করতে থাকে।

১৯০৫ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ইহুদির সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। ১৯১৪ সাল থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৯১৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশদের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ২০ হাজারে উন্নীত হয়। এরপর প্রকাশ্যে ইহুদি অভিবাসীদের ধরে এনে ফিলিস্তিনে জড়ো করা শুরু হলে ১৯২৩ সাল নাগাদ ইহুদিদের সংখ্যা ৩৫ হাজারে পৌঁছে যায়। ১৯৩১ সাল নাগাদ এ সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে এক লাখ ৮০ হাজারে উন্নীত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নািস বাহিনীর ইহুদীবিরোধী নৃশংসতার সময় ব্যাপক হারে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে পাড়ি জমায় এবং ১৯৪৭ সাল নাগাদ ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয় লাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনকে দ্বিখন্ড করার প্রস্তাব পাস করে নিজেদের মাতৃভূমির মাত্র ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের আর বাকি ৫৫ শতাংশ ইহুদিদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জনসংখ্যার দিক দিয়ে ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা ইহুদি অভিবাসীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও নিজ মাতৃভূমির মাত্র ৪৫ শতাংশ দেওয়া হয় ফিলিস্তিনিদের, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। পরাশক্তির সহায়তায় ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

মূলত ১৯১৭ সালে উপনিবেশবাদী ব্রিটেন ও বিশ্ব ইহুদিবাদের মধ্যে সম্পর্কের নয়া অধ্যায় শুরু হয়। তখন থেকে তিন দশক ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে ছিল ফিলিস্তিন। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসকরা ফিলিস্তিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব কাঠামো ধ্বংস করে দেয়। এই তিন দশকে বিশ্ব ইহুদিবাদ ফিলিস্তিনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে নেয়। ফিলিস্তিনিদের জমিজমা দখল করে ইহুদিদের জন্য স্থায়ী আবাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ সময় ব্রিটিশ সরকারের মদদে ইহুদিরা গোপনে ‘হাগনাহ’ নামক সন্ত্রাসী সেনাদল গঠন করে। তারা নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের হত্যার মিশনে অংশ নেয় এবং বহু ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে। ১৯৪৮ সালের মে মাসে ফিলিস্তিন থেকে ব্রিটিশ বাহিনী চলে যাওয়ার পর শুরু হয় ইহুদিবাদের দুঃশাসন।

১৯৫০-এর দশকে ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মায়ার বলেছিলেন, ‘ফিলিস্তিনের প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্ম আর ফিলিস্তিনের কথা মনেই করতে পারবে না। ’ কিন্তু ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধে গোল্ডা মায়ারের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ফিলিস্তিনিদের নতুন প্রজন্মও মাতৃভূমি উদ্ধারে সোচ্চার রয়েছে এবং প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েল নামক অবৈধ রাষ্ট্রটি শুধু ফিলিস্তিন নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েল সৃষ্টির পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি ও অবৈধ দখলদারিত্ব জেঁকে বসেছে।

পরাশক্তির সমর্থনপুষ্ট এবং ইসরায়েল নিজেও পারমাণবিক বোমার অধিকারী হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিনকে গ্রাস করার জন্য যুদ্ধের উন্মাদনায় মেতে ওঠে। ফিলিস্তিন জবরদখলের দুই দশক পরেই ১৯৬৭ সালে ইহুদিরা আরব বিশ্বের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। এ সময় ইহুদিবাদী ইসরায়েল জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, পূর্ব বায়তুল মোকাদ্দাস, সিরিয়ার গোলান মালভূমি ও মিসরের সিনাই মরুভূমি দখল করে নেয়। যুদ্ধে এসব আরব ভূখন্ড দখলের পর এসব এলাকায় ইহুদিরা উপশহর নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে। জমি দখলের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের অবশিষ্ট বসতিগুলো একে একে গ্রাস করতে থাকে এবং শহর থেকে গ্রামগুলো বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের শহর ও গ্রামগুলো পরস্পর আলাদা হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনে মুসলিম অধ্যুষিত শহর ও গ্রামের মধ্যে যাতে সেতুবন্ধ গড়ে উঠতে না পারে সে জন্য শহর ও গ্রামের মাঝামাঝি ইহুদি উপশহর নির্মাণ করা হয়েছে। এই উপশহর থেকে শহর ও গ্রামকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইহুদিদের এনে এসব এলাকায় জড়ো করা হচ্ছে এবং ফিলিস্তিনিদের তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিয়ে ইহুদিদের ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সব কিছু হারিয়ে শরণার্থীতে পরিণত হচ্ছে অসংখ্য ফিলিস্তিনি।

ইসরায়েলের এ ধরনের অমানবিক তৎপরতার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ এক ইশতেহারে ১৯৬৭ সালে দখলকৃত ভূখ- থেকে সরে আসতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল জাতিসংঘের ইশতেহারকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে তাদের বসতি নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। এ ছাড়া ২০০২ সালে ইসরায়েল বর্ণবাদী দেয়াল নামে পরিচিত ৭০০ কিলোমিটার দেয়াল নির্মাণ করে ফিলিস্তিন ভূখন্ডের একটা অংশ নতুন করে দখল করে নিয়েছে। দখলদারিত্ব ও অবরোধের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের ওপর মাঝেমধ্যেই ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে ইহুদিবাদীরা। ২০০৮ ও ২০১২ সালের ব্যাপক হামলায় গাজার বিপুল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু নিরপরাধ ফিলিস্তিনি শাহাদাতবরণ করেন। ইসরায়েলিদের দখলকৃত অংশে তথা স্বভূমিতে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের মানবেতর জীবন যাপন, আন্তর্জাতিক নির্দেশ উপেক্ষা করে ইসরায়েলের আগ্রাসন, নিরীহ ফিলিস্তিনিদের নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় ধীরে ধীরে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব গড়ে উঠছে বিশ্বব্যাপী। এরই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং মানবতাবাদী অসংখ্য মানুষ ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব ভূখ- ফিরে পাওয়ার ন্যায়সংগত দাবির প্রতি সমর্থন জোগাচ্ছে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ১৯৬৭ সালে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে ইসরায়েলের আরব ভূখন্ড দখল করে নেওয়া আন্তর্জাতিক আইনে যেখানে সুস্পষ্ট আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত এবং যে কারণে ইউরোপসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ ১৯৬৭ সালের ইসরায়েল-আরব যুদ্ধ-পূর্ব মানচিত্র অনুযায়ী ইসরায়েলের সীমানা প্রত্যাহারের পক্ষে, যেখানে জাতিসংঘের অসংখ্য সম্মেলনে আরব লীগ কর্তৃক উত্থাপিত এবং এশিয়া ও ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ কর্তৃক সমর্থিত ইসরায়েলের সীমানা প্রত্যাহারের বিল বারবার পরাজিত হয়েছে শুধু আমেরিকার ভেটোর কারণে।

আমেরিকার এহেন নগ্ন হস্তক্ষেপ, চরম পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, অন্ধভাবে ইসরায়েলকে সমর্থনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা বারবার বিঘিœত হচ্ছে। ইসরায়েল-আমেরিকার সঙ্গে আরব বিশ্বের বিরোধ ও দ্বন্দ্বের চিরস্থায়ী সমাধান এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প সেই শান্তির পথে পা না বাড়িয়ে উল্টো জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির আগুন জে¦লে দিয়েছেন। এই অশান্তির আগুন কোথায় গিয়ে শেষ হবে কে জানে?
লেখক : গীতিকার, কলাম লেখক

পাঠকের মন্তব্য: (পাঠকের কোন মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষ কোন ক্রমে দায়ী নয়)